ভিপি সাদিক, জিএস ফরহাদ ও এজিএস মহিউদ্দিন

ডাকসুতে ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয়

সৈয়দ খালিদ হোসেন
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৪৭

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সব হল ও পুরো ক্যাম্পাসে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। মেয়েদের হলগুলোয় আগের রাতে চলছিল গল্প-আড্ডা, মেহেদি রঙে রঙিন হওয়া আর নানা সাজে সজ্জিত হওয়ার প্রতিযোগিতা। কেউ কেউ বুথে গিয়ে ঝামেলা এড়াতে রাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কোন পদে কাকে ভোট দেবেন। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর জীবনের প্রথম ভোট হওয়ায় উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। ভোট দিতে এসে শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যমকর্মীদের এমনই জানিয়েছিলেন। কিছুটা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ থাকলেও ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই। প্রায় সাত বছর পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের রায়ে বিরাট বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এ ছাত্র সংগঠনটির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’র প্রার্থীরা ডাকসুর ২৮টি পদের মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহ-সাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২৩টিতেই বিজয়ী হয়েছে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর দ্বিগুণের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমর্থিত প্রার্থীরা। ভোটের এই ব্যবধান শুধু ডাকসু নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২৮ পদের ২৩টিতেই জয় শিবিরের
গত ১০ সেপ্টেম্বর বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার পর ঢাবির সিনেট ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন ডাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। এতে জানা গেছে, ভিপি পদে ছাত্রশিবির প্যানেলের মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) পেয়েছেন ১৪ হাজার ৪২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম ৫ হাজার ৭০৮ ভোট পেয়েছেন। ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট পেয়ে জিএস পদে জয়ী হন এসএম ফরহাদ। তিনিও ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট থেকে লড়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল নেতা তানভীর বারী হামীম পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮৩ ভোট। এছাড়া প্রতিরোধ পর্ষদের মেঘমল্লার বসু ৪ হাজার ৯৪৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। এজিএস পদেও বিজয়ী হন ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের মুহা. মহিউদ্দিন খান। তিনি ১১ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়েছেন। ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ পেয়েছেন ৫ হাজার ৬৪ ভোট। এছাড়া আরও ২০ পদে বিজয় লাভ করেছেন ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতেমা তাসনিম জুমা পেয়েছেন ১০ হাজার ৬৩১ ভোট। ৭ হাজার ৮৩৩ ভোট পেয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে জয়ী হন ইকবাল হায়দার। আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে খান জসিম পেয়েছেন ৯ হাজার ৭০৬ ভোট। ছাত্র পরিবহন সম্পাদক হিসেবে লড়ে আসিফ আবদুল্লাহ পেয়েছেন ৯ হাজার ৬১ ভোট। ৭ হাজার ২৫৫ ভোট পেয়ে ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন আরমান হোসাইন। কমন রুম, রিডিং রুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে উম্মে ছালমা পেয়েছেন ৯ হাজার ৯২০ ভোট। ১১ হাজার ৭৪৭ ভোট পেয়ে মানবাধিকার ও আইন সম্পাদক হন সাখাওয়াত জাকারিয়া। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে এমএম আল মিনহাজ পেয়েছেন ৭ হাজার ৩৮ ভোট। এছাড়া ৯ হাজার ৩৪৪ ভোট পেয়ে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদকে বিজয় ছিনিয়ে আনেন মাজহারুল ইসলাম। শিবিরের ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ থেকে সদস্য হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন সাবিকুন্নাহার তামান্না (১০ হাজার ৪৮ ভোট), সর্ব মিত্র চাকমা (৮ হাজার ৯৮৮ ভোট), আনাস ইবনে মুনির (৫ হাজার ১৫ ভোট), ইমরান হোসেন (৬ হাজার ২৫৬), তাজিনুর রহমান (৫ হাজার ৬৯০), মেফতাহুল হোসেন আল মারুফ (৫ হাজার ১৫), বেলাল হোসাইন অপু খান (৪ হাজার ৮৬৫), রাইসুল ইসলাম (৪ হাজার ৫৩৫), মো. শাহিনুর রহমান (৪ হাজার ৩৯০), মোছা. আফসানা আক্তার (৫ হাজার ৭৪৭) ও রায়হান উদ্দীন (৫ হাজার ৮২ ভোট)। শিবিরের প্যানেলের বাইরে বাকি পাঁচ পদে জয়ী হয়েছেন অন্য প্রার্থীরা। তারা হলেন- সমাজসেবা সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবাইর বিন নেছারী। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী সানজিদা আহমেদ তন্বী। সদস্য পদে হেমা চাকমা ও উম্মু উসউয়াতুন রাফিয়া।
উল্লাসে মেতে উঠল অডিটোরিয়াম
ডাকসু নির্বাচনে এবার চমক দেখালেন শিবিরে তিন স্টার সাদিক কায়েম, এস এম ফরহাদ ও মহিউদ্দিন খান। ডাকসুর নতুন ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস ফরহাদ। ফলাফল ঘোষণার পর উল্লাসে মেতে উঠে পুরো অডিটোরিয়াম। শিক্ষার্থীরা আল্লাহু আকবার স্লোগানে মাতিয়ে তোলে অডিটরিয়াম ও তার আশপাশের এলাকা।
প্রভাব ফেলতে পারে জাতীয় রাজনীতিতে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের ব্যাপক উচ্ছ্বাস, বিপুলসংখ্যক ভোটার উপস্থিতির এ নির্বাচনের প্রভাব শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর ফল জাতীয় রাজনীতিতে; বিশেষ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে, ঘুরিয়ে দিতে পারে জাতীয় রাজনীতির মোড়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ঐতিহ্যগতভাবে এখান থেকেই দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠন তাদের নেতৃত্ব তৈরি করে এসেছে। ফলে ডাকসু নির্বাচনে যে ছাত্র সংগঠন জয়ী হয়, তা সেই ছাত্র সংগঠনের মূল দলের জনপ্রিয়তা ও জনভিত্তির একটি প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হয়ে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় এবারের ডাকসু নির্বাচনের ফলও বিজয়ী প্রার্থীর মূল দলকে আগামী সংসদ নির্বাচনে অনেকাংশে এগিয়ে রাখতে পারে। এবারে ঢাবিতে শুধু কেন্দ্রীয় সংসদ নয়, হল সংসদের ফলেও দেখা যায় একই ধারা। আর এমন ফলের প্রভাব শুধু ঢাবি ক্যাম্পাসের ছাত্ররাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে এর প্রতিফলন ঘটবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এবারের ডাকসু নির্বাচন অনেকে দেখছেন নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক রুচি ও প্রবণতা যাচাইয়ের একটি সুযোগ হিসেবে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে কোন আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে, তা এ নির্বাচনের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে। যেহেতু আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা ৩ কোটির বেশি, তাই ডাকসুর ফল রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সেজন্য এ নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছে বড় দলগুলো। এমন প্রেক্ষাপটে ডাকসু নির্বাচন যতটা না ছাত্ররাজনীতির, তার চেয়ে বেশি জাতীয় রাজনীতির একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। এ নির্বাচনের ফল শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস নয়, দেশের রাজনীতি এবং জাতীয় নির্বাচনের গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে।
নির্বাচন ছিল ‘প্রহসনের জবাব’
গণঅভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা নেয় নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর কেটে গেছে এক বছরেরও বেশি সময়। তবে এ সময়ে বলার মতো কোনো বড় প্রতিষ্ঠান কিংবা স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচন হয়নি। ফলে ডাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সারা দেশের মানুষের কাছে ছিল বিশেষ গুরুত্বের। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে কারচুপি, জোরজবরদস্তি ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগে শিক্ষার্থীরা যে হতাশায় ভুগছিল, এবার তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে অনেকটাই। ভোর থেকেই ক্যাম্পাসে ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ লাইন লক্ষ করা যায়। আবাসিক হল থেকে শুরু করে অনাবাসিক শিক্ষার্থীরাও দলবেঁধে ভোট দিতে আসেন। শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র, উদয়ন স্কুল কিংবা কার্জন হল প্রতিটি কেন্দ্রেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উপচেপড়া। শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, এ নির্বাচন ছিল ‘প্রহসনের জবাব’। দীর্ঘদিন পর স্বাধীন ও তুলনামূলক নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোট দিতে পারার আনন্দ তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল। ভোট দেওয়া মানে যে উৎসব, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যা একসময় ছিল সাধারণ চিত্র, এবার তার প্রতিফলন দেখা গেছে ডাকসু নির্বাচনের ময়দানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী শিক্ষার্থী। এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নজর কেড়েছে সবার। ভোট গ্রহণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রগুলোয় বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষার্থীকে ভোট দিতে দেখা গেছে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হিসাবে প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সমানতালে। নারী ভোটারদের ভাষ্য, নিরাপদ পরিবেশে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে পারাটা ছিল তাদের বড় একটি অভিজ্ঞতা। তাদের মতে, ২০১৯ সালের ভোটের মতো ভয়ভীতি এবার ছিল না। প্রত্যেকেই নিজেদের মতামত প্রকাশে স্বাধীন ছিলেন। ফলে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ শুধু পরিসংখ্যানে নয়, প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্ব বহণ করছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবাসিক শিক্ষার্থীদেরও ভোট প্রদানে উৎসাহ দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস এবং অনেকে নানা যানবাহনে করে ক্যাম্পাসে ভোট দিতে আসেন। ফলে ভোট গ্রহণের হারও বেড়েছে।
রেকর্ডসংখ্যক ৭৮.৩৩ শতাংশ ভোট
সারা দিনের ভোটগ্রহণে ১৮টি হলের ৩৯ হাজার ৭৭৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে ভোট পড়েছে ৭৮.৩৩ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আটটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে সূর্য সেন হলে, যেখানে ভোটদান হার ৮৮ শতাংশ। শেখ মুজিবুর রহমান হলে ৮৭ শতাংশ, কবি জসীমউদ্দীন হলে ৮৬ শতাংশ, বিজয় একাত্তর হলে ৮৫.০২ শতাংশ, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ৮৪.৫৬ শতাংশ, অমর একুশে হলে ৮৩.৩০ শতাংশ, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ৮৩.৩৭ শতাংশ, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ৮৩ শতাংশ, স্যার এ এফ রহমান হলে ৮২.৫০ শতাংশ, ফজলুল হক মুসলিম হলে ৮১.৪৩ শতাংশ, জগন্নাথ হলে ৮২.৪৪ শতাংশ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে ৮০.২৪ শতাংশ, রোকেয়া হলে ৬৫.৫০ শতাংশ, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ৬৮.৩৯ শতাংশ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ৬৭.০৮ শতাংশ, কবি সুফিয়া কামাল হলে ৬৪ শতাংশ এবং শামসুন নাহার হলে ৬৩.৬৭ শতাংশ ভোট পড়েছে।
প্রার্থীরা অভিযোগ তুললেও ভোটারদের কাছে নির্বাচন ছিল উৎসবমুখর
এবারের ডাকসু নির্বাচনে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল, প্রচারের সময় থেকে ভোটগ্রহণের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের সহিংসতা বা কাদা ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটেনি। যদিও বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়মের অভিযোগ এসেছে, তবে তা নির্বাচনের সামগ্রিক চিত্রে প্রভাব ফেলেনি। প্রার্থীরা অভিযোগ তুললেও ভোটারদের কাছে নির্বাচন ছিল উৎসবমুখর। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ডাকসু নির্বাচনে এই ইতিবাচক অভিজ্ঞতা সারা দেশের মানুষের নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।
পুরো ক্যাম্পাসে ছিল নিñিদ্র নিরাপত্তা
নির্বাচন ঘিরে অন্যরকম এক ক্যাম্পাস দেখেছেন পড়ুয়ারা। পুরো ক্যাম্পাসে ছিল নিñিদ্র নিরাপত্তা। ৮ সেপ্টেম্বর সোমবার রাত থেকেই ক্যাম্পাসে প্রবেশের ক্ষেত্রে ছিল কড়াকড়ি। ভোট গ্রহণ সামনে রেখে ওইদিন রাত থেকেই পুরো ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। সাধারণ শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে ঘুরে বেড়ান ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে। ভোর পর্যন্ত টিএসসি, রাজু ভাস্কর্য, ভিসি চত্বর, মল চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে শিক্ষার্থীর ভিড়। ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রবেশপথে ছিল কড়াকড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং অনুমতিপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট সাংবাদিকদের বাইরে কেউ-ই ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেননি। আটটি প্রবেশপথে বসানো ছিল নিরাপত্তা চৌকি। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি ছিল মোবাইল প্যাট্রল, ডগ স্কোয়াড, বিশেষায়িত টিম, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াত টিম, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা (ডিবি), সিসিটিভি মনিটরিং সেল এবং স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স।
ডাকসু নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী তন্বী
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে বিজয়ী জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখ সানজিদা আহমেদ তন্বী। স্বতন্ত্র প্রার্থী তন্বী ভোট পেয়েছেন ১১ হাজার ৭৭৭টি। যিনি জুলাই যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। গত বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা।
প্রথমবারের মতো একসঙ্গে জয়ী হলেন স্বামী-স্ত্রী
ডাকসু নির্বাচনে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে জয়ী হলেন স্বামী-স্ত্রী। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন এ দম্পতি। ডাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিন কেন্দ্রীয় সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে তার স্ত্রী উম্মে সালমা কমন রুম ও রিডিং সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন। রায়হান বলেন, সব মিলিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেছি। শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়েছি, তারা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন। আমরা কাজ করে যেতে চাই। উম্মে সালমা বলেন, শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করাই হবে আমার কাজ। রায়হান উদ্দিন ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের এবং উম্মে সালমা একই বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
বিপুল ভোটে বিজয়ী সেই সর্ব মিত্র চাকমা
ডাকসু নির্বাচনে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী’ জোট প্যানেলের প্রার্থী সর্ব মিত্র চাকমা। তিনি ৮ হাজার ৯৯৮ ভোট পেয়েছেন।
আবিদের ফল প্রত্যাখ্যান, ‘সম্মান’ জানালেন হামিম
ডাকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণার প্রাথমিক পর্যায়েই তা প্রত্যাখ্যান করেছেন ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান। গত ৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে নিজের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি লেখেন, “পরিকল্পিত কারচুপির এ ফলাফল দুপুরের পরপরই অনুমান করেছি। নিজেদের মতো করে সংখ্যা বসিয়ে নিন। এ পরিকল্পিত প্রহসন প্রত্যাখ্যান করলাম।”
এর আগে রাতে তিনি ভোট গণনায় কারচুপি হচ্ছে অভিযোগ তুলে টিএসসিতে বলেন, “যে ভোটের বাক্সগুলোকে খালি বলা হয়েছিল। পরে গণনার সময় দেখা গেছে সেগুলোতে ব্যালট ভর্তি। এ নির্বাচন কারচুপিতে হাসিনা নির্বাচনকেও ছাড়িয়ে গেছে।” এদিকে ছাত্রদলের প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম শিক্ষার্থীদের রায়কে সম্মান জানানোর কথা বলেছেন। রাত সোয়া ২টার দিকে নিজের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি লেখেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি মনে করেনÑ এটিই তাদের রায়, তবে এই রায়কে আমি সম্মান জানাই। আমি শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষমাণ।”
রোকেয়া হলেও শীর্ষে সাদিক, তৃতীয় ফাতেমা, পরে ডাকসু বর্জনের ঘোষণা
ডাকসু ভোটে রোকেয়া হলে সাদিক কায়েমের কাছে হার মানলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা। তিনি রোকেয়া হলে মোট ভোট পেয়েছেন ৬১৪। অন্যদিকে রোকেয়া হলে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন ডাকসুর ভিপি পদে প্রার্থী সাদিক কায়েম। তিনি মোট ১ হাজার ৪৭২ পেয়েছেন। এছাড়া আবিদুল ইসলাম ৫৭৫; শামীম হোসেন ৬৮৪ ভোট পেয়েছেন। মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ডাকসু বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী উমামা ফাতেমা। উমামা ফাতেমা লেখেন, ‘বয়কট! বয়কট! ডাকসু বর্জন করলাম। সম্পূর্ণ নির্লজ্জ কারচুপির নির্বাচন। ৫ আগস্টের পরে জাতিকে লজ্জা উপহার দিল ঢাবি প্রশাসন। শিবির পালিত প্রশাসন।’ এর আগে আরেকটি আলাদা স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘চলিতেছে সার্কাস। কে কে দেখতেছেন?!’ উমামা ফাতেমা এমন স্ট্যাটসে কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা নিয়ে অনেকেই নানা মন্তব্য করছে।
ইসি আচরণবিধি কার্যকরে বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, অভিযোগ আব্দুল কাদেরের
ডাকসু নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ করেছেন বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী আব্দুল কাদের। ভোটের দিন দুপুরে টিএসসিতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এত ষড়যন্ত্রের পরও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে তামাশা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। আব্দুল কাদের অভিযোগ করেন, ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রার্থীরা সরাসরি ভোটারদের প্রভাবিত করেছেন। ইসি আগে আচরণবিধি কার্যকর করার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তারা কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, সেটা শিক্ষার্থীরা এখন বুঝে গেছে।
সবাই একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা সাদিক কায়েমের
ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে নির্বাচিত সাদিক কায়েম বলেছেন, যে মতের হোক না কেন সবাই একসঙ্গে কাজ করবেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা আমাদের প্রত্যাশা। আমরা ক্যাম্পাসকে স্বপ্নের ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলব।’ যারা একসাথে নির্বাচন করেছেন তাঁরা প্রত্যেকে উপদেষ্টা বলেন ভিপি সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, তাঁরা আমাদের পরামর্শ দেবেন। জুলাই বিপ্লব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগামী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখবেন বলে জানান তিনি। দায়িত্ব পালনকালে মারা যাওয়া সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান সাদিক কায়েম। তিনি সব গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ জানান। ১০ সেপ্টেম্বর বুধবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া জানান ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের নির্বাচিত ভিপি সাদিক কায়েম।
ঢাবির সব শিক্ষার্থীর বিজয় বললেন ফরহাদ
ডাকসু নির্বাচনে জিএস নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ছাত্রশিবিরের নেতা এস এম ফরহাদ। তিনি বলেন, ‘আমার দিক থেকে ব্যক্তিগত অবজারভেশন হচ্ছে জিএস হিসেবে নির্বাচিত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীদের বিজয়। এটি ব্যক্তি ফরহাদের বিজয় হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নাই।’ সব শিক্ষার্থীদের আমানত তাদের ওপর অর্পিত হয়েছে বলেন ফরহাদ। তিনি বলেন, যে কয়দিন দায়িত্বে থাকবেন সে কয়দিন যদি ভুল কিছু করেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা তাকে যেন শুধরে দেন। কোনো বিজয় মিছিল করবেন না বলেও জানান ফরহাদ। বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এ প্রতিক্রিয়া জানান ফরহাদ।
ছাত্রশিবিরের কর্মসূচি ঘোষণা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন-২০২৫ এর ফলাফল ঘোষণার পর দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। গত বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ কৃপায় ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’-এর বিজয়ের মাধ্যমে মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বিজয়ী হয়েছে। এ নির্বাচনে যারা বিভিন্ন প্যানেল থেকে ও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হয়েছেন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। মহান আল্লাহ তায়ালা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্বের আমানত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যথাযথভাবে রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমীন’
ডাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের এই ঐতিহাসিক বিজয় উপলক্ষে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ২ দিনব্যাপী নিম্নোক্ত কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো- ডাকসু নির্বাচনে বিজয় উপলক্ষে ছাত্রশিবিরের কর্মসূচি ঘোষণা। এক. শুকরিয়া আদায় করে দোয়া মাহফিল ও শব্বেদারি (নৈশ ইবাদত) বাস্তবায়ন। দুই. শহীদদের কবর জিয়ারত এবং শহীদ পরিবার ও আহতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ। বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার আলোকে ছাত্রশিবিরের সকল মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয়, শহর ও জেলা শাখাকে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি কোনো ধরনের আনন্দ মিছিল, শোভাযাত্রা বা র‌্যালি আয়োজন করা থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এর আগে, গত মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিরতিহীন বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে। বড় কোনো ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয়েছে ডাকসুর ৩৮তম নির্বাচন। এবার ডাকসুতে ২৮টি পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ৪৭১ জন। আর ১৮টি হল সংসদে নির্বাচন হয়েছে ১৩টি পদে। হল সংসদের ২৩৪টি পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৩৫ জন। ডাকসুতে এবার মোট ভোটার ছিলেন ৩৯ হাজার ৮৭৪ জন। এর মধ্যে পাঁচটি ছাত্রী হলে ১৮ হাজার ৯৫৯ জন আর ১৩টি ছাত্র হলে ভোটার ২০ হাজার ৯১৫ জন ভোটার ছিলেন।