জনগণের সাথে দূরত্ব বাড়ছে
২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৩
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ দুটি বিল আকারে সংসদে পাস করেনি বিএনপির সরকার। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত অধ্যাদেশ দুটি আইনে রূপান্তর না হওয়া, গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নানা টালবাহানা করায় সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক। এছাড়া আইনশৃঙ্খলার অবনতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ থেকে শুরু করে সর্বত্র স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ, দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়াঙ্গনে নির্লজ্জ আত্মীয়করণ, আর্থিক খাত ধ্বংসকারীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত এবং ফ্যাসিস্ট স্টাইলে মিথ্যা মামলা-হয়রানি শুরু করেছে সরকার। ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের মানুষ যে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিল, সাধারণ মানুষের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আশাহত মানুষের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভও। নানাকাণ্ডে যেখানে মানুষ আস্থা হারিয়েছে সেখানে সরকারের দুই মাসের অর্জন তুলে ধরে করা সংবাদ সম্মেলন করেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই মাসের মাথায়ই জনআকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগে চাপে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার। নির্বাচনোত্তর সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বিস্তর ফারাক দেখা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনাস্থা ক্রমেই বাড়ছে। সরকার গঠনের আগে (জনগণের কাছে ভোট চাওয়ার সময়) জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত, প্রশাসনিক সংস্কার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন সরকার ১৮০ ডিগ্রি এঙ্গেলে পল্টি (আগের অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে যাওয়া) মেরেছে। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসেই সরকার হিমশিম খাচ্ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও তীব্র সংকট, অতীতে যা কখনো হয়নি। পর্যাপ্ত মজুদ আছে দাবি করলেও ফিলিং স্টেশনগুলো দীর্ঘ লাইন দিয়েও পাচ্ছে না বিভিন্ন পরিবহনের মালিকরা। লোডশেডিং এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ মৌলিক খাদ্যপণ্যের দাম কমানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে। সব মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি এখন অস্থির। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, নীতিগত স্থিতিশীলতার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিনিয়োগের পরিবেশও প্রত্যাশিত মাত্রায় উন্নত হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিভিন্ন স্থানে চুরি, ছিনতাই ও সহিংস ঘটনার খবর বাড়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিরোধীদল ও নাগরিক সমাজের অভিযোগ, প্রশাসনের কার্যকারিতা এখনো সুসংহত হয়নি।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তাপ বিরাজ করছে। সরকারবিরোধী দলগুলো দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম ও সুশাসনের দাবিতে কঠোর আন্দোলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বল্পসময়ে প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হলেও কার্যকর নীতি ও দ্রুত বাস্তবায়নই আস্থা পুনর্গঠনের একমাত্র পথ। তারা মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে না পারলে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে ক্ষমতার শুরুর এ পর্যায়েই জনআস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে পড়েছে সরকার। বিরোধীদলগুলো সরকারকে সময় দিতে চাচ্ছে আন্দোলন কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকলেও এখনো কঠোর কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। ফলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিরোধীদলগুলো সরকারকে সময় দিতে চাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার যদি জুলাই গণআকাক্সক্ষা অনুযায়ী পথ না চলে, তাহলে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার কোনো বিকল্প থাকবে না।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি
স্বাভাবিক হচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজে নাই। তিনি সংসদে তার দলের সংসদীয় নানা দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে পালন করতে হচ্ছে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির কথা ভাবতে পারছেন না তিনি। ফলে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। একজন মসজিদের ইমামের বাসায়ও তার কন্যা নিরাপদ থাকছেন না। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কুষ্টিয়ায় একজন কথিত পীরকে মব সৃষ্টি করে হত্যা ঠেকাতে পারেনি সরকার। হত্যার পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন সেখানে ডাকাতি-ছিনতাই ও খুন-খারাবি হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাসায় ডাকাতদল প্রবেশ করে অস্ত্রের মুখে সব লুটে নিচ্ছে। গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার এ প্রতিবেদন লেখার দিনও নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলায় একই পরিবারের চার সদস্যকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। মঙ্গলবার ভোরে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা ছিলেন- হাবিবুর রহমান, তার স্ত্রী পপি সুলতানা, তাদের ১০ বছর বয়সী ছেলে পারভেজ এবং ৩ বছর বয়সী কন্যা সাদিয়া আক্তার। নৃশংসতা একটি পরিবার পুরো নিঃশেষ হয়ে গেল। এভাবে দেশের কোনো না কোনো স্থানে প্রতিদিনই নানা অঘটন ঘটছে।
সর্বত্র দলীয়করণ
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দেশের প্রশাসন, নিয়োগ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বাড়ছে। সচিবালয়, পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বত্র দলীয় ও অনুগতদের বসানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক পরিচয় বা অনুগত প্রাধান্য পাচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হলে দলীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ না হলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
ক্রীড়াঙ্গনে নজিরবিহীন আত্মীয়করণ
আগেও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আত্মীয়করণ হয়েছিল, কিন্তু এবার আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। গত ৭ এপ্রিল জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এই কমিটি গঠনের মাধ্যমে নির্বাচিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কমিটি বাতিল করা হয়েছে। নতুন কমিটিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে সৈয়দ ইব্রাহিম আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রী পদমর্যাদার রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরুর ছেলে ইসরাফিল খসরু এবং গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী রাশনা ইমাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি হয়। নির্বাচিত কমিটি বাতিলের বিষয়টি জাতীয় সংসদে তোলেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিসিবিকে যেভাবে দখল করা হয়েছে, তা আর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নয়। এটি এখন বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে পরিণত হয়ে গেছে।’ ক্রিকেট বোর্ডের এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বোর্ডে রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত সংযোগের কারণে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা কমে গেছে। নির্বাচিত কমিটি বাতিল ও নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত ক্রিকেট-ভক্তদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
আর্থিক খাত ধ্বংসকারীদের প্রশ্রয়
বাংলাদেশের আর্থিক ও ব্যাংকিং খাত বিগত শেখ হাসিনার ১৬ বছরে নজিরবিহীন লুটপাট, অর্থ পাচার এবং অনিয়মের মাধ্যমে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে মূল হোতাদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এই বিপর্যয়ের পেছনে প্রধানত গুটিকয়েক ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং কিছু অসাধু ব্যাংকার দায়ী, যারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ উপেক্ষা করে এই খাতকে ধ্বংস করেছে।
বিশেষ করে লুটপাট ও অর্থ পাচারের শীর্ষে ছিলেন এস আলম গ্রুপ, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, চৌধুরী নাফিস সরাফাত, নজরুল ইসলাম মজুমদার, সিকদার পরিবারসহ প্রভাবশালীরা ব্যাংক খাতকে লুটের আঁতুড়ঘরে পরিণত করেছে। তখন ব্যাংক দখল করতে অযোগ্যদের বসানো হয়েছে। জোরপূর্বক পরিচালকদের সরিয়ে সরকারের অনুগতদের বসিয়ে ব্যাংক দখলের নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছিল। অযোগ্য ব্যক্তিদের ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন নির্বাচিত সরকার ঠিক একই পথে হাঁটছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সরকার গঠনের পর শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ননের মতো শীর্ষপদে বসানো হলো তারেক রহমানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যকে। তিনি কখনো ব্যাংকার ছিলেন না, সোয়েটার ব্যবসায়ী এবং তিনি নিজেও ঋণখেলাপি, ঋণপুনঃতফসিল করাতে কয়েকদিন আগের বাংলাদেশ ব্যাংকের এই টেবিল থেকে সেই টেবিলে ঘুরেছিলেন। আর ক্ষমতায় এসে নতুন সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যাংকিং না জানা একজনকে বসিয়ে দিয়েছেন। এখন তার বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগ আমলের মাফিয়া এস আলম গ্রুপকে দৃশ্যপটে আনার অভিযোগ উঠছে। দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ফের ধ্বংস করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া অযোগ্যরা এই শীর্ষ ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। এসবের নেপথ্যে সরকারের আশকারা থাকতে পারে বলে মনে করছেন আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টরা। দেশের আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল রাখতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো অপরিহার্য। রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও নিরপেক্ষ তদন্তই এই খাতের উন্নয়নে সহায়ক হতে পাওে বলে মনে করছেন বিশ্লষকরা।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত ও ফ্যাসিস্ট স্টাইলে হয়রানি শুরু
জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে ফেসবুকে লেখা বা পোস্ট করার কারণে গ্রেফতারের ঘটনা কারোই কাম্য ছিল না। কিন্তু সেটি হচ্ছে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে একজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুর ই আলম চৌধুরীকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন পোস্ট বা শেয়ার করার কারণে ফেসবুক ব্যবহারকারীকে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। ‘সাওদা সুমি’ নামে এক নারীকে জ্বালানি সংকট নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য করার কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে একটি আলোচিত বিষয়, যা নিয়ে জাতীয় সংসদে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক চলছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, সরকার, প্রধানমন্ত্রী বা সরকারি দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট বা কার্টুন শেয়ার করার অভিযোগে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন স্থানে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে সরকারদলীয় লোকদের পক্ষ থেকে। যা আওয়ামী লীগ আমলের ফ্যাসিবাদী আচরণের পুনরাবৃত্তি বলে মনে করে পর্যবেক্ষকরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাই যেখানে সহাবস্থানের রাজনীতির কথা বলছে, তখন প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি পরিস্থিতিকে জটিল করবে।
গত ২৭ মার্চ হরিপুর জামে মসজিদে জুমার নামাজের খুতবার আগে মুসল্লিদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যের জেরে কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামী সংসদ সদস্য আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন সিরাজগঞ্জের আদালত। গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার আদালত এ পরোয়ানা জারি করেন। এমন হয়রানি ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলেও ছিল।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সংকট, নাভিশ্বাস
জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৭ দিনের ব্যবধানে এলপিজি ১২ কেজিতে বেড়েছে ৫৯৯ টাকা। বিদ্যুৎ এর ইউনিট প্রতি ১ দশমিক ৮০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। লঞ্চ ভাড়া ৪২ শতাংশ বাড়ানোর এবং বাস ভাড়া ৬৪ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ দুই মাসেই বিদ্যুৎ ও জ্বালাতি খাতে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যবৃদ্ধির জনগণকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপণ্যের মূল্যও হু-হু করে বাড়তে শুরু করেছে।
বিশিষ্টজনদের অভিমত
স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অধিকারের সুরক্ষাসংক্রান্ত আইন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি মনে করেন, সরকার অতীত থেকে শিক্ষা নেয়নি। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে প্রণীত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিত করা হলো।’ বদিউল আলম বলেন, আগে ‘উচ্চ আদালতে গিয়ে বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে জামিনের জন্য ধরনা দিতে দেখেছি। কী করুণ অবস্থা! অনেক নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে আদালতে গিয়েও তারা প্রতিকার পাচ্ছিলেন না। এখন বর্তমান বিএনপি সরকার এই যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে, তারা অতীত থেকে অবশ্যই শিক্ষা নেয়নি।’ স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন আইনি কাঠামোর লঙ্ঘন। তিনি বলেন, ‘আমার বিবেচনায়, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের এমন আইন প্রণয়ন করা দরকার, যা বিরোধীদলে গেলে তাদের সুরক্ষা দেবে, কিন্তু বিএনপি উল্টো পথে হাঁটছে। এর পরিণতি কী? আমি শঙ্কিত। আমার আশঙ্কা, এর পরিণতি নাগরিকদের জন্য ভালো হবে না এবং ক্ষমতাসীনদের জন্যও মঙ্গলজনক হবে না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট আইনজীবী, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির মনে করেন, বর্তমান সরকার সংস্কার উদ্যোগে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তিনি মনে করেন, সরকার জুলাই আন্দোলনের দাবি পূরণ করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার ভারতীয় আধিপত্যবাদ মেনে নিয়েছে এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী ভারতীয় বাহিনীকে ট্রেনিংয়ের সুযোগ দিচ্ছে, যা জুলাইয়ের আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থী। সংসদ ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে তিনি রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে জুলাইয়ের সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানান।