প্রেরণার বাতিঘর শহীদ প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি


২৯ জুলাই ২০২৬ ১৯:৩১

॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
মিশর : নবীদের পদচারণায় ধন্য এক ইতিহাস, সভ্যতার আলোকবর্তিকা
মিশর মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন জনপদ, ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী এবং নবী-রাসূলদের পদচারণায় ধন্য এক পবিত্র ভূখণ্ড। হাজার হাজার বছরের ইতিহাস, জ্ঞান-বিজ্ঞান, রাজনীতি, সভ্যতা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই দেশ শুধু আফ্রিকার নয়, সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। নীল নদের তীরে বিকশিত মিশরীয় সভ্যতা মানবজাতির জ্ঞান, স্থাপত্য, গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিকাশে অসামান্য অবদান রেখেছে।
মিশরের ইতিহাস কেবল ফেরাউনদের রাজপ্রাসাদ, পিরামিড কিংবা সাম্রাজ্যের ইতিহাস নয়; এটি আল্লাহর মনোনীত নবীদের সংগ্রাম, ধৈর্য, ঈমান, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর পরিকল্পনার বাস্তব প্রতিফলনেরও ইতিহাস। পবিত্র কুরআনে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় মিশরের প্রসঙ্গ তুলনামূলকভাবে বেশি এসেছে। হযরত ইউসুফ (আ.) ও হযরত মূসা (আ.)-এর জীবন ও দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এই ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।
হযরত ইউসুফ (আ.) : ধৈর্য, সততা ও নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত
হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন কাহিনী পবিত্র কুরআনের দ্বাদশ সূরাÑ সূরা ইউসুফে ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এ কাহিনীকে ‘আহসানুল কাসাস’, অর্থাৎ সর্বোত্তম কাহিনী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
‘আমি আপনার কাছে এই কুরআন অবতীর্ণ করে সর্বোত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি।’ (সূরা ইউসুফ : ৩)।
হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানুষের ষড়যন্ত্র কখনোই আল্লাহর পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করতে পারে না। ভাইদের হিংসা, কূপে নিক্ষেপ, দাস হিসেবে বিক্রি হওয়া, মিথ্যা অপবাদে কারাবরণÑ প্রতিটি পরীক্ষার পর আল্লাহ তাঁকে আরও উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। অবশেষে তিনি মিশরের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনার সর্বোচ্চ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন এবং দুর্ভিক্ষের সময় দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি জাতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, “ইউসুফ বললেন, ‘আমাকে দেশের ভাণ্ডারসমূহের দায়িত্ব দিন। নিশ্চয়ই আমি একজন বিশ্বস্ত ও জ্ঞানসম্পন্ন রক্ষক।’ অতঃপর আমি ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম; তিনি সেখানে ইচ্ছামতো অবস্থান করতে লাগলেন।” (সূরা ইউসুফ : ৫৫-৫৬)।
হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন থেকে কয়েকটি চিরন্তন শিক্ষা পাওয়া যায়Ñ
আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে সর্বদা শ্রেষ্ঠ।
ধৈর্য (সবর) ও তাকওয়ার ফল একদিন অবশ্যই আসে।
ক্ষমা প্রতিশোধের চেয়ে মহত্তর।
সততা, চরিত্র ও আমানতদারিতা একজন মানুষকে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ আসনে পৌঁছে দিতে পারে।
কঠিন পরীক্ষা অনেক সময় মহান সফলতার সূচনা হয়ে ওঠে।
এই শিক্ষা কেবল ব্যক্তিজীবনের জন্য নয়; রাষ্ট্র পরিচালনা, নেতৃত্ব এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
হযরত মূসা (আ.) এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
হযরত ইউসুফ (আ.)-এর কয়েক শতাব্দী পরে মিশরে আগমন ঘটে হযরত মূসা (আ.)-এর। এ সময় বনী ইসরাইল ফেরাউনের শাসনে নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। ক্ষমতার অহংকার, জুলুম, বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা (আ.)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন।
ফেরাউন ছিল সীমাহীন ক্ষমতার প্রতীক, আর মূসা (আ.) ছিলেন সত্য, ন্যায় ও মুক্তির প্রতীক। এই সংঘর্ষ কেবল দুই ব্যক্তির ছিল না; এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার, ন্যায় ও অন্যায়ের, ঈমান ও অহংকারের এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব।
মিশরের ইতিহাস তাই একদিকে যেমন উন্নত সভ্যতার ইতিহাস অন্যদিকে তেমনি অত্যাচার ও মুক্তির সংগ্রামেরও ইতিহাস। এই ভূমিতেই আমরা দেখি একদিকে ইউসুফ (আ.)-এর ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন; অন্যদিকে ফেরাউনের সীমাহীন স্বৈরশাসন।
অতীত থেকে বর্তমান
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মিশর বারবার রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, বিদেশি শাসন, বিপ্লব ও প্রতিরোধ আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে। কখনো এই দেশ ন্যায়ভিত্তিক শাসনের উদাহরণ স্থাপন করেছে, আবার কখনো স্বৈরশাসন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো আধুনিক মিসরে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থান, ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠা, দীর্ঘ দমন-পীড়ন এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসির উত্থান, ক্ষমতাচ্যুতি ও কারাবন্দি জীবন।
ড. মুহাম্মদ মুরসির জীবন ও সংগ্রামকে বোঝার জন্য তাই মিশরের হাজার বছরের ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একসূত্রে বিবেচনা করা অপরিহার্য। কারণ তিনি কেবল একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন না; তিনি এমন একসময়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যখন মিশর আবারও স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রক্ষমতা এবং জনগণের আকাক্সক্ষার প্রশ্নে ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিল।

॥ দুই॥
মিশর বিজয়, ইসলামী সভ্যতার বিকাশ এবং ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠা : এক নবজাগরণের ইতিহাস
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু বিজয় শুধু ভূখণ্ডের সীমানা পরিবর্তন করেনি; পরিবর্তন করেছে একটি জাতির চিন্তা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গতিপথ। সপ্তম শতাব্দীতে মুসলমানদের মিশর বিজয় ছিল তেমনই এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই বিজয়ের মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের বিস্তারের দ্বার উন্মোচিত হয় এবং মিশর পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে ইসলামী সভ্যতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
মিশর বিজয় : ন্যায়ভিত্তিক শাসনের সূচনা
দ্বিতীয় খলিফা আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে সাহাবী আমর ইবনুল আস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী মিশর অভিযানে অগ্রসর হয়।
এর আগে ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইয়ারমুকের যুদ্ধে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পরাজয়ের ফলে সিরিয়া মুসলিম শাসনের অধীনে আসে এবং মিশর অভিযানের পথ উন্মুক্ত হয়। সে সময় মিশর ছিল পূর্ব রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ।
তৎকালীন শাসকদের উচ্চ করনীতি, ধর্মীয় বৈষম্য এবং প্রশাসনিক নিপীড়নের কারণে স্থানীয় কিবতি (কপটিক) খ্রিস্টানদের একটি বড় অংশ শাসকদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল। এই বাস্তবতা মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রাকে সহজতর করে।
প্রথমে মাত্র চার হাজার সৈন্য নিয়ে অভিযাত্রা শুরু হলেও পরে খলিফা ওমর (রা.) আরও সেনা পাঠান। দীর্ঘ অবরোধের পর বর্তমান কায়রোর নিকটবর্তী ব্যাবিলন দুর্গ মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে। ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের মাধ্যমে কার্যত সমগ্র মিশর মুসলিম শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়।
এই বিজয়ের ফলে মিশরে ইসলামী প্রশাসন, আরবি ভাষা, নতুন শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থার বিকাশ ঘটে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় মিশর কেবল রাজনৈতিক কেন্দ্র নয়; বরং ইসলামী জ্ঞানচর্চা, ফিকহ, তাফসির, হাদিস, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্থাপত্যকলার অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।
ঔপনিবেশিক যুগ : স্বাধীনতার সংকট ও জাতীয় চেতনার জাগরণ
১৫১৭ সালে মিশর উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উসমানীয় শাসনের অংশ থাকলেও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে।
১৮৮২ সালে ব্রিটিশ বাহিনী মিশর দখল করে। যদিও ১৯২২ সালে দেশটি আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা লাভ করে, তবুও ব্রিটিশ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে। স্যুয়েজ খাল, প্রশাসন, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির ওপর ব্রিটিশদের প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
এ সময় মিশরের সমাজে একদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব বাড়তে থাকে; অন্যদিকে রাজনৈতিক দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগও বৃদ্ধি পায়। বহু চিন্তাবিদ উপলব্ধি করেন যে, কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়; নৈতিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক পুনর্জাগরণও অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষাপটেই আবির্ভাব ঘটে বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের।
হাসান আল-বান্না : এক নবজাগরণের স্থপতি
১৯২৮ সালে তরুণ শিক্ষক ইমাম হাসান আল-বান্না ইসমাইলিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন আল-ইখওয়ানুল মুসলিমুন (মুসলিম ব্রাদারহুড)।
তাঁর লক্ষ্য ছিল সমাজে ইসলামের নৈতিক শিক্ষা, চরিত্রগঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, জনসেবা এবং জাতীয় আত্মমর্যাদাবোধ পুনরুজ্জীবিত করা। একইসঙ্গে তিনি বিদেশি ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে মিশরের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিকে জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
প্রথমদিকে সংগঠনটি ছিল একটি সামাজিক ও দাওয়াহভিত্তিক আন্দোলন। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, চিকিৎসাকেন্দ্র, দাতব্য সংস্থা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।
মাত্র দুই দশকের মধ্যে সংগঠনটি মিশরের অন্যতম বৃহৎ গণআন্দোলনে পরিণত হয়।
সংঘাতের সূচনা
সংগঠনের দ্রুত বিস্তার তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।
১৯৪৮ সালে সরকার ইখওয়ানুল মুসলিমিনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। হাজার হাজার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সংগঠনের কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়।
একই বছরে প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ আন-নুকরাশী পাশা নিহত হওয়ার পর সরকার আরও কঠোর দমননীতি গ্রহণ করে। সংগঠনটির বিরুদ্ধে কঠোর নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়।
১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল-বান্না কায়রোয় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। বহু গবেষক ও ঐতিহাসিকের মতে, সে সময়ের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছিল; যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তা অস্বীকার করে।
তাঁর মৃত্যু সংগঠনের জন্য ছিল এক গভীর আঘাত। কিন্তু আদর্শ ও সাংগঠনিক ভিত্তি এতটাই দৃঢ় ছিল যে, প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পরও আন্দোলন থেমে যায়নি।
নাসের যুগ : দমন-পীড়নের দীর্ঘ অধ্যায়
১৯৫২ সালের বিপ্লবের পর প্রথমদিকে ইখওয়ান ও নতুন সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা সংঘাতে রূপ নেয়।
১৯৫৪ সালে প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের ওপর হত্যাচেষ্টার অভিযোগের পর সরকার ইখওয়ানুল মুসলিমিনকে পুনরায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
এরপর শুরু হয় ব্যাপক গ্রেপ্তার, দীর্ঘ কারাবাস, নির্যাতন এবং বিশেষ আদালতে বিচার।
হাজার হাজার নেতা-কর্মী কারাগারে বন্দি হন। বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অনেকেই বছরের পর বছর বিচার ছাড়াই আটক ছিলেন।
এই সময়েই ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ কুতুব বন্দিজীবনে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থসমূহ রচনা করেন। ১৯৬৬ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁর মৃত্যু ইসলামী চিন্তার ইতিহাসে গভীর আলোচিত ও বিতর্কিত এক ঘটনা হয়ে আছে।
সাদাত ও মোবারক আমল : সীমিত সুযোগ, অব্যাহত নিয়ন্ত্রণ
১৯৭০ সালে আনোয়ার সাদাত ক্ষমতায় এসে অনেক রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেন। ইখওয়ান আনুষ্ঠানিক বৈধতা না পেলেও তুলনামূলকভাবে কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পায়।
পরবর্তীকালে হোসনি মোবারকের দীর্ঘ শাসনামলে সংগঠনটি আইনগতভাবে নিষিদ্ধই থাকে। তবু স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং ২০০৫ সালের সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে।
এই সাফল্যের পর আবারও বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন, সংগঠনের সম্পদ জব্দ করা হয় এবং সামরিক আদালতে বিচার পরিচালিত হয়।
আরববসন্ত : ইতিহাসের নতুন মোড়
২০১১ সালের আরববসন্ত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মিশরের লাখো মানুষ কায়রোর তাহরীর স্কয়ারে গণতন্ত্র, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেন।
দীর্ঘ তিন দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগ করেন।
এই পরিবর্তনের পর অনুষ্ঠিত অবাধ নির্বাচনে ইখওয়ানের রাজনৈতিক দল ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি সংসদে উল্লেখযোগ্য বিজয় অর্জন করে।
২০১২ সালে ড. মুহাম্মদ মুরসি গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে আধুনিক মিশরের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এটি শুধু একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক বিজয় নয়; বরং দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবাস, দমন-পীড়ন এবং জনগণের ভোটাধিকারের দাবির একটি ঐতিহাসিক পরিণতি। [চলবে]