গাজীপুরে অস্ত্রের মুখে স্কুলছাত্রীকে অপহরণ নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন


২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪১

সোনার বাংলা ডেস্ক : দিনে-দুপুরে স্কুলছাত্রীকে বাবার বাসা থেকে অস্ত্রের মুখ অপহরণের ঘটনা নতুন করে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শত শত মানুষের সামনে অস্ত্রের মুখে বাসায় হামলা ও ভাঙচুর করে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।
গত ১৫ এপ্রিল বুধবার বিকেলে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় মসজিদের ইমাম বাবার গলায় পিস্তল ঠেকিয়ে ১৫ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রীকে অপহরণের ঘটনাটি ঘটে। তবে ঘটনার দীর্ঘসময় পর মেয়েটিকে উদ্ধার করলেও মূল আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এমনকি ঘটনার সাথে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও ওঠে।
এ ঘটনার পর গত ১৭ এপ্রিল শুক্রবার স্থানীয় আলেম-ওলামারা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখায়। বিক্ষোভ মিছিল করে মেয়েটিকে উদ্ধারের জন্য আল্টিমেটাম দেয়।
এদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ঘটনাটিকে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড উল্লেখ করে তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। নিজের ভ্যারিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘গাজীপুরের শ্রীপুরে দিনে-দুপুরে একটি মসজিদের ইমামের মেয়ে মাদরাসাছাত্রী অপহরণ, পরিবারের সদস্যদের ওপর বর্বরোচিত হামলা এবং লুটপাটের ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। এ ঘটনা আমাকে গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ করেছে। এটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। দুঃখজনকভাবে ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও অপহৃত ছাত্রীকে উদ্ধার করতে না পারা চরম উদ্বেগজনক।’
তিনি লেখেন, ‘আমি অবিলম্বে অপহৃত মেয়েটিকে অক্ষত উদ্ধার, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।’
তিনি আরও লেখেন, ‘যাদের ছত্রছায়ায় এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে, সামাজিকভাবে এদের বয়কট করতে হবে এবং দেশবাসীকে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে। বিশেষভাবে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অপরাধীদের প্রশ্রয় দিয়ে কোনোভাবেই এ ধরনের বর্বরতা চলতে দেওয়া যায় না।’
এছাড়া দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় না আনায় তীব্র, নিন্দা, প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে গত ১৮ এপ্রিল শনিবার এক বিবৃতি দিয়েছেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে মসজিদের ইমাম বাবার গলায় পিস্তল ঠেকিয়ে ১৫ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রীকে অপহরণের ঘটনায় এবং পুলিশ প্রশাসন তাকে উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় না আনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং উদ্বেগ প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে ঘটনার পর দীর্ঘসময় অতিবাহিত হলেও অপহৃত ছাত্রীকে উদ্ধার করতে না পারা এবং সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় না আনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির বহিঃপ্রকাশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার দেশের মা-বোনদের ইজ্জতের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার কারণে দিনে দুপুরে সন্ত্রাসীরা বাবার কাছ থেকে মেয়েকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটাচ্ছে। আমি দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপহৃত মেয়েটিকে উদ্ধার করে বাবা-মায়ের কাছে ফেরত দেয়া এবং অপরাধীদের গ্রেফতার ও শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছি।
তবে অপরাধীদের পরিচয় ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। ভুক্তভোগী মেয়েটির বাবা গণমাধ্যমে স্পষ্ট বলেন, অনেক মানুষের সামনে থেকে সুমিত ও আবিদ নামের সন্ত্রাসীরা পিস্তল ঠেকিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তার মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছেন। এর নির্দেশদাতা ছিলেন আবিদের পিতা স্থানীয় সুরুজ। এর পরও এখন পর্যন্ত মেয়েটি উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেফতার করতে না পারার দায় সরকার ও প্রশাসনকে নিতে হবে।
ফেস দ্য পিপলকে দেয় সাক্ষাৎকারে ভুক্তভোগী মেয়ের বাবার দাবি অনুযায়ী ঘটনার দিন নামাজের প্রস্তুতি নেয়ার সময় সন্ত্রাসীরা ঘরের দরজা ও জানালায় হামলা চালায়। ভুক্তভোগীর বাবা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সজল, পৌর বিএনপির সদস্য খন্দকার বাবুল, বিল্লাহ হোসেনকে বাসায় ডেকে নিজের পরিবারের ইজ্জত নিয়ে বেঁচে থাকার আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা অপরাগতা প্রকাশ করে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করার পরামর্শ দেন। ওই ইমাম সাহেব ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেয়ার পর সন্ত্রাসীরা আবারও বাসায় আক্রমণ করেন এবং গেটের ও দরজার তালা ভেঙে ফেলে। মেয়েটির বাবা তাতে বাধা দিলে সন্ত্রাসী আবিদের বাবা সুরুজ ইমামকে গুলি করার নির্দেশ দেন। পরে জীবন বাঁচাতে ঘরের ভিতরে গিয়ে দরজা আটকিয়ে দিলে শাবল ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র দিয়ে দরজা ভাঙচুর করে। ঘটনাটি ৪০-৪৫ মিনিট ধরে ঘটে। অপহরণের শিকার স্কুলছাত্রী তার বাবাকে জড়িয়ে তাকে হেফাজতের জন্য আর্তানাদ করলেও সন্ত্রাসীরা পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এর আগে গত ১৫ এপ্রিল মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে মাদরাসায় যাওয়ার পথে মাওনা ফায়ার সার্ভিসসংলগ্ন এলাকায় ছাত্রীকে আবিদ ও তার সহযোগীরা জোর করে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে ফেরত দেয়া হলেও আবার শুক্রবার তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসী আবিদ।
ঘটনার চার দিন পর গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে উপজেলার নয়নপুর এলাকা থেকে ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেফতার করা হলেও প্রধান আসামি আবিদ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশ জানায়, শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে অভিযান চালিয়ে শ্রীপুরের গাজীপুর ইউনিয়নের নয়নপুর (এমসি বাজার) এলাকা থেকে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় মামলার প্রধান আসামি আবিদসহ অন্যরা পালিয়ে যান। উদ্ধারের পর ছাত্রীর মেডিক্যাল পরীক্ষা এবং জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে পাঠানো হয়। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।