হিংসা : ব্যক্তি ও সমাজের নীরব ঘাতক


২৯ জুলাই ২০২৬ ১৯:৩৯

॥ এস এম মাহমুদ হাসান ॥
মানুষের অন্তরে এমন কিছু অনুভূতি রয়েছে, যা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে জীবন সুন্দর ও অর্থবহ হয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারালে তা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা তেমনই একটি ধ্বংসাত্মক মানসিক ব্যাধি। এটি এমন এক অদৃশ্য আগুন, যা অন্যের ক্ষতি করার আগে হিংসুক ব্যক্তির নিজের হৃদয়কেই জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। বাহ্যিকভাবে একজন মানুষ যতই হাসি-খুশি থাকুক না কেন, যদি তার অন্তরে হিংসা বাসা বাঁধে, তবে সে কখনো প্রকৃত শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করতে পারে না। আজকের পৃথিবীতে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে, প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটেছে, যোগাযোগের দূরত্ব কমে এসেছে; কিন্তু একইসঙ্গে বেড়েছে মানুষে মানুষে তুলনা, প্রতিযোগিতা এবং মানসিক অস্থিরতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সুখ, সাফল্য, বিলাসবহুল জীবন কিংবা অর্জন দেখে অনেকেই নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করেন। ধীরে ধীরে জন্ম নেয় অসন্তোষ, অতৃপ্তি এবং হিংসা। ফলে সমাজে স¤পর্কের অবনতি, পরনিন্দা, ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ ও পার¯পরিক অবিশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হিংসা কী?
বাংলা ভাষায় ‘হিংসা’ বা ‘পরশ্রীকাতরতা’ বলতে বোঝায় অন্যের সুখ, স¤পদ, সম্মান, জ্ঞান, সৌন্দর্য বা সাফল্য দেখে কষ্ট পাওয়া এবং মনে মনে কামনা করা যে, সে যেন এই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়। ইসলামী পরিভাষায় একে ‘হাসাদ’ বলা হয়। ইমাম রাগিব আল-ইস্পাহানী (রহ.) বলেন, ‘হাসাদ হলো অন্যের কোনো নিয়ামত বিলুপ্ত হয়ে যাক এমন কামনা করা, যদিও তা নিজের কাছে না আসে।’ এটিই হিংসার প্রকৃত পরিচয়।
হিংসা কেন জন্ম নেয়?
হিংসার প্রধান কারণ মানুষের অন্তরের দুর্বলতা। যে ব্যক্তি নিজের প্রতি সন্তুষ্ট নয়, আল্লাহর ফয়সালার ওপর আস্থা রাখে না এবং সবসময় নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে, তার অন্তরে সহজেই হিংসা জন্ম নেয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, হিংসার অন্যতম কারণ হলো হীনম্মন্যতাবোধ বা ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স। যখন একজন ব্যক্তি মনে করেন যে, তিনি অন্যদের তুলনায় কম সফল, কম সুন্দর, কম জনপ্রিয় বা কম যোগ্য, তখন অন্যের উন্নতি তাকে আনন্দ না দিয়ে কষ্ট দেয়। আবার নিরাপত্তাহীনতাও হিংসার একটি বড় কারণ। অনেকেই মনে করেন, অন্যের সাফল্য মানেই নিজের গুরুত্ব কমে যাওয়া। ফলে সহকর্মীর পদোন্নতি, বন্ধুর ব্যবসায়িক সফলতা কিংবা আত্মীয়ের সামাজিক মর্যাদা তাকে মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে। বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হিংসার প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ সেখানে জীবনের কেবল সুন্দর দিকগুলোই তুলে ধরে। ফলে দর্শকের মনে হয়, অন্য সবাই সুখে আছে, শুধু সে-ই পিছিয়ে। এই ভুল ধারণা থেকে জন্ম নেয় হতাশা, অতৃপ্তি এবং হিংসা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতা, রিজিক, সৌন্দর্য ও সুযোগ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেকের পরীক্ষা আলাদা, দায়িত্বও আলাদা। কিন্তু মানুষ যখন আল্লাহর এই প্রজ্ঞাপূর্ণ বণ্টনকে মেনে নিতে পারে না, তখনই হিংসার সূচনা হয়। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা কি মানুষের প্রতি এজন্য হিংসা করে যে, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ তাদের দান করেছেন?’ (আন-নিসা : ৫৪)। এই আয়াত ¯পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, হিংসা মূলত আল্লাহর ফয়সালার প্রতিই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে হিংসা
ইসলাম মানুষের অন্তরকে পবিত্র করার ধর্ম একটি ব্যবস্থা । এটিবাহ্যিক ইবাদতের পাশাপাশি অন্তরের রোগ থেকেও মুক্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। হিংসাকে ইসলাম অত্যন্ত ঘৃণিত চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের প্রতি হিংসা করো না, একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, সম্পর্ক ছিন্ন করো না। বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো।’ (সহিহ মুসলিম)। এই হাদিসে হিংসাকে শুধু একটি ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে নয়, বরং মুসলিম সমাজের ঐক্য বিনষ্টকারী ব্যাধি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আরেকটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে গ্রাস করে, যেমন আগুন শুকনো কাঠকে ভস্ম করে দেয়।’ (আবু দাউদ)। এই হাদিস আমাদের সতর্ক করে যে, হিংসা শুধু মানসিক শান্তিই নষ্ট করে না, বরং বহু বছরের ইবাদত ও সৎকর্মের সওয়াবও ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তবে ইসলাম একটি বিষয়কে ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেটি হলোÑ ‘গিবতাহ’ বা ইতিবাচক ঈর্ষা। নবী সা. বলেছেন, ‘দুই ব্যক্তিকে ছাড়া অন্য কারো ব্যাপারে ঈর্ষা (গিবতাহ) করা বৈধ নয়, একজন, যাকে আল্লাহ স¤পদ দিয়েছেন এবং সে তা সত্যের পথে ব্যয় করে; আরেকজন, যাকে আল্লাহ কুরআনের জ্ঞান দিয়েছেন এবং সে তা অনুযায়ী আমল করে ও অন্যদের শিক্ষা দেয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)। অর্থাৎ অন্যের কল্যাণ দেখে নিজেও সেই কল্যাণ অর্জনের আকাক্সক্ষা করা প্রশংসনীয়; কিন্তু অন্যের নিয়ামত ধ্বংস হয়ে যাক এমন কামনা করা হারাম। আবার সূরা ফালাকে আল্লাহ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, ‘আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে। (ফালাক : ৫)। এখানে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ হিংসুক ব্যক্তি প্রায়ই অপবাদ, গীবত, ষড়যন্ত্র, কুৎসা রটনা কিংবা অন্যের ক্ষতির পরিকল্পনায় লিপ্ত হয়।
ইতিহাসের পাতায় হিংসার ভয়াবহতা
মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অসংখ্য যুদ্ধ, হত্যাকাণ্ড, ষড়যন্ত্র ও পারিবারিক বিভেদের পেছনে হিংসা অন্যতম প্রধান কারণ। মানুষ যখন অন্যের প্রাপ্তি মেনে নিতে পারে না, তখন তার বিবেক অন্ধ হয়ে যায়। ফলে ন্যায়-অন্যায়ের বোধ হারিয়ে গিয়ে সে এমন অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে, যা একসময় সে নিজেও কল্পনা করেনি। হিংসার প্রথম ও সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ইবলিসের ঘটনা। আল্লাহ তায়ালা যখন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সিজদা করার নির্দেশ দিলেন, তখন সবাই আদেশ পালন করলেও ইবলিস অহংকার ও হিংসায় অন্ধ হয়ে অস্বীকার করল। সে বলল, আমি তার চেয়ে উত্তম; আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। (আরাফ : ১২)। এই অহংকার, হিংসা ও অবাধ্যতাই তাকে আল্লাহর রহমত থেকে চিরতরে বিতাড়িত করল। তাই বলা যায়, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ধ্বংসাত্মক হিংসার প্রকাশ ঘটেছিল ইবলিসের মাধ্যমে। এরপর আসে হাবিল ও কাবিলের ঘটনা। আল্লাহ তায়ালা দুই ভাইয়ের কুরবানি গ্রহণের পরীক্ষা নিলেন। হাবিলের কুরবানি কবুল হলো, কিন্তু কাবিলেরটি হলো না। কাবিল নিজের ভুল সংশোধন না করে ভাইয়ের প্রতি হিংসা পোষণ করল। শেষ পর্যন্ত সে নিজের ভাইকে হত্যা করল। এটাই মানব ইতিহাসের প্রথম হত্যাকাণ্ড। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তার প্রবৃত্তি তাকে তার ভাইকে হত্যা করত উদ্বুদ্ধ করল। অতঃপর সে তাকে হত্যা করল এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। (মায়েদা : ৩০)। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো নবী ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের কাহিনী। তারা পিতার ভালোবাসায় ইউসুফ (আ.)-কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে মনে করে হিংসায় আক্রান্ত হয়। সেই হিংসা তাদের ছোট ভাইকে কূপে নিক্ষেপ করার মতো জঘন্য কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পরে তারা নিজেদের ভুল উপলব্ধি করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। ইতিহাসে রাজা-বাদশাহদের মধ্যকার ক্ষমতার লড়াই, ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তপাত; এমনকি আধুনিক রাজনীতি ও ব্যবসায়িক জগতের অসংখ্য ষড়যন্ত্রের পেছনেও হিংসার ভূমিকা সু¯পষ্ট।
হিংসার বহুমাত্রিক ক্ষতি
হিংসার ক্ষতি শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। যেমন-
১. আত্মিক ক্ষতি : হিংসা ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। হিংসুক ব্যক্তি আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। ফলে তার অন্তর থেকে তাওয়াক্কুল, কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টি হারিয়ে যায়। ইবাদতের স্বাদ কমে যায় এবং দোয়ায় একাগ্রতা নষ্ট হয়।
২. মানসিক ক্ষতি : হিংসুক মানুষ কখনো সুখী হতে পারে না। অন্যের সাফল্যে সে আনন্দিত হতে পারে না, আবার নিজের অর্জনেও তৃপ্তি পায় না। তার জীবন কাটে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, রাগ ও হতাশার মধ্যে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিনের হিংসা একজন মানুষের উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসহীনতার কারণ হতে পারে।
৩. শারীরিক ক্ষতি : অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে উচ্চরক্তচাপ, অনিদ্রা, মাথাব্যথা, হজমের সমস্যা এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক আবেগকে শরীরের জন্য ক্ষতিকর বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
৪. পারিবারিক ক্ষতি : অসংখ্য পরিবারে ভাই-বোনের বিরোধ, স¤পত্তি নিয়ে মামলা, আত্মীয়তার স¤পর্ক ছিন্ন হওয়ার পেছনে হিংসা বড় কারণ। এক ভাইয়ের উন্নতি অন্য ভাই মেনে নিতে না পারলে পারিবারিক বন্ধন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
৫. সামাজিক ক্ষতি : হিংসা মানুষকে গীবত, অপবাদ, মিথ্যাচার, কুৎসা রটনা ও ষড়যন্ত্রে উৎসাহিত করে। ফলে সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের মধ্যে সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিহিংসা সৃষ্টি হয় এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৬. আখিরাতের ক্ষতি : হিংসার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর আখিরাতের পরিণতি। একজন মানুষ বহু বছর ইবাদত করলেও হিংসা, গীবত ও অন্যের ক্ষতি কামনার কারণে তার নেক আমল বিনষ্ট হতে পারে। তাই আত্মশুদ্ধির পথে হিংসা দূর করা অপরিহার্য।
হিংসা থেকে মুক্তির উপায়
১. আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা : হিংসার মূল কারণ হলো আল্লাহর বণ্টনের প্রতি অসন্তুষ্টি। মানুষ যখন মনে করে, ও কেন পেল, আমি কেন পেলাম না, তখন সে অজান্তেই আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অথচ একজন মুমিন বিশ্বাস করে আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন, তা তাঁর অসীম জ্ঞান ও হিকমতের ভিত্তিতেই দিয়েছেন। এই বিশ্বাস হৃদয়ে দৃঢ় হলে অন্যের প্রাপ্তি দেখে মন অস্থির হয় না। বরং সে উপলব্ধি করে আমার জন্য যা কল্যাণকর, আল্লাহ তাই নির্ধারণ করেছেন।
২. কৃতজ্ঞতার অভ্যাস গড়ে তোলা : হিংসুক ব্যক্তি সবসময় নিজের অপূর্ণতার দিকে তাকায়; কৃতজ্ঞ ব্যক্তি তাকায় আল্লাহর দেওয়া অসংখ্য নিয়ামতের দিকে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের চেয়ে নিচ অবস্থার মানুষের দিকে তাকাও; যারা তোমাদের চেয়ে ওপর রয়েছে তাদের দিকে তাকিও না। এতে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে করবে না। (বুখারি ও মুসলিম)। প্রতিদিন নিজের জীবনের নিয়ামতগুলো স্মরণ করলে অন্তরে সন্তুষ্টি জন্মায় এবং হিংসা দূর হতে শুরু করে।
৩. অন্যের জন্য দোয়া করা : যার প্রতি হিংসা জন্মায়, তার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা হিংসা দূর করার একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি। প্রথমে এটি কঠিন মনে হলেও ধীরে ধীরে অন্তরের বিদ্বেষ দূর হয়ে যায়। একজন মুমিন জানে, অন্যের কল্যাণ কামনা করলে ফেরেশতারা তার জন্যও একই দোয়া করেন। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম তার অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য দোয়া করলে একজন ফেরেশতা বলেন, আমীন, তোমার জন্যও অনুরূপ হোক।’ (সহিহ মুসলিম)।
৪. তুলনার পরিবর্তে আত্মোন্নয়নে মনোযোগ : বর্তমান যুগে অধিকাংশ হিংসার জন্ম হয় অপ্রয়োজনীয় তুলনা থেকে। প্রত্যেক মানুষের জীবন, রিজিক, মেধা, সুযোগ এবং পরীক্ষা ভিন্ন। তাই অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা না করে গতকালের নিজের সঙ্গে আজকের নিজের তুলনা করা উচিত। মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত আমি কি গতকালের চেয়ে বেশি জ্ঞানী, বেশি সৎ, বেশি আমলকারী এবং বেশি উপকারী মানুষ হতে পেরেছি?
৫. অহংকার দূর করা : হিংসা ও অহংকার একই মুদ্রার এপীঠ-ওপীঠ। ইবলিসের পতনের মূল কারণও ছিল অহংকার। যে ব্যক্তি বিনয়ী হয়, সে সহজেই অন্যের গুণের প্রশংসা করতে পারে। নবী সা. বলেছেন ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম)। বিনয় মানুষকে হিংসা থেকে দূরে রাখে।
৬. গীবত, অপবাদ ও কুৎসা থেকে বিরত থাকা : হিংসার সবচেয়ে সাধারণ বহিঃপ্রকাশ হলো গীবত। যখন কেউ অন্যের সাফল্য সহ্য করতে পারে না, তখন সে তার দোষ খুঁজতে শুরু করে, অপবাদ দেয় কিংবা তার সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করে। তাই জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা মানে অনেকাংশে হিংসাকে নিয়ন্ত্রণ করা।
৭. বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত : জিকির ও দোয়া কুরআন মানুষের অন্তরের রোগের চিকিৎসা। আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘আমি কুরআনে এমন বিষয় নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।’ (আল-ইসরা : ৮২)। নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, ইস্তেগফার এবং দোয়া অন্তরকে নরম করে এবং হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার দূর করে। বিশেষ করে সূরা আল-ফালাক পাঠের মাধ্যমে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা সুন্নাহ।
৮. মনোবৈজ্ঞানিক সমাধান : ইসলামের শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক মনোবিজ্ঞানও হিংসা থেকে মুক্তির কিছু কার্যকর উপায় নির্দেশ করে। প্রথমত, নিজের সাফল্যের তালিকা তৈরি করুন। দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার সীমিত করুন। অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবন তুলনা করলে হতাশা বাড়ে। তৃতীয়ত, নিজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। অন্যের জীবন নয়, নিজের উন্নয়নের পরিকল্পনা করুন। চতুর্থত, ইতিবাচক মানুষের সঙ্গে চলুন। যারা সবসময় অন্যের সমালোচনা করে, তাদের সঙ্গ হিংসা বাড়ায়; আর যারা অনুপ্রেরণা দেয়, তাদের সান্নিধ্য হৃদয়কে প্রশান্ত রাখে। পঞ্চমত, প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নিতে দ্বিধা করবেন না।
প্রকৃতপক্ষে হিংসা এমন এক আগুন, যা প্রথমে অন্যের সুখ দেখে জ্বলে ওঠে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের হৃদয়, নিজের ইবাদত, নিজের স¤পর্ক এবং নিজের শান্তিকেই পুড়িয়ে দেয়। এটি শুধু একটি নৈতিক দুর্বলতা নয়; বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য এক নীরব ধ্বংসকারী। যে হৃদয়ে হিংসা বাসা বাঁধে, সেখানে শান্তি, ভালোবাসা ও বরকত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই আসুন, আমরা অন্তরের এই ব্যাধির বিরুদ্ধে আজই সংগ্রাম শুরু করি। অন্যের পতন নয়, নিজের উন্নতি কামনা করি; অন্যের নিয়ামত দেখে কষ্ট নয়, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি; বিদ্বেষ নয়, ভালোবাসা ছড়াই। কারণ হিংসামুক্ত হৃদয়ই প্রকৃত ঈমানের সৌন্দর্য, আর নির্মল অন্তরই দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের সফলতার সর্বশ্রেষ্ঠ পাথেয়।