দেশ অস্থিতিশীল করতে হাজার কোটি টাকার ফান্ড

আ’লীগকে ফেরাতে ভারতের ষড়যন্ত্র

ফারাহ মাসুম
২৯ আগস্ট ২০২৫ ১৩:০৭

আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফেরাতে ভারত নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা শুরু করেছে। এ কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক অন্তর্ঘাত ও অস্থিরতা তৈরি করে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ করে দেয়া। একই সাথে ২৪-এর বিপ্লবের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি করার কৌশলও গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কৌশল বাস্তবায়নের জন্য একদিকে পঞ্চম প্রজন্মের প্রচারযুদ্ধ শুরু করা হয়েছে; অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ আওয়ামী রাজনৈতিক শক্তিসমূহকে প্রশিক্ষিত করে মাঠে নামানোর আয়োজন চলছে।
ভারতের ঘোষিত অবস্থান বনাম রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
ঘোষিত লাইমলাইট অনুসারে : দিল্লি প্রকাশ্যে বলে, ভারত অন্য দেশের বিরুদ্ধে তাদের মাটি ব্যবহার করতে দেয় না; বাংলাদেশের বিষয়ে ‘ভুল ব্যাখ্যা’ দেওয়া হয়েছে বলে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযোগ নাকচ করেছে; পাশাপাশি ভারত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বাধীন ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন’ চায় বলে উল্লেখ করে।
অথচ দ্য গার্ডিয়ান ও আল-জাজিরার পর্যবেক্ষণ অনুসারে, ভারতের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ২০০৯-২৪ মেয়াদে হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা-অর্থনীতি-সংযোগে ‘ডিপ ইন্টিগ্রেশন’ গড়ে ওঠে; আর তার পতনের পর ভারতের প্রভাব ও ‘চীনঝুঁকি’ নিয়ে দেশটির বাস্তববাদী দুশ্চিন্তা স্পষ্ট হয়, যা দিল্লিকে অন্ততপক্ষে এক্সট্রাডিশন বিলম্ব/সেফ-হ্যাভেন ও নির্বাচনী কন্সটেলেশন প্রভাবের পর্যায়ে ‘হাসিনা-সহায়ক ইকোসিস্টেম’ ধরে রাখার জন্য প্রেরণা দেয়।
দিল্লির সম্ভাব্য ‘রিটার্ন-টু-পাওয়ার’ গেমপ্ল্যানের ৫টি স্তম্ভ
ভারতের নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণে সক্রিয় উচ্চপর্যায়ের তথ্যানুসারে, দিল্লির সম্ভাব্য ‘রিটার্ন-টু-পাওয়ার’ গেমপ্ল্যানের ৫টি স্তম্ভ রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে অ্যাসাইলাম/সেফ-হ্যাভেন মডেল। এই কৌশলের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হাসিনা ভারতেই আশ্রয় নেন- এ কৌশলের তথ্য বহু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসেছে। সেফ-হ্যাভেন থাকলে দলীয় কাঠামো ও অর্থায়ন শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়; প্রবাসভিত্তিক মেসেজিং/লবিংও চালানো যায়। আওয়ামী লীগকে এই নিরাপদ অবস্থান দেয়ার পরও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করছে- আর এটাই তাদের ‘প্লওজিবল ডিনায়াবিলিটি’ ঢাল হিসেবে কাজ করে বলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়ে গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
ভারতীয় গেমপ্ল্যানের দ্বিতীয় স্তম্ভটি হলো কূটনৈতিক ন্যারেটিভ-শেপিং। এর অংশ হিসেবে ‘স্বাধীন-অন্তভর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’- এর ফ্রেমে দাঁড়িয়ে দিল্লি আন্তর্জাতিক মহলে নিজেকে ‘নর্মেটিভ’ দেখায়; একই সাথে ঢাকায় ‘হাসিনা নিষিদ্ধ’ রাজনীতির বিরুদ্ধে বয়ান সৃষ্টির চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরি ও সংখ্যালঘু সুরক্ষা’ ইত্যাদির কথা বলে ফোকাস সরানোর চেষ্টা করা হয়।
অর্থনৈতিক/ট্রেড লিভার হলো ভারতীয় কৌশলের তৃতীয় স্তম্ভ। ২০২৫-এর এপ্রিলে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার; মে-জুনে স্থলবন্দর দিয়ে ৪২% আমদানি নিয়ন্ত্রণ- এগুলো ঢাকার ওপর ‘কস্ট অব ডিস্ট্যান্সিং’ বাড়ায় এবং দিল্লির আলোচনার ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে। রয়টার্স ও ইকোনমিক টাইমসের বিশ্লেষণে এ কথা উল্লেখ করা হয়।
সিকিউরিটি-বর্ডার কার্ড হলো ভারতীয় কৌশলের চতুর্থ স্তম্ভ। পুশইন, সীমান্তে অনুপ্রবেশ/অপরাধ ইস্যুতে নিয়মিত ‘কঠোরতা’ প্রদর্শন- নয়াদিল্লির ঢাকার ওপর চাপ ও বার্তা রাজনীতির অংশ। সাম্প্রতিক বিএসএফের গ্রেফতারের ঘটনাও প্রাসঙ্গিক বার্তা দেয় যে- সীমান্তনির্ভর ‘আশ্রয়’/‘এস্কেপ’ দিল্লির নজরে রয়েছে।
ওয়াশিংটন বা তৃতীয়পক্ষের সঙ্গে ব্যাকচ্যানেল প্রতিষ্ঠা ভারতীয় কৌশলের পঞ্চম স্তম্ভ বলে গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪-এর প্রেক্ষাপটে ভারত-মার্কিন সমন্বয় নিয়ে সরাসরি অভিযোগমূলক রিপোর্টিং রয়েছে। দিল্লি হাসিনা-অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ওয়াশিংটনকে ‘প্রেশার-অফ’ রাখতে চেয়েছিল- এমন বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয় পত্রিকাটিতে। এ ধরনটি ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিসা-মানবাধিকার-স্যাংশন- সবই এখানকার লিভারেজ বলে মনে করা হয়।
‘রিটার্ন’ পরিকল্পনার তিন পথনকশা
বিশ্লেষণে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন কেমন হতে পারে, তার তিনটি পথনকশা বা সিনারিও কল্পনায় রাখা হয়েছে। এর প্রথমেই রয়েছে আইন-রাজনীতি মিশ্রিত রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন। এর অংশ হিসেবে ট্রায়াল/কেসের গতিপথে সময়ক্ষেপণ করে পরে পাওয়ার-শেয়ারিং অথবা প্রতীকী/আংশিক অংশগ্রহণ করা হতে পারে, যা দিয়ে আওয়ামী লীগকে মূলধারায় ফেরানোর চেষ্টা থাকবে। এখানে দিল্লির উদ্দেশ্য হলো সীমান্ত-কানেক্টিভিটি-চীনঝুঁকি আঞ্চলিক রাজনীতি ‘স্ট্যাবিলাইজ’ করা। ঘোষিতভাবে ভারত নিরপেক্ষ থেকেও ট্রেড/কূটনীতির প্রণোদনা দিয়ে ‘ফলাফলের পরিধি’ প্রভাবিত করা সম্ভব বলে হিসাব করা হয়েছে।
নির্বাচনী কনফিগারেশন শিফট হলো দ্বিতীয় পথনকশা। এ পরিকল্পনা অনুসারে নির্বাচনের সময় জোট-ইঞ্জিনিয়ারিং- আওয়ামী লীগের নতুন ব্যানার/অ্যালায়েন্স, মুখ বদল, ‘আন-টক্সিফিকেশন’ ক্যাম্পেইন করা হবে। দিল্লির পজিশন হবে: ‘সবার অংশগ্রহণ’ বললেই যথেষ্ট- তবে বাস্তবে ‘ফিল্ডিং কন্ডিশন’ বদলালেই উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব হবে।
প্রত্যাবর্তনের বদলে ‘দূর-নিয়ন্ত্রণ’ হলো তৃতীয় পথনকশা। হাসিনা স্বয়ং না ফিরলেও দল/সম্পদ/নীতি নেটওয়ার্ক সক্রিয় রেখে ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করা- এক্ষেত্রে ন্যূনতম লক্ষ্যরেখা- ভারতের জন্য ‘স্টেট-টু-স্টেট’ চ্যানেল রিস্টার্ট না হওয়া পর্যন্ত নন-স্টেট প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করা।
মাঠের বাস্তবতা, যা ইতোমধ্যে দেখা গেছে
গার্ডিয়ানের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, মাঠের বাস্তবতা- যা ইতোমধ্যে দেখা গেছে, তার মধ্যে সেফ-হ্যাভেন ইফেক্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০২৪-২৫ সালজুড়ে আন্তর্জাতিক রিপোর্টে হাসিনার ভারতে অবস্থান ও ঢাকার আদালত-রাজনীতিতে তার ইস্যু হয়ে থাকার প্রসঙ্গ চলমান রয়েছে।
দিল্লির ডিনায়াল-ডকট্রিনও একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। ঢাকা বলেছিল, ভারতের মাটি থেকে ‘আ’লীগসংশ্লিষ্ট’ কাজ হচ্ছে; দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মিসপ্লেসড’ বলে তা খারিজ করে দিয়েছে এবং নীতিগত অগ্রাহ্যতা পুনর্ব্যক্ত করেছে। অথচ বিভিন্ন গণমাধ্যমে হাসিনার সাথে দিল্লিতে তার অর্থনৈতিক অলিগার্ক দোসর এস আলমের ৫ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকের বিস্তারিত খবর প্রকাশ হয়েছে। কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক তৎপরতার খবরও নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে।
ট্রেড লিভারেজ ব্যবহার এখনকার আরেকটি বাস্তবতা। রয়টার্স ও ইকোনমিক টাইমস এ বিষয়টি নিয়ে তাদের বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে আলোকপাত করেছে। এক্ষেত্রে ট্রান্সশিপমেন্ট প্রত্যাহার এবং আমদানি-নিয়ন্ত্রণ- দুই সিদ্ধান্তই কস্ট-সিগন্যাল; ‘রিসেট চাইলে ডিলিভারেবল দেখান’- এ বার্তাই এর মাধ্যমে দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হয়।
দিল্লির ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা
ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ান বিশ্লেষণে ভারতের এসব কৌশলে দিল্লির জন্য কিছু সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অ্যান্টি-ইন্ডিয়া সেন্টিমেন্ট প্রবলভাবে বেড়ে যাওয়া। ২০২৪-এর পর বাংলাদেশি জনপরিসরে দিল্লিবিরোধী মনোভাব স্পষ্ট হতে থাকে। প্রকাশ্যে ‘হাসিনা-প্রত্যাবর্তনকারক’ ভাবমূর্তি ভারতের কৌশলকে ব্যুমেরাং করতে পারে বলে ধারণা গার্ডিয়ানের।
ওয়াশিংটনের মানবাধিকার মেট্রিক্সও দিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র/ইইউ’র ভিসা পলিসি, শ্রম-ডিউটি ইস্যুর মতো নর্মেটিভ শর্তাবলি ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। দিল্লির নীরব ব্যাকচ্যানেলও সবসময় ফলপ্রসূ নাও হতে পারে বলে ধারণা গার্ডিয়ান বিশ্লেষকের।
অর্থনৈতিক পাল্টা চাপও দিল্লির জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়, আমদানি-ট্রানজিটে অতিরিক্ত কঠোরতা ঢাকাকে চীন-কার্ডের দিকে ঠেলে দেবে- এটা দিল্লিও জানে। তাই ‘শাস্তি’ ও ‘প্রণোদনা’- দুই স্লাইডার সামলাতে হবে দিল্লিকে।
প্র্যাকটিক্যাল ওয়াচলিস্ট
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ৩ থেকে ৬ মাসে কী দেখা যেতে পারে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ভারতের বিদেশ বিষয়ক দফতরের ব্রিফিংয়ের শব্দচয়ন- ‘ইনক্লুসিভ ইলেকশন’ থেকে যদি ‘আওয়ামী লীগ/নির্বাসিত নেতাদের অধিকার’ প্রদান জাতীয় ভাষায় দিল্লি সরে আসে কি না, সেটি এক্ষেত্রে দেখার বিষয়। সেটি যদি বাস্তবে ঘটে, তাহলে বিএনপির সরকার গঠনের পর ভারতীয় স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে দিল্লির আশ্বস্ত হবার একটি প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। সেটি না হলে বুঝতে হবে দিল্লির প্রকৃত বাজি এখনো পতিত আওয়ামী লীগেই রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ইকোনমিক টাইমস মনে করে, ট্রেড সিগন্যাল- স্থলবন্দরের কোটার নরম হওয়া বা কয়েকটি এইচএস কোডে ছাড় দেয়ার মতো বিষয় ‘বার্তা বদলের’ ইঙ্গিত হতে পারে। অন্যদিকে গার্ডিয়ান এক্সট্রাডিশন/লিগ্যাল করিডোরের বিষয়ে ঢাকা কি আনুষ্ঠানিক অনুরোধ নিয়ে এগোয় আর দিল্লি কি ‘প্রসেস-হেভি’ করে সময় টানে, নাকি জাজমেন্ট-সেফটি শর্ত তোলে- এসব দেখার বিষয় বলে মনে করে।
তৃতীয়পক্ষ ন্যারেটিভের ক্ষেত্রে ইইউ ব্রিফিং, বড় মিডিয়া লিকের মতো বিষয়ে দিল্লির ব্যাকচ্যানেলের উপস্থিতি/অনুপস্থিতি বোঝা যায় বলে মনে করা হয়। ইকোনমিক টাইমস বর্ডার ইভেন্ট-সিগন্যালÑ বিএসএফের পুশইন জাতীয় ঘটনায় ‘নাজুকতা’ দেখিয়ে বার্তা প্রদানের রাজনীতি বাড়ে কি না, সেটিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
বটম লাইন
ভারত প্রকাশ্যে নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে। আর বাস্তবে ট্রেড-বর্ডার-কূটনীতি-সেফ-হ্যাভেন- এই চার লিভারের সূক্ষ্ম সমন্বয়ে আওয়ামী লীগকে পুনরায় বৈধ রাজনৈতিক খেলার মাঠে ফেরানো তাদের ন্যূনতম লক্ষ্য বলে বার্তা দিচ্ছে। দিল্লির একটি অংশ মনে করে, সরাসরি আওয়ামী লীগের ‘রিটার্ন-টু-অফিস’ এখনই সম্ভব নয়; তবে রিহ্যাবিলিটেশন → অ্যালায়েন্স-ইঞ্জিনিয়ারিং → নির্বাচনী রি-এন্ট্রি- এ ধাপভিত্তিক পথটাই সবচেয়ে সম্ভাব্য হতে পারে।
ভারতের ‘স্বাধীন, ইনক্লুসিভ নির্বাচনের পাশে’ থাকার ঘোষণা এ কৌশলের অংশ বলে মনে করা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র গত ১৪ মে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করার বিষয়টি ভারত ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করে ‘স্বাধীন, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের জন্য জোর দিয়েছে। তারও আগে মার্চ ২০২৫ সালে ভারত ‘সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে’ বলেছে এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার দাবি জানিয়েছে ঢাকার কাছে।
আওয়ামী লীগ-সংক্রান্ত ভারতীয় ভূমিকার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আগস্ট ২০২৫ সালে বাংলাদেশ সরকার অভিযোগ করে যে- কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগ-সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড চলছে। তবে ভারত তা অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, ‘ভারতের ভূখণ্ড থেকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপ অনুমোদিত নয়’। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও মিন্ট এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করে।
ভারতের কৌশলগত গতিশীলতা পর্যবেক্ষণে একাধিক রাজনৈতিক স্তরে প্রভাব ফেলে এবং প্রকাশ্য কৌশলগত কর্মপন্থা লক্ষ করা যায় তাতে।
ঐতিহাসিক বন্ধন ও টেকসই কৌশলগত অবস্থানকে এক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি ভারতের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অবকাঠামোগত প্রকল্প এবং পূর্বমুখী নীতির অংশ হিসেবে যোগাযোগ উদ্যোগে তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন। এ বাস্তবতার বিষয়টি দ্য হিন্দু ও গার্ডিয়ান দুই পত্রিকাই তুলে ধরেছে তাদের বিশ্লেষণে।
বর্তমান নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গত এপ্রিলে (২০২৫) ভারত বাংলাদেশে মালামাল পরিবহনের মাধ্যমে তৃতীয় দেশগুলোয় যাওয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করে, যা রপ্তানি ও লজিস্টিক খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। একইভাবে ভারতের সিদ্ধান্তে (মার্চ ২০২৫) বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রায় ৪২% আমদানি সীমা আরোপ করা হয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সংক্রান্ত টানাপড়েন সৃষ্টি করছে বলে পর্যবেক্ষণ ইকোনমিক টাইমসের।
সীমান্ত নিরাপত্তা ও বাস্তব অবস্থাও দুই দেশের সম্পর্ক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এক্ষেত্রে বর্ডার হাট (সীমান্তের সাপ্তাহিক বাজার) ও সাময়িক সম্পর্ক যা ছিল, তা এখনো বজায় আছে; তবে টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর অনুসারে, নিরাপত্তা চাপ বাড়ছে প্রান্তিক এলাকায়।
আন্তরিক বা সদা বর্তমান কৌশল
ভারতের নীতি, আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসুক বা না আসুক, নিরপেক্ষতার প্রতিফলন বলে মনে হতে পারে তাদের আনুষ্ঠানিক কথাবার্তায়। তবে গভীর পর্যালোচনা করা হলে পরিষ্কার হয় যে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত সুষ্ঠু নির্বাচন মনে করে, যেখানে আওয়ামী লীগের জন্য কার্যকর রাজনৈতিক স্পেস থাকবে। দ্য হিন্দু ও ইকোনমিক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুসারে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে দিল্লি। তবে তা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে মাইনাস করে হতে পারে না বলেই দিল্লি মনে করে।
এ পত্রিকাগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়, হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘসময়ের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা- এখনো প্রাসঙ্গিক। যদিও বর্তমান সংকটের কারণে তার অনেক কিছু অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। বাণিজ্য ও সীমান্তে চাপ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারত নিজস্ব স্বার্থে এর মাধ্যমে কৌশলগত তাৎপর্য বজায় রাখতে চাইছে।
সারকথা হলো, ভারতের বাংলাদেশ কৌশল হলো নির্বিকার অবস্থান, যা রাজনৈতিকভাবে বহুমাত্রিক নির্বাচন প্রসারের আহ্বান করা। তবে সেই সাথে চাপও প্রদর্শন করা- যাতে সামগ্রিক দৃষ্টিতে ভারত নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে মনে হতে পারে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একেবারে সাম্প্রতিক এক খবর অনুসারে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফেরাতে একটি বিস্তৃত নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে দিল্লির এক বৈঠকে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, দেশকে আবার অস্থির করে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসন ফেরাতে নতুন পরিকল্পনা করা হয়েছে শেখ হাসিনার সাথে মিলে ব্যাংকের তহবিল লুটের জন্য অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের একাধিক বৈঠকে। এ উদ্দেশ্যে এস আলম সম্প্রতি দিল্লি গিয়ে শেখ হাসিনাকে ২৫০০ কোটি টাকা হস্তান্তর করেছেন এবং আরো দুই হাজার কোটি টাকা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে এসেছেন। এই অর্থ বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফেরানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে।