যুগে যুগে বহু রাষ্ট্রপ্রধানকেই বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে
২৯ জুলাই ২০২৬ ২০:০১
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
বাংলাদেশে এক ফ্যাসিস্ট প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগ করা এ প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন মো. সাহাবুদ্দিন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে অবৈধ নির্বাচনে গঠিত জাতীয় সংসদ দ্বারা নির্বাচিত অবৈধ প্রেসিডেন্ট ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। গত ২৪ জুলাই শুক্রবার তিনি পদত্যাগ করেন। বিগত ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্বাস্থ্যগত অজুহাত দেখিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে দেন তিনি। পদত্যাগপত্রে স্বাস্থ্যগত কারণ উল্লেখ করলেও তা সঠিক নয়, এখানেও তিনি প্রতারণা করেছেন। প্রকৃত কারণ হচ্ছে সরকারের কঠিন চাপের মুখে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়েন তিনি। আর এ চাপের কারণ হচ্ছে তিনি বঙ্গভবনে অবস্থান করেই বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলেন।
পদত্যাগের পর মো. সাহাবুদ্দিন নির্বিঘ্নে বঙ্গভবন থেকে সরে এসে গুলশানে নিজস্ব বাসভবনে নিরাপদে অবস্থান করছেন। তার নিরাপদ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন থাকত না, যদি তার অতীত কর্মকাণ্ড স্বচ্ছ ও নৈতিক অবস্থান নিষ্কলুষ থাকত। তার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ২০২৪ সালের এ জুলাই মাসেই সারা দেশে গণহত্যা চালানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেও তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকের লাখ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে তার নেতৃত্বে। এ ধরনের একজন অপরাধী যিনি প্রেসিডেন্ট হোন বা প্রভাবশালী হোন, বিচার না করার কোনো সুযোগ কোনো রাষ্ট্র ও সরকারের নেই।
তবে শুধু মো. সাহাবুদ্দিনই নয়, ইতোপূর্বে বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন কারণে পদত্যাগ করতে হয়েছে বা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিরাপদে নির্বিঘ্নে শান্তিতে শেষ জীবন অতিবাহিত করেছেন। আবার কাউকে অতীত অপরাধের জন্য বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে। যেমন বাংলাদেশে স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী তথা রাষ্ট্রপ্রধানরা ক্ষমতায় থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার, গণতন্ত্র হত্যা, নির্বাচনে কারচুপি, ভোট জালিয়াতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণহত্যা ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপকর্মের কারণে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। অনেক রাষ্ট্রপ্রধানকে জেল-জরিমানাসহ বহু বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে এবং অনেককে নির্বাসনেই অপমানকর জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছে।
বিশ্বের ৭৮টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে
বিশ্বের অন্তত ৭৮টি দেশে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী তথা রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের শীর্ষনেতাদের আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং অনেককেই কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছে। বিশ্বের যেসব দেশ ও নেতার বিচারে মুখোমুখি হতে হয়েছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট এরশাদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পাকিস্তানে ইমরান খান, নওয়াজ শরীফ, পারভেজ মোশাররফ ও জুলফিকার আলী ভুট্টো। থাইল্যান্ডের থাকসিন সিনওয়াত্রা ও ইংলাক সিনাওয়াত্রা। দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক গিউন-হে, লি মিয়ং-বাক, চুন দু-হাওয়ান, রো তাই-উ, মালয়েশিয়ায় নাজিব রাজ্জাক, মিয়ানমারে অং সান সু চি এবং ইসরাইলে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ইয়াহুদ ওলমার্ট।
দক্ষিণ আমেরিকায় পেরুর আলবার্তো ফুজিমোরি, পেদ্রো কাস্তিয়ো, আলেহান্দ্রো তোলেদো ওলান্তা হুমালার, বলিভিয়ায় জেনিন আনেজ, ইভো মোরালেস, ব্রাজিলে লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা, মিশেল তেমের, জাইর বলসোনারো এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউরোপে ফ্রান্সে নিকোলাস সারকোজি, জ্যাক শিরাক, ইতালিতে সিলভিও বেরলুসকোনি, ইউক্রেনে ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ, ইউলিয়া তিমোশেঙ্কো ও রোমানিয়ায় নিকোলাই চসেস্কু, ইয়ন অ্যান্টোনেস্কু। আফ্রিকা মহাদেশে দক্ষিণ আফ্রিকায় জ্যাকব জুমা, মিশরে হোসনি মোবারক, সুদানে ওমর আল-বশির, লাইবেরিয়ায় চার্লস টেলর ও তিউনিসিয়ায় জাইন আল-আবেদীন বিন আলীসহ বিশ্বের অনেক দেশের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রপ্রধানকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
তাদের অধিকাংশই ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্বাচনী জালিয়াতি, যুদ্ধাপরাধ, রাষ্ট্রদ্রোহিতা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধ করেছেন। এসব গুরুতর অপরাধের কারণেই প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মতো রাষ্ট্রনায়কদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপ্রধানদের দায়মুক্তি, বিচার ও শাস্তি
রাজনৈতিক বিজ্ঞানে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তথা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের অপরাধ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচার করার পক্ষে এবং বিপক্ষে সুদীর্ঘ পর্যালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। কোনো কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তাদের দায়মুক্তি দিতে বলেছেন আবার কেউ কেউ তাদের বিচারের আওতায় আনার কথা বলেছেন। যেসব রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানদের বিচারের পক্ষে মতামত দিয়েছেন, তাদের মূল যুক্তি হলো ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা’, ‘জবাবদিহি (Accountability)’ এবং ‘ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ (Deterrence)’ করতে হলে অপরাধী রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের বিচারের পক্ষে মতামত দেওয়া উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্যাথরিন এ. সিকিঙ্ক তাঁর বিখ্যাত বই ‘The Justice Cascade’-তে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আদালতগুলোয় সাবেক শীর্ষনেতাদের বিচারের মুখোমুখি করার একটি বিশ্বব্যাপী আবেদন তথা দাবি উঠেছে। সিকিঙ্ক যুক্তি দিয়েছেন যে, সাবেক স্বৈরাচারী বা মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী নেতাদের বিচার করলে সমাজে অপরাধের শাস্তি না পাওয়ার যে সংস্কৃতি (Impunity) থাকে তা উঠে যায়। এর ফলে পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসা নেতারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে ভয় পান এবং দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন শক্তিশালী হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এলেন এল. লুটজ এবং ক্যাটলিন রিগার (Ellen L. Lutz & Caitlin Reiger) তাঁদের সম্পাদিত বই ‘Prosecuting Heads of State’-এ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানদের বিচারের কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁরা মনে করেন, সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানদের বিচার কেবল রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়; বরং বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোর জন্য এটি জরুরি। বিশেষ করে দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধে শীর্ষনেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক গ্যারি জোনাথন বাস তাঁর বই ‘Stay the Hand of Vengeance: The Politics of War Crimes Tribunals’-এ আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিচারিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করে যুক্তি দিয়েছেন যে, সাবেক নেতাদের বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করে ছেড়ে দিলে বা গণহারে ক্ষমা করে দিলে দেশে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ তৈরি হয়। এর চেয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার করা অনেক বেশি স্থিতিশীলতা আনে এবং রাজনৈতিক রক্তপাত ও প্রতিশোধের চক্র বন্ধ করে।
আইন বিশেষজ্ঞ হুন জুন কিম তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, যেসব দেশে সাবেক নেতাদের অপরাধের বিচার বা ট্রুথ কমিশন গঠন করা হয়েছে, সেসব দেশে পরবর্তীতে গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব এবং নতুন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বহুলাংশে কমেছে।
বিচার করার পক্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের যুক্তি
আইনের চোখে সবাই সমান (Equality before the Law) : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো পদই অপরাধ করার পর পার পাওয়ার ঢাল হতে পারে না। রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন বলেই ছাড় দেওয়া হলে তা আইনের শাসনের মূলনীতিকে আঘাত করে।
প্রতিরোধমূলক প্রভাব (Deterrence Effect) : বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শাসকদের বার্তা দেওয়া যে, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় অমানবিক বা অবৈধ কাজ করলে মেয়াদ শেষে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায়বিচার (Justice for Victims) : সাবেক শাসকদের দ্বারা যেসব সাধারণ মানুষ বা রাজনৈতিক দল নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের মানসিকভাবে ও সামাজিকভাবে ন্যায়বিচার প্রদান করা।
ইনস্টিটিউশনাল রিফর্ম বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার : দুর্নীতিগ্রস্ত সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের বিচার বিচার বিভাগকে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
অবশ্য এর বিপরীতে কিছু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী যেমন স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন মনে করেন যে, গণতন্ত্রে উত্তরণের সময় সাবেক শাসকদের বিচার করতে গেলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক অভ্যুত্থানের ঝুঁকি থাকে, তাই কখনো কখনো তাদের ক্ষমা বা আপসের পথ বেছে নেওয়া হয়। তবে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের বড় একটি অংশ জবাবদিহি ও বিচারের পথকেই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার জন্য সেরা মনে করেন।
ইসলামের ইতিহাসেও রাষ্ট্রপ্রধানদের বিচারের সম্মুখিন হতে হয়েছে
শুধু আধুনিক বিশ্বেই নয়, ইসলামের ইতিহাসেও আইনের শাসন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার অনন্য উদাহরণ হিসেবে বেশ কয়েকজন মহান শাসক বা খলিফাকে সাধারণ নাগরিকের মতোই আদালতের কাঠগড়ায় বা বিচারকের সামনে জবাবদিহির জন্য দাঁড়াতে হয়েছিল। পরবর্তীতে আব্বাসীয় যুগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুগে মুসলিম শাসক তথা খলিফাদেরও আদালতে বিচারকের সামনে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) এক বেদুইনের কাছ থেকে একটি ঘোড়া কেনেন। কিছুক্ষণ পর ঘোড়াটি খুঁড়িয়ে চলতে শুরু করলে তিনি সেটি ফেরত দিতে চান। বিক্রেতা তা নিতে অস্বীকৃতি জানালে বিরোধ মীমাংসার জন্য তাঁরা তৎকালীন বিখ্যাত কাজি শুরাইহ-এর আদালতে যান। কাজী শুরাইহ খলিফার বিপক্ষে এবং সাধারণ বেদুইনের পক্ষে রায় দেন। অর্ধপৃথিবীর শাসক হওয়া সত্ত্বেও ওমর (রা.) সানন্দে সেই রায় মেনে নেন এবং বিচারকের নিরপেক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কুফার প্রধান বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন।
ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর একটি মূল্যবান বর্ম হারিয়ে যায়, যা পরে এক অমুসলিম (ইহুদি বা খ্রিস্টান মতান্তর) নাগরিকের কাছে পাওয়া যায়। খলিফা জোর করে বর্মটি না নিয়ে বিষয়টি সুরাহার জন্য কাজি শুরাইহ-এর আদালতে হাজির হন। আদালতে খলিফা তাঁর নিজের দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত আইনি প্রমাণ বা সাক্ষী উপস্থাপন করতে না পারায় কাজী শুরাইহ রাষ্ট্রপ্রধানের বিপক্ষে এবং অমুসলিম নাগরিকটির পক্ষে রায় দেন। নিজের দেশের আদালতের এই অবিশ্বাস্য ইনসাফ ও খলিফার বিনম্রতা দেখে সেই ব্যক্তি স্তম্ভিত হয়ে যান এবং পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র বা খলিফাদের একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিচার বিভাগের স্বাধীন মর্যাদা এবং শরিয়া আইনের প্রাধান্য রক্ষায় কাজি তথা বিচারকদের ভূমিকা ছিল অনন্য। সাধারণ মানুষের অভিযোগের জবাবে একাধিকবার ক্ষমতাধর খলিফা ও প্রশাসনিক গভর্নরদেরও বিচারের কাঠগড়ায় এসে বিচারকের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আব্বাসীয় আমলে বিচার বিভাগ বেশ সুসংগঠিত করা হয় এবং ‘কাজি আল-কুজাত’ তথা প্রধান বিচারক পদের সৃষ্টি করা হয়।
খলিফা আল-মনসুর ও বিচারক শুরিক : আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা খলিফা আবু জাফর আল-মনসুরের বিরুদ্ধে এক সাধারণ উট ব্যবসায়ী বা ঠিকাদার পাওনা আদায়ের মামলা করেন। বিচারক শুরিক ইবনে আবদুল্লাহ খলিফাকে সাধারণ নাগরিকের মতো বিচারকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন। মনসুর আদালতে হাজির হন এবং বিচারক খলিফার বিপক্ষে এবং সাধারণ নাগরিকের পক্ষে রায় প্রদান করেন। মনসুর বিচারকের এই নিরপেক্ষতা দেখে তাঁকে পুরস্কৃত করেছিলেন।
খলিফা আল-মাহদি ও কাজি আবু ইউসুফ : খলিফা আল-মাহদির আমলে এক সাধারণ ব্যক্তি খলিফার বিরুদ্ধে জমি দখলের মামলা করেন। প্রধান বিচারক ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) খলিফাকে আদালতে ডেকে পাঠান। খলিফা সাক্ষী উপস্থাপন করতে না পারায় বিচারক জমিটি সাধারণ নাগরিকের অনুকূলে ফিরিয়ে দেন। সংবিধানের অধীনেই সাহাবুদ্দিনের বিচার হতে পারে
কিন্তু বর্তমান সরকার সদ্য পদত্যাগী ফ্যাসিস্ট প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের মারাত্মক ও জঘন্য অপরাধগুলোকে যেন বেমালুম চেপে যাওয়ার চিন্তা করছে। কিন্তু আইনের শাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হলে অপরাধী রাষ্ট্রপতি হোক বা সাধারণ মানুষ হোক, যে কাউকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ব্যক্তিগত কোনো অপরাধ করে থাকলে সে বিষয়ে মামলা দায়ের, অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচারে কোনো বাধা দেখছেন না দেশের বিশিষ্ট কয়েকজন আইনজীবী। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ও পরে তার যে কোনো ফৌজদারি ও দেওয়ানি অপরাধের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। তাদের মতে, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার মেয়াদকালের কর্মকাণ্ডকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে এ পদে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের বাইরে যদি তিনি ব্যক্তিগত অপরাধ করে থাকেন, তাহলে সেই অপরাধের বিচার হতে পারে। তারা উদাহরণ হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জেল খাটার প্রসঙ্গ সামনে আনেন। আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগের পর তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল, দুর্নীতির মামলায় দণ্ডও হয়।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক একটি দৈনিক পত্রিকাকে বলেন, ৫১(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে পূর্ণ দায়মুক্তি দেয় না। দুর্নীতি, ফৌজদারি অপরাধ বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধ এই সুরক্ষার আওতায় পড়ে না। ফলে সাবেক রাষ্ট্রপতিকেও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা সম্ভব।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংসদ-সদস্য জয়নুল আবেদীন বলেন, ৫১ অনুচ্ছেদ সব কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে পূর্ণ দায়মুক্তি দেয় না। দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরের কাজ, দুর্নীতি, ফৌজদারি অপরাধ বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধ এই সুরক্ষার আওতায় পড়ে না। ফলে দাপ্তরিক সীমার বাইরে থাকা কাজের জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতিকেও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা সম্ভব।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের আগের অপরাধের বিচার করতে কোনো বাধা দেখছেন না আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি একটি দৈনিক পত্রিকাকে বলেন, সংবিধানে রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু পদে থাকার আগে এবং পরে সংঘটিত কোনো অপরাধের কথা উল্লেখ নেই। অতএব সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কোনো বাধা দেখছি না।
গণপ্রত্যাশা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
দেশে যদি গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, রাজনীতিক, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পপতি থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি-পেশার যে কেউ অপরাধ বা আইন ভঙ্গ করলে তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে উঁচু-নিচু, ধনী-গরিব, সাদা-কালো, ক্ষমতাসীন-ক্ষমতাহীন, সরকারি-বেসরকারি, আমলা-বেআমলা, সামরিক-বেসামরিক অর্থাৎ কোনো জাত শ্রেণি-পেশার পরিচয় না দেখে যখন বিচার করা হবে, তখনই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হতে পারে। আর এভাবেই গড়ে উঠবে রাষ্ট্র, সরকার ও প্রশাসনে জবাবদিহির সংস্কৃতি; প্রতিষ্ঠিত হবে মানবাধিকার, জনগণের ভোটাধিকার, গণতন্ত্র এবং ফিরে আসবে স্থিতিশীলতা ও সম্ভব হবে ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ। বর্তমান সরকার ফ্যাসিস্ট মো. সাহাবুদ্দিনের বিচার করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেÑ এটাই সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com