আমেরিকা ও ইউরোপের দেশেগুলোতেও ‘শরীয়া আইন’ চালু আছে !
২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৩৪
যারা ‘শরীয়া’ আইনের দেয়াল তুলে উন্নয়ন সহযোগী মিত্র এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাঝে দেয়াল তোলার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন, তাদের অবগতির জন্য বলছি, এ অপচেষ্টা সফল হবে না। তারা আসলে জানেন না,আমেরিকা ও ইউরোপের দেশেগুলোতেও শরীয়া আইন চালু আছে। সত্যতা প্রমাণ করতে এখনই – এআই অথবা গুগলে সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন। লেখাটির উপসংহারে বিষয়টি ব্যাখ্যাসহ সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।
আমেরিকা বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী মিত্র রাষ্ট্র । কিন্তু তার সাথে সরকার ছাড়াও কোন কোন রাজনৈতিক দলের মিত্রতার আছে তা নিয়ে এখন চলছে নানান বিচার বিশ্লেষণ। যদিও একথা সবাই স্বীকার করেন, এমন একটি উন্নয়ন সহযোগী মিত্রের সাথে সুসম্পর্ক ছাড়া দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবুও এক শ্রেণির সুশীল দেয়াল তোলার অপচেষ্টা করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপক জনসমর্থন এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠন করার মতো আসন হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠার পর, যখন সে দেশের একজন কূটনৈতিক জামায়াতের সাথে বন্ধুত্বের কথা বলেছেন। ওয়াশিংটন পোস্টে ২২ জানুয়ারি ‘জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ চায় আমেরিকা’ প্রতিবেদন প্রকাশের পর ইসলাম ও জাাময়াতে ইসলামীর বিরোধীদের মাথায় ব্রজপাত হয়েছে। তারা শরীয়া আইনের দেয়াল তুলে এ সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অবশ্য ঢাকায় আমেরিকার দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শি দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক বিবৃতিতে পরিষ্কার বলেন,‘বহু রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়েছে’ এবং “বাংলাদেশের জনগণ যে সরকারই নির্বাচন করুক না কেন, আমেরিকা তার সঙ্গেই কাজ করবে; আমেরিকা কোনো একটি দলকে অন্যটির ওপর অগ্রাধিকার দেয় না।’
বিশিষ্ট কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার শুক্রবার ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ সকালে রাজধানীর প্রেসক্লাবে দেশব্যাপী গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিশুদ্ধ পানির সংকট, নাগরিক সমাজের করণীয় শীর্ষক আলোচনা সভায় এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন,যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় ভূরাজনৈতিক শক্তি। বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক আইন বলে কিছু কার্যকর নেই। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণই তার প্রমাণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের প্রত্যেকটা দলই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। ভারতীয় আধিপত্যের সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকেই ভারতবিরোধী কথা বলেন, কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তেমন কথা বলেন না। সম্প্রতি বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়েছে জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব চায়’ যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতেরও সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আগে এই প্রেক্ষাপটে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ১৭ কোটি মানুষকে নিয়ে আমরা কীভাবে টিকে থাকবো? আমি যুদ্ধ চাই না, কারও যুদ্ধে জড়াতে চাই না। সাধারণভাবে ডাল-ভাত খেয়ে শান্তিতে বাঁচতে চাই।
পৃথিবী একটি বড় গ্রাম। যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা গ্লোবাল ভিলেজ বলে অভিহিত করেন। এ গ্লোবাল ভিলেজে মাথা উচু করে বেঁচে থাকলে হলে নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখার সুকৌশলের বিকল্প নেই। এ কৌশলে যারা যত দক্ষ তারাই নিবরে উন্নতি করছে। এক্ষেত্রে জাপান ও তুরস্ক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তারা স্ব স্ব নীতি বজায় রেখে বিশ্বমোড়ল আমেরিকার সাথে সুসম্পক ঠিক রেখেই উন্নতি করছে।
আমার তুরস্কের রাজনৈতিক নেতা তালিম কালিমুল্লাহ উখলুর সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়েছিলো। তিনি তখন জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আংকারা সিটির মেয়র ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন,‘আমরা ইসলামের সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠাতার জন্য মুখের কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। এর মানে আমরা জনগণের নিরাপত্তা, সুশিক্ষা, ন্যায়বিচার ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। কাউকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ কিংবা দায়িত্ব অর্পণ করতে সততা, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে আমরা প্রাধান্য দেই। স্বজনপ্রীতি,ঘুষ,দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি চাকরি বা দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তিরা কিভাবে সুশাসন উপহার দিবে ? তাই আমরা উল্লেখিত বিষয়গুলোকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করি। জনগণের জন্য সুশাসন নিশ্চিত করাই আমাদের কাছে ইসলাম এবং ইবাদাত। মুখে শরীয়া আইনের কথা প্রচার করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। বরং মুখে বলা হলো শরীয়া আইনের কথা বাস্তবে থাকলো দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন এতে ইসলামের প্রতি শুধু অবিচার নয়, চরম অবিচার করা হয়।’ চাঁদাবাজি,দখলবাজির কথা তাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, হয় তো তাদের দেশে এ সব নেই। তাই তিনি নিজে থেকেও এ সম্পর্কে কিছু বলেননি।
এবার আসা যাক আইন প্রসঙ্গে। ‘শরিয়া’ (Sharia) একটি আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ হলো ‘সরল পথ বা প্রধান রাস্তা। ইসলামী চিন্তাবিদ আল-কুরতুবী (১২১৪-১২৭৩) বলেন: “শিরাঈ এবং শরিয়ত শব্দ দুটি সেই পথকে বোঝায় যার মাধ্যমে নাজাত লাভ করা যায়। আরবীতে, শরিয়ত মানে পানির দিকে যাওয়ার পথ। শরিয়ত আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তাও বোঝায়। শারাঈ ক্রিয়াপদটির অর্থ আইন প্রণয়ন করা বা আইন প্রতিষ্ঠা করা। ” আসলে শরীয়া হলো আইন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনগণের কল্যাণের জন্য প্রণীত আইনই শরীয়া।
মুসলিম দার্শনিক আল-রাগীব আল-ইসফাহানি (ইন্তেকাল ৫০২ হিজরী) তাঁর বিখ্যাত বই “আল-ধারিয়াহ ইলা মাকারিম আল-শরিয়াহ” (শরিয়াহর নোবেল ফজিলতসমূহের উপায় বা শরীয়ার মহান উদ্দেশ্য)। এটি নীতিশাস্ত্র ও শিক্ষার দর্শনের উপর তার লেখা একটি বিখ্যাত বই। আল-রাঘিব আত্মা, মন এবং নীতিবোধের পরিশুদ্ধিকে শরিয়া মনে করেন। তার স্পষ্ট বক্তব্য হলো, মহৎ নীতিসমূহের মূল হলো শরীয়া। তিনি ইসলামী আইনের গুণাবলী সংজ্ঞায়িত করে বলেন: “ইসলামী আইনের গুণাবলী হল: প্রজ্ঞা, মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সহনশীলতা, দানশীলতা এবং সদ্গুণ। এর উদ্দেশ্য হল জান্নাত অর্জন এবং সর্বশক্তিমান প্রভুর নৈকট্য অর্জন।”
জান্নাতে পৌঁছানোর আগে দুনিয়াতে জান্নাতের শান্তির সুবাতাস অর্জনের মাধ্যম হলো শরীয়া। রাঘিব বিষয়টি সংজ্ঞায়িত বলেছন, ইসলামী আইনের শ্রেষ্ঠত্ব – সংক্ষেপে মানব অস্তিত্বের তিনটি প্রধান লক্ষ্য অর্জনে : উন্নয়ন, ইবাদাত এবং তত্ত্বাবধান (খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন)। তিনি বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর পৃথিবীর তত্ত্বাবধায়ক ( খলিফা ) হওয়ার, তাঁর ইবাদাত করার, তাঁর ( আল্লাহ) পৃথিবীকে উন্নত করার যোগ্য নন , তিনি ইতর জন্তুরও অধম। তিনি মুসলিম দূরের কথা সাধারণ মানুষ হওয়ার যোগ্য নন, আল্লাহর সৃষ্টি ইতর প্রাণীর চেয়েও অধম।’ মহৎ আইন তৈরি এবং মানুষের কল্যাণে আইন তৈরির সময় বিশ্ব জাহানের সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহর বিধান) পাঠানো বিধান গুরুত্বে সাথে গ্রহণ করেছেন আধুনিক আইন প্রণেতারা। এক্ষত্রে তারা আল কুরআন, বাইবেল, তাওরাতসহ বিভিন্ন আসমানী কিতাবকে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করে তারা সমৃদ্ধ হয়েছেন।
পৃথিবীর আইনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মহৎ আইন তৈরিতে এ উৎসকে গুরুত্বে সাথে গ্রহণ করা হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদ তৈরির সময় সামনে রাখা হয়েছে মদিনা সনদ। আমরা জানি, শরীয়াহর উৎস পবিত্র কুরআন ও রাসূল সা. এর সুন্নাহ। শুধু বাংলাদেশের মতো মুসলিম দেশ নয়,পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই মুসলমানদের জন্য ব্যক্তি ইবাদাত, বিবাহ, সম্পত্তির বন্টনের ক্ষেত্রে শরীয়া আইন চালু আছে। আমেরিকা ও পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে আছে। কারণ তারা আমেরিকার মুসলিমরা সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে মূলত ইসলামী শরিয়াহ আইন (Islamic Inheritance Law বা ফারায়েয) অনুসরণ করেন, যা কুরআন ও সুন্নাহর ওপর ভিত্তি করে তৈরি; তবে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ আইনের সাথে সমন্বয় করে প্রয়োগ করতে হয়, যেখানে শরিয়াহ-ভিত্তিক ‘উইল (Will)’ তৈরি করা যায়, তবে আদালত সরাসরি শরিয়াহ অনুযায়ী সম্পত্তি বন্টনের আদেশ দেয় না, বরং ব্যক্তির ধর্মীয় ইচ্ছাকে সম্মান জানায়। ( গুগলে সার্চ দিয়ে এখনই সত্যতা যাচাই করতে পারেন।) ঘুষ না গ্রহণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি না করা,সততা,ন্যায়বিচার ইনসাফ ও মানবাধিকার রক্ষা করা সবই শরীয়া আইনের প্রতিফলন।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে শরীয়াহ আইন নিয়ে এত ভীতি কেন? এককথায় বললে বলতেই হয় এজন্য দায়ী আমরা মুসলমানরা। বিশেষ করে শাসকগোষ্ঠি এবং আধুনিক দুনিয়া এমন কি রাসুল সা,এর মদিনা রাষ্ট্র সম্পর্কেও কোন ধারণা নেই এমন এক শ্রেণির পুঁথিগত বিদ্যার আরবি জানা মুসলিম। তাই তারা শরীয়া- এ বিষয়টিকে আধুনিক বিশ্ববাসীর কাছে বিশাল এক দৈত্য হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাই সাধারণ ইংরেজি শিক্ষিত মুসলমানও শরীয়া আইনের কথা শুনলেই আতঙ্কে উঠে। এ আইনের মূল লক্ষ্য ন্যায় ইনসাফ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি,দখলবাজি,ঘুষ-দুর্নীতি মুক্ত সমাজ,দেশ গড়া। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক,কথাসাহিত্যিক
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥ আমেরিকা ও ইউরোপের দেশেগুলোও শরীয়া আইন চালু আছে জামায়াতে ইসলামী