রাসূল (সা.) প্রদর্শিত লেনদেন পদ্ধতি


২৬ জুন ২০২৫ ১১:১৪

॥ ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস ॥
মানুষের ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। অতীতে সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মানুষকে অভাব, দারিদ্র্যতা, বৈষম্য ও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছিল। মানুষের সৃষ্ট অর্থব্যবস্থার দুর্বিষহ অভিশাপ থেকে নিষ্কৃতি লাভের আশায় মানুষ রাসূল (সা.) প্রবর্তিত লেনদেন পদ্ধতিকে সহজেই গ্রহণ করেছিল। রাসূল (সা.) সমাজে সুদি কার্যকলাপকে পর্যায়ক্রমে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে সাদাকা-খয়রাত করার প্রতি তাগিদ দিয়েছিলেন। কিন্তু সব মানুষ দান-সাদাকা করার সামর্থ্য রাখে না, আবার সব লোক সাদাকা নিতে পছন্দও করেন না। প্রয়োজন পূরণ করার জন্য মানুষের মাঝে ধার-কর্জ বা ঋণ আদান-প্রদানের প্রয়োজন দেখা দেয়। আর এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্জ বা ঋণদান অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল বলে ঘোষণা দিয়েছেন। হযরত ইবনে মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক ঋণই সাদকাহ।’ [বায়হাকী]। অপর এক বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘কোন মুসলিম অপর কোন মুসলিমকে দুবার ঋণ দিলে সে একবার সাদকাহ করার সওয়াব পাবে।’ [ইবনে মাযাহ]।
কর্জ বা ঋণ যেহেতু অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়, তাই এর প্রতি গুরুত্ব না দিলে বা সঠিক লেনদেন পদ্ধতি গ্রহণ না করলে তা কলহ-বিবাদের কারণও হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.)-এর মারফতে আল-কুরআনে ঋণ সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন বা বিধিমালা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। আল-কুরআনের সূরা আল-বাকারার ২৮২ নাম্বার আয়াত যাকে ‘আয়াতুদ দাইন’ বা দেনার আয়াত বলা হয়। এটি আল-কুরআনের মধ্যে সবচেয়ে বড় আয়াত। এ আয়াতে কারীমা হচ্ছে লেনদেন বা ঋণের ওপর একটি আইন সঙ্কলন। এ আয়াতে কারীমায় লেনদেন সম্পর্কিত আইনের জরুরি মূলনীতি জারি করা হয়েছে।
লেনদেনে সময় নির্দিষ্ট করা ও লিপিবদ্ধ করা: লেনদেন সংক্রান্ত মূলনীতি বা আইনের বিধান বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২ নাম্বার আয়াতে কারীমার প্রথমে বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখ।’ আলোচ্য আয়াতে কারীমায় লেনদেন সম্পর্কিত আইনের জরুরি মূলনীতি ব্যক্ত হয়েছে। যাকে চুক্তিনামাও বলা যেতে পারে। এরপর সাক্ষ্য-বিধির বিশেষ ধারা উল্লেখিত হয়েছে। [ফি যিলালিল কুরআন]। আজকাল লেখালেখির যুগ, লেখাই মুখের কথার স্থলাভিষিক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু যদি চৌদ্দশত বছর পূর্বের দিকে তাকাই তখন দুনিয়ার সব কাজ-কারবার ও ব্যবসা-বাণিজ্য মুখে মুখেই চলত। লেখালেখি এবং দলিল-দস্তাবেজের প্রথা প্রচলন ছিল না। সর্বপ্রথম কুরআনুল কারীম এদিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ আয়াতে বলা হয়েছে, হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণ দেওয়া-নেওয়া কর, তখন তা লিখে নাও। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]।
দলিল বা চুক্তি লেখকের মাধ্যমে লিখে নেওয়া: লেনদেনের ব্যাপারে দলিল বা চুক্তি লেখকের করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২নং আয়াতের পরবর্তী অংশে বলেন, ‘আর তোমাদের মধ্যে একজন লেখক যেন ইনসাফের সাথে লিখে দেয়। আল্লাহ যাকে লেখাপড়ার যোগ্যতা দিয়েছেন, সে লিখতে অস্বীকার করবে না।’ এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, আর তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয় এবং আল্লাহ যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন। সেইরূপ লিখতে কোনো লেখক যেন অস্বীকার না করে। আয়াতের এ অংশটি অদ্ভুত। চুক্তি লেখক যে লিখতে পারে, সে যে শিক্ষিত মানুষ হয়েছে, তার কৃতিত্ব আল্লাহ তায়ালা দিচ্ছেন। এখানে তিনি আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, আমরা যে আজকে পড়ালেখা করে শিক্ষিত হয়েছি, পঁচিশ বছর ধরে পড়াশোনা করে আইনজীবী হয়েছি, তার কৃতিত্ব আল্লাহর তায়ালার। তিনি ব্যবস্থা করে না দিলে আজকে আমরা শিক্ষিত হতাম না। ইসলামী দায়িত্ব পালন করার সময় আমরা যেন এ কথা সবসময় মনে রাখি। আজকে আমরা যেই যোগ্যতার বড়াই করি, যেই ডিগ্রি, সার্টিফিকেট পেয়েছি, সেটা শুধু আমাদের নিজেদের অর্জন নয়, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় রেখেছিলেন বলেই তা সম্ভব হয়েছে। [তাফহীমূল কুরআন] ।
কেউ আমাদেরকে ঋণের চুক্তি লিখে দেওয়ার অনুরোধ করলে, তাকে ‘অন্যের কাছে যান, আমি এসব ছোট-খাটো কাজ করি না। আমি একজন ব্যারিস্টার!’ বলে তাড়িয়ে দেওয়ার আগে যেন মনে রাখি যে, আমার যোগ্যতা আল্লাহর তায়ালার অনুগ্রহের ফল। তিনি চাইলে আমাকে যে কোনো সময় পথে বসিয়ে দিতে পারেন। এটা জরুরি যে, তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখবে। এতে একদিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, লেখক কোনো এক পক্ষের লোক হতে পারবে না; বরং নিরপেক্ষ হতে হবেÑ যাতে কারো মনে সন্দেহ-সংশয় না থাকে। অপরদিকে লেখককে ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যের ক্ষণস্থায়ী উপকার করে নিজের চিরস্থায়ী ক্ষতি করা তার পক্ষে উচিত হবে না। এরপর লেখককে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে এ লেখার বিদ্যা দান করেছেন। এর কৃতজ্ঞতা এই যে, সে লিখতে অস্বীকার করবে না। [মা’আরিফুল কুরআন]।
ঋণগ্রহীতার মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণ করা: লেনদেনের ব্যাপারে দলিল বা চুক্তি লেখার সময় ঋণগ্রহীতার করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২ নং আয়াতের পরবর্তী অংশে বলেন, ‘সুতরাং সে যেন লিখে রাখে এবং লেখার বিষয়বস্তু বলে দেবে সেই ব্যক্তি যার ওপর ঋণ চাপছে (অর্থাৎ ঋণ গ্রহীতা)। আর সে যেন তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং পাওনা থেকে যেন সামান্যও কম না দেয়।’ এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, অতএব তার লিখে দেওয়াই উচিত। আর ঋণগ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র কম-বেশি না করে। এখানে ঋণগ্রহীতাকে বোঝানো হয়েছে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং টাকার যেন সঠিক পরিমাণ লিখায়, কম করে যেন না লিখায়। অর্থাৎ চুক্তি লেখার সময় সব শর্ত বলবে ঋণগ্রহীতা, ঋণ দাতা নয়। [তাফসীরে উসমানী] ।
ঋণগ্রহীতা অপারগ হলে অভিভাবকের মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণ করা: ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বা শর্ত বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে দলিল বা চুক্তি লেখা সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তায়ালা আয়াতে কারীমার পরবর্তী অংশে বলেন: ‘কিন্তু ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ বা দুর্বল হয়, অথবা সে লেখার বিষয়বস্তু না বলে দিতে পারে, তাহলে তার অভিভাবক যেন ইনসাফের সাথে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়।’ এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, অনন্তর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বা শর্ত বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লেখায়। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]।
লেনদেনের ব্যাপারে দেনাদার ব্যক্তি কখনো নির্বোধ বা অক্ষম, বৃদ্ধ, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক, মুক অথবা অন্য ভাষাভাষী হতে পারে। এ কারণে দলীলের বিষয়বস্তু বলে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তার পক্ষ থেকে তার কোনো অভিভাবক চুক্তি লেখাবে। যেমন পাগল ও নাবালেগের সব কাজ-কারবার অভিভাবক দ্বারাই সম্পন্ন হয়। মুক ও অন্য ভাষাভাষীর অভিভাবকও এ কাজ সম্পন্ন করতে পারে। যদি তারা কাউকে উকিল নিযুক্ত করে, তাতেও চলবে। এখানে কুরআনুল কারীমের ‘ওলি’ শব্দটি উভয় অর্থই বোঝায়।
লেনদেনের সময় দুজন বিশ্বস্ত সাক্ষী রাখা: লেনদেনের ব্যাপারে দীলল বা চুক্তি লেখার সময় ঋণ দাতা ও গ্রহীতার করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২নং আয়াতের পরবর্তী অংশে বলেন, ‘অতঃপর (লেনদেনের সময়) তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দুজন সাক্ষী রাখ। আর যদি দু’জন পুরুষ না পাওয়া যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষী হিসেবে তোমরা পছন্দ কর। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।’ এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, আর তোমাদের মধ্যে দুজন পুরুষকে (এই আদান-প্রদানের) সাক্ষী কর। যদি দুজন পুরুষ না পাও, তাহলে সাক্ষীদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর তাদের মধ্য হতে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলাকে সাক্ষী কর; যাতে মহিলাদ্বয়ের একজন ভুলে গেলে যেন অন্য জন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। [তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ]।
ফিকাহবিদগণ বলেছেন যে, শুধু লেখা শরিয়ত সম্মত প্রমাণ নয়, তাই লেখার সমর্থনে শরিয়তসম্মত সাক্ষ্য বিদ্যমান না থাকলে শুধু লেখার ওপর ভিত্তি করে ফায়সালা করা যায় না। বর্তমানে সাধারণ আদালতসমূহেও এ রীতিই প্রচলিত রয়েছে। লেখার মৌখিক সত্যায়ন ও তৎসমর্থনে সাক্ষ্য ব্যতীত কোনো ফয়সালা করা হয় না। আয়াতে এরপর সাক্ষ্য-বিধির কতিপয় জরুরি নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। (ক) সাক্ষী দুজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা হওয়া জরুরি। একা একজন পুরুষ অথবা শুধু দুজন মহিলা সাধারণ লেনদেনের সাক্ষ্যের জন্য যথেষ্ট নয়। (খ) সাক্ষী মুসলিম হতে হবে। (গ) সাক্ষী নির্ভরযোগ্য আদিল বা বিশ্বস্ত হতে হবে, যার কথার ওপর আস্থা রাখা যায়। ফাসেক ও ফাজের (অর্থাৎ পাপাচারী) হলে চলবে না। যেখানে সাক্ষী রাখা ইচ্ছাধীন সেখানে মুসলমানরা কেবলমাত্র মুসলমানদের সাক্ষী বানাবে। তবে অমুসলিমদের সাক্ষী অমুসলিমরা হতে পারে। যে কোনো ব্যক্তি সাক্ষী হবার যোগ্য নয়। বরং এমন সব লোককে সাক্ষী করতে হবে, যারা নিজেদের নৈতিক চরিত্র ও বিশ্বস্ততার কারণে সাধারণভাবে লোকদের মধ্যে নির্ভরশীল বলে বিবেচিত হতে হবে। [তাফহীমূল কুরআন]।
লেনদেনে সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে সাক্ষীর বিরক্ত না হওয়া: লেনদেনের ব্যাপারে দলিল বা চুক্তি লেখার সময় সাক্ষীর করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২নং আয়াতের পরবর্তী অংশে বলেন, ‘সাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে, যখন তাদেরকে ডাকা হয়। আর (লেনদেন) তা ছোট হোক কিংবা বড় হোক তা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করতে তোমরা বিরক্ত হয়ো না। এটি আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও প্রমাণের জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার অধিক নিকটতর।’ এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, আর যখন সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়, তখন যেন সাক্ষীরা অস্বীকার না করে। ঋণ ছোট হোক, বড় হোক, তোমরা মেয়াদসহ লিখতে কোনোরূপ অলসতা করো না। এ লেখা আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও সাক্ষ্য-প্রমাণের জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার অধিক নিকটতর। [তাফসীরে ইবনে কাছীর]।
আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, যখন কোনো ব্যাপারে কাউকে সাক্ষী করার জন্য ডাকা হয়, তখন সে যেন আসতে অস্বীকার না করে। কেননা সাক্ষ্যই হচ্ছে সত্য প্রতিষ্ঠিত করার এবং বিবাদ মেটানোর উপায় ও পন্থা। কাজেই একে জরুরি জাতীয় কাজ মনে করে কষ্ট স্বীকার করবে। এরপর আবার লেনদেনের দলিল লিপিবদ্ধ করার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে, লেনদেন ছোট কিংবা বড় হোকÑ সবই লিপিবদ্ধ করা দরকার। এ ব্যাপার বিরক্তিবোধ করা উচিত নয়। কেননা লেনদেন লিপিবদ্ধ করা সত্য প্রতিষ্ঠিত রাখতে, নির্ভুল সাক্ষ্য দিতে এবং সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকতে চমৎকাররূপে সহযোগিতা করে। যদি নগদ লেনদেন হয়। বাকিতে না হয়, তবে তা লিপিবদ্ধ না করলেও ক্ষতি নেই। তবে এ ব্যাপারেও কমপক্ষে সাক্ষী রাখা বাঞ্ছনীয়। কেননা উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো সময় মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। যেমন- বিক্রেতা মূল্যপ্রাপ্তি অস্বীকার করতে পারে কিংবা ক্রেতা বলতে পারে যে, সে ক্রীতবস্তু বুঝে পায়নি। এ মতবিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য কাজে লাগবে। [মা’আরিফুল কুরআন]।
ইচ্ছা হলে নগদ লেনদেন না লিখে রাখা: নগদ লেনদেনের ব্যাপারে করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২নং আয়াতের পরবর্তী অংশে বলেন, ‘তবে তোমরা পরস্পর যে ব্যবসায় নগদ লেনদেন কর, তা না লিখলে তোমাদের কোন দোষ নেই।’ এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, ব্যবসায় যে নগদ আদান-প্রদান কর, তা না লিখলে কোনো দোষ নেই। তোমরা যখন পরস্পর বেচাকেনা কর, তখন সাক্ষী রাখ। অর্থ হচ্ছে, যদিও নিত্যদিনের কেনাবেচার ক্ষেত্রে লেনদেনের বিষয়টি লিখিত থাকা ভালো, যেমন আজকাল ক্যাশমেমো লেখার পদ্ধিত প্রচলিত আছে, তবুও এমনটি করা অপরিহার্য নয়। অনুরূপভাবে প্রতিবেশী ব্যসায়ীরা পরস্পরের মধ্যে রাত দিন যেসব লেনদেন করতে থাকে, সেগুলোও লিখিত আকারে না থাকলে কোনো ক্ষতি নেই। [তাফহীমূল কুরআন]।
ঋণ চুক্তির লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত না করা: লেনদেনের ব্যাপারে দলিল বা চুক্তি লেখার সময় লেখক বা সাক্ষীর সাথে দাতা ও গ্রহীতার করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২নং আয়াতের শেষ অংশে বলেন, ‘আর তোমরা সাক্ষী রাখ, যখন তোমরা বেচাকেনা করবে এবং কোনো লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর যদি তোমরা কর, তাহলে নিশ্চয় তা হবে তোমাদের সাথে অনাচার। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেবেন। আর আল্লাহ সব বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’
আয়াতের শুরুতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন লিখতে ও সাক্ষী দিতে অস্বীকার না করে। এমতাবস্থায় তাদেরকে হয়তো মানুষ বিরক্ত করে তুলতে পারত। তাই আয়াতের শেষ ভাগে বলা হয়েছে, কোনো লেখক বা সাক্ষীকে যেন ক্ষতিগ্রস্ত করা না হয়। নিজের উপকারের জন্য যেন তাদের বিব্রত না করা হয়। এরপর বলা হয়েছে, তোমরা যদি লেখক বা সাক্ষীকে বিব্রত কর, তবে এতে তোমাদের গুনাহ হবে। এজন্য লেখক কিংবা সাক্ষীকে বিব্রত বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হারাম। এ কারণেই ফকীহগণের মতে, লেখক লেখার পারিশ্রমিক দাবি করে কিংবা সাক্ষী যাতায়াত খরচ চায়, তবে এটা তাদের নায্য অধিকার। তা না দেয়াও তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিব্রত করার শামিল। ইসলাম বিচার ব্যবস্থায় সাক্ষীকে সাক্ষ্যদানে বাধ্য করেছে এবং সাক্ষ্য গোপন করাকে কঠোর অপরাধ সাব্যস্ত করেছে। [তাফসীরে জাকারিয়া]।
উপসংহার : ব্যবসা ও লেনদেনে চুক্তিপত্র বা দলিলে লিপিবদ্ধ করা উচিত, যাতে ভুল-ভ্রান্তি অথবা কোনো পক্ষ থেকে অস্বীকৃতির কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়, এজন্য মেয়াদ বা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করতে হবে। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধার-কর্জের লেনদেন বৈধ নয়। চুক্তি লেখার সময় কোনো লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয় এবং আল্লাহ যেরূপ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন। সেইরূপ লিখতে কোনো লেখক যেন অস্বীকার না করে। চুক্তি লেখার সময় সব শর্ত বলবে ঋণগ্রহীতা, ঋণদাতা নয়। দেনাদার ব্যক্তি কখনো নির্বোধ হলে তার পক্ষ থেকে তার কোন অভিভাবক লিখে দেবে। ইসলামে সাক্ষ্য-বিধির জরুরি নীতি হলো- সাক্ষী দুজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা হতে হবে, সাক্ষী নির্ভরযোগ্য বা বিশ্বস্ত হতে হবে। লেনদেনের ব্যাপারে কাউকে সাক্ষী করার জন্য ডাকা হলে, অস্বীকার করা যাবে না। পরস্পরে ব্যবসায় যে নগদ আদান-প্রদান করা হয, তা না লিখলে কোনো দোষ নেই। লেনদেনের ব্যাপারে কোনো লেখক বা সাক্ষীতে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। কেননা এটি বড় ধরনের অপরাধ। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আল্লাহর আইন মেনে রাসূল (সা.) প্রদর্শিত পন্থায় লেনদেন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, পাবনা।