সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

বাইরের প্রভাবে নতুন সমীকরণ


২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২০

॥ ফারাহ মাসুম ॥

বাংলাদেশের সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতি এখন একটি ‘সংস্কারবাদী যুগে’ প্রবেশ করেছে। একই সাথে ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং এর গতিপথে এক গভীর রূপান্তর পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটি যদি সফল হয়, তবে বাংলাদেশ একটি কার্যকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ সংসদীয় গণতন্ত্রের দিকে এগোবে। অন্যথায় ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ আবার পুরনো কোনো বৃত্তে দেশটিকে ফিরিয়ে নিতে পারে। তবে তরুণ প্রজন্মের সক্রিয়তা ও নজরদারি এই পথে সবচেয়ে বড় পাহারাদার হিসেবে কাজ করছে। ২০২৬ সালের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় বাইরের শক্তিগুলোর ভূমিকা আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ এবং কৌশলগত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর পরাশক্তিগুলোর অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যে দিকগুলোয় মোড় নিচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে-
১. নতুন সাংবিধানিক কাঠামো ও ‘জুলাই সনদ’ : ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ (সংবিধান সংস্কার) নিয়ে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোট অধ্যাদেশ অকার্যকর হয়ে গেলেও বিএনপি বলছে, এতে দেয়া প্রতিটি অঙ্গীকার বিএনপি পালন করবে। সেটি যদি বাস্তব হয়, তাহলে এর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের পথ তৈরি হবে। এর আওতায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকা একক ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতি ও সংসদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। একই সাথে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদের যে প্রস্তাব রয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন হবে, যেখানে বিভিন্ন পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণ থাকবে। গৃহীত সংস্কার প্রস্তাব অনুসারে কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না- এমন বিধান কার্যকর হলে সেটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
২. রাজনৈতিক মেরুকরণ ও নতুন শক্তি : নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসায় বর্তমানে সংসদীয় রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। তবে তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী ইশতেহার ও জুলাই সনদের সংস্কারগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা। এ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক পার্টি নতুন শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন দলগুলো প্রথাগত রাজনীতির বাইরে ‘জনআকাক্সক্ষা’ পূরণে চাপ সৃষ্টি করছে। ফ্যাসিবাদ কায়েমের কারণে বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না থাকা এবং দলটির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সংসদীয় বিতর্কের ধরনের বড় পরিবর্তন এনেছে।
৩. সংসদের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি : অতীতের সংসদগুলোয় কোরাম সংকট বা একতরফা সিদ্ধান্তের যে সংস্কৃতি ছিল, তা ভাঙার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে সংসদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর- ক. সংসদীয় কমিটির সক্রিয়তা: মন্ত্রণালয়গুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করার কথা বলা হচ্ছে। খ. সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব: ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক ভোট ব্যবস্থা চালুর আলোচনা রয়েছে, যা ছোট দলগুলোর সংসদে যাওয়ার পথ সুগম করতে পারে। গ. বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা: সংসদীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ওপর।
৪. চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি : ভবিষ্যৎ পথটি সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক নয়। কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান এখনো বিদ্যমান, যার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা। নির্বাচনের পরও বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতার রেশ রয়ে গেছে। সংস্কারের বাস্তবায়নও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। জুলাই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব কার্যকর করা এবং আমলাতন্ত্রের প্রভাব কাটিয়ে সংসদকে মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা একটি দীর্ঘমেয়াদি কাজ। এছাড়া রয়েছে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ। বৈদেশিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা বর্তমান সংসদের জন্য বড় অগ্নিপরীক্ষা।
বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরে কোন দেশ বা শক্তি কী ধরনের ভূমিকা রাখছে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
১. ভারত : ‘সহযোগিতার নতুন সমীকরণ’: ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর ভারতের নীতিতে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি সমর্থন থাকলেও, বর্তমানে তারা ‘রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক’ নীতিতে এগোচ্ছে। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা- ভারতের মূল লক্ষ্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের মাটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন। ২০২৬-এর নতুন সরকারের সাথে তারা এ বিষয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি চায়। কানেক্টিভিটি- ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভারত বর্তমান সরকারের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাড়াতে আগ্রহী।
২. যুক্তরাষ্ট্র : গণতন্ত্র ও মানবাধিকারে সহায়তা: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। দেশটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারে যুক্তরাষ্ট্র কারিগরি ও নৈতিক সমর্থন দিচ্ছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র শ্রম অধিকার ও সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতায় চাপ প্রয়োগ করছে। তারা চায় বাংলাদেশ যেন কোনো নির্দিষ্ট আঞ্চলিক শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে।
৩. চীন : উন্নয়ন ও অবকাঠামোর অংশীদার: চীনের ভূমিকা মূলত অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত। তারা আদর্শিক রাজনীতির চেয়ে ‘স্থিতিশীল পরিবেশ’ এবং তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের অগ্রাধিকারে রয়েছে অবকাঠামো বিনিয়োগ: মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বড় প্রকল্পে চীন অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখছে। তারা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়। চীন বর্তমান সরকারের সাথে দ্রুত সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে। কারণ তারা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে তাদের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে চায়।
৪. ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্য : ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৬ সালের নির্বাচনে বড় আকারের পর্যবেক্ষক দল পাঠিয়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছে। ইইউ’র সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- জিএসপি প্লাস সুবিধা। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা (জিএসপি+) ধরে রাখতে গণতন্ত্র এবং সুশাসনের কঠোর শর্ত পালন করতে হবে। এটি সরকারকে গণতান্ত্রিক পথে থাকতে এক ধরনের ইতিবাচক চাপে রাখছে।
৫. জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা : জাতিসংঘ মূলত সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে। বিশেষ করে ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত এবং পরবর্তীতে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তারা কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং ২০২৬ সালের সংসদীয় রাজনীতির নতুন যাত্রায় রাশিয়া এবং ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত। ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো তারা সরাসরি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে তাদের ভূমিকা অপরিসীম।
৬. রাশিয়া : অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ধারাবাহিকতা: রাশিয়া সাধারণত কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে মাথা ঘামায় না, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতেই বেশি আগ্রহী। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রাশিয়ার সবচেয়ে বড় স্বার্থের জায়গা। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালু হওয়ার কথা রয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলেও রাশিয়া এই প্রকল্পের সুরক্ষা এবং ঋণের টাকা (প্রায় ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার) ফেরত পাওয়া নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখছে। রুবলে লেনদেন ও বিকল্প অর্থায়ন তাদের অগ্রাধিকার। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া বাংলাদেশের সাথে ডলারের বদলে রুবল বা বিকল্প মুদ্রায় (যেমন ইউয়ান) লেনদেনের ব্যবস্থা আরও জোরদার করছে। এটি বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতির চাপ সামলাতে একটি বিকল্প পথ হতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা প্রশ্নে গ্যাস অনুসন্ধান ও অন্যান্য জ্বালানি খাতে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর (যেমন: গ্যাজপ্রম) অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
৭. ওআইসিভুক্ত দেশসমূহ : সংহতি ও সহযোগিতা : ইসলামী দেশগুলোর সংস্থা ওআইসির সদস্য হিসেবে সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে জাতিসংঘে সমর্থনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব পাওয়ার জন্য লড়ছে। ওআইসি দেশগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশের এই প্রার্থিতাকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার এবং বিশ্বজুড়ে প্রচারণা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রেমিট্যান্স ও জনশক্তির কর্মসংস্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। নতুন সংসদীয় সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে তারা জনশক্তি আমদানির পরিমাণ আরও বাড়াবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করবে। এর বাইরে সৌদি আরব এবং কাতার বর্তমানে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে তুরস্কের সাথে প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশের সহযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
সংক্ষেপে ভারত বাংলাদেশে কৌশলগত নিরাপত্তা ও ট্রানজিট নিশ্চিত করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্রের তদারককারী ও মানবাধিকার রক্ষা ও কৌশলগত স্বার্থের সংরক্ষণ এবং চীনা প্রভাবে নিয়ন্ত্রণ চায়। চীন অর্থনৈতিক সাহায্যদাতা ও অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে চায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্যিক অংশীদার এবং সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড বজায় রাখায় গুরুত্ব দেয়। রাশিয়া জ্বালানি ও বৃহৎ প্রকল্প রাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ওআইসি সংহতি ও কর্মসংস্থান আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করে। রাশিয়া এবং ওআইসি দেশগুলো সাধারণত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার বা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো সরব হয় না। এটি বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য এক ধরনের ‘কৌশলগত সুবিধা’ তৈরি করে। যদি পশ্চিমা দেশগুলো কোনো কারণে কঠোর শর্ত দেয়, তখন বাংলাদেশ এই ব্লকটির (রাশিয়া ও ওআইসি) মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
সারকথা হলো- বাইরের শক্তিগুলো এখন আর কেবল একক কোনো দলকে সমর্থন দিচ্ছে না। বরং বাংলাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে সবাই চাইবে একটি স্থিতিশীল সরকার থাকুক, যারা তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। তবে জনগণের আকাক্সক্ষা ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারই শেষ পর্যন্ত এই গণতান্ত্রিক পথযাত্রার মূল ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
ভারত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বা ‘পুনর্বাসন’ করার জন্য সরাসরি কতটা চাপ দেবে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় এটি বেশ জটিল ও বহুমাত্রিক। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপির বিশাল জয় এবং ‘জুলাই সনদ’-এর অধীনে সাংবিধানিক সংস্কারের পর ভারতের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান ও চাপের ধরনগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো-
১. কৌশলগত পিছুটান : ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র হওয়ায় দিল্লি বুঝতে পেরেছে যে, শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট দলের (আওয়ামী লীগ) ওপর নির্ভর করা তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। বর্তমান বিএনপি সরকারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারত এখন আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের জন্য সরাসরি কোনো রাজনৈতিক চাপ দিচ্ছে না। বরং তারা ‘ডি-হাইফেনেশন’ নীতি গ্রহণ করেছে, অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ভাগ্য থেকে নিজেদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আলাদা রাখার চেষ্টা করছে।
২. শেখ হাসিনার উপস্থিতি ও আইনি বাধ্যবাধকতা : শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর প্রত্যর্পণের আবেদন জানিয়েছে। ভারত এই আবেদনটি ‘আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার’ অধীনে পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে। আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চাপের চেয়েও ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো হাসিনাকে ফেরত দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক জটিলতা।
৩. আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ভারতের ‘মৃদু শক্তি’ : ভারত সরাসরি চাপ না দিলেও কিছু কৌশলী অবস্থান বজায় রাখছে। আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে বাংলাদেশের পার্লামেন্টে যে আলোচনা বা আইন (যেমন : ২০২৬ সালের সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধনী বিল), তা ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের দীর্ঘমেয়াদি চাওয়া হলো বাংলাদেশে তাদের ভাষায় একটি ‘উদার ও অসাম্প্রদায়িক’ রাজনৈতিক ধারা বজায় থাকুক- যাতে আওয়ামী লীগ বা সমমনা কোনো শক্তি ভবিষ্যতে জায়গা পায়। এছাড়া হিন্দুসহ অন্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টি ভারত বারবার সামনে আনছে। অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে তারা পরোক্ষভাবে দলটির প্রয়োজনীয়তা বা রাজনৈতিক স্পেস দেওয়ার কথা বলতে পারে।
৪. বাস্তববাদী সম্পর্ক : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর অর্থ হলো- প্রথমত, তারা নিরাপত্তা গ্যারান্টি চায়, যদি বর্তমান সরকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় না দেয়, তবে ভারত আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের জন্য কোনো চাপ দেবে না। একই সাথে ভারত চায় না বাংলাদেশ চীন বা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ুক। এই ভারসাম্য রক্ষার বিনিময়ে ভারত আওয়ামী লীগ ইস্যুটিকে সরিয়ে রেখে বর্তমান সরকারের সাথে কাজ করতে আগ্রহী হতে পারে।
সংক্ষেপে ভারত এখন আর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর বা পুনর্বাসনের জন্য সক্রিয় চাপ দিচ্ছে না। বরং তাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো, নিজের দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলো রক্ষা করা এবং শেখ হাসিনা ইস্যুটি এমনভাবে সমাধান করা- যাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ফাটল না ধরে আবার তাদের এই রাজনৈতিক এসেটের ক্ষতি না হয়।