বয়সের ভার ও নানা শারীরিক জটিলতা তাকে দুর্বল করলেও আদর্শ ও রাজনৈতিক সাহস ছিল অটল। আজ তার এই বিদায় কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক যুগের পরিসমাপ্তি। ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন এমন এক নেত্রী হিসেবে, যিনি জাতীয় নির্বাচনে কোনোদিন পরাজিত হননি এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজ আদর্শে অটল ছিলেন।
দিনাজপুরে ইস্কান্দর মজুমদার ও বেগম তৈয়বা মজুমদার দম্পতির ঘরে ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেন খালেদা জিয়া। জন্ম নাম ছিল খালেদা খানম পুতুল। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ভাইয়েরা সবার ছোট।
১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুর শহরের ১৫ বছর বয়সী কিশোরী খালেদা খানমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ২৪ বছর বয়সী জিয়াউর রহমান। সে সময় জিয়া ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ডিএফআই-এর কর্মকর্তা হিসেবে তখন দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন।
১৯৬৫ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমানে পাকিস্তান) যান। সেখানে একই বছরের ২০ নভেম্বর প্রথম পুত্র তারেক রহমানের জন্ম হয়। ১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত করাচিতে স্বামীর সঙ্গে ছিলেন খালেদা জিয়া। এরপর ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় ও কনিষ্ঠ সন্তান আরাফাত রহমান কোকো জন্ম নেয়। কিছুদিন জয়দেবপুর থাকার পর চট্টগ্রামে স্বামীর পোস্টিং হলে তার সঙ্গে সেখানে এবং চট্টগ্রামের ষোলশহর একালায় বসবাস করেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে খালেদা জিয়া কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় চলে আসেন। বড় বোন খুরশিদ জাহানের বাসায় ১৭ জুন পর্যন্ত থাকেন। ২ জুলাই সিদ্ধেশরীতে এস আব্দুল্লাহর বাসা থেকে পাক সেনারা তাকে দুই ছেলেসহ বন্দি করে। ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের মেয়াদ শুরু হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতির পদ অধিগ্রহণের মাধ্যমে। মাত্র চার বছরের মাথায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে হত্যা করা হয় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। আজকের বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। মূলত দুই পুত্রকে লালন পালন ও ঘরের কাজ করেই সময় কাটাতেন। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাধারা তো দূর, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তার দেখা মিলত না।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। এরপর তাকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। সে সময় নানা কারণে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি অনেকটা ছত্রভঙ্গ, বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা ছিল। দল টিকিয়ে রাখতে দলের সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ এবং অনুরোধে ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া। সে থেকেই শুরু। খালেদা জিয়া হয়ে উঠেন বিএনপির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বামীর প্রতিষ্ঠিত দলকে সংগঠিত করে সামনে এগিয়ে যেতে শুরু করেন তিনি।
জেনারেল এরশাদের শাসনামলে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন খালেদা জিয়া। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময় কয়েকবার আটক করা হলেও নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তার ভূমিকা দেশব্যাপী তাকে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে। এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। জীবনের প্রথম নির্বাচনেই পাঁচটি আসন থেকে লড়ে সবকটিতেই জয়লাভ করেন খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে আসার মাত্র ১০ বছরের মাথায় হন প্রধানমন্ত্রী।
সেই মেয়াদ শেষে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবারো প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তবে বেশিদিন থাকতে পারেননি। একই বছরের মার্চে সে সংসদ ভেঙে দেয়া হয় এবং ১২ জুনের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে জিতে জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে নিয়েই সরকার গঠন করে বিএনপি। ২০০১ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর হন খালেদা জিয়া। মেয়াদ পূর্ণ করে ২০০৬ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে সংসদ ভেঙে দেন তিনি।
সেই সরকারের হাতেই ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির অভিযোগে পুত্রসহ আটক হন খালেদা জিয়া। এরপর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বার সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্তিলাভ করেন।
ওই বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের কাছে হেরে যায় বিএনপি। শেখ হাসিনা হলেন প্রধানমন্ত্রী, আর খালেদা জিয়া হলেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে তখনকার প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ দলই সে নির্বাচন বর্জন করে। আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্রসহ ১৭টি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। সারা দেশের ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় নির্বাচনটি বিতর্কের জন্ম দেয়।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। এরপরই তাকে বন্দি করে ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ সময় বন্দি থাকার পর ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর তিনি মুক্তি পান। ৫ আগস্টের মুক্তির কিছুদিন পর ১৯ আগস্ট তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, যা ২০০৭ সালে জব্দ করা হয়েছিল, তা সচল করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নির্দেশ দেয়া হয়।
খালেদা জিয়া দীর্ঘস্থায়ী ধরে কিডনি, পচনশীল যকৃতের রোগ, অস্থির হিমোগ্লোবিন, ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং অন্য বয়সজনিত জটিলতায় ভুগছেন। ২০২১ সালের এপ্রিলে তিনি করোনা-ভাইরাসে আক্রান্ত হন। তার বাসা ফিরোজার আরো ৮ জনের করোনা-ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। ২০২২ সালে তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। ৯ জানুয়ারি তাকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) থেকে স্থানান্তর করা হয়। তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য কাতারের আমীরের পাঠানো বিশেষ এয়ার এম্বুলেন্সে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন এবং ৮ জানুয়ারি লন্ডনে পৌঁছান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত চার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন খালেদা জিয়া। শুধু ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনটি আসন ও বাকিগুলোয় পাঁচটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। প্রতিবারই সবকটি আসনে জয় পান। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনে কারো কাছে কখনো পরাজিত হননি তিনি।
খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে একটি যুগের অবসান ঘটল। গৃহবধূর শান্ত জীবন থেকে সময়ের প্রয়োজনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন রাজপথের কাণ্ডারি এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই, কারাবরণ আর ব্যক্তিগত শোক—কোনো কিছুই তাকে তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। মৃত্যুতে তার শারীরিক উপস্থিতি থমকে গেলেও, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার ত্যাগ ও ‘আপসহীন’ নেতৃত্বের উত্তরাধিকার চিরকাল প্রাসঙ্গিক থাকবে। তিনি চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক বর্ণাঢ্য ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ইতিহাস।