সংবিধান সংশোধন কমিটির খসড়া : গণভোটের রায়কে উপেক্ষা

জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা ধ্বংসের নীলনকশা


৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৫:৫৬

॥ জামশেদ মেহদী॥
পৃথিবীব্যাপী এটি সর্বজন গ্রহণযোগ্য বিষয় যে, একটি দেশের সংবিধান সাধারণত সমস্ত রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে অর্থাৎ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। বাংলাদেশ সম্ভবত প্রধান ব্যতিক্রম যে, এদেশে কোনো সংবিধান সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়নি। ১৯৭২ সালে যে সংবিধান গৃহীত হয়েছিল এবং আজও যেটি চালু আছে (অবশ্য এর মধ্যে ১৭টি সংশোধনী হয়েছে), সেটি রচনা করার আইনগত ভিত্তি রচয়িতাদের ছিল না। কারণ সামরিক প্রশাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আইনগত কাঠামো বা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের (এলএফও) ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচিনটি হয় পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য। কারণ ইয়াহিয়া খান আইয়ুব খানের ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্র বাতিল করেছিলেন।
পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার জন্য যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা বানালেন বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র। যেটা তাদের করা উচিত ছিল, সেটি হলো— বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিব ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য একটি গণপরিষদ গঠন করতে পারতেন। এই গণপরিষদ গঠনের জন্য নির্বাচনের প্রয়োজন হতো। ঐ গণপরিষদ বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতো।
সেটি তিনি করেননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি ইসলামী দল তথা ইসলামী রাজনীতি শেখ মুজিব নিষিদ্ধ করেন। ১৯৭২ সালে সংবিধান কার্যকর হওয়ার পূর্বেও বাংলাদেশে ইসলামী তথা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দেশে সব ধরনের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৭২ সালে সংবিধান চালু হওয়ার পর ঐ সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি তথা ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধই থাকে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকেই যে সংবিধান চালু হয়, সেটিও সর্বজন গ্রহণযোগ্য ছিল না। এখনো সেটি সর্বজন গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া একাধিকবার বলেছেন যে, মুজিববাদী সংবিধান ছুড়ে ফেলতে হবে। এ সম্পর্কিত তার ভিডিও বক্তৃতা এখন ভাইরাল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
জুলাই বিপ্লবের পরপরই বিপ্লবের তরুণ নেতারা দাবি করেছেন যে, মুজিববাদী সংবিধান ছুড়ে ফেলতে হবে। নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য তারা গণপষিদ গঠনের দাবি করেছিলেন। বিএনপির বিরোধিতার জন্য ঐ দাবি গৃহীত হয়নি। বরং যে সংবিধানটি বেগম জিয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না, সেই সংবিধান বজায় রাখার পক্ষেই তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিএনপির এই অবস্থান জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান রচনা বা বর্তমান সংবিধান সংস্কার— যা কিছুই হোক না কেন, সেটি করার দাবিতে অটল রয়েছে।
এই অবস্থার পটভূমিতে বিএনপি বর্তমান সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৪ সদস্যের একটি স্পেশাল কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি গঠনের আগে তারা জামায়াতকে অনুরোধ করেছিল স্পেশাল কমিটিতে জামায়াত বা ১১ দলের প্রতিনিধি দিতে। জামায়াত সেটি অস্বীকার করে। জামায়াতের অবস্থান হলো, এটি একটি নীতিগত প্রশ্ন। তাদের কথা হলে সংবিধান সংস্কারকল্পে সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য জনগণ গণভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছেন। এখন সংবিধান সংস্কার পরিষদ না করে সংবিধান সংশোধনের কমিটি গঠন ঐ গণভোটের সাথে গাদ্দারি করা হবে। জামায়াত তাই সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে এবং ১১ দলকে দূরে রেখেছে। আর বিএনপিও জামায়াতের অবস্থানকে উপেক্ষা করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের কাজে এগিয়ে নিচ্ছে।
সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, স্পেশাল কমিটি কিছু প্রস্তাবনা প্রণয়ন করেছে। সংসদের আগামী অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনকল্পে ঐসব প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হবে। বলাইবাহুল্য, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তারা যেভাবে চাইবে সেভাবেই সংবিধান সংশোধিত হবে।
তবে সাবেক গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা, বর্তমানে তারেক সরকারের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, যেসব প্রস্তাবনা প্রণয়ন করা হয়েছে, সেগুলো চূড়ান্ত নয়। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের আগ পর্যন্ত যে সময় হাতে পাওয়া যাবে, সে সময় পর্যন্ত সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি থেকে সংশোধনীর ব্যাপারে মতামত চাওয়া হবে। উল্লেখ্য, জোনায়েদ সাকি স্পেশাল কমিটির একজন সদস্য।
সংবিধান সংশোধনীর যে খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, সেই খসড়া সোনার বাংলার এই প্রতিনিধির দেখার সুযোগ হয়েছে। দেখা গেছে যে, এই খসড়া জুলাই সনদের বিধৃত বেশকিছু ক্ষমতা খর্ব করেছে। জুলাই সনদে ২২টি নোট অব ডিসেন্ট দেওয়ার পর ঐ সনদটির যে অবস্থা ছিল, আলোচ্য খসড়ায় সেই অবস্থারও অনেক সংকোচন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা হয়েছে। তারা বলেন, জুলাই বিপ্লব তো শুধুমাত্র একটি সরকার পরিবর্তনের বিপ্লব ছিল না। আওয়ামী লীগকে হটিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর বিপ্লব ছিল না। জনগণ চেয়েছিলেন আমূল রাষ্ট্র সংস্কার। সেই সংস্কারের জনইচ্ছা প্রতিফলিত হতে যাচ্ছিল জুলাই সনদে। তবে জুলাই সনদে ২২টি প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়ায় জুলাই সনদও আর সর্বজন গ্রহণযোগ্য হয়নি। এভাবে খণ্ডিত জনমত নিয়ে বিএনপি সংবিধান সংশোধনের কাজে এগিয়ে নিচ্ছে।
স্পেশাল পার্লামেন্টারি কমিটি যে খসড়া করেছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্নরূপ—
কমিটি উচ্চকক্ষ গঠন সম্পর্কে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটি হলো— জাতীয় সংসদে যে দলের যে কয়জন সদস্য রয়েছেন, সেসব সদস্যের সংখ্যা অনুপাতে উচ্চকক্ষে সদস্য থাকবেন। উচ্চকক্ষ গঠিত হবে ১০০ সদস্য নিয়ে। উল্লেখ্য, জামায়াত এবং ১১ দল দাবি করে আসছে যে, গত নির্বাচনে যে দল যত ভোট পেয়েছে, সেই ভোটের সংখ্যার অনুপাতে উচ্চকক্ষে সদস্য নির্বাচিত হবেন। এটিকে বলা হয়েছে পিআর সিস্টেম বা প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (সংখ্যানুপাতিক) সিস্টেম। জামায়াত ও ১১ দলের মতামতের কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট মোতাবেক সংসদের সদস্য সংখ্যার অনুপাতে উচ্চকক্ষে সদস্য নির্বাচিত হবেন।
আলোচ্য খসড়ায় দেশে একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অথচ বর্তমান সংবিধান অথবা জুলাই সনদ কোথাও ভাইস প্রেসিডেন্টের কোনো প্রভিশন নাই। এমনকি বিএনপি যে ২২টি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, সেখানেও ভাইস প্রেসিডেন্টের কোনো উল্লেখ নাই। ভাইস প্রেসিডেন্ট উচ্চকক্ষের সভায় সভাপতিত্ব করবেন।
এই ভাষ্য লেখার সময় পর্যন্ত স্পেশাল কমিটি ৯টি বৈঠকে মিলিত হয়। আলোচ্য প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে, গণভোটে যেসব প্রস্তাব পাস হয়েছে, সেগুলো হুবহু কার্যকর করা হবে না। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গণভোটে আপার হাউস গঠনে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর সিস্টেমের প্রতি জনগণ ভোট দিয়েছেন। কিন্তু সেটিকে বাদ দিয়ে সংসদ সদস্যের সংখ্যাভিত্তিক আপার হাউস গঠনের প্রস্তাব নিয়ে বিএনপি সুস্পষ্টভাবে গণভোটের এই রায়কে উপেক্ষা করতে যাচ্ছে।
জুলাই সনদে বলা হয়েছে যে, নিম্নকক্ষ কোনো বিল পাস করলে উচ্চকক্ষ ২ মাস ধরে সেটি পর্যালোচনা করতে পারবে। সংবিধান সংশোধন, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে আপার হাউসের বা উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকবে। কিন্তু আলোচ্য খসড়ায় উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন এখন আর প্রয়োজন হবে না। এছাড়া উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষের অনুমোদিত বিল ২ মাস পর্যালোচনা করবে বলে সনদে যা বলা হয়েছে, সেটির সময়সীমা কমিয়ে এক মাস করা হয়েছে। এছাড়া সংবিধান সংশোধন বিল, অর্থ বিল, অনাস্থা ভোট এবং যুদ্ধে জড়িত হওয়া ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয় উচ্চকক্ষে প্রেরণ করা হবে না।
উচ্চকক্ষের নাম হবে সিনেট। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যে সিনেট আগামীতে গঠিত হতে যাচ্ছে, সেই সিনেট দেশের আইন প্রণয়নের কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হতে যাচ্ছে।
দেশের প্রেসিডেন্ট যেমন ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন, তেমনি ভাইস প্রেসিডেন্টও ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। যদি প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হয় অথবা কোনো কারণে প্রেসিডেন্ট তার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, তাহলে দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট— যিনি উচ্চকক্ষের প্রেসিডেন্ট হবেন, তিনি দেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— তত্ত্বাবধায়ক সরকার। শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছিলেন। বিপ্লবের পর হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট সেটি পুনর্বহাল করেছেন। তবে কোন ফর্মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে, সেটি নির্ধারণ করবে দেশের রাজনীতিবিদরা।
স্পেশাল কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা স্পষ্ট করেনি। এই বিষয়টি এই মুহূর্তে জনসমক্ষে প্রকাশ থেকে বিএনপি বিরত থাকছে। তবে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী বলেছেন যে, বিএনপি চায়, উচ্চকক্ষের প্রেসিডেন্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন।
বিষয়টি কাজ করবে এভাবে— বর্তমানে নিম্নকক্ষ সাড়ে ৮ মাস পার করেছে। যখন উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, ততদিনে নিম্নকক্ষ ১ বছর পার করবে। ৫ বছর পর যখন নিম্নকক্ষ মেয়াদ শেষে ভেঙে যাবে, তখনো উচ্চকক্ষ অস্তিত্বশীল থাকবে। ভাইস প্রেসিডেন্টও উচ্চকক্ষের সভাপতি হিসেবে থাকবেন। তখন ভাইস প্রেসিডেন্টই কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হিসেবে কাজ করবেন।
ড. দিলারা চৌধুরীর মতে যেহেতু সংসদ সদস্যদের সংখ্যা অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠিত হচ্ছে, তাই ভাইস প্রেসিডেন্টও বিএনপিরই হবেন। সুতরাং কেয়ারটেকার সরকারের যিনি প্রধান হবেন, তিনিও হবেন বিএনপির লোক। তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে, কিন্তু ‘নিরপেক্ষ’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে না। অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী প্রশ্ন করেন তাহলে আর ১৪শত মানুষ রক্ত দিলো কেন? তারা তো একটি পরিবর্তন চেয়েছিলো। এই কি সেই পরিবর্তন?
সুজনের সভাপতি এবং ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, এনসিপি নেতা সারওয়ার তুষার এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা এডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম বলেছেন, যে ধরনের উচ্চকক্ষ গঠিত হতে যাচ্ছে, সেটি হবে নিম্নকক্ষের কার্বন কপি। এতে দেশের কোনো লাভ হবে না। আর যে ধরনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উচ্চকক্ষের প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন, সে ধরনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হবেন বিএনপির পুতুল। এগুলো করে শুধুমাত্র রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হবে। তারা আশঙ্কা করছেন যে, বিএনপির এই ভূমিকা জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে ব্যর্থ করতে চলেছে।
E-Mail : jamshedmehdi15@gmail.com