জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার আলোকে পথ চলতে হবে
১৯ জুন ২০২৫ ১০:৫৭
॥ মতিউর রহমান আকন্দ॥
দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি ছিল নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বিতর্ক হয়েছে। কেউ বলেছেন, আগে সংস্কার তারপর নির্বাচন। কেউ বলেছেন, সবার আগে বিচার। বিএনপি শুরু থেকেই দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। তারা নির্বাচিত সরকার সংস্কার করবে মর্মে বলে আসছিলো। জনগণের প্রত্যাশা ছিলো সংস্কার না হলে নির্বাচন অর্থবহ হবে না। অনেকেই বলেছেন, শুধু নির্বাচনই যদি সমস্যার একমাত্র সমাধান হতো, তাহলে অতীতে অনেক নির্বাচন হওয়া সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের উত্থান হলো কেন? ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছিল। তারপরও দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়নি। গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে বিদ্যমান পদ্ধতির পরিবর্তন করতে হবে। এজন্য সংস্কার অপরিহার্য। দেশের রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিকসহ বিশেষজ্ঞগণ মতামত দিয়েছেন, ফ্যাসিবাদ যাতে কোনোদিন ফিরে আসতে না পারে- এজন্য বিচার, সংস্কার ও অতঃপর নির্বাচনের আয়োজন করা প্রয়োজন। যেসব রাজনৈতিক দল বিচার ও সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে তারা কখনো নির্বাচনের বিপক্ষে ছিল না, এখনো নেই। অন্তর্বর্তী সরকার বিচার ও সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি নির্বাচনেরও প্রস্তুতি গ্রহণ করে যাচ্ছিল। বিএনপি মে মাসে ঘোষণা দেয়- ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন হতে হবে। ১৩ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত রাজধানীতে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। ২১ মে সেনাপ্রধানের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়া দরকার মর্মে প্রদত্ত বক্তব্য দেশে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি করে। এ অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা ২৪ ও ২৫ মে সকল রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করেন।
গত ৬ জুন শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী বছরের এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধের যেকোনো দিন অনুষ্ঠিত হবে। এ ঘোষণার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন উপযুক্ত সময়ে নির্বাচনের বিস্তারিত রোডম্যাপ দেবে বলেও জানান তিনি। প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পরও রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান হয়নি। যেদিন প্রধান উপদেষ্টা এ ঘোষণা দিলেন, সেদিন রাতেই বিএনপির স্থায়ী কমিটি বৈঠক করে জানিয়ে দেয়, জনগণ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। নির্বাচনের জন্য এপ্রিল উপযুক্ত সময় নয়। নির্বাচন ডিসেম্বরে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে ৬ জুন রাতেই এক বিবৃতি প্রদান করেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ৬ জুন সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বলেছেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধের যেকোনো একটি দিনে অনুষ্ঠিত হবে।’ তার এ ঘোষণায় জাতি আশ্বস্ত হয়েছে এবং ঘোষিত সময়ের মধ্যেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জাতি আশা প্রকাশ করছে। তিনি আরও বলেন, জাতির তীব্র আকাক্সক্ষা সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনÑ এ ৩টি বিষয়ের ভিত্তিতে এবং ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশকে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন।”
বিএনপির অভিযোগ, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কথা বললেও একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সিংহভাগ রাজনৈতিক দলের মতামত অগ্রাহ্য করে নিজেদের নিরপেক্ষতাকেই যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, তাতে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে দেশের জনগণ সঙ্গতভাবেই শঙ্কিত হতে পারে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপিসহ বেশিরভাগ দল ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার কথা বলেছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কড়া ভাষায় ঘোষণা দেন, ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন হবে। বিএনপির এ ঘোষণায় রাজনীতিতে অচলাবস্থার তৈরি হয়। কোনো একটি রাজনৈতিক দল ভিন্নমত পোষণ করলে আর যাই হোক, সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সঙ্গতকারণেই এ অবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন ছিল। অবশেষে প্রধান উপদেষ্টার লন্ডন সফরকালে তাঁর ও তারেক জিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অচলাবস্থা নিরসনের সুযোগ তৈরি হয়। বৈঠক সম্পর্কে রাজনৈতিক মহলে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যাই থাকুক, তা গুমোট নিরসনে যে ভূমিকা রেখেছে, তা সকলের নিকটই স্পষ্ট। প্রধান উপদেষ্টার সাথে তারেক জিয়ার বৈঠকের ফলে বিএনপি তার অনড় অবস্থান থেকে সরে আসে। সরকারপ্রধান যেকোনো দলের সাথে যেকোনো বিষয় আলোচনা করতে পারেন। ড. ইউনূস ও তারেক জিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি খুবই স্বাভাবিক। প্রশ্ন উঠেছে শুধুমাত্র একটি দলের সাথে আলাপের পর বিদেশে যৌথ প্রেস ব্রিফিং করে প্রধান উপদেষ্টা অন্যান্য রাজনৈতিক দলকেও অবজ্ঞা করলেন কিনা? একটি মাত্র রাজনৈতিক দলের সাথে আলাপের পরই সাংবাদিকদের সামনে যৌথভাবে ঘোষণা প্রদান নৈতিকতার দৃষ্টিতে যথার্থ নয়। এর মাধ্যমে তিনি তার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করেছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা হচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যক্রমের মাধ্যমে এ প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে। নতুবা নির্বাচন বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। জনগণ কোনো প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত নির্বাচন চায় না।
ইতোমধ্যেই পত্রপত্রিকায় মতামত প্রকাশ করা হচ্ছে যে, ড. ইউনূস ও তারেক জিয়ার মধ্যকার আলোচনা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন, আলোচনায় উভয় পক্ষই বেশকিছু শর্ত দিয়েছে। বৈঠক শেষে যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে যেসব কথা বলা হয়েছে, তা সামনে আনলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।
যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে ‘অত্যন্ত সৌহার্দ্যমূলক পরিবেশে অধ্যাপক ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার কাছে আগামী বছরের রমজানের আগে নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তাব করেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও মনে করেন, ওইসময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভালো হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তিনি আগামী বছরের এপ্রিলের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ২০২৬ সালের রমজান শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহেও নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সেই সময়ের মধ্যে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন হবে।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার এ অবস্থানকে স্বাগত জানান এবং দলের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানান। প্রধান উপদেষ্টাও তারেক রহমানকে ফলপ্রসূ আলোচনার জন্য ধন্যবাদ জানান।’
বিশ্লেষকগণ বলছেন, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের মধ্যে অনেক শব্দের মারপ্যাঁচ রয়েছে। তা হলোÑ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করা যেতে পারে। তাই ঘোষিত ঐ সময় নির্বাচন হবে কিনা, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়ে গেছে। অনেকেই বলেছেন, সামনে রাজনৈতিক সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কবে হবে, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনা হলে ইসি সরকারের ‘ভাব’ বুঝতে পারবে। তখন নির্বাচনের তারিখের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে হোক বা এপ্রিলে- যখনই হোক নির্বাচন কমিশনকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, আগে বলা হয়েছিল ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে। সেই সময়সীমা মাথায় রেখে ইসি প্রস্তুতি শুরু করেছিল। সেভাবে এগিয়েছিল। এখন আবার নতুন ‘ডাইমেনশন’ এসেছে। যৌথ বিবৃতির বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সিইসি বলেন, ‘যে ঘোষণাটা লন্ডনে বসে হয়েছে, এটা আপনারা যেটুকু জানেন, আমি এর বাইরে বেশি কিছু জানি না। আপনারা যেটুকু দেখেছেন মিডিয়ায়, আমিও সেটুকু দেখেছি।’
আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হতে পারে- এ সংক্রান্ত যৌথ বিবৃতির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘আমি এটা টেলিভিশনে দেখেছি, এটাকে আমি ফরমাল, অফিসিয়াল ভাবতে পারছি না। সরকারের সঙ্গে আমাদের এখনো কথাবার্তা হয়নি, কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসে। আমরা এখন আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে ভাবছি।
সিইসি আরও বলেন, ‘এখন আমরা প্রস্তুতির বাইরে কিছু চিন্তা করছি না। যখন সরকারের সঙ্গে কথা হবে যে ওনারা কী আলোচনা করেছেন, আমরা তো নিশ্চয়ই ওনাদের ভাব বুঝতে পারব, তখন একটা তারিখ দেয়া হবে। এখন আমাদের চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা, শয়নে-স্বপনে নিজেদের প্রস্তুতি।’
এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন- এটা এখনো তাঁদের কাছে পরিষ্কার নয়। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, গেজেটের মাধ্যমে ভোটের তারিখ ঘোষণা করা হয়। ছয় মাস-আট মাস আগে ভোটের তারিখ বলার বিধান আইনে নেই।
সিইসি বলেন, যৌথ বিবৃতিতে তিনি যেটা দেখেছেন যে রমজানের আগেও নির্বাচন হতে পারে। সেখানে ‘যদি’ আছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে সিইসি বলেন, নির্বাচনের জন্য বড় প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো অনেকটা শেষ হয়েছে। সবচেয়ে বড় কাজ ভোটার নিবন্ধন, এটি মোটামুটি শেষ।
লন্ডনের বৈঠকের পর বিএনপির মধ্যে এক ধরনের উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে। তারা নির্বাচনের বিষয়ে প্রার্থী নির্ধারণসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লন্ডনে বসে বৈঠক করে সমাধান করার পদক্ষেপকে যথার্থ নয় বলে মন্তব্য করেছেন। অনেকে এটা রাজনৈতিক পরাজয় বলেও উল্লেখ করেছেন। বৈঠকে আলোচ্য বিষয় নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং ফলাফল সম্পর্কে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। যৌথ বিবৃতির বিষয়ে অনেকে অসন্তোষ জানিয়েছেন।
ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন এবং পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, তাদের মতামতটিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি ঝুঁকে পড়ে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কোনো একটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। এজন্যই দরকার রাজনৈতিক বিষয়ে ঐকমত্য হওয়া। বিএনপি যদি মনে করে তারাই এককভাবে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে, তাহলে সেটা হবে মস্তবড় ভুল।
রাজনীতি একদিকে সহজ, আবার অন্যদিকে এক কঠিন কাজ। এটা নির্ভর করে কে কীভাবে রাজনীতি করে তার ওপর। কেউ যদি সহজ রাজনীতির পথ পরিহার করে অহেতুক কুটিল ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করে, তবে তারা নিজেরাই রাজনীতি থেকে হারিয়ে যায়। আওয়ামী লীগ ও জাসদ আমাদের সামনে রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। অতীতে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় অনেক সুযোগ পেয়েছিল। সে সময় তারা জাতিকে সঠিক নির্দেশনা ও নেতৃত্ব দিতে পারেনি। রাজনীতিতে সামান্য ভুল পদক্ষেপ বড় বিপর্যায়ের কারণ হতে পারে। এদেশের সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সফলতা লাভ করেছিলো। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী লীগ যে নির্যাতন চালিয়েছিল, তা জনগণ ভুলে যায়নি। আওয়ামী লীগ দেশের জনগণকে অবজ্ঞা করে শুধুমাত্র ভারতের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে রাজনীতি করায় জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে জনরোষের শিকার হয়ে শেখ হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়। রাজনীতি হতে হবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য করে জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে হয়। জনগণ যদি কোনো রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, সে দলের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন কলামিস্ট মন্তব্য করেছেন, বিএনপি যদি জনগণের ভাষা বুঝতে না পারে, তাহলে তাদেরও করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে। জনগণ সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে। বিএনপির কোনো কোনো কথা ভারতের সাথে মিলে যাচ্ছে। বিএনপি যখন ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের জোর দাবি জানায়, তখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখমাত্র বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে প্রেস ব্রিফিং করে। একই সময় সেনাপ্রধান ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়া দরকার বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। বিএনপি, ভারত ও সেনাপ্রধানের বক্তব্য একই ধরনের হওয়ায় জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দেয়।
দ্রুত নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপির অনড় অবস্থান সম্পর্কে কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, দলের ভেতরে অন্তর্দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ৪ সহস্রাধিক লোককে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় কোন্দলে এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক লোক নিহত হয়েছে। চাঁদাবাজি ও প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুরের কারণে জনগণের মধ্যে বিএনপির বিষয়ে এক নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। এগুলো সামাল দেয়ার জন্য বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। তারা ভাবছে নির্বাচন হলেই তারা ক্ষমতায় চলে যাবে এবং এসব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু জনগণের মধ্যে এ ধারণার উল্টো অবস্থা বিরাজমান। জনগণ কোনো চাঁদাবাজ ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। জনগণের প্রত্যাশা তারা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে জনগণের মনোভাবকে সামনে রেখে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান যে জরিপ চালিয়েছে, তাতে জনগণ পরিবর্তনের দিকেই তাদের মনোভাব ব্যক্ত করেছে। জনগণের দৃষ্টি জামায়াতে ইসলামীর দিকে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৫ আগস্টের পর দেশ ও জাতির কল্যাণের লক্ষ্যে যে গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছে, তাতে জামায়াতের সমর্থন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য, বিবৃতি, সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শাহাদাতবরণকারী ও আহতদের পাশে আমীরে জামায়াত যেভাবে দাঁড়িয়েছেন, তাতে গোটা দেশের নজর জামায়াতে ইসলামী ও আমীরে জামায়াতের দিকে। জনগণ জামায়াতকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আস্থাভাজন দল হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। আমীরে জামায়াত ১৬ এপ্রিল বিদেশি মিশনের সাথে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে ২০২৬ সালের রমজানের পূর্বে ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন হওয়ার বিষয়ে দলের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন। তার এ বক্তব্য দলীয় স্বার্থে ছিলো না। দেশ ও জাতির স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই তিনি তার বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন।
লন্ডনের বৈঠক, যৌথ ব্রিফিং, রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতিক্রিয়া, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, বিশেষজ্ঞগণের বিশ্লেষণ সামনে রাখলে প্রতীয়মান হয়- বিএনপি আপাতত উচ্ছ্বসিত হলেও রাজনীতির অনিশ্চয়তা কাটেনি। রাজনীতিতে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে সকল দলকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে কতগুলো কমন বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি সরকারপ্রধান যদি ঝুঁকে পড়েন, তাহলে রাজনীতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে। এ বিষয়ে সরকারকে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটকে সামনে রেখে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করে যেতে হবে।