সম্পাদকীয়

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ সময়ের দাবি


২৯ জুলাই ২০২৬ ১৯:৩৬

প্রতি বছরের মতো এবারও ডেঙ্গু চোখ রাঙাচ্ছে। ইতোমধ্যেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতলে ভর্তির খবর পাওয়া গেছে। দেশে বর্ষায়; বিশেষ করে যখন পানি কমতে শুরু করে, তখনই ডেঙ্গু রোগের বিস্তার ঘটে। অবশ্য ইদানীং দেখা যাচ্ছে, এডিস মশাবাহিত এই রোগের প্রাদুর্ভাব এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই। তবে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি জমা এবং আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। বর্তমানে ডেঙ্গুর সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তা আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে। এখনই যদি সমন্বিত, পরিকল্পিত ও কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে সামনে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।
পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত হওয়ার আগেই সরকার, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো রোগী ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসাসেবা সুনিশ্চিত করা। প্রথমত, প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা ও পৃথক ডেঙ্গু কর্নার প্রস্তুত রাখতে হবে। জরুরি ওষুধ; বিশেষ করে স্যালাইন এবং রক্ত বা প্লাটিলেট পরীক্ষার সরঞ্জামের কোনো ঘাটতি যেন না হয়, তা আগেভাগেই নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে বাজারে ডাবের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং স্যালাইনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এসব অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ডেঙ্গু চিকিৎসার হালনাগাদ গাইডলাইন বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা প্রদান এবং রক্তের সাধারণ কিছু পরীক্ষা (যেমন : এনএস-১, সিবিসি) স্বল্পমূল্যে বা প্রয়োজনে বিনামূল্যে নিশ্চিত করা উচিতÑ যাতে সাধারণ মানুষ দ্রুত রোগ নির্ণয় করতে পারে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয়ও চিকিৎসার সুব্যবস্থা রাখা প্রয়োজনÑ যাতে ঢাকার ওপর অতিরিক্ত রোগীর চাপ না পড়ে।
ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ প্রত্যেকটি মহানগরী ও নগরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এখনই মাঠে নামতে হবে বলে আমরা মনে করি। কারণ ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল যুদ্ধটি লড়তে হয় মাঠে, অর্থাৎ মশকনিধন অভিযানে। এই জায়গায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথাগত ও লোকদেখানো মশকনিধন কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে এসে বৈজ্ঞানিক উপায়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
প্রথমত, সিটি করপোরেশনগুলোকে এলাকাভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিত করে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ ও লার্ভিসাইডিং (লার্ভা ধ্বংস) অভিযান পরিচালনা করতে হবে। কোন এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব বেশি, সে তথ্য নিয়মিত জরিপ করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। মশা মারার যেসব ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে, সেগুলোর গুণগতমান নিয়মিত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা উচিতÑ যাতে ওষুধে মশার প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হয়।
দ্বিতীয়ত, ড্রেন, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রাম, পরিত্যক্ত টায়ার এবং বাসাবাড়ির ছাদে জমে থাকা পানির লার্ভা ধ্বংসে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। যেসব ভবন বা প্রতিষ্ঠানে বারবার জমে থাকা পানি ও মশার লার্ভা পাওয়া যাবে, সেখানে কেবল জরিমানা নয়, প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি মশকনিধন কর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আছে। অবশ্য জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব সরকারের।
জনসচেতনতা ও সরকারি সমন্বয় জোরদার করা ছাড়া কোনো উদ্যোগই সফল হয় না। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর মধ্যে সঠিক সমন্বয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের উচ্চপর্যায়ের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশনকে মুখোমুখি অবস্থান বা একে-অপরের ওপর দোষ না চাপিয়ে এক হয়ে কাজ করতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) খুলে সার্বিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে নাÑ ডেঙ্গু প্রতিরোধের এই লড়াই কেবল সরকারের একার পক্ষে জেতা সম্ভব নয়। নাগরিক সচেতনতা এখানে অত্যন্ত জরুরি। নিজের আঙিনা পরিষ্কার রাখা, বাসাবাড়িতে ৩ দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া এবং রাতে ও দিনে মশারি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার অভিযান চালাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোকে এই প্রচারণায় যুক্ত করা যেতে পারে।
ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, সরকারি সংস্থাগুলোর আন্তঃসমন্বয় এবং প্রশাসনিক তৎপরতা থাকলে ডেঙ্গু থেকে অসংখ্য অমূল্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। বিপর্যয় ঘটার আগেই সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। কথায় আছে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়। তাই ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটার আগেই আসুন আমরা সবাই সচেতন হই।