ভারতীয় ইন্ধনে পাক-আফগান সংকট : মুসলিম উম্মাহর সমর্থন হারাচ্ছে তালেবান
৫ মার্চ ২০২৬ ২১:১৮
॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
আফগান-পাকিস্তান যুদ্ধের সূচনা ২০২৫ সালে। মুসলিম দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধ থামাতে কাতার এবং তুরস্ক অনেক চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু তালেবান ভারতের ইন্ধনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে আফগানিস্তান, পাকিস্তান তথা মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি করছে। তালেবান ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে অন্তত ৭৫ বার ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ভারতের মদদপুষ্ট তালেবানরা মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলটিতে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে।
উন্মুক্ত যুদ্ধ
পাক তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানান, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ছাড়াও কান্দাহার এবং পাকতিয়া প্রদেশে তালেবানের সামরিক লক্ষ্যবস্তু; বিশেষ করে ব্রিগেড সদর দপ্তর এবং গোলাবারুদের ডিপো লক্ষ করে পাকিস্তান বিমান থেকে বোমা হামলা চালিয়েছে। আফগান বাহিনী বিমান বিধ্বংসী কামানের গোলা ছুড়ে পালটা জবাব দিয়েছে।
হামলার পরপরই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, ধৈর্যের পরীক্ষা শেষ উন্মুক্ত যুদ্ধ শুরু।
উত্তেজনার সূত্রপাত গত ২২ ফেব্রুয়ারি আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলা মধ্য দিয়ে। তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ জানিয়েছেন, সেই হামলার প্রতিশোধে শুক্রবার ভোরে আফগান বাহিনী ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানগুলোয় আক্রমণ চালায়। আন্তর্জাতিক মহল এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সংলাপ ও আস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং উভয় দেশের তথা মুসলিম উম্মাহর জন্য শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানায় আরব আমিরাত। আর ভারত এই বিমান হামলার নিন্দা জানিয়ে একে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করে ইন্ধন জুগিয়েছে। এই ইন্ধন ডেভিড হান্টিংটন প্রদত্ত ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত ইসলামোফোবিয়া থেকে ধারণা বিশেষজ্ঞ মহলের। ভারতীয় ইন্ধন ছাড়াও পাক-আফগান সংঘাতের শেকড় প্রোথিত ডুরান্ড লাইন, শীতল যুদ্ধকালীন ছায়াসংঘাত, ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বের উত্তাল ভূ-রাজনীতি, টিটিপি ইত্যাদিতে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তাদের পরিচালিত ‘অপারেশন গজব-লিল হক’-এ এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানের ৩৭ স্থানে বিমান হামলা, ১০৪টি চেকপোস্ট ধ্বংস, ৩৩১ জন ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছেন। আফগানিস্তানও পাকিস্তানি সেনার মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। দুদেশের মাঝে উত্তেজনা চলমান। আফগানিস্তান-পাকিস্তানের ক্ষতি মানে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি সেক্ষেত্রে ইসলামোফোবিয়া থেকে ভারতীয় ইন্ধন সফল বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
‘এটা যুদ্ধ নয়, তবে অভিযান চলবে’: আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাহবাজ শরীফের মুখপাত্র মুশাররফ জাইদিকে জিজ্ঞেস করা হয়, পাকিস্তান কি আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে?
মুশাররফ জাইদি বলেন, ‘যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে না। এটা যুদ্ধ নয়। যুদ্ধ হয় দুটি দেশের মধ্যে’।
‘পাকিস্তান তার প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে যেন পাকিস্তানের মাটি ও জনগণকে… আফগান মাটি থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ থেকে রক্ষা করা যায়’, বলেন তিনি। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে কীভাবে আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে এমন প্রশ্নে জাইদি বলেন, “আমরা আমাদের ভূমি ও জনগণকে রক্ষায় ‘আগুনের প্রাচীর’ গড়ব”। তিনি আরও বলেন, আফগান তালেবান এবং ভারতের উচিত আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। কারণ তারাই আস্থা নষ্ট করার জন্য দায়ী। তিনি বলেন, তালেবানকে দোহা চুক্তির শর্ত পূরণ করতে হবে, যার অধীনে তাদের ভূখণ্ড কোনো দেশের বিরুদ্ধে উগ্রপন্থিদের দ্বারা ব্যবহার হতে দেওয়া যাবে না।
পাকিস্তানকে ‘হুঁশিয়ারি’: ভারত ও আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুজনেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেন। পরে সংবাদ সম্মেলনের সময় পাকিস্তানের উদ্দেশে ‘সতর্কবার্তা’ দিতে দেখা যায় আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুত্তাকিকে।
ভারতের রাজধানী থেকেই পাকিস্তানকে কিছুটা হুঁশিয়ারির সুরেই ‘খেলা বন্ধ’ করার বার্তা দিয়েছেন। আফগানদের সাহস পরীক্ষা করা উচিত নয়। যদি কেউ তা করতে চায়, তাহলে তাদের উচিত ব্রিটিশ, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোকে জিজ্ঞাসা করা, যাতে তারাই ব্যাখ্যা করে দিতে পারে যে আফগানিস্তানের সাথে খেলা করলে ভালো হয় না।’ ভারতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি ভারত-আফগানিস্তানের যৌথ হুমকি প্রমাণ করে এটি ভারতেরই যুদ্ধ।
পাকিস্তানের ‘আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রের : ইসলামাবাদ দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ ঘোষণার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র ই-মেইল বার্তায় আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ‘আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন জানিয়েছে। মার্কিন কূটনীতিক আলিসন হুকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, তিনি শুক্রবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালোচের সঙ্গে কথা বলেছেন।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষ জানায়, পাকিস্তান তাদের বাহিনীর ওপর বোমা হামলা চালানোর পরও তারা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। যদিও ভারতীয় ইন্ধনে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তালেবান দায়ী।
ডুরান্ড লাইন : পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে ২৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ডুরান্ড লাইন’। পাকিস্তান একে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত হিসেবে দাবি করলেও আফগানিস্তান এটিকে ঔপনিবেশিক শাসনের আরোপিত সিদ্ধান্ত বলে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদের যুক্তি, এটি ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সাথে বাতিল হয়ে গেছে। আর তালেবান একে ‘কাল্পনিক রেখা’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
১৮৯৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের ব্রিটিশ কূটনৈতিক মার্টিমার ডুরান্ড ও আফগান রাজা আমীর আবদুর রহমান খান তাদের নিজ নিজ দেশের সীমা নির্ধারণের জন্য ব্রিটিশ-ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে ডুরান্ড লাইন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৯ সালের অ্যাংলো-আফগান চুক্তির মাধ্যমে লাইনটি সামান্য পরিবর্তিত হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীনতা পেলে এই ডুরান্ড লাইন বরাবর ভাগ হয় আফগানিস্তান-পাকিস্তানের সীমান্ত। ব্রিটিশ কূটনীতিক স্যার ডুরান্ডের টানা সীমারেখা কার্যত পশতুন জনগোষ্ঠীর মাতৃভূমিকে দ্বিখণ্ডিত করে এক অংশ ব্রিটিশ ভারতের অধীনে, আরেক অংশ আফগানিস্তানে দেয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করে, তখনো আফগানিস্তান একমাত্র দেশ হিসেবে এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল, যেটিকে মুসলিম দেশের মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ভোট হিসেবে ধরা হয়।
হস্তক্ষেপের ভূ-রাজনীতি : ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আক্রমণ পুরো আঞ্চলিক ভারসাম্য বদলে দেয়। তখন পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সহায়তায় আফগান মুজাহিদিনদের (বিভিন্ন ইসলামপন্থী গেরিলা গোষ্ঠী) প্রধান মিত্র ও সহায়ক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
পাকিস্তানের এ নীতির পেছনে ছিল সোভিয়েত প্রভাব মোকাবিলা করা এবং কাবুলে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ, পাকিস্তানপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা করার আকাক্সক্ষা। পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) সংস্থা মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করে। মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তা দেয়াল পাকিস্তানের সহযোগিতায় আফগানিস্তান পরিণত হয় ইসলামপন্থী যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণাগারে।
তালেবান প্যারাডক্স : আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েতদের চলে যাওয়ার পরই দেশটিতে শুরু হয় ভয়ংকর গৃহযুদ্ধ। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই পাকিস্তান ‘তালেবান’ নামের নতুন এক শক্তিকে সমর্থন দেয়। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই তালেবানকে সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করে। এর ফলে ১৯৯০-এর দশকে তালেবান দ্রুত কাবুল দখল করে আফগানিস্তানের বড় অংশে আধিপত্য স্থাপন করে। পাকিস্তানসহ মাত্র তিনটি দেশ তালেবানের ইসলামিক এমিরেটকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
তালেবানকে এমন সমর্থন পাকিস্তানের ‘কৌশলগত সুরক্ষা’ নীতির (স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ) শীর্ষ অর্জন বলে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর সবকিছু বদলে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদা তালেবান-নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তান থেকে এই হামলা পরিচালনা করেছে অভিযোগ করে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে হামলা চালায়। ফলে পাকিস্তান বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জোটে যোগ দিতে।
এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের নীতিতে গভীর অন্তর্দ্বন্দ্ব তৈরি করে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র; অন্যদিকে তাদের গোয়েন্দা সংস্থার কিছু অংশ গোপনে তালেবানদের সমর্থন দিতে থাকে।
পাকিস্তানের এই ‘দ্বৈত খেলা’ ওয়াশিংটন ও কাবুল উভয়ের সঙ্গে দেশটির প্রচণ্ড অবিশ্বাস তৈরি করে।
পরবর্তীতে দীর্ঘ ২০ বছর সংঘাতের পর ২০২১ সালের ৩০ আগস্ট আফগানিস্তান থেকে সম্পূর্ণরূপে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মুজাহিদিন থেকে তালেবান : আশির দশকের সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে লড়াইরত আফগান মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকেই তালেবানের উদ্ভব হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমর্থনে পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) মুজাহিদিন যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ করে, যা প্রায় এক দশক ধরে চলা সংঘর্ষের পর ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনীর প্রত্যাহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়, যা আফগানিস্তানকে প্রায় সাত বছরের গৃহযুদ্ধের মধ্যে নিয়ে যায় এবং ১৯৯৬ সালে শেষ হয়। গৃহযুদ্ধকালীন ১৯৯৪ সালে তালেবান গোষ্ঠী আত্মপ্রকাশ করে। দুই বছরের মধ্যে তালেবান কাবুল দখল করে এবং আফগানিস্তানে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠা করে।
শরণার্থী সঙ্কট : পাকিস্তান বহু বছর ধরে লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, বর্তমানে যার মধ্যে সাড়ে ১৩ লাখ নিবন্ধিত রয়েছে। তবে ২০২৩ সালের শেষ দিকে ইসলামাবাদ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অনিবন্ধিত শরণার্থীদের যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তালেবান এই পদক্ষেপকে তীব্রভাবে বিরোধিতা করে একে ‘অগ্রহণযোগ্য আচরণ’ বলে উল্লেখ করে, যা দুই দেশের মধ্যে আরো উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে। মূলত কিছু শরণার্থী ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে মিলে পাকিস্তানে টার্গেট কিলিং করছে।
পাকিস্তানের তালেবান কৌশল : পাকিস্তান ধারণা করেছিল, তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান টিটিপিকে দমন করবে কিন্তু বুমেরাং হয়েছে। এই আশায় প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের (২০১৮-২২) সরকার প্রকাশ্যে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পক্ষে অবস্থান নেয়। তার প্রশাসন বারবার যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান আগ্রাসনকে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করে এবং ২০২১ সালের আগস্টে যখন তালেবান কাবুল দখল করে, তখন খান একে ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার’ সাথে তুলনা করেন।
পশতু জাতি : হাজার বছর ধরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলে বসবাস করা পশতু ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীই মূলত পশতু জাতি হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে পশতু ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ৬ থেকে ৭ কোটি যাদের অধিকাংশ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে বসবাস করে। তবে তারা নিজেদের পাঠান হিসেবেও পরিচয় দিয়ে থাকেন। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ৭০-৮০ শতাংশ পশতু জাতির বসবাস। এছাড়া কোহাট, বান্নু, দেরা ইসমাইল খান, সোয়াত, মানসেহরা, চিত্রাল এবং বেলুচিস্তানের কোয়েটা, চামান, লোরালাই অঞ্চলেও পশতুদের বসবাস রয়েছে। এসব অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতিদের মধ্যে অন্যতম ইউসুফজাই, আফ্রিদি, মেহসুদ গোষ্ঠী। পশতুদের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের পেশোয়ার।
টিটিপি সন্ত্রাসী নাকি স্বাধীনতাকামী সংগঠন : পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর সাম্প্রতি যেসব সন্ত্রাসী হামলা ঘটনা ঘটেছে, তার নেতৃত্ব দিয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। ২০২৪ সাল ছিল পাকিস্তানের প্রায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছর। এ বছর সেখানে সন্ত্রাসী হামলায় তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়। এসব হামলার বেশিরভাগই তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের দায় বলে মনে করা হয়। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে বৈতুল্লাহ মেহসুদ টিটিপি প্রতিষ্ঠা করেন। টিটিপি পশতু জাতির স্বাধীনতা চাইলেও তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড লক্ষণীয়। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া, বেলুচিস্তানের কোয়াট, চামান, সোয়াত ইত্যাদি সীমন্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে ‘পশতুনিস্তান’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চায়।
তবে ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হওয়ায় পাকিস্তান টিটিপিকে ফিত্না-আল-খারিজ বা সন্ত্রসী হিসবে চিহ্নিত করে আসছে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে, যখন টিটিপির অস্ত্রধারীরা পেশোয়ারের একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে ১৩০ স্কুলশিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এটি পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের এসব হামলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন টিটিপি প্রধান নূর ওয়ালি মেহসুদ। নূর ওয়ালি মেহসুদ ২০১৮ সালে টিটিপির নেতৃত্বে আসেন। কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে মেহসুদ টিটিকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন, নতুন কৌশল নিয়েছেন এবং বিভক্ত গোষ্ঠীগুলোকে স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ করেছেন।
টিটিপির সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক : আফগানিস্তানে বসবাস করা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বৃহত্তম পশতু জনগোষ্ঠী টিপিপির অন্যতম। আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৪০-৪৫ শতাংশ পশতু। ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তানে তালেবান সরকারকে উৎখাত করলে, অনেক আফগান ও পাকিস্তানি যোদ্ধা সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের এসব উপজাতীয় এলাকায় আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে এসব অঞ্চল থেকে গেরিলা হামলা চালাতে থাকে। তাই তালেবান সরকারের যোদ্ধাদের সঙ্গে টিটিপির সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ।
ভারতের ভূমিকা : পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে যে, ভারত পরোক্ষভাবে টিটিপিকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্প্রতি ভারতের উষ্ণ সম্পর্কে তা স্পষ্ট হচ্ছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানকে ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত করা ভারতের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা। পাকিস্তানকে দুর্বল করতে বিভিন্ন সময় বিদ্রোহী সংগঠনগুলোকে সাহায্য করার অভিযোগ এসেছে ভারতের বিরুদ্ধে। আফগানিস্তানের সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত না থাকায় দেশটিকে বিনিয়োগের উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করে আসছে ভারত। ২০০১-২০২১ সালের মধ্যে ভারত আফগানিস্তানে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগ নির্মাণ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অন্তরালে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার বিনিয়োগ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পাকিস্তান-আফগানিস্তানের কনফেডারেশন : জহির শাহের শাসনামলে দুটি ঘটনা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। প্রথম ঘটনাটি জাতিসংঘে আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের বিরোধিতা। দ্বিতীয় ঘটনাটি উত্তর ওয়াজিরিস্তানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী গোত্রীয় নেতা ফকির আইপি পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তাকে অস্ত্র সরবরাহ করছিল কাবুলের ভারতীয় দূতাবাস।
মসজিদে আকসার ইমাম মুফতি আমিনুল হোসাইনি ২২ মার্চ ১৯৫১ সালে ওয়ানা যান এবং গোত্র নেতারা ও পাকিস্তান সরকারের মধ্যে বিবাদ মীমাংসা করেন। তিনি কাবুলও যান। জহির শাহকে বোঝান, পাকিস্তানের সাথে লড়বেন না। ফিলিস্তিনের মুফতির প্রচেষ্টায় যখন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক উন্নত হলো, তখন ১৬ অক্টোবর ১৯৫১ সালে সাইয়েদ আকবর নামে জনৈক আফগানী কর্তৃক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে রাওয়ালপিন্ডিতে হত্যা করা হয়।
সাইয়েদ আকবর ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের লোক ছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই পুলিশ কর্মকর্তা কুরবান আলী তাকে অকুস্থলে গ্রেফতার না করে গুলি করেন। এদিকে জহির শাহের বিরুদ্ধে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ষড়যন্ত্র শুরু হলে জহির শাহকে প্রস্তাব দেয়া হয়, সোভিয়েত ইউনিয়নের মোকাবিলা করার জন্য পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কনফেডারেশন গঠন করা উচিত, যার অধীনে উভয় দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকবে, তবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি সম্মিলিত হবে।
নিউইয়র্ক টাইমস ১০ এপ্রিল ১৯৫৪ সালে একটি স্টোরি প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কনফেডারেশনের একটি প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে, যার মাধ্যমে পাকিস্তানের এ উপকার হবে যে, কাবুল পশতুনিস্তান আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা ত্যাগ করবে। আর আফগানিস্তানের উপকার হবে, বহিরাক্রমণরূপে পাকিস্তানের বাহিনী আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা দেবে। এ প্রস্তাব অগ্রগতি পায়নি এবং উভয় দেশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বিদ্যমান থাকে। তথাপিও ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে আফগানিস্তান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো রণাঙ্গন চালু করেনি। জুলফিকার আলী ভুট্টোর শাসনামলে হায়াত মুহাম্মদ খান শেরপাও হত্যার পর উভয় দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। (হামিদ মীর)।
টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতীয় ইন্ধনে তালেবানের অনীহা পাক-আফগান জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে তালেবানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ভেঙে যেতে পারে এবং এতে আরো চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো; বিশেষ করে ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশ (আইএসকেপি), শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তালেবানের এই অবস্থান অনেকটা পাকিস্তানের অতীত কৌশলের প্রতিফলন, যেখানে ইসলামাবাদ নিজ ভূখণ্ডে তালেবানের কার্যক্রম দমনে আফগান ও মার্কিন দাবি উপেক্ষা করেছিল।
আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালানোর পেছনে পাকিস্তানের উদ্দেশ্য বহুমুখী। একদিকে এটি টিটিপির কার্যক্রম দমন করার প্রচেষ্টা; অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহলে শক্তির প্রদর্শন। একই সাথে এটি তালেবান সরকারকে বার্তা দিচ্ছে যে, সীমান্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।
এদিকে তালেবান সরকার পাকিস্তানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। ৮ জানুয়ারি ২০২৫ সালে দুবাইতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আফগানিস্তানের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন, যা তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ। এই বৈঠকে আফগানিস্তান ইরানের চাবাহার বন্দরের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে, যা স্পষ্টতই পাকিস্তানের বাণিজ্য রুটের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর ইঙ্গিত দেয়। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, আফগানিস্তান কৌশলগতভাবে পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভারতের সাথে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করছে যে কারণে তালেবান মুসলিম উম্মাহর সমর্থন হারাচ্ছে। সব ভেদাভেদ ভুলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের উচিত একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষা করা। কেননা উভয়ের শান্তি ও নিরাপত্তা একে অপরের শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল।
তথ্যসূত্র : ডন, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, অ্যামনেস্টি কানাডা, দ্য ন্যাশনাল ব্যুরো অব এশিয়ান রিসার্চ, দ্য ডিপ্লোম্যাট, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, টোলো নিউজ,আনাদোলু, আরব নিউজ।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।