ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনে শ্রমিকদের অবস্থান
২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:৪২
॥ আলম শামস ॥
ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনের মুখ্য ভূমিকায় ছিলো বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কোটা আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে এটি গঠিত হয়। এটি কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তীতে অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
২০২৪ সালের ১ জুলাই সংগঠনটির সৃষ্টি হয় এবং সৃষ্টির পরপরই আন্দোলন সফল করার জন্য ৮ জুলাই সংগঠনটি ৬৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি ঘোষণা করে, যার মধ্যে ২৩ জন সমন্বয়ক ও ৪২ জন সহ-সমন্বয়ক ছিলেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে একাধিক সমন্বয়ককে এ সংগঠনের নেতৃত্বে দেখা গেছে। যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাত রশিদ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সারজিস আলম, ইংরেজি বিভাগের হাসনাত আবদুল্লাহ, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের আসিফ মাহমুদ সজীব ও ভূগোল বিভাগের আবু বাকের মজুমদার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের খান তালাত মাহমুদ রাফি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ সোহেল এবং অন্যরা। সমন্বয়কদের তালিকায় কৌশলগত কারণে নাম না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নেতা সাদিক কায়েম, ফরহাদ এবং মহানগরীগুলোয় ছাত্রদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ছাত্রশিবির নেতা জাহিদুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম সাদ্দাম প্রমুখ।
কোটা সংস্কারের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে চার দফা দাবিতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এর ব্যানারে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা লাগাতার কর্মসূচি দেয়। ২ থেকে ৬ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করে। ৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকায় গণপরিবহন বন্ধ এবং রাস্তা অবরোধ কর্মসূচি চালায় এবং পরবর্তীতে সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচি দেয়া হয়, যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি নামে পরিচিত। বাংলা ব্লকেড চলাকালীন রাজধানীতে শুধু মেট্রোরেল চালু ছিল। পরবর্তীতেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কর্মসূচিত পালিত হয়। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। এদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এক বক্তব্যে কোটা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ হিসেবে অভিহিত করেন।
শেখ হাসিনার মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ব্যঙ্গ করে ‘তুমি কে আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ এবং ‘চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ সেøাগান দেয়।
১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, মন্ত্রী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নষ্ট করার অভিযোগ আনেন। ১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীকে তার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলাম। প্রত্যাহার না হওয়ায় আমরা রাস্তায় নেমেছি।’
এ আন্দোলন যখন ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়, তখন আন্দোলনে ছাত্রদের পাশাপাশি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিক ভাই-বোন অংশগ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শতাধিক শ্রমিক নিহত হয়। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক হাজার। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে শ্রমিকদের এ আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়। তাদের অধিকার যেন নিশ্চিত করা হয়। ন্যায্য মজুরিসহ যেকোনো দাবি আদায়ে কোনো শ্রমিককে যেন রাস্তায় নামতে না হয়। শ্রমিকরা যেন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন। নারী শ্রমিকদের জন্য পরিবেশ যেন নিশ্চিত হয়।
গত বছরের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিকদের মূল্য দিতে হয়েছে অনেক বেশি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার এ গণঅভ্যুত্থানে সহিংসতায় অন্তত ১১২ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২১ জন দোকানদার, ১৫ রিকশাচালক, ১২ পরিবহনকর্মী, ৯ পোশাক শ্রমিক, ৯ দিনমজুর, ছয় নির্মাণ শ্রমিক, পাঁচ হকার, চারজন হোটেলকর্মী। বাকিরা বিদ্যুৎ ও ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করতেন। নিহতদের মধ্যে ২৩ জন ছিল শিশুশ্রমিক। যাদের বয়স ১৩-১৮ বছরের মধ্যে বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানে শ্রমিক হত্যার দায়ে শেখ হাসিনার বিচার দাবি করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘নারী শ্রমিকদের কথা বিবেচনায় সব প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করতে হবে। বন্ধ হওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু ও নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে তুলে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। আউটসোর্সিং বন্ধ করে স্থায়ী পদ সৃষ্টি করতে হবে। অবাধ ও গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক হত্যার বিচার ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। জাতীয়ভাবে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা ঘোষণা করতে হবে। বৈষম্যহীন জাতীয় পে-স্কেল ও মজুরি হার ঘোষণা করতে হবে। জরুরি পরিসেবা আইনসহ সব ধরনের কালাকানুন বাতিল করতে হবে।’ খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমিয়ে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করতে হবে বলে তিনি জানান।
মে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মে দিবসের মূল দাবি দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ। অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন ও যৌথ দরকষাকষির অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব আকাক্সক্ষা ও দাবি পূরণের লক্ষ্যে মে দিবসের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের সব শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়নে যুক্ত হতে হবে।’
অভ্যুত্থানের প্রথম চাওয়া ছিল ‘শ্রমিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ বলে উল্লেখ করেছেন গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের নেতা এবং গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার। তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছর অন্য পেশাজীবীদের মতো শ্রমিকরাও স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারেননি। তাই শ্রমিকরা কথা বলতে পারবেন, এমন পরিবেশ ছিল আমাদের প্রথম চাওয়া। ৫ আগস্ট-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এসব বিষয়ে নজর দেবে বলে প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু রাতারাতি সব প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার নয়।’
নারী শ্রমিকদের সমস্যার কথাগুলো তুলে ধরে তাসলিমা আখতার বলেন, ‘দেশে আট কোটি শ্রমিক রয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ নারী। কিন্তু নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যে মজুরিবৈষম্য রয়েছে। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীরা মজুরিবৈষম্যের শিকার। এটা গুরুত্ব দিয়ে দূর করতে হবে। যৌন হয়রানিসহ সব ধরনের হয়রানি দূর করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের নারী-পুরুষসহ কোনো ধরনেরই প্যারামিটারেই যেন বিভক্ত করা না হয়।’ সামগ্রিকভাবে শ্রমিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করনে।
যদিও শ্রমিকদের আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থানের অর্জন নস্যাতকারীদের নানা তৎপরতাও লক্ষ করা যাচ্ছে মাসজুড়ে। শ্রমিক ও শিল্পের স্বার্থে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধতাই সব অপচেষ্টা রুখে দেবে সেই ভরসা আমরা রাখি।
শিক্ষার্থীদের মাঝে বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা ছড়িয়েছে, যা সবাইকে একবিন্দুতে দাঁড় করিয়েছে। নিপীড়ন-নির্যাতন কোনোভাবেই চিরস্থায়ী হয় না এবং তার ওপর ভর করে চিরস্থায়ীভাবে টিকে থাকা যায় না সেটাই প্রমাণ করেছে ছাত্র-জনতা-শ্রমিকরা।
সব নির্যাতন-নিপীড়নের ভয় উপেক্ষা করে আবু সাঈদ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে সব ভয়-জড়তা ভেঙে চুরমাচুর করে সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। সবার দায়বোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাধ্য করেছে আন্দোলনে নামতে। আবু সাঈদের ডাক শ্রমিকের জীর্ণ ঘরেও কীভাবে পৌঁছেছে, সেটা গুলিবিদ্ধ সুমনের মৃত্যুর আগের কথাগুলোয় স্পষ্ট।
ঢাকা ইপিজেডের শান্তা গার্মেন্টের শ্রমিক সুমন বলেছিলেন, ‘আমার খুব ইচ্ছা, আবু সাঈদ যেমন দেশের জন্য জীবন দিসে, আমিও যদি সে রকমভাবে দেশের পাশে দাঁড়াতে পারি, তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করবো। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন, যাতে দেশ স্বাধীন করতে পারি! স্বাধীনভাবে চলতে পারি। আর যদি বেঁচে না ফিরি, আমার দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করবেন।
মৃত্যুর আগে ঢাকা ইপিজেডের শান্তা গার্মেন্টের শ্রমিক সুমনের কথাগুলো কেমন গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়। কীভাবে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ফারহান, নাঈমার মতো করে পোশাক শ্রমিকরাও আমাদের সাহসের প্রতীক হয়েছে, তারই দৃষ্টান্ত সুমনসহ প্রাণ হারানো শ্রমিকরা।
আন্দোলনের শুরুতে আন্দোলন ঢাকার আশেপাশে শ্রমিক এলাকাগুলোয়ও ছাত্র-জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার পাশে আশুলিয়া-সাভার, ভেতরে বাড্ডা-মহাখালী-উত্তরা, একপ্রান্তে গাজীপুর, আরেকপ্রান্তে নারায়ণগঞ্জ প্রত্যেকটিই পোশাক শ্রমিক এলাকা। কোটা সংস্কার আন্দোলনে একপর্যায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের প্রশ্নও যুক্ত হয়। এরইসঙ্গে যখন নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড ক্রমশ বাড়তে শুরু করে, তখন সব ভয়কে প্রতিহত করে শিক্ষার্থীরা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। কারখানায় যাওয়া আর বাড়ি ফেরার পথে আশপাশে আন্দোলনে সতর্ক ও উৎসুক নজর বাড়ে শ্রমিকদের। কখনো সুযোগ পেয়েই যুক্ত হয়েছে মিছিলে। কখনো ছবি তুলেছে, ভিডিও করেছে ছড়িয়ে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিও মৃত শ্রমিকদের শনাক্ত করতে সহায়তা করে। ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতন মেনে নিতে পারেনি শ্রমিকরাও। নানা মাত্রায়, কায়দায় আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে, সমর্থন জুগিয়েছে। একইসঙ্গে মাত্র সাড়ে ১২ হাজার টাকার সস্তা মজুর এ পোশাক শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত তাদের জীবনে যে বঞ্চনার শিকার হন, সেই বঞ্চনা থেকেই মুক্ত হতে ঐক্য বোধ করেন ছাত্র-জনতার সঙ্গে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাবে পোশাক শ্রমিকরা সবসময় কথা বলার অধিকার হারিয়েছে, নিপীড়ন-নির্যাতন হামলা-মামলা-হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ২০২৩ সালের মজুরি আন্দোলনে এবং রানা প্লাজা ও তাজরীন হত্যাকাণ্ড তার উদাহরণ।
এসব থেকে মুক্তির ইচ্ছা ও মর্যাদার জীবন পাওয়ার বাসনা তাদেরও যুক্ত করে এ আন্দোলনে। সেটা সবসময় সংখ্যায় হিসাব না করা গেলেও তাদের অংশগ্রহণের গুণগত গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। বিশেষ করে এ আন্দোলন এক দফায় পরিণত হওয়ার পরপর ২ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়।
গণভবনের দিকে রওনা হতে গিয়ে এবং ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পদত্যাগ ও দেশছাড়ার পর বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা মিছিলে যোগ দিলে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড চলে। শ্রমিকদের ওপরে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড হয়েছে ৫ আগস্ট। শ্রমিকদের বড় অংশ গুলিতে প্রাণ হারায় ওই দিন।
আশুলিয়া থানার সামনে যখন মৃতদেহের স্তূপ, ভ্যানে তুলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখনো পোশাক শ্রমিক সুমন তার আশেপাশে। পরিবার থেকে বোন মনিজা ও স্ত্রী মরিয়ম তাকে বাড়ি যেতে বললেও তার মন সায় দিচ্ছিল না। বাড়ি ফেরার আশ্বাস দিয়েও সুমন ওইখানে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর গুলিবিদ্ধ হয় এবং লাশ হয়ে নিজ গ্রাম পঞ্চগড়ে বাবা-মায়ের কাছে ফেরে।
৫ আগস্ট পর্যন্ত নানা সময়ে সুমনের মতোই শাকিনুর, নাজমুল, নাঈম, তৌহিদুর, রহমত, শুভশীল, রাসেল, মিনারুল, সোহেল, রহমত, রবিউল, ইয়ামীন, আয়াতুল্লাহ, শরীফুল, সোহাগ, রাশেদুল, আসিফুরসহ অনেক শ্রমিক নিহত হন। তাদের কারো পিঠে, কারো মাথায়, কারো বুকে লাগে গুলি।
বর্তমানে নতুন বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকরাও নতুন কর্ম পরিবেশ চায়। যেখানে তাদের দাবিগুলো দমনের ভাষায় পাঠ না করে, উদ্যোক্তা ও সরকার হৃদয় দিয়ে শুনবে।
শ্রমিকরাও শিক্ষার্থীদের মতো নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রাণ খুলে তাদের দাবি দাওয়া সামনে আনার সাহস পাচ্ছে যা ইতিবাচক। ২৫ হাজার টাকার মজুরি মূল্যায়নসহ কারখানাভিত্তিক আশু দাবি ও দীর্ঘমেয়াদের দাবি তুলছে শ্রমিকরা। যার মধ্যে আছে গণঅভ্যুত্থানে হত্যা ও ২০২৩ সালে মজুরি আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচার ও ক্ষতিপূরণ এবং নিহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের সম্মান প্রদানের দাবি।
গাজীপুরের টঙ্গিতে আমট্রানেট গ্রুপের মালিকানাধীন একটি পোশাক কারখানার সামনে বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা।
মজুরি আন্দোলনসহ নানা সময়ে শ্রমিক নেতৃত্ব ও শ্রমিকদের ওপর করা দমনমূলক সব মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। পোশাক কারখানার ইতিহাসে ভয়াবহতম ঘটনা হচ্ছে তাজরীন ও রানা প্লাজায় কাঠামোগত শ্রমিক হত্যা। এর বিচার প্রক্রিয়া পুনরায় শুরুর দাবি জানিয়েছে তারা।
বর্তমান বাজারে বেঁচে থাকা কঠিন হওয়ায় রেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দাবিসহ কারখানাভিত্তিক কিছু দাবিও উঠে আসছে। সেগুলো হলো শ্রমিকদের টিফিন বিল, নাইট বিল, হাজিরা বোনাস, মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি, যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা, অভিযোগ সেল গঠন ইত্যাদি। আছে আন্দোলন করার কারণে কালো তালিকাভুক্ত না করার দাবিও।
ইতোমধ্যে মালিকরা হাজিরা বোনাস ও টিফিন বিল বাড়িয়েছে। কিন্তু অনেক কারখানায় শ্রমিকদের বকেয়া বেতন আটকে আছে। স্বৈরাচারী সরকারের শিল্প উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিশাল কারখানা বেক্সিমকোয় শ্রমিকরা কাজ হারানোর শঙ্কায় আছে। এরই মাঝে গণঅভ্যুত্থানের অর্জন নস্যাৎ করতে শ্রমিক এলাকায় ঝুট ব্যবসায়ীসহ বিগত ক্ষমতাসীনদের সহযোগীদের নানা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।
শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার ন্যায্যতাকে নতুনভাবে বিচার করা এখন নতুন বাংলাদেশে একটি জরুরি দিক। শ্রমিকের দাবির প্রতি-উত্তরে দমনের ভাষা বা কৌশল ব্যবহার করলে সেটি নেতিবাচক বার্তাই সামনে আনবে। দমন নয়, শ্রমিকদের মন জয় করার চেষ্টা করতে হবে। দমনের পথে গেলে তার পরিণতি কী হয়, তা গণঅভ্যুত্থানই প্রমাণ করেছে।
পোশাক শ্রমিকরা দীর্ঘদিন প্রকৃত ট্রেড ইউনিয়ন করা, শ্রমিক এলাকায় দাবি-দাওয়া তোলা, সংগঠন করার অধিকার ও মতপ্রকাশের অধিকার থেকে বঞ্চিত। নিম্ন মজুরির পাশাপাশি শ্রমিক এলাকায় আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বাধা শ্রমিক এলাকাগুলোয় ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের আমলে এবং তার আগেও মালিক-সরকারের যৌথ তৎপরতায় নিয়ন্ত্রণ ও দমন।
সরকারগুলো সবসময় মালিকদের পাশে থেকে শিল্প-পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে শ্রমিক আন্দোলন দমনের চেষ্টা করেছে। শ্রমিক নেতৃত্ব দূষিত করতে ভয় ও প্রলোভন জারি রেখেছিল সবসময়। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আর সবার মতো শ্রমিকদেরও অনেক প্রত্যাশা। যে প্রত্যাশায় শেকড়ে-বাকড়ে জেঁকে থাকা শ্রমিক আন্দোলন দমনের সংস্কৃতি ও আয়োজনের আছে, সেই সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা জরুরি।
কিন্তু সেটি খুব সহজ কাজ নয়। সে কারণে শ্রমিকদের যেমন সতর্ক থাকতে হবে, তেমনি সরকারকে আরও বেশি শ্রমিক-বান্ধব উদ্যোগের স্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে, পোশাক খাতে উন্নয়ন বলতে কেবল কারখানার ভবন ও ইটপাথর, গ্রিন ফ্যাক্টরির সৌন্দর্য বা মালিকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন নয়; বরং শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন, কথা বলার অধিকার এবং জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখার মধ্যে নিহিত।
গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষায় নতুন বাংলাদেশে, নতুন করে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন ও শিল্প খাত উন্নয়নে, নতুন সরকারকে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা শ্রমিকরা প্রত্যাশা করে। সৎ নেতৃত্ব ও সচেতন দক্ষ পোশাক শ্রমিক তৈরিতে কোনো আইনি বাধা, রাষ্ট্রীয় বাধা এবং মালিকের বাধা যাতে আবারও শেকড় গাড়তে না পারে সে বিষয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
শ্রমিকরা কখনোই আন্দোলন না করে কিছু পায়নি। সেই আন্দোলন যাতে শক্ত ভীতের ওপর দাঁড়িয়ে শানিত হয়, সেদিকে খোয়াল রাখতে হবে। শ্রমিকের আন্দোলনের পাশে থাকতে হবে সমাজের দেশপ্রেমিক সচেতন শিক্ষিত তরুণ, নারী, বুদ্ধিজীবী, গবেষকসহ সব অংশকে। কারণ শ্রমিকের আন্দোলন কেবল শ্রমিকের না, এরসঙ্গে জড়িয়ে আছে গণতান্ত্রিক রূপান্তর, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জনগণের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রশ্ন।
বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক হাওয়ায় যাতে কেউ আমাদের গণঅভ্যুত্থানের অর্জন ধূলিসাৎ করতে না পারে, সে বিষয়ে শ্রমিক ও মালিক সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো- শ্রমিকদের নতুন কর্ম পরিবেশ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন, মজুরি ও গণতান্ত্রিক আইনের পথ প্রশস্ত করা। রাষ্ট্র সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের ধরন, গঠন ও চর্চার মধ্যেও নতুন চিহ্ন ফেলতে হবে। সংস্কার, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা অন্তর্বর্তী সরকারসহ সব সরকারের উদ্যোগের মধ্যে প্রতিফলিত হতে হবে। সেটাই শ্রমিক ও শ্রমিক আন্দোলনেরও প্রত্যাশা।
উদ্যোক্তাদের শিল্পের স্বার্থে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন বিষয়ে সচেতন হতে হবে। শ্রমিকদের প্রকৃত ইউনিয়ন করার সুযোগ প্রশস্ত করতে হবে উদ্যোক্তাদের এবং দমনের পথ পরিহার করতে হবে। এসব প্রত্যাশার বাস্তবায়নে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এ সময়ে নতুন করে আন্দোলন সংগঠন সংগঠিত করা এবং মজবুত ঐক্য গড়া এখন সময়ের দাবি।
ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান বিরাট সাহস হয়ে প্রভাব ফেলেছে। ইতিহাস সবসময় ক্ষমতাশীলরা নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং বরাবরই শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের লড়াইয়ের ইতিহাস আরও বেশি চাপা পড়েছে, এটিও সত্য। কিন্তু আমরা চাই, ইতিহাস একপাক্ষিক না হয়ে অর্থনীতির চালিকা শক্তি শ্রমজীবীর লড়াই ও আত্মত্যাগ যুক্ত হোক। শ্রমজীবীদের স্বর জাতীয় নীতি পর্যায়েও উচ্চারিত হোক।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক।