মেহরিনের বীরত্বে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

সোনার বাংলা ডেস্ক
২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:২৯

সোনার বাংলা ডেস্ক: রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় শিক্ষিকা মেহরিন চৌধুরীর বীরত্ব ও আত্মত্যাগ এখন দেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছে। প্রাণপণ চেষ্টা করে অন্তত ২০ শিক্ষার্থীকে মৃত্যুর মুখ থেকে রক্ষা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি তার নিজের। এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম। তিনি গত ২৩ জুলাই বুধবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে লেখেন, বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আমার হৃদয়ভরা সমবেদনা। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বহু শিশুর প্রাণহানি ও শিক্ষিকা মেহরিন চৌধুরীর বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ আমাদের সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তিনি নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে যেভাবে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করেছেন, তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার আরও জানান, তিনি নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি লিখে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে সমবেদনা ও সংহতি জানাবেন।
তিনি বলেন, শোকের এ সময়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের ভাই-বোনদের পাশে রয়েছে। আমরা প্রতিটি হারানো প্রাণের জন্য শোকাহত এবং প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা জানাই। গত ২১ জুলাই সোমবার দুপুরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মেহরিনের স্বামীর আহাজারি: আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে নেয়ার আগে বলল, ‘আমার ডান হাতটা শক্ত করে ধরো’। ভাই, হাত ধরা যায় না, সব পুড়ে শেষ। ওই সময় বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘তোমার সাথে আর দেখা হবে না’।’ বিমান বিধ্বস্তের পর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা মেহরিন চৌধুরী নিজের সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। কেন তিনি দুর্ঘটনার পর নিরাপদে সরে এলেন না, স্বামী মনছুর হেলালের এমন প্রশ্নে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিক্ষিকা বলেছিলেন, ‘ওরাও তো আমার সন্তানের মতো, ওদের ফেলে কীভাবে আসি?’ গত মঙ্গলবার (২২ জুলাই) গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকার বগুলাগাড়িতে ওই শিক্ষিকার দাফন সম্পন্ন হয়। ওই সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থার শেষ সময়ে স্ত্রীর সাথে হওয়া কথোপকথনের বিষয়ে জানান মনছুর হেলাল। তিনি বলেন, “আমি মেহরিনকে জিজ্ঞেস করি ‘তুমি কেন এমন করলা?’ সে বলে, ‘আমার বাচ্চারা চোখের সামনে আগুনে পুড়ে মারা যাবে এটা আমি মেনে নিতে পারিনি। আমি কিছু বাচ্চা বের করি, আরো কিছু বাচ্চা বের করার সময় দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে।”
মনছুর বলেন, ‘ভাই, তার পুরো শরীরটা পুড়ে গিয়েছিল। শুধু একটু কথা বলতে পারছিল। পা থেকে মাথা পর্যন্ত সব পুড়ে শেষ। আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে নেয়ার আগে বলল, ‘আমার ডান হাতটা শক্ত করে ধরো’। ভাই, হাত ধরা যায় না, সব পুড়ে শেষ। ওইসময় বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘তোমার সাথে আর দেখা হবে না’।’
স্বামীর হাত ধরে মেহরিন তখন বলছিলেন, ‘আমার বাচ্চাদের দেখো।’ জবাবে মনছুর হেলাল বলেন, ‘তোমার বাচ্চাদের এতিম করে গেলা!’ এদিকে তার মৃত্যুতে নেমে আসে শোকের ছায়া। মেহরিনের নিজের জেলাবাসী তাকে অভিহিত করেছেন ‘গর্ব’ হিসেবে।
মেহরিন চৌধুরীর বাবার বাড়ি নীলফামারী জলঢাকা উপজেলা বগুলাগাড়ী চৌধুরীপাড়ায়। মহিতুর রহমান চৌধুরী ও সাবেরা খাতুন দম্পতির বড় মেয়ে তিনি। শিক্ষাজীবন শেষে ২০০২-০৩ সালের দিকে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত হন মেহরিন চৌধুরী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা মিডিয়াম শাখার তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির কো-অর্ডিনেটর ছিলেন। তার শ্বশুরবাড়ি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার চরআত্রাই গ্রামে। স্বামী মনছুর হেলাল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার। বৈবাহিক জীবনে দুই ছেলেসন্তান আয়ান রশীদ ও আদেল রশীদের মা ছিলেন মেহরিন। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভাতিজি। জিয়াউর রহমানের মা জাহানারা বেগম এবং মেহরিন চৌধুরীর দাদি রওশনারা বেগম ছিলেন আপন বোন।