সোনার বাংলা ও শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান রহ.’র অন্তিম সাক্ষাৎকার
২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:২৩
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান রহ. এক অকুতোভয় সাংবাদিক, সম্পাদক ও রাজনীতিবিদ। এককথায় এক ক্ষণজন্মা পুরুষ। মেধাবী ছাত্র মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় মাস্টার্স সম্পন্ন করে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামী ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলন জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শেরপুর জেলায় জন্মগ্রহণকারী এ দক্ষ সাংবাদিক ও রাজনীতিক ইসলামী আন্দোলন এবং রাজনীতির পাশাপাশি দৈনিক সংগ্রাম ও সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছেন। আওয়ামী ইসলামবিরোধী শক্তি ইসলামী আদর্শের পতাকাবাহী নেতাদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অন্য নেতাদের মতো তাকেও মিথ্যা অভিযোগে জুডিশিয়াল কিলিং প্রক্রিয়ায় হত্যা করে।
১৯৮১ সাল ও কুমিল্লার শিক্ষাশিবির
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছে ১৯৮১ সালে, কুমিল্লা টাউন হল মিলনায়তনে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায়। ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ শিবিরে তিনি ঢাকা থেকে অতিথি শিক্ষক হিসেবে গিয়েছিলেন। ঐ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় সাংবাদিকতার ওপর একটি সেশনে আলোচনা করেছিলেন। তখন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জাতীয় পত্রিকা সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। উল্লেখ্য, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পাকিস্তান আমলে ১৯৬০-এর দশকে প্রথম প্রকাশিত হয়। মুসলিম লীগের মানুষ মাগুরা নিবাসি মহিউদ্দিন আহমদ তৎকালে সাপ্তাহিক সোনার বাংলা প্রকাশ শুরু করেন। তারপর ১৯৭২-১৯৮০ সাল পর্যন্ত বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মাহবুবুল হক সোনার বাংলার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রকাশ করা শুরু করেন। ১৯৮১ সালে মাহবুবুল হকের কাছ থেকে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান সোনার বাংলার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাংবাদিকতার ওপর নাতিদীর্ঘ আলোচনা শেষে আমি মঞ্চে গিয়ে উনার সাথে পরিচিত হয়ে সাংবাদিকতা পেশায় আসার আগ্রহ পেশ করলে সম্মতি দেন। উনি সোনার বাংলা পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেয়ার কথা বললেন। আমি তখন ছাত্র, তাই সার্বক্ষণিক সাংবাদিকতা করার সুযোগ ছিল না, বিধায় সংবাদদাতা হিসেবেই কাজ করার কথা বললেন। তারপর থেকে আমি সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করি। প্রায় দুই বছর সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করার পর ঢাকায় চলে আসি। তারপর ১৯৮৮ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় আন্তর্জাতিক বিভাগে শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে সার্বক্ষণিক সাংবাদিকতা পেশায় যোগদান করি। পর্যায়ক্রমে দৈনিক সমাচারে যুগ্ম চিফ রিপোর্টার, দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় রাজনৈতিক ও পার্লামেন্ট রিপোর্টার, দৈনিক জনতায় আন্তর্জাতিক বিভাগ ও পরবর্তীতে বার্তা সম্পাদক, কাতারের ইসলাম অনলাইন পত্রিকার স্টিঙ্গার, তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদলো নিউজ এজেন্সি ও আঙ্কারার ডিপ্লোমেটিক জার্নালসহ দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রায় দুই দশক কাজ করে আবার সোনার বাংলা পত্রিকায় আসি। ২০০৯ সালে শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসনীম আলমের আহ্বানে সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগদান করি।
জেলখানায় সাক্ষাৎ ও পত্রিকার সার্কুলেশন
সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। ২০১০ সালের ২৯ জুলাই এক মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের কথিত অভিযোগে গ্রেফতার দেখিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। গ্রেফতারের পর দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। কারাগারে অবস্থান করেও তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় লিখতেন ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই সোনার বাংলার কাজ তথা দায়িত্ব পালনের কারণেই উনার সাথে বেশ কয়েকবার কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাক্ষাৎ করতে হয়েছে। প্রতিটি সাক্ষাৎকারে তিনি সোনার বাংলার সার্বিক বিষয় জানার পর সার্কুলেশন সংখ্যাটা জানতে চাইতেন। তিনি যখন ২০১০ সালের জুন মাসে গ্রেফতার হন, তখন সোনার বাংলার সার্কুলেশন প্রায় ২৫ হাজারের কাছাকাছি ছিল। দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের সময় উনি জানতে চেয়েছেন যে, সোনার বাংলার সার্কুলেশন কি ৩০ হাজার হয়েছে। তৃতীয় সাক্ষাতে আমি যখন বললাম, কামারুজ্জামান ভাই সোনার বাংলার সার্কুলেশন ৩০ হাজার অতিক্রম করেছে, তখন উনি খুশি হলেন। জেলখানায় থেকেও চিন্তা করতেন সোনার বাংলার সার্কুলেশন বাড়ছে কি না। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে আমি উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- আপনি ১৯৮১ সালে যখন সোনার বাংলা শুরু করেন, তখন প্রথম কত কপি ছাপাতেন, তিনি বলেছিলেন এটা সম্ভবত দেড় থেকে দুই হাজার কপি। অবশ্য পরবর্তীতে সোনার বাংলার সার্কুলেশন আরো বেড়ে প্রায় ৫০ হাজারের কোঠায় পৌঁছেছে। বাংলাভাষী সাপ্তাহিক সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে সাপ্তাহিক সোনার বাংলা এখন সর্বাধিক সার্কুলেশনের পত্রিকা।
আবুল ওয়াফী ছদ্মনামে লিখতেন
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান যে সিজন জার্নালিস্ট, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছেÑ উনি গ্রেফতার হওয়ার পর জেলখানার কুঠুরিতে বসেও লিখতেন এবং অব্যাহতভাবে লিখে গেছেন। জেলখানায় বই-পত্রপত্রিকা পড়া যায়। লেখাও যায়, তবে সে লেখা হতে পারে বই। তিনি ফাঁসির সেল থেকে বাংলাদেশ নামে একটি বইও লিখেছেন। কিন্তু পত্রিকায় লেখার সুযোগ নেই বললেই চলে। কিন্তু মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জেলখানায় থেকেও সোনার বাংলার জন্য লিখতেন এবং লেখা পাঠাতেন। একটি বিশেষ টেকনিক অবলম্বন করে জেলখানা থেকে লেখা পাঠাতেন। তিনি আবুল ওয়াফী নামে একটি ছদ্মনামে লিখতেন। এখানে কয়েকটি লেখার শিরোনাম ও তারিখ উল্লেখ করছি।
২০১২ সালের ২০ জানুয়ারি আবুল ওয়াফী নামে ‘বাংলাদেশের ৪১ বছর, কবে রাজনৈতিক নেতারা বলবেন, আমরা পদে পদে ভুল করছি’ শিরোনামে। ২০১২ সালের ১২ মার্চ প্রথম পাতার লিড নিউজটি ছিলো আবুল ওয়াফী লেখা শিরোনামটি ছিলো, ‘এখনো সময় আছে ‘বাংলা বসন্ত’ ঠেকান। ২০১২ সালের ২৫ মে, প্রথম পাতায় বক্স নিউজ, ‘দেশে এখন একদলীয় শাসন! দেশবাসী সাবধান!’ ২০১২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথম পাতায় বক্স আইটেম, ‘রাষ্ট্র ও সংবিধান সবই মানুষের জন্য’ ২১ সেপ্টেম্বর বক্স নিউজ ‘১৯৪৭ সালে আশ্রয় গ্রহণকারী ও বর্তমান রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সরকারের একই নীতি হওয়া উচিত নয় কি?’ তবে উনার গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখাটি ছিল ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর সাপ্তাহিক সোনার বাংলার প্রথম পৃষ্ঠায় শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের যুগান্তকারী (ছদ্মনামে আবুল ওয়াফী) শীর্ষ নিবন্ধ। ঐ নিবন্ধের শিরোনামটি ছিল, ‘গণঅভ্যুত্থান ও রাজপথই সঙ্কট নিরসনের উপায়’। উনার এ লেখার ১২ বছর পর ঠিকই বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে এবং মূল ফ্যাসিস্টকে পালাতে হয়েছে, কিন্তু উনি দেখে যেতে পারেননি।
‘গণঅভ্যুত্থান ও রাজপথেই সঙ্কট নিরসনের উপায়’ শিরোনামে নাতিদীর্ঘ নিবন্ধের কিছু চুম্বকাংশ এখানে তুলে ধরা হলো। নিবন্ধটির প্রথমেই তিনি লিখেছেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এক গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এ ব্যাপারে আজ গোটা জাতি দ্বিধাবিভক্ত। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে তাদের দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। ওদিকে বিরোধীদল বলে দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়। ফলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। কোনো ধরনের সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে সে ব্যাপারে সমঝোতা না হলে গণতন্ত্রের বিপর্যয় অনিবার্য।
গণতন্ত্রের সঙ্কট নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো উৎকণ্ঠা নেই, বরং যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যেকোনো অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিতে পারে দলটি। সুবিধাবাদী এবং ধোঁকা প্রতারণার রাজনীতিতে চ্যাম্পিয়ন এই দলের এমন আচরণে বিস্মিত বা হতবাক হবার কিছু নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনের দাবিতে জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করে সেই ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে এবং ২০০৮ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বেনিফিশিয়ারি আওয়ামী লীগ এখন আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে বর্তমান সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে। এটা দলটির বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতির অংশ। এর আগে ১৯৭৫ সালে গণতন্ত্র হত্যা করে আওয়ামী লীগ জাতির সাথে বেঈমানী করে একদলীয় বাকশালী শাসন চাপিয়ে দিয়েছিল।’
নিবন্ধটির শেষ প্যারায় তিনি লিখেছেন, ‘তবে বিএনপি-জামায়াতকে একটা জিনিস বুঝতে হবে যে, সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালিপ্সু দল হিসেবে আওয়ামী লীগ জনগণের মতামত ও সমালোচনার কোনো তোয়াক্কা করে না এবং এজন্য তারা লজ্জিতও বোধ করেন না। কারণ এই দলটি বিরোধী দলে থাকাকালে গণতন্ত্রের স্লোগান দিলেও ক্ষমতায় গেলে বদলে যায়। গণতন্ত্রের ভাষা আওয়ামী লীগ বুঝে না। তাছাড়া আওয়ামী লীগ বিরোধীদলকে বা বিরোধীদলের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করে থাকে এবং মনে করে বিরোধীদল আন্দোলন করার শক্তি রাখে না। তাই বিএনপি-জামায়াত যদি মনে করে যে, দেশের প্রায় ৯০% ভাগ মানুষের দাবি শেখ হাসিনার সরকার মেনে নিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন দিয়ে দেবে, তাহলে সেটা হবে মারাত্মক ভুল। আওয়ামী লীগ শক্তের ভক্ত, নরমের যম। সুতরাং রাজপথের প্রচণ্ড আন্দোলন ছাড়া আওয়ামী লীগের দুর্নীতিপরায়ণ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেবে না। বিষয়টি রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হতে হবে। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে দেশ যে গভীর সঙ্কটে নিপতিত হবে তা থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থান ঘটানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণ তাদের মুক্তির লক্ষ্যে একটি গণঅভ্যুত্থান করেছে।
সর্বশেষ দেখা ও পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকার
২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে উনার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশ জেল কোডের বিধান অনুযায়ী ফাঁসির রায় কার্যকর করার দিন আসামির আত্মীয়-স্বজনকে শেষবারের মতো দেখা করার সুযোগ দেয়া হয়ে থাকে। ঐদিন কামারুজ্জামান ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তানসহ কয়েকজন উনার সাথে দেখা করতে যাবেন। আমিও তাদের সাথে শেষবারের মতো রাতের বেলায় উনার সাথে দেখা করতে যাই। সবার সাথে কথাবার্তা শেষে আমি উনাকে একটি প্রস্তাব দিলাম, আর সেটা হচ্ছে একজন রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের রাজনীতি, ইসলামী আন্দোলন ও মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে জানানোর জন্য আপনার একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার নিতে চাই। আমার প্রস্তাবে উনি রাজি হলেন না। তারপর আবার অন্যান্য কথাবার্তা শেষে আবার প্রস্তাব করলাম, তারপরও উনি রাজি হলেন না। এবার উনার স্ত্রী বললেন, যেহেতু ফেরদৌস ভাই এ সাক্ষাৎকারটা নিতে চাচ্ছে এবং এটা তোমার শেষ সাক্ষাৎকার তা দিতে পারো। এবার তিনি কিছুটা রাজি হলেন তবে বললেন, তুমি কীভাবে সাক্ষাৎকার নেবে, তোমার লিখিত প্রশ্ন কোথায় এবং লিখবে কীভাবে, তোমাদের পেছনেই তো গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। উনারা তো তোমাকে কাগজ কলমে লিখতে দেবে না। তখন আমি উনাকে বললাম, আমি প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি, প্রশ্ন আমার মাথায় আছে, আমি প্রশ্ন করবো, আপনি উত্তর দেবেন, আমি সেটা আমার ব্রেইনে সংরক্ষণ করে বাইরে গিয়ে কাগজে লিখব। উনি সাক্ষাৎকার দিলেন, আমি সাক্ষাৎকার নিয়ে বাইরে এসে লিখে, ঐদিনই কায়রো ম্যাগাজিনে সাক্ষাৎকারটি পাঠিয়ে দিই। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আমার নাম ছাড়াই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে এবং উল্লেখ করে যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের জেলখানার ভেতরে ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে সাংবাদিকের সাথে সাক্ষাৎকার।
ফাঁসির সেল থেকে কামারুজ্জামানের শেষ সাক্ষাৎকার
মিশরের রাজধানী কায়রোভিত্তিক জনপ্রিয় ইসলামী অনলাইন ম্যাগাজিন অন-ইসলাম-এর পক্ষ থেকে ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল ঢাকার সেট্রাল জেলে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান যে সাক্ষাৎকার দেন, তা আরবি ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়। ঐ সময়ই এ সাক্ষাৎকারটি বিদেশে কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত এবং বাংলাভাষীদের জন্য কোনো কোনো অনলাইন পত্রিকা তা অনুবাদ করে প্রকাশ করে। অন-ইসলাম থেকে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের সাক্ষাৎকারের মূল অংশটুকু ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদসহ তুলে ধরা হলো :
কামারুজ্জামান তার সর্বশেষ এ সাক্ষাৎকারে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ ও উম্মাহ নিয়ে তার আশা-আকাক্সক্ষার কথা ব্যক্ত করেন। উনার কাছে প্রথম প্রশ্ন ছিল,
Q. How do you see the current Awami regime in Bangladesh?
প্রশ্ন : বর্তমান আওয়ামী লীগের অবস্থান আপনি কীভাবে দেখছেন?
Muhammad Kamaruzzaman: Present regime and Bangladesh Awami League, ruling party, have already destroyed themselves in all sides and areas by their negative activities.
অনুবাদ : বর্তমান সরকার ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সকল দিক দিয়েই ধ্বংশের দ্বারপ্রান্তে। এটা তাদের নানারকম কুকীর্তির কারণেই হয়েছে।
Q. What are you thinking about Islamic student movement in Bangladesh?
প্রশ্ন : বাংলাদেশের ছাত্র ইসলামী আন্দোলন নিয়ে আপনার মতামত কী?
Muhammad Kamaruzzaman: In Bangladesh, Islamic student movement is going advance day by day, no any force will be able to resist Islamic student movement.
But we should train young Muslims on information technology and modern sciences. This information technology and science should be used for Islamic movement and preaching of Islam throughout the world.
অনুবাদ : বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। এটাকে কেউই ঠেকাতে পারবে না। তবে তরুণ প্রজন্মকে আমাদের ট্রেনিং দিতে হবে তথ্য প্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে। এই তথ্যপ্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান ব্যবহৃত হবে ইসলামী আন্দোলনের জন্য এবং সাড়া বিশ্বে ইসলামকে প্রচারের জন্য।
Q. What about the Islamic movement?
প্রশ্ন : ইসলামী আন্দোলন নিয়ে আপনার কী পরামর্শ?
Muhammad Kamaruzzaman: Islamic organization and forces should be working in media, cultural fields and sports, including cricket.
Islamist forces should avoid all kinds of differences and contradictions between themselves, uniting under one Islamic cause on national and international levels.
অনুবাদ : ইসলামী আন্দোলনের লোকজনদের কাজ করতে হবে মিডিয়া, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং ক্রিকেটসহ অনান্য খেলাধুলায়।
ইসলামিস্টদের সকল ভেদাভেদ ভুলে একসাথে দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে হবে শুধুমাত্র ইসলামের জন্য।’
Q. Do you have a message to the people of Bangladesh?
প্রশ্ন : বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আপনার কি কোনো আহ্বান আছে?
Muhammad Kamaruzzaman: I would urge them to spread the spirit of Islam, Quran and Hadith in all villages, cities and towns in Bangladesh.
Islamist and Nationalist forces will go to power in Bangladesh and finally Islamist force will dominate in politics and to govern Bangladesh Insha Allah.
অনুবাদ : ইসলামী সংগঠনের প্রতি আমার পরামর্শ, বাংলাদেশের শহর, বন্দর ও গ্রামে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিতে। ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী শক্তি বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাবেই এবং পরিশেষে বাংলাদেশে ইসলামী শক্তিই একদিন সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করবে, ইনশাআল্লাহ।
আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে তার সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, এবারের জাতীয় নির্বাচনে তার প্রতিফলন দেখা গেছে। এবারের নির্বাচনে তার প্রিয় দল জামায়াতে ইসলামীর আহ্বান রাজধানী ছাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি পাড়া-মহল্লা, গ্রাম ইউনিয়ন, উপজেলা শহর ও জেলা বিভাগীয় শহরে পৌঁছে গেছে। দেশের প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষ এবার জামায়াতে ইসলামী জোটকে ভোট দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এবার সরকার গঠন করতে না পারলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রধান ও শক্তিশালী বিরোধীদল হিসেবে অধিষ্ঠিত। সংসদীয় রাজনীতির ট্রেন্ডই হচ্ছে যারা একবার বিরোধীদল হয় তারা একসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যায়। শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানসহ ইসলামী আন্দোলনের নেতারা যে উদ্দেশ্য নিয়ে ইসলামী আন্দোলন শুরু করেছিলেন, বাংলাদেশে ইসলামী আদর্শ কায়েম হবেই, ইনাশাআল্লাহ।