চীন-রাশিয়া বৈঠক : ক্রেমলিনের হুঁশিয়ারি : তেলআবিব উদ্ধার করতে চান ট্রাম্প : তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা

ইসরাইল-ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র


১৯ জুন ২০২৫ ১১:০৯

॥ ফারাহ মাসুম ॥
ইরানে হামলা চালাতে গিয়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়া ইহুদিবাদী রাষ্ট্রকে উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল-ইরান যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলা চালানোর বিষয়টি ‘গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা’ করছেন। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছেন, আর সে সাথে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীকে হত্যার পরোক্ষ হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের আকাশের ওপর এখন আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমি কোনোভাবেই আকারে বা ইঙ্গিতে শান্তি আলোচনার জন্য ইরানের সাথে যোগাযোগ করিনি। এদিকে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যুদ্ধ চাইলেও পররাষ্ট্র দফতর এর বিপজ্জনক দিকটির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সার্বিকভাবে ট্রাম্প পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে বৈঠক ডাকলে ইরানের ওপর ইসরাইলের হামলা নিয়ে মন্ত্রিসভা বিভক্ত হয়ে পড়ে। এতে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যুদ্ধে সরাসরি জড়িত থাকার পক্ষে মত জানালেও, অন্যরা প্রত্যক্ষ যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুক্তি দেখান।
এরপরও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে হামলায় ইসরাইলের সাথে যোগ দিতে পারে আমেরিকা। কংগ্রেসের চাপের মধ্যে এক জ্যেষ্ঠ আমেরিকান কর্মকর্তা টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে বলেছেন যে, বিকল্পটি ‘বিবেচনা করা হচ্ছে’। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি মোতায়েনের বিষয়টি ‘প্রতিরক্ষামূলক’ প্রকৃতির হবে। কারণ আমেরিকান বাহিনী ইসরাইলের সামরিক অভিযানে যোগ দিতে পারে এমন জল্পনা চলছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেছেন, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের মধ্যে মার্কিন নাগরিক, কূটনৈতিক মিশন এবং কর্মীদের সহায়তার সমন্বয় করার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মধ্যপ্রাচ্য টাস্কফোর্স গঠন করেছে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা বলেছেন, নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন যে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কয়েকদিনের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করবে।
অন্যদিকে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য থমাস ম্যাসি ইসরাইল-ইরান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার জন্য ‘ইরান যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। এমনকি যদি তা হয়ও, কংগ্রেসকে আমাদের সংবিধান অনুসারে এ ধরনের বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ আমেরিকান উচ্চকক্ষ সিনেটের ৮ জন সদস্য একই ধরনের বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এ আইন পাস হলে ট্রাম্প একক সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ নিয়ে যেতে পারবেন না। অবশ্য ইরানের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধের খবরের পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সেনাবাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শিগগিরই একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ’ দেবেন বলে জানানো হয়েছে। এতে তিনি কী বলবেন, সে সম্পর্কে নিশ্চিত কেউ আভাস দেয়নি। তবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেছেন যে, ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করা উচিত হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, সবচেয়ে বড় ভুল হবে সামরিক হামলা করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা হলে, কারণ তখন পুরো অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বলেছেন, ‘আমরা কখনোই ইসরাইলের সাথে আপস করব না’। ইসরাইলি সশস্ত্র বাহিনী-আইডিএফ বলেছে যে, ইরানের এখনো ইসরাইলে আঘাত করার উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। ইরান সব ইসরাইলিকে অবিলম্বে তেলআবিব ও হাইফা ছেড়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। ইরানের চার দিনের পাল্টা হামলায় তেলআবিব পশ্চিম জেরুসালেম হাইফাসহ অন্য অনেক শহরে বিপর্যয় নেমে এসেছে। ইরানি সুপারসনিক ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে আঘাত হেনে নরকতুল্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সেখানে ভিডিওচিত্রসহ সর্বশেষ খবরে জানা যাচ্ছে, ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্ষমতা হারিয়ে ইসরাইলের ভূমিতে একের পর এক আত্মঘাতী আঘাত হানার ঘটনা ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে একদিকে নেতানিয়াহু ক্ষয়ক্ষতিকে জনগণ সামনে আড়াল করে রাখছে; অন্যদিকে আমেরিকার সরাসরি যুদ্ধে আবির্ভূত হওয়ার ব্যাপারে পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে। ইসরাইলে অবস্থানরত ইরানের নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভিকে দিয়ে নেতানিয়াহু বলিয়েছেন যে ‘ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়ছে এবং শেষ হয়ে যাচ্ছে। খামেনি পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন।’
আমেরিকার যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা দেখা দেওয়ার প্রেক্ষিতে চীন ও রাশিয়ার শীর্ষনেতারা কথা বলেছেন। রাশিয়া পরিষ্কার বলেছে, ইরানের ওপর ইসরাইলের আক্রমণ অবৈধ। চীনও একই মনোভাব ব্যক্ত করেছে।
আমেরিকা ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে জড়াবে?
এ প্রশ্নের জবাবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন সম্ভাবনা আছে, তবে সেটি হতে পারে শর্তসাপেক্ষ। আমেরিকার ইসরাইলের নিরাপত্তা রক্ষায় গভীর অঙ্গীকার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বলে এসেছে, তারা ইসরাইলের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাধারণভাবে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চায় না, কিন্তু চাপ প্রয়োগ করে। ইরানকে প্রতিরোধে এবং দুর্বল রাখতে নিষেধাজ্ঞা, কূটনীতি ও সাইবার যুদ্ধ ব্যবহার করলেও ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিকভাবে জড়িত হওয়া এড়িয়ে চলে। কিন্তু ইরানে হামলা করতে গিয়ে ইসরাইল তেহরানের পাল্টা আক্রমণে মুখে পড়ে রীতিমতো অস্থিত্বের সংকটে পড়েছে। এ অবস্থায় ইসরাইলপন্থি মার্কিন নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ইসরাইল নিজের কাছে পরমাণু অস্ত্র রাখলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ইসরাইলের জন্য হুমকি বলে অব্যাহতভাবে প্রচার করে। ইসরাইল একাধিকবার সরাসরি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে গোপন হামলা চালিয়েছে। এবার দেশটি প্রক্সিযুদ্ধ থেকে সরাসরি সংঘর্ষে নেমে পড়েছে। সরাসরি যুদ্ধে জড়িত হওয়ার ব্যাপারে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ফ্রন্টে চাপে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ ইউরোপীয় মিত্র যুদ্ধের বিস্তৃতি চায় না। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুদ্ধের বিরুদ্ধেই তারা অবস্থান নিতে পারে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে জড়াবে কি না, তা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি বা মিত্রদের ওপর আঘাত হয় কি না, তার ওপর নির্ভর করতে পারে। ইরান এখন পর্যন্ত আমেরিকান কোন স্বার্থে সরাসরি আঘাত হানেনি। যদিও বলে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ইসরাইল ইরানে সামরিক হামলা চালিয়ে আসছে।
প্রশ্ন হলোÑ যদি আমেরিকা ইসরাইলের সাথে ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিণতি কী হতে পারে? এটি ঘটলে যুদ্ধের ব্যাপক বিস্তার ঘটতে পারে। যুদ্ধ কেবল ইরান-ইসরাইল এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, আফগানিস্তান, পারস্য উপসাগর; এমনকি ইয়েমেনেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইরানের প্রক্সি হিজবুল্লাহ, হুথি, শিয়া মিলিশিয়া, ফিলিস্তিনি গ্রুপগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে।
ওয়াশিংটন ইরানে হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা হতে পারে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলোয় (কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, আমিরাত, জর্ডান, ইরাক) হামলা করতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচল বিপর্যস্ত হবে। এর প্রভাব পড়বে অর্থনৈতিক ও জ্বালানির ওপর। যুদ্ধ হলে পারস্য উপসাগরের ২০ শতাংশ তেল চলাচল বন্ধ হতে পারে। এতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সে সাথে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্যসংকট তৈরি হতে পারে। যুদ্ধের ধাক্কায় বিনিয়োগ কমে যাবে, বিশ্ববাজার অস্থির হবে। ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া; এমনকি বাংলাদেশের মতো দেশের ওপর ভয়ানক প্রভাব পড়বে।
ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়া ও চীন ইরানকে সমর্থন করতে পারে, সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও ইরান পক্ষকে অস্ত্র, গোয়েন্দা বা কূটনৈতিক সহায়তা দিতে পারে। এ সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন ঠাণ্ডাযুদ্ধের রূপরেখা তৈরি করবে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ, উত্তেজনা ও বিদ্রোহ বাড়বে। তুরস্ক, কাতার ও পাকিস্তানের মতো দেশ কূটনৈতিকভাবে কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
ইরান, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক থেকে লাখো মানুষ শরণার্থী হয়ে ইউরোপ ও তুরস্কে ঢুকবে। তাতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে জনমত তীব্রভাবে যুদ্ধবিরোধী হয়ে উঠবে, সরকারগুলো চাপের মুখে পড়বে। ইসরাইলের শহরগুলোয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়বে, যুক্তরাষ্ট্রে বিরোধীদল, প্রেস, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ বাড়বে।
যুদ্ধে ইরান দুর্বল হবে, কিন্তু টিকে থাকতে সক্ষম হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক কাঠামো ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু শাসন পরিবর্তন কঠিন হবে। আর মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থামলেও এ অঞ্চলে প্রক্সি সংঘর্ষ ও বিদ্রোহ অব্যাহত থাকবে। চীন-রাশিয়া বলয় জোরদার হবে। এ বলয় ইরানের পক্ষে দাঁড়িয়ে পশ্চিমা জোটকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। মার্কিন নেতৃত্ব এতে প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং বিশ্বমঞ্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবাজ হিসেবে দেখা হতে পারে, ফলে আন্তর্জাতিক শক্তিধর দেশটির বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে।
মোটকথা, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরাইলের সাথে সরাসরি ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এটি শুধুই ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ থাকবে না, বরং একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক সংকট; এমনকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাও করতে পারে। এটি বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তার মানচিত্র বদলে দিতে পারে।
কেন ইরান ও ইসরাইল উত্তেজনা
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ উত্তেজনার মূল কারণ হলো ইসরাইলের পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি দখলের প্রচেষ্টা। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে প্রথমে গাজা ও পশ্চিমতীর থেকে ফিলিস্তিনিদের নিমূল করার জন্য যুদ্ধ শুরু করে তেলআবিব। এরপর লেবানন ও সিরিয়ার ভূখণ্ড দখল করেছে, তারপর আঘাত করেছে এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ ইরানকে। নেতানিয়াহুর বক্তব্যে স্পষ্ট প্রকাশ পেয়েছে এরপর টার্গেট হবে পাকিস্তান ও তুরস্ক। এ শক্তিধর দেশগুলোকে নত করতে পারলে পুরো অঞ্চলে ইসরাইলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাবে।
ইরানকে আঘাত করতে ইসরাইল যুক্তি হিসেবে নিয়ে এসেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গতি বৃদ্ধিকে। এই অভিযোগকে ঘিরে ইরানে ইসরাইল বার বার গোপন অভিযান পরিচালনা করেছে। ইরানের সাথে এ বিষয়ে সুর মিলিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইলের প্রধান মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে সামরিক প্রস্তুতি, গোয়েন্দা সমন্বয় ও নৌবাহিনী মোতায়েন বাড়িয়েছে।
প্রশ্ন হলো- যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা কী হতে পারে? যদি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে মার্কিন বাহিনী ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা করতে পারে। হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনী মোতায়েন করতে পারে। সাইবার হামলা ও উপগ্রহ গোয়েন্দা সহায়তা এবং বিশেষ বাহিনী ও রসদ সহায়তা প্রদান করতে পাওে ইসরাইলকে।
সম্ভাব্য পরিণতি বিশ্লেষণ
আমেরিকা এ যুদ্ধে জড়ালে ব্যাপক নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। যুদ্ধ শুধু ইসরাইল-ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, বাহরাইন ও ইয়েমেনে ছড়িয়ে পড়বে। ইরানের প্রতিরোধ সহযোগী গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ, হুথি, হাশদ আল শাবি সক্রিয় হয়ে বিস্তৃত হামলা শুরু করতে পারে।
ওই যুদ্ধের বিস্তৃতিতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। ৩৫ মিলিয়ন মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটতে পারে। তেহরান, তেলআবিব, হাইফা, দামেস্ক, বাগদাদের মতো শহরে নাগরিক অবকাঠামো ধ্বংস হবে। পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হলে বিকিরণ বা রাসায়নিক দূষণ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।
এ যুদ্ধের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা দেবে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার বেড়ে যেতে পারে। হরমুজ প্রণালী ঝুঁকিতে পড়লে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।
এতে নতুন আন্তর্জাতিক মেরুকরণ সৃষ্টি হতে পারে। রাশিয়া ও চীন কূটনৈতিক বা সামরিকভাবে ইরানকে সহায়তা করতে পারে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বিক্ষোভ ও সরকারবিরোধী চাপ বাড়তে পারে। জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে সামরিক হামলায় জড়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা কমবে।
জাতিসংঘ কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। এক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিযন্ত্রণে তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ করতে পারে। সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, ওমান এর মতো নিরপেক্ষ দেশ দ্বারা ত্বরিত মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা শুরু করতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন আহ্বান করা যেতে পারে।
মানবিক প্রস্তুতির কিছু পদক্ষেপও নিতে হবে জাতিসংঘকে। এইএনসিআর, ডব্লিউএইচও ডব্লিউএফপি ইত্যাদির সমন্বয়ে শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সাড়া দানের পরিকল্পনা নেয়ার প্রয়োজন হবে। জর্ডান, তুরস্ক, পাকিস্তানে শরণার্থী কেন্দ্র প্রস্তুত করতে হবে।
পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপ হিসেবে জাতিসংঘভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত পর্যবেক্ষণ ইউনিট গঠন করতে হবে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে হবে।
আইনি কাঠামো নিশ্চিতকরণেও বিশ্ব সংস্থাকে পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) ও ৫১ অনুসারে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আত্মরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও যুদ্ধ আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।
ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণ, বৈধ হোক বা না হোক, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এটি হবে গভীর হুমকি। এক্ষেত্রে জাতিসংঘকে প্রতিক্রিয়ামূলক নয় প্রতিরোধক ভূমিকা নিতে হবে- যেন এ সংঘাত আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংকটে পরিণত না হয়। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব ড্যাগ হ্যামারশোল্ড বলেছিলেন, ‘জাতিসংঘকে তৈরি করা হয়েছিল মানুষকে স্বর্গে নিয়ে যেতে নয়, বরং নরক থেকে বাঁচাতে।’ সেই ধরনের নরক সৃষ্টির আশঙ্কা এখন সৃষ্টি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে।
মুসলিম বিশ্ব কী করবে?
ইসরাইল ও তার মিত্রদের চলমান যুদ্ধ ও আগ্রাসন যে মুসলিম বিশ্বকে টার্গেট করে, তাতে সন্দেহ নেই। ইরান এটিকে মোকাবিলা করার জন্য যেভাবে একটি ‘মুসলিম সামরিক জোট’ বা ‘মুসলিম সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বাহিনী’ গঠনের প্রস্তাব করছে। প্রশ্ন হলো এটি কি বাস্তবায়নযোগ্য?
ইরান বহু বছর ধরেই একটি ‘Muslim Unity Army’ ev ‘Islamic Joint Defense Pact’ গঠনের কথা বলে আসছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো- মুসলিম দেশগুলোর সামরিক নিরাপত্তার সমন্বয়, ইসরাইল ও পশ্চিমা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা, ফিলিস্তিন ও কাশ্মীর ইস্যুতে সক্রিয় সামরিক প্রস্তুতি, সুন্নি-শিয়া বিভাজন দূর করে মুসলিম ঐক্য গড়ে তোলা।
এটি বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো- সুন্নি-শিয়া বিভাজন। সৌদি আরব, মিশর, পাকিস্তান, তুরস্ক অধিকাংশ সুন্নি রাষ্ট্র ইরানের নেতৃত্বে কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হতে এক সময় দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। ইরান-সৌদি মতাদর্শিক ও কৌশলগত বৈরিতাও বড় বাধা ছিল। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল, রাজনৈতিক বিভাজন। তুরস্ক চায় নিজে মুসলিম বিশ্বের নেতা হতে, তাই ইরান-নেতৃত্বাধীন কোনো জোটে অনীহা রয়েছে বলে অনেকে ধারণা। পাকিস্তান, কাতার, মালয়েশিয়ার মতো দেশ ‘ভারসাম্য কূটনীতি’ অনুসরণ করে, তারা সরাসরি ইরানের পাশে দাঁড়ায় না। তৃতীয়ত, রয়েছে আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার ভয়। ইরান নিজেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় আছে; ইরানের নেতৃত্বে কোনো সামরিক জোট মানে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ চাইবে না এমন কোনো জোট কার্যকর হোক।
এসব কারণে এ প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। তবে একটি সীমিত পরিসরের ‘শিয়া-মুসলিম মিলিশিয়া কনফেডারেশন’ বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে করা হয়, যেটি ইসরাইল ও পশ্চিমা স্বার্থের জন্য প্রতিরোধমূলক হয়ে উঠতে পারতো। তবে এখনকার বাস্তবতা আর বিভক্তি কোনো ঐক্য নয়, এখন দরকার মুসলিম উম্মাহর সমন্বিত ঐক্য। তা না হলে কোনো দেশই আগ্রাসনের মুখে স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম হবে না।
ইসরাইল কি ইরান যুদ্ধে জয় পাবে?
এর সরল উত্তর না। ‘জয়’ শব্দটি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। নিচে কৌশলগত, সামরিক, রাজনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলোÑ
সামরিক দিক থেকে ইসরাইলের শক্তির দিক হলো, এর অত্যন্ত উন্নত বিমানবাহিনী (এফ-৩৫, এফ-১৬ ও ড্রোন); ইলেকট্রনিক ও স্টাক্সনেট ইত্যাদির মতো সাইবার যুদ্ধ ক্ষমতা; নিউক্লিয়ার অস্ত্রের সম্ভাব্য মালিক (অস্বীকার করে এলেও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়); আয়রন ডোম, অ্যারো ও ডেভিডস স্লিং এর মতো মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ইসরাইলের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, ইরান ভৌগোলিকভাবে বিশাল (১.৬ মিলিয়ন বর্গকিমি), দূর থেকে আক্রমণ করা কঠিন; অনেক পরমাণু স্থাপনা ভূগর্ভে ও ছদ্মবেশে রয়েছে; একাধিক যুদ্ধক্ষেত্র খুলে যেতে পারে এবং লেবানন, গাজা, সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে একযোগে হামলা হতে পারে।
ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য। এর রয়েছে বিপুল ব্যালাস্টিক মিসাইল স্টক; হিজবুল্লাহ (লেবানন), হাশদ (ইরাক), হুথি (ইয়েমেন), হামাস এর মতো সহযোগী প্রতিরোধ গোষ্ঠী রয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি কার্যকর করতে পারে। দেশটির জনসংখ্যা ও স্থলবাহিনী অনেক বড় (ইসরাইলের চেয়ে কয়েকগুণ)।
কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক হিসাব: ইসরাইলের আন্তর্জাতিক মিত্র হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কিছু ইউরোপীয় দেশ। কৌশলগতভাবে রাশিয়া ও চীন ইরানের সাথে যুক্ত যদিও ইসরাইলের সাথে তাদের সম্পর্ক রয়েছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের অবস্থান ইরানের দিকে। এ বিষয়ে শাসকদের ভাবনা ও সক্রিয় সমর্থন যাই থাক না কেন, জনগণের পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভেতরে-বাইরে জনসমর্থন কমে যাবে। মুসলিম জাতিগত ঐক্য ও ইসলামী প্রতিরোধ জোরদার হবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলাফল
যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত হলে স্বল্পমেয়াদি বিমান হামলায় ইসরাইল আংশিক সফল হতে পারে, কিন্তু প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি থাকবে। সংঘাত সম্পূর্ণ যুদ্ধে রূপ নিলে যুদ্ধ দীর্ঘ হবে, ইসরাইল এককভাবে কোনোভাবেই জিততে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যে ইরানের পরমাণু স্থাপনা ধ্বংসের চেষ্টা সম্ভব, তবে তা চূড়ান্ত যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিন্দা তৈরি করবে। বিশেষত লেবানন ও গাজা থেকে প্রক্সি যুদ্ধ ও বহুমুখী ফ্রন্ট হলে ইসরাইল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রশ্ন হলো- ইসরাইল কি জয়ী হতে পারবে? বাস্তবতা হলো সামরিকভাবে কিছু লক্ষ্য অর্জন করতে পারে (যেমন: পরমাণু স্থাপনায় আঘাত)। কিন্তু পূর্ণমাত্রায় ‘জয়’ কোনোভাবেই সম্ভব নয়, যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় বা বহু ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের মূল্য হবে অনেক বেশি: ইসরাইলের নাগরিক ক্ষয়ক্ষতি আন্তর্জাতিক বৈরিতা পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা নিয়ে আসবে।
সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র: ইসরাইল হয়তো এক-দুই দফা সফল হামলা চালাবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ইরান ও তার প্রক্সি শক্তির কারণে জিততে পারবে না। বরং অঞ্চলটি অবিরাম সংঘর্ষে জর্জরিত হতে পারে, যেখানে কোনো পক্ষই সম্পূর্ণ জয়ী হবে না।
সার্বিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি প্রয়োগ যে শান্তি আনতে পারে না, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি ঐকমত্য রয়েছে।
দেখা গেছে, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত চতুর্থ দিনে প্রবেশ করার পর উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে সহিংসতার চক্রে সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়িয়েছে। পারস্পরিক আক্রমণের ফলে কেবল হতাহত এবং অবকাঠামোগত ক্ষতিই হয়নি বরং পারমাণবিক ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ করে একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইসরাইল এবং ইরান উভয়ই মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশ। ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং শান্তির সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে জরুরি কাজ হলো সংঘাতের তীব্রতা এড়াতে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা, অঞ্চলটিকে আরও বেশি অস্থিরতার দিকে ঠেলে না দেওয়া এবং কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের পথে ফিরে আসা। এ বিষয়ে চীনা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে গ্লোবাল টাইমসে বলা হয়েছে, সিপিসি কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরান এবং ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে পৃথক ফোনে কথা বলেছেন, উভয় পক্ষকে সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন। সংঘাতের তীব্রতা থামাতে এবং পরিস্থিতির তাপমাত্রা কমাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যও মধ্যস্থতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরাইলি বোমাবর্ষণ। তেলআবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। যথেষ্ট উত্তেজনা। এবার থামার সময় এসেছে। শান্তি এবং কূটনীতি জয় করতে হবে।’
চীনের এ উদ্যোগ সফল হলে পরিস্থিতির অধিক অবনতি ঠেকতে পারে। তা না হলে বিশ্ব আরেকটি প্রলয়ংকরী সংঘাতের পর্বে প্রবেশ করবে, যা শেষ পর্যন্ত কারো কল্যাণ বয়ে আনবে না।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আপাতদৃষ্টিতে ‘পারমাণবিক’ প্রশ্ন থেকেই এ সংঘাতের সূত্রপাত বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এর মূলে এটি একটি গভীর-মূলযুক্ত নিরাপত্তা দ্বিধার আরেকটি প্রকাশ। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়ন তার নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ এ আশঙ্কায় ইসরাইল একটি ‘পূর্ববর্তী’ কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনকারী কর্মকাণ্ডের ফলে, তার নিজের জন্য আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ইরানের পারমাণবিক ইস্যু সমাধানের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানোর মুহূর্তটি ‘পূর্ববর্তী’ স্ট্রাইকের মাধ্যমে অর্জন করা হয়নি; বরং এটি ছিল ১৩ বছরের ‘ম্যারাথন’ আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলাফল, যার পরিণতি ছিল ২০১৫ সালে একটি বাধ্যতামূলক ব্যাপক চুক্তি অর্জন। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তীতে চুক্তি থেকে সরে না যেত এবং চুক্তিটি আন্তরিকভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হতো, তাহলে ইরান এবং ইসরাইল উভয়ই আজ স্পষ্টতই অনেক বেশি নিরাপদ থাকত।