কবিতার হৃদয় ধ্যানে আহমদ বাসির
১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৯
ওমর বিশ্বাস
আহমদ বাসিরকে নিয়ে দুই এক কথা লিখবো বলে মনটা মাঝে মাঝে তার প্রতি ঝঁকে পড়ে। আহমদ বাসির আমাদের অনুজ কবি – কাছাকাছি সময়ের, প্রায় নিকট সমকালীন। কবিতায় সে ছিল নিবেদিত। কবিদের জন্য এক আন্তরিকতায় ভরা হৃদয় ছিল তার। আহমদ বাসির বস্তুগত জীবনের ভিতরেই প্রকৃত জীবনের সন্ধান করে গেছে। জীবনের মর্মবাণী খুঁজে খুঁজে জীবনকে সেভাবে রাঙানোর প্রচেষ্টা ছিল তার ভিতরে। তার কবিতাগুলো ছিল বাস্তবতার রঙে সাজানো।
আহমদ বাসিরের কবিতার উচ্চারণ ছিল স্পষ্ট। নিজের বিশ্বাস আর অবলোকনকে রূপ দিয়েছিল কাব্যে। ভাষার ভাঁজে ভাঁজে যে শব্দ বুনান করেছিল সেখানে জীবনের কথাগুলো বলা আছে। তার একটা কবিতা বই বের হয়েছিল সেটা ২০১৭ সালে “গোপন মাটির বীজতলা” নামে। এই বইয়ের কবিতাগুলো জীবন রসায়নের সাথে মিলে যায়। এই বইতে তার একটা কবিতা আছে ‘ঘুম’ নামে। আহমদ বাসে লিখেছে, “চোখে ঘুম নামলে পৃথিবী পর হয়ে যায়।” এখন যে কেউ চোখ বন্ধ করে ভাবতে পারে এই পঙক্তির অর্থের ব্যাপকতা। এর অন্তর্দৃষ্টি ও কাব্যিক সৌন্দর্য। সেখান থেকে চিন্তাকে প্রসারিত করে কবিতার আরেকটু ভিতরে যদি যাওয়া যায় তাহলে জীবনকে আরও নিখুঁতভাবে দেখা যাবে। এর পরপরই কবি বলেছে, “মরুভূমি বনাঞ্চল/ এমনকি নদীর চরও ঘর হয়ে যায়”। এরপর কবিতাটির আরও কিছু অংশ পাঠককে আরো প্রলুব্ধ করে, “দৃশ্যত আমরা অদৃশ্য হয়ে যাই/ শিশুর কান্না, পাড়ার কোলাহল/ কী অবলীলায় গুম হয়ে যায়।” এই কবিতায় কবির বিশ্বাসের একটা প্রতিবিম্ব পাওয়া যায়। পাওয়া যায় কাব্যের সাথে জীবনের নিগূঢ় বন্ধনের খোঁজ। কবিতার মধ্য দিয়ে বাসির জীবনকে তুলে দিয়েছে জীবনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কিত দিকগুলো।
এই বইয়ের কবিতাগুলো জীবনের স্বাদ দেয়। পাওয়া যায় শুদ্ধতম কবিতার কথা। তার আরেকটি কবিতায় উচ্চারিত হয়, “একটি শুদ্ধ সুন্দর কবিতা হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষায়/ আমার সত্তাও বিলীন হতে চায় আত্মার বুকে।”
আহমদ বাসির প্রতিভাবান তরুণ ছিল। শব্দচর্চার সাথে সাথে আবৃত্তি করতো। কন্ঠ ছিল দরাজ। উপস্থাপনা করত। সে পরিশ্রমিক কবি ছিল। কবিতার বই সহ তার পাঁচটা বই আছে। তার চিন্তার জগৎ ছিল অনেকটা অগ্রসর। সেটাও পরিপূর্ণ ছিল বিশ্বাস দিয়ে ভরা। তার কবিতায় হৃদয়ের ধ্যানে যুক্ত হয়ে আছে।
আহমদ বাসিরকে মাঝে মধ্যেই মনে পড়ে। তার পদচরণার ধ্বনির অভাববোধ অনুভূত হয়। তার একটি কবিতায় আছে, “ভাসমান মেঘের মতোই/ হারিয়ে গিয়েছিলো/ অতি জরুরী দুটি রঙ/ যাদের নাম ছিল প্রেম ও প্রচেষ্টা। ” কবির জীবনকে ভালোভাবে দেখলে দেখা যায় তার নিজের বুকের ভিতরই লুকানো ছিল ‘প্রেম’ ও ‘প্রচেষ্টা’র একনিষ্ঠতা। সে মানুষকে ভালোবাসতো, মানবতাকে ভালোবাসতো। মানুষ ও মানবতার জন্য কাজ করতেই তাকে দেখেছি সব সময়। তাকে থাকতে দেখেছি সত্য ও সুন্দরের সাথে প্রতিনিয়ত।
বাসিরের চেতনার দিকগুলো আমাদের ভাবায়। তার কবিতায় আছে, “আমরা তো আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলাম/ আকাশ হওয়ার স্বপ্ন আমাদের ছুঁতে পারেনি।” কিন্তু আমরা তার জীবনের ধাপগুলোকে দেখতে পাই সে স্বপ্ন দেখতো ও দেখাতো। তার অন্তরে লুকানো ছিল সেই ‘আকাশ‘ হওয়ার বাসনা। এজন্যই সে জীবনের দুটি রং খুঁজে নিয়েছিল। আকাশ হওয়ার সেই ‘প্রচেষ্টা’ ছিল – পুরোপুরি ‘প্রেম’ দিয়ে। তার ব্যক্তি জীবনেও আমরা এর প্রতিফলন দেখেছি। তার মন মানবিকতায় পরিপূর্ণ ছিল।
বাসিরের কাব্যচর্চা ৪২ বছরে থেমে যায়। আমাদের চোখে তার স্মৃতি এসে প্রায় জড়ো হয়। তার কবিতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় তার কাব্যিক চেতনাকে। তার কবিতাগুলো ছুঁয়ে দেখি তাই স্মৃতির আয়নার সাথে মিলিয়ে। সাহিত্যকেন্দ্রিক তার অনেক কাজ ছিল। অনেক কাজ ততদিনে আলোর মুখ দেখা শুরু করেছিল। কিন্তু কবির জীবন থেমে গেছে। তার আর প্রচেষ্টা করা হবে না। তবে প্রেম দিয়ে আহমদ বাসির থাকুক কবিদের অন্তরে। তার রেখে যাওয়া প্রেম ও প্রচেষ্টা তাকে টিকিয়ে রাখবে।
লেখক: ওমর বিশ্বাস, কবি।
কবি আহমদ বাসিরের ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী; মৃত্যু: ১৮ নভেম্বর ২০২০)