নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ‘সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র’ কাম্য নয়
২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪৫
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নামেও কঠিন স্বৈরশাসন কায়েম হয়ে যায়। এদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করছে। সেই আতঙ্ক এবারও তাদের তাড়া করছে। কারণ পুরোনো ব্যবস্থার সেই কারিগররা জনগণের ভোটের ফলাফল পরিবর্তন করে তাদের পছন্দের এমন সরকার গঠন করেছে, যার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ। বিরোধীদলকে জাতীয় সংসদে আলোচনার সুযোগ; এমনকি বিল উপস্থাপনের আগে যথেষ্ট সময় দেয়া হচ্ছে না। তারা বিলগুলো দেখার বা পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। জাস্ট নিয়ম রক্ষার জন্য কয়েক মিনিট আগে সরবরাহ করা হচ্ছে। গোপনীয়তার অজুহাত দেখিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। প্রেস গ্যালারি বা সাংবাদিকদের হাতে আইনে পরিণত হওয়ার আগে বিলের কপি দেয়া হচ্ছে না। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ৮-১০ মিনিট আলোচনার পরই বিলগুলো আইনে পরিণত করা হচ্ছে। পরে সংবাদ সম্মেলনে সরকার কত দ্রুত গতিতে চলছে, তা গর্বভরে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ বিরোধীদলকে আলোচনার জন্য যথেষ্ট সময় না দিয়ে এত দ্রুত কোনো বিলকে আইনে পরিণত করা ‘সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র’ বৈ অন্য কিছু নয় বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, এমন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দল গণতান্ত্রিক চেতনায় উজ্জীবিত না হলে, চরম ক্ষমতার প্রভাবে তা চরম স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। তখন বাধ্য হয়ে বিরোধীদলকে গণতন্ত্রের স্বার্থে বারবার ওয়াকআউট এবং সাথে আরো কঠিন কর্মসূচির পথে হাঁটতে হয়।
ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, বিরোধীদলের এমন কঠোর অবস্থান ও কর্মসূচিগুলোর বিরুদ্ধে নেতিবাচক বয়ান তৈরি করতে সরকার তার অনুগত মিডিয়া ব্যবহার করা শুরু করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের পর দেখা যাচ্ছে, কিছু মিডিয়া প্রচার করছে, ‘আনাড়ি নতুন সংসদ সদস্যদের কারণে শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে।’ যা নতুন সংসদ সদস্যদের মনোবল দুর্বল করার অপকৌশল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা দলান্ধ সাংবাদিকদের মূল সমস্যার দিকেও নজর দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিরোধীদলের মনোবল বাড়াতে তাদের পক্ষে লেখালেখিও করে গণতন্ত্র বিকাশে ভূমিকা পালন করছেন।
গণতন্ত্র অর্থ কেবল ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন’ নয়
গণতন্ত্র অর্থ কেবল ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন’ নয়। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন আছে- এমন যুক্তি দেখিয়ে বিরোধীদলের ন্যায়সঙ্গত মতামতের সুরক্ষা করতে না দেয়া এবং কেবল সংখ্যার জোরে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া বিরোধীদল বা ভিন্নমতের গুরুত্বকে উপেক্ষা করাকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার’ (Tyranny of the Majority) বলে।
সরকারি দল বাঁকবদল করে গণতন্ত্রের পথ ছেড়ে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে জোর অপতৎপরতা শুরু করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলের শীর্ষনেতা জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দলের অন্য সদস্যদের সাথে নিয়ে সেই সত্য বলিষ্ঠভাবে জাতির সামনে তুলে ধরছেন। তাদের এ মতামতের সমর্থনে নাগরিক সমাজ উচ্চকণ্ঠ। অন্যদিকে বিরোধীদলের কণ্ঠরোধ করতে পতিত আওয়ামী লীগের সুরে বিএনপি সরকার একই বয়ান ফেরি করা শুরু করেছে।
সরকার মূল সমস্যা এড়িয়ে যতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করুক কিংবা পুরোনো বয়ান ফেরি করুক, তা বুমেরাং হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এ প্রসঙ্গে রাজনীতি বিশ্লেষক সালেহ উদ্দিন আহমদ সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের মন্তব্য কলামে লিখেছেন, “সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার যখন বলেন ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অভিশাপ’ কিংবা সাংবাদিক সোহরাব হাসান যখন বলেন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু করা নয়’ কিংবা আলোকচিত্রশিল্পী ও অধিকারকর্মী শহিদুল আলম যখন বলেন, ‘গদি পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে সুফল পাওয়া যায় না’ এসব কথা অবশ্যই কোনোভাবে জামায়াতের রাজনীতিকে সমর্থনের জন্য নয়।” বরং বাস্তবতা হলো, জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী জনগণের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি বলিষ্ঠতার সাথে তুলে ধরছে। তাই নাগরিক সমাজের কণ্ঠে ও কলামে একই বার্তা উঠে আসছে। এ সত্য সরকারের পক্ষ থেকে উপেক্ষা করার কারণেই সমস্যা বাড়ছে মূল সমস্যা। এমন উপেক্ষা ক্ষোভের তীব্রতা বাড়াচ্ছে। তা আরো বাড়বেÑ এটাই স্বাভাবিক।
বিরোধীদলীয় নেতার বিব্রত ক্ষোভ
সরকারের উপেক্ষার প্রতিবাদে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিব্রত ক্ষোভ প্রকাশ করে একাধিকবার সরকারকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। যেমন: অতিসম্প্রতি তিনি জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন বিল’ পাসের সময় বিলের কপি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাসময়ে হাতে না পাওয়ায় স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিলটি পাসের আগ মুহূর্তে টেবিলে নথিপত্র দেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ জানিয়ে তিনি বলেন, না বুঝে কোনো সিদ্ধান্তের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নৈতিকভাবে অপরাধ।
সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, কোনো বিল পাসের অন্তত তিন দিন আগে সংসদ সদস্যদের কাছে নথিপত্র পৌঁছানোর কথা। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তত এক দিন আগে তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বিলটি যখন পাসের প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক তখন তাদের টেবিলে নথিপত্র রাখা হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “আমরা তো সবাই অর্থনীতির ছাত্র নই যে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সব বুঝে ফেলব। দ্রুত এই জটিল বিষয়গুলো বুঝে ওঠা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। দুর্বল ছাত্র হওয়ার কারণে হাত তুলব না নামাব, তা বুঝতে পারিনি। না বুঝে ‘হ্যাঁ’ বলা যেমন অপরাধ, ‘না’ বলাও সমান অপরাধ। এই নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা নীরব থেকেছি।” সরকারি দলের সদস্যদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, ‘তারা হয়তো অত্যন্ত মেধাবী এবং সবাই অর্থনীতির ছাত্র, তাই মুহূর্তেই সব বুঝে ফেলেছেন। কিন্তু আমাদের এই অক্ষমতার কথা স্বীকার করছি। এখন আমাদের জন্য আপনারাই পরামর্শ দিন আমরা কী করব।’
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে যখন এই বিলগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তখন বিরোধীদলের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই সর্বসম্মতিক্রমে অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে পাসের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখন বিল পাসের পর ‘কিছুই বুঝলাম না’ বলাটা সমীচীন নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিশেষ কমিটিতে এমন কোনো কথা হয়নি যে সংসদ চলাকালীন একেবারে শেষ মুহূর্তে নথিপত্র দেওয়া হবে। সংসদ সদস্যদের বিল নিয়ে কথা বলার অধিকার থাকা উচিত।
লেখার পরিসর সীমিত রাখতে আরো উদাহরণ তুলে ধরা হলো না। এর আগের গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন সরকার প্রসঙ্গে এসেছে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সরকার এ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এলে ৩৬ জুলাই বিপ্লবের আলোকে সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে আন্তরিক হতো জনগণ এমন বার্তা পেতো। ‘ব্যক্তির চেয়ে দল, দলের চেয়ে দেশ বড়’ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এ দর্শনই পারবে দেশকে ‘সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র’ এর অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তবে এর ভিন্নমতও আছে। তা হলো- সরকার ব্যবস্থার চেয়ে ব্যক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যক্তির চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটে সরকারে। কোন ব্যবস্থায় সরকার পরিচালিত হচ্ছে, তার চেয়ে কোন আদর্শের ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব, তা গুরুত্বপূর্ণ। তাই আদর্শ ছাড়া শুধু সরকার বদল হলেই আশা পূরণ হয় না।
প্রত্যাশা পূরণে করণীয়
আমূল পরিবর্তনের প্রত্যাশা থেকেই ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়েছে ৩৬ জুলাই বিপ্লব সফল করতে। শুধু সরকার বদল নয়। গোটা ব্যবস্থার বদলই দেশবাসীর কাম্য। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ নিয়ে সংশয় কাটছে না। কারণ ইতিহাসে দেখা যায় পৃথিবীর অনেক দেশে অনেকবার বিপ্লব হয়েছে, কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা খুব কমই পূরণ হয়েছে। কারণ সরকার বদলের নামে পুরোনো প্রভুর জায়গা দখল করেছেন নতুন কোনো রাজা-মহারাজা। যাদের বর্তমান সংস্করণ প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রী। অথচ প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন পুরোনো ব্যবস্থার বদলে বিশ্বজাহানের মালিকের সেই গোলামদের হাতে দায়িত্ব দিতে হবে, যারা সরকার গঠনের পর নিজেদের প্রভু মনে করেন না। বিশ্বজাহানের মালিকের প্রতিনিধি বা খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় বিশ্বজাহানের মালিকের গাইডলাইন মানতে ব্যর্থ হলে আখিরাতের আদালতে তার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে- এমন বিশ্বাস ও ভয় যারা অন্তরে পোষণ করেন। এমন বিপ্লবের ইতিহাসও আছে। যেমন: মদিনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো বিশ্বজাহানের স্রষ্টার এমন বান্দার শাসন। সেই সোনালি যুগের পর মানুষ সরকার বদলের জন্য যতবার বিপ্লব করেছে। সফলও হয়েছে। কিন্তু মুক্তি খুব কমই এসেছে। তাই বিতর্কেরও শেষ নেই।
সরকার ব্যবস্থা নিয়ে এ বিতর্ক আজকের নয়। অষ্টাদশ শতাব্দী ইংরেজ কবি সাহিত্যিক ও ধর্মযাজক আলেকজান্ডার পোপ (১৬৮৮-১৭৪৪) বিষয়টি তীক্ষন ব্যঙ্গাত্মকভাবে (satire) কবিতার ভাষায় এভাবে তুলে ধরেছেন, For forms of government let the fools contest; whatever is the best administered is the best. (অর্থ: সরকার ধরন নিয়ে বিবাদে করে শুধুই বোকারা; যে সরকার সবচেয়ে ভালোভাবে পরিচালিত হয়, সেটিই সেরা)। তাই সরকার গঠনের আগে মানুষ গড়তে হবে। যারা সততা ও যোগ্যতার সাথে সরকার পরিচালনা করবেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতো আদর্শিক রাজনৈতিকদলগুলো সেই কাজই করছে। দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত মানুষ গড়ার কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। তবেই বিপ্লব সফল হবে। ‘সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র’র উত্থান চিরতরে রুদ্ধ হবে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।