৬ নেতাকে নিয়ে ড. ইউনূসের যুক্তরাষ্ট্র সফর : ফ্যাসিবাদের অস্থিরতার প্রকল্প চলমান

রাজনৈতিক মেরুকরণ কোন পথে


২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩৪

॥ ফারাহ মাসুম ॥
অন্তর্বর্তী সরকার আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য পুরো প্রস্তুতি শুরু করেছে। কিন্তু জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও নির্বাচন পদ্ধতিসহ আরো কিছু মৌলিক বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য এখনো তৈরি হয়নি। এর মধ্যেই অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ৬ নেতাকে সফরসঙ্গী করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে গেছেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক আলী রীয়াজ এর আগেই নিউইয়র্ক পৌঁছেছেন। নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের আলোচনা সমঝোতা সেখানে হতে পারে বলে প্রত্যাশা রয়েছে অনেকের। তবে এই সমঝোতার কেন্দ্রে রয়েছে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কী ধরনের মেরুকরণ হতে যাচ্ছে, সেটি।
সফরের উদ্দেশ্য ও সময় : ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে। সফরের সময় প্রধান আলোচ্যসূচি থাকবে- দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান এবং রাজনৈতিক পার্থক্যগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক পক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। অধ্যাপক ইউনূসের সফরসঙ্গী হিসেবে ছয়জন নেতাকে নেওয়া হয়েছে তিনটি রাজনৈতিক দল থেকে। এর মধ্যে বিএনপির রয়েছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও সাবেক আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ড. নকীবুর রহমান তারেক। এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও কেন্দ্রীয় নেত্রী ডা. তাসনিম জারা।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে রাজনীতিবিদদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে, তাই আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সম্পৃক্ত রাখা হচ্ছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি একটি নতুন রূপের ‘রাষ্ট্রীয় ঐক্যের’ বার্তা বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করার চেষ্টা। এতে সব রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করা না হলেও এটি একটি ঐক্যবোধ গঠনের প্রয়াস। তবে নির্বাচিত নেতারা বড় ও মাঝারি দলগুলোর প্রতিনিধি।
ঐকমত্য কতটা সম্ভব? : এই সফরে ঐকমত্য কতটা সম্ভব- এ প্রশ্ন সবার মধ্যে রয়েছে। নেতারা একসঙ্গে বিদেশ সফরে অংশ নিচ্ছে, রোহিঙ্গা ও নির্বাচন ইস্যুতে একই ভাষায় বার্তা দেয়া হবে। এই ধরনের ঐক্য প্রদর্শন ভালো দৃষ্টিগোচর হয়, তবে গভীর ও বাস্তব ঐক্য ততটা নাও হতে পারে, যতটা রয়েছে চেহারাগত। এরপরও এতে ফলাফলের উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যেই ‘ঐকমত্য কমিশন’ এবং রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। ‘জুলাই সনদ’ ইত্যাদি বিষয়ে সমঝোতা চাওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক অবিশ্বাস, রাজনৈতিক স্বার্থ, দলগত চাওয়া ও আদর্শগত পার্থক্য আছে। ফলে এক্ষেত্রে ফলাফল প্রাপ্তির মাঝারি সম্ভাবনা রয়েছে। সম্পূর্ণ ঐক্য ও জোট গঠন নিয়ে দৃষ্টান্ত হিসেবে কিছু দল ইতোমধ্যে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। রাজনীতির গঠন পরিবর্তনের দিকে একটি পথ খুলে দিতে পারে নেতৃত্ব ও মতবিরোধ। কিছু দল বিরোধিতার সুরে মন্তব্য করেছে, ‘একপক্ষীয় নির্বাচন’ ইত্যাদি।
সম্ভাব্য গতি ও সময়সীমা : প্রধান উপদেষ্টার এই সফর ও তাতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অন্তর্ভুক্তি একটি ট্রিগার পয়েন্ট হতে পারে, যা আলোচনার গতিকে দ্রুত করবে। যদি সফর শেষে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট ঘোষণাপত্র বা মেন্টরিয়াল মিটিং হয়, তা ঐক্যকে শক্তি দিতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের ঘনিয়ে আসা সময় এবং রাজনৈতিক চাপে তৈরি চুক্তি টেকসই হবে কিনা- এ প্রশ্নও বড়। এছাড়া ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে চুক্তির জটিলতা নিয়ে।  নিজস্ব স্বার্থ ও আদর্শ থাকতে পারে দলগুলোর। এক দল ‘ধারণা’ চাইতে পারে, অন্য দল ‘প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ’- এগুলোর সমন্বয় সহজ নয়। এতে ভরসার অভাব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।  পূর্ব ইতিহাসে রাজনৈতিক ঐক্য চাওয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। এই কারণে নেতৃবৃন্দ ও জনসাধারণের আস্থা রাখতে কষ্ট হবে।
এই সফর আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে ‘রাষ্ট্র নিরপেক্ষতার’ প্রশ্ন তুলতে পারে- বিশেষ করে গণতন্ত্র, নির্বাচন, মানবাধিকার বিষয়গুলোয়।  মিডিয়া কোনো একপক্ষকে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দিলে বিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।
এই ধরনের বিদেশ সফর ও নেতৃবৃন্দকে সাথে নেয়ার উদ্যোগ প্রতীকী ঐক্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ সরকার ও বিরোধীদলগুলোর অন্তর্ভুক্তি এবং বিদেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যকে উপস্থাপন করা যাবে। কিন্তু সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ঐক্যÑ যেখানে বিরোধীদল এবং সরকার একসঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে, নীতিগত চুক্তি হবে এবং ক্ষমতা হস্তান্তর ন্যায্যভাবে হবে। এতে পৌঁছানো খুবই চ্যালেঞ্জযুক্ত।
রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ
আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। প্রধান দলগুলোর মধ্যে চলছে জোট ভাঙা-গড়ার এক জটিল হিসাব-নিকাশ। একদিকে যেমন নির্বাচন বানচালের ‘গভীর ষড়যন্ত্রের’ আশঙ্কা করা হচ্ছে; তেমনই অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানও লক্ষ করা যাচ্ছে।
দেশের বৃহত্তম দল বিএনপি জানিয়েছে, তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে একই সঙ্গে একটি নতুন নির্বাচনী জোট গঠনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে। জামায়াতে ইসলামী এখন বিএনপির বলয় থেকে বেরিয়ে নিজস্ব ইসলামপন্থী জোট তৈরির চেষ্টা করছে। দলগুলোর এই অবস্থানের পেছনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো প্রভাব ফেলছে।
এই সমীকরণে নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতাদের দ্বারা গঠিত ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি’ (এনসিপি)। নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে দলটি নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। দলটি তৃতীয় একটি জোট গঠন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা দেশের প্রচলিত দ্বি-দলীয় রাজনীতির বাইরে একটি নতুন বিকল্প তৈরি করতে পারে।
বিএনপির সিনিয়র নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো ষড়যন্ত্র দেশের গণতন্ত্রকামী জনতা প্রতিহত করবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন এর সময়টি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক অগ্নিপরীক্ষার সমান। আগামী কয়েক মাসেই নির্ধারিত হবে নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জোটের চূড়ান্ত রূপরেখা কী হবে, সেটি।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাস বাকি থাকতেই দেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে দৃশ্যমান সক্রিয়তা বাড়ছে। জামায়াতে ইসলামীসহ সাতটি রাজনৈতিক দল জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন ও বিভিন্ন দাবিতে অভিন্ন কর্মসূচি পালন শুরু করছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে দেশ কি নতুন এক মেরুকরণের পথে হাঁটছে?
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে চাপের মধ্যে রাখতেই বিভিন্ন দল এ ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঐক্য ধরে রাখতে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোকে আগে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। একে অপরের প্রতি ছাড় না দিলে সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এজন্য সব পক্ষকে সংযত ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। অন্যথায় বিভক্তির সুযোগ নেবে পরাজিত শক্তি।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই রাজপথে আন্দোলনের আহ্বান জানানো অযৌক্তিক। যারা স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চায়, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জনগণ।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম জানান, ‘সমমনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলো একই দাবিতে কর্মসূচি দিয়েছে। এটি জনমতকে শক্তিশালী করবে। বরং ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হবে। জনগণের দাবি প্রমাণ করার জন্যই এই কর্মসূচি।’
নানামুখী প্রচেষ্টা ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের প্রাক-নির্বাচন সময়ে রাজনীতির ‘মেরুকরণ’ বা পুনর্বিন্যাসের জন্য নানামুখী প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদ কায়েম ও গণহত্যা চালানোর কারণে দলটির কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ এবং দলটির নিবন্ধনও স্থগিত রয়েছে। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ একদিকে নির্বাচন বানচালের জন্য দেশে অস্থিরতা তৈরি করে রাখছে; অন্যদিকে নির্বাচন ঠেকানো সম্ভব না হলে জাতীয় পার্টির ব্যানারে অথবা স্বতন্ত্র নির্বাচন করে সংসদে যাবার উপায় খুঁজছে। আর আওয়ামী লীগহীন রাজনীতিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপির জন্য নতুন মাঠ তৈরি হচ্ছে।
২০২৪-এর গণঅভ্যত্থানের পর ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে এসেছে। রাজনীতিতে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নতুন তরুণ নেতাদের ভূমিকা বাড়ছে। সেইসাথে নির্বাচন সামনে রেখে জোটবদ্ধতার ও সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনের আগে জোট বা অ্যালায়েন্স গঠন করার কথা বলা হচ্ছে- যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শক্তির ভারসাম্য পাওয়া যায়।
এই মেরুকরণে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যেও সমন্বয় ও ‘নির্বাচনী সমঝোতা’ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সাথে থাকছে বেশ কটি মধ্যমপন্থী রাজনৈতিক দল। এসব দল সংস্কার ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিষয়ে কাছাকাছি দাবি নিয়ে রাজপথে কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে অবিলম্বে ও স্বচ্ছ নির্বাচনসহ নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা, সময়সূচি ইত্যাদিতে সংস্কার দাবি উঠেছে। অন্যান্য দাবির পাশাপাশি জুলাই সনদের সাংবিধানিক ও আইনি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং আনুপাতিক নির্বাচনের দুটি মৌলিক দাবিতে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ‘জুলাই সনদ’ এবং জাতীয় পরিচিতি, সংবিধান সংশোধন ইত্যাদি প্রশ্নে তাদের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে।
মেরুকরণ কোন পথে
বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছু সম্ভাব্য গতিপথ দৃশ্যমান হচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক নেতাদের দাবি ও বক্তব্যে বিএনপির সাথে একটি দূরত্ব লক্ষ করা যায়। তবে দলটির নেতাদের মধ্যে চিন্তার অনৈক্য ফুটে ওঠে বিভিন্ন সময়। কোনো কোনো নেতা বিএনপির সাথে রাজনৈতিক সমঝোতায় যেতে চায়। আবার অন্য একটি অংশ মনে করে, নির্বাচনী বাস্তবতাকে সামনে রেখে ইসলামিস্ট ও সমমনাদের সাথে ঐক্য গড়ে তোলা দরকার। আরেকটি অংশ মনে করে কোনো পক্ষে না গিয়ে এনসিপি মধ্যবর্তী একটি অবস্থান নিতে পারে আর বিএনপির সম্ভাবনাময়ী বিক্ষুব্ধ নেতাদের মনোনয়ন দিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে সাফল্য পেতে পারে।
বিএনপি নেতৃত্বের একটি অংশ থেকে ভারতীয় আধিপত্যকামী সমঝোতার বক্তব্য আসায় এনসিপির পক্ষে তাদের সাথে রাজনৈতিক জোট করা স্বাভাবিক নয় বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও মাহফুজ আলমসহ কয়েকজন নেতার বিএনপির সাথে নির্বাচনী জোটের ব্যাপারে আগ্রহের কথা জানা যায়। সম্প্রতি লন্ডন সফরকালে জামায়াতের বিরুদ্ধে তার কৌশলী বক্তব্য সেই ইঙ্গিত এবং বিএনপির শীর্ষনেতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য দেয়া বলে মনে করা হচ্ছে।
এনসিপি তারুণ্য থেকে উঠে আসা দল হওয়ায় তরুণ যুবকদের ভোটে অংশ গ্রহণ তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিয়ে আসবে বলে মনে করা হচ্ছিল। বাংলাদেশের ১২ কোটির কিছু বেশি ভোটারের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ হলো ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সের। এই বয়সীরাই ২৪-এর গণঅভ্যত্থানে জীবন দিয়ে স্বৈরাচারকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। তবে সাম্প্রতিক ডাকসু, জাকসুসহ ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোয় ছাত্র সমর্থন সেভাবে এনসিপি বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদের পক্ষে যায়নি। এ দুটি ছাত্র সংসদে ইসলামী ছাত্রশিবির নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে।
এনসিপি পরবর্তী নির্বাচনে ইসলামিস্ট ও মধ্যপন্থীদের জোটে গেলে তরুণ ভোটারদের ভোট দান এই বলয়ের দিকে যাবার সম্ভাবনা প্রবলভাবে রয়েছে। সেটি না ঘটলেও আপ বাংলাদেশ ও জুলাই মঞ্চসহ জুলাই বিপ্লবের সামাজিক রাজনৈতিক শক্তি ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনার কারণে ইসলামী জোটের দিকে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। যেটি ডাকসু-জাকসুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
এনসিপি ও নতুন তরুণ দলগুলোর অংশগ্রহণ ভোটের ধরনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে যদি তারা মূলধারার রাজনীতি ও জনবিচার দাবি নিয়ে আসে। তবে সাংগঠনিক সক্ষমতা, অর্থ, মানুষকে প্রভাবিতকরণ এবং ভোটজয় নিশ্চিত করার বিষয়ে এবার কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। সেক্ষেত্রে এনসিপি কতটা জায়গা করে নিতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেকের মাঝে।
জামায়াত-বিএনপি সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে বিরোধ ও দূরত্ব অনেকখানি বেড়েছে। নির্বাচনের আগে তাদের মধ্যে জোট বা সমঝোতা হবার সম্ভাবনা এক প্রকার নেই বলেই মনে হচ্ছে। অধিকন্তু বিএনপির বিভিন্ন নেতার বক্তব্যে প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টিকে সামনে নিয়ে আসতে তাদের বেশি আগ্রহ রয়েছে, বলে মনে হতে পারে। এমনও বলা হয় যে, বিএনপির রাজনীতিকে যারা বাইরে থেকে প্রভাবিত করছে তারা দলটিকে নির্বাচনী ময়দানে পতিত রাজনৈতিক বলয়কে সামনে নিয়ে আসার পরামর্শ দিচ্ছে। এতে একদিকে এই ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক বলয়ের ভোটারদের বিএনপির সমর্থনে কাছে টানতে পারে; অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে একই ভোট বলয়ের ইসলামিস্টদের মাঝখানে একটি ব্যবধান তৈরি হবে। আবার ইসলামিস্টদের সরাসরি প্রতিপক্ষ করার বিষয়ে বিএনপির মধ্যে ভীতিও রয়েছে। যার কারণে বৈরী ইসলামিক শক্তির ট্যাগ যাতে না লাগতে পারে, তার জন্য কয়েকটি ইসলামী দলকে বিএনপি জোটে নিয়ে আসা এবং হেফাজতের নেতাদের সাথে সদ্ভাব তৈরির প্রচেষ্টা হাতে নেয়া হয়েছে।
তরুণ-ছাত্র আন্দোলন রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি তুলছে; তারা নতুন দল-নেতৃত্ব, আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতি, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সংস্কার দাবি করছেন। যদি তারা মাঠে পুরোপুরি সংগঠিত হতে পারে বা ভোটে প্রভাব দেখায়, তাহলে একটি ফল তারা পেতে পারে বলে আশা করে। তবে কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রতিষ্ঠিত পার্টির বাধা অনেক বড় হতে পারে।
ক্ষমতা ও নির্বাচনী সময়সূচির নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের কতটা ক্ষমতা রয়েছে, নির্বাচন কবে ও কীভাবে হবে, সেটি কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে- এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। সময়সূচি, নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা ইত্যাদিতে নিয়ন্ত্রণ অনেক কিছু নির্ধারণ করবে। রাজনৈতিক আস্থা, বৈদেশিক নজরদারি, জনমত, অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত চাপ সবই গুরুত্বপূর্ণ; যদি সন্দেহ উচ্চ হয়, পার্টিগুলো নির্বাচনে যোগদান বা বয়কট করেও যেতে পারে। সেটি হলে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়েও সংশয় দেখা দিতে পারে।
ঝুঁকি ও সাংবিধানিক বাধা
যদি কোনো বড় দলের অংশগ্রহণ বন্ধ থাকে বা বিরোধীরা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অপূর্ণ বলে ঘোষণা করে তাহলে রাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়তে পারে। আইনি ও প্রশাসনিক বাধা; যেমন দল-নিবন্ধন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, ভোটার তালিকা হালনাগাদ ইত্যাদিতে বাধা থাকতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক আস্থা যদি ভেস্তে যায়, তখন নির্বাচন বৈধতার প্রশ্ন উঠতে পারে এবং ফলাফল জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রাক-নির্বাচন মেরুকরণ বড় কিছু পরিবর্তন ও সুযোগ রেখে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে নতুন দল, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, তরুণ নেতৃত্ব, পুরনো জোটের পরিবর্তন- এসব মিলিয়ে পুরনো রাজনীতির ধরন একটু নড়বড়ে হচ্ছে।
ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়ী পরিবর্তন হচ্ছে বিরোধীদল ও নতুন ধারার সংযুক্ত শক্তিতে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সময়সূচি নিয়ে বাস্তব সংস্কার হওয়ায়।
সম্ভাব্য জোটচিত্র (সিনারিও)
সিনারিও-এ- পুরনো ধারা পুনরুজ্জীবন হয়ে বিএনপি ও জামায়াত আবারও জোট গড়লে; তরুণ দলগুলো ছিটকে পড়ে ঐতিহ্যবাহী দুই মেরু ফিরে আসতে পারে।
সিনারিও-বি- নতুন ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা হতে পারে তরুণ ও নতুন দল (এনসিপি) স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়ালে; বিএনপি-জামায়াত একদিকে; সেক্যুলারপন্থীরা আরেকদিকে এভাবে ভোট তিন ভাগে বিভক্ত হতে পারে। সেটি হলে কারা কৌশলগত আসন সমঝোতা করবে সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
সিনারিও-সি- বিস্তৃত বিরোধী ফ্রন্ট বিএনপি, ছোট বাম ও নাগরিক সমাজ একত্র হয়; জামায়াত, এনসিপি, সমমনা ও ইসলামপন্থীরা এক হলে নতুন ধাঁচের বিরোধী ফ্রন্ট তৈরি হতে পারে, যা তরুণ ভোটারকে টানতে পারে।
সিনারিও-ডি- বয়কট/সীমিত অংশগ্রহণ বড় কোনো দল (যেমন বিএনপি) নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায় বা সীমিত প্রার্থী দেয় অন্তর্বর্তী সরকার ও ছোট দলগুলো নিয়ে নির্বাচন হয়, তখন বৈধতার প্রশ্ন উঠতে পারে।
সম্ভাব্য ভোটধারা নিয়ে এখনো শেষ কথা বলা যায় না; মূল নিয়ামক হবে- নির্বাচন কমিশনের আস্থা, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা, তরুণদের সংগঠনক্ষমতা এবং বিদেশি চাপ। জাতীয় ভোটার তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটার সংখ্যা এখন প্রায় ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার ৫১২ জন। ১৮-৩৩ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই শ্রেণিটির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাদের জন্য নতুন ইস্যু প্রাধান্য পাবে। তখন শিক্ষা, চাকরি, পরিবহন, সামাজিক ন্যায়বিচার, ডিজিটাল সুযোগ ইত্যাদি বিষয়গুলোর গুরুত্ব বাড়বে। ছাত্র-আন্দোলন থেকে উঠে আসা দাবিগুলোর প্রতি রাজনৈতিক পার্টির মনোযোগ বাড়তে পারে। ভোটার অংশগ্রহণ ও প্রার্থী নির্বাচনগত কৌশল তরুণ ও ছাত্র ভোটারকে আকৃষ্ট করার জন্য রাজনৈতিক প্রচারণায় নতুন ধরন আনতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন প্রচারণা, ‘মেমে‐পলিটিকস’, তরুণ নেতৃত্বের আগমন ইত্যাদির প্রয়োগ বাড়বে। প্রার্থীরা ছাত্র-সংগ্রাম, শিক্ষানীতি, স্কলারশিপে বা বৃত্তি, ক্যাম্পাস অবকাঠামো ইত্যাদিতে প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হবে।