১৯৬১-১৯৭১ : এক দশকের ভারতীয় সুক্ষ পরিকল্পনা ...

শেখ মুজিব ও বাংলাদেশ


৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৬:০৮

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
বাংলাদেশ ও তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমান খুবই চতুর ও আলোচিত রাজনীতিক ছিলেন। মুসলিম লীগ দিয়ে রাজনীতি শুরু হলেও আদর্শিক রাজনীতি থেকে তিনি দ্রুত ডেভিয়েট তথা বিচ্যুত হয়েছিলেন। তাই রাজনীতিতে তার বিশ্বস্ততা ও সততা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি আওয়ামী লীগ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, বাম, কমিউনিস্ট ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা হলেও ডান ও ইসলামপন্থি জনগণের কাছে ছিলেন একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। ১৯৭২-৭৫ শাসনামলে তার অগ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ মেলে; বিশেষ করে মৃত্যুর পর এ জনপদের সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াটা তার প্রতি চরম নেতিবাচক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হন। তার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের একসময়ের সভাপতি আবদুল মালেক উকিল বলেছিলেন, ‘ফেরাউনের পতন হয়েছে, দেশ আজ স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত হয়েছে।’ তার অস্বাভাবিক হত্যাকাণ্ডের পর দেশের সাধারণ মানুষকে উৎফুল্ল হতেই দেখা গেছে। অবশ্য শেখ মুজিবকে জানতে-বুঝতে বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের কিছুদিন সময় লাগে, অবশ্য ততদিনে মুসলমানদের ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে যায়। তার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার, প্রশাসন ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলগুলো ইতিবাচক ছিল না। মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজাম ইসলামসহ দেশপ্রেমিক ও আদর্শিক রাজনৈতিক দলগুলো একপর্যায়ে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ থেকে দূরে সরে যায়। বিশেষ করে ১৯৭১ সালে গিয়ে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নীতি ও সিদ্ধান্তের বিপরীত দিকে অবস্থান নেয় মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামসহ ডান ও ইসলামপন্থি দলগুলো। অবশ্য আদর্শিক রাজনৈতিক দলগুলো শেখ মুজিবের রাষ্ট্রবিরোধী গোপন চিন্তা, ইসলামবিরোধি চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ড বুঝতে দেরি হলেও পাকিস্তান সরকার ১৯৬০-এর দশকেই বুঝতে পারে। তাই পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালেই তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেছিল। যেই মামলাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তান সরকারের নথি অনুযায়ী, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সরকারি বা আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য’। ইংরেজিতে এর আনুষ্ঠানিক নাম ছিল State of Pakistan vs Sheikh Mujibur Rahman and others। ১৯৬৮ সালের প্রথম ভাগে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ বাঙালি সামরিক ও সিএসপি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করেছিল।
আওয়ামী লীগ মামলাটিকে তৎকালে মিথ্যা বলে প্রচার করেছিল এবং বাংলাদেশের সাধারণ জনগণও বিশ্বাসও করেছিল। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগই এটাকে সত্য মামলা বলে প্রচার করে। এ মামলার অন্যতম আসামি ও আওয়ামী লীগ নেতা জাতীয় সংসদের বিতর্কিত নির্বাচনে পাস করা এমপি ডেপুুটি স্পিকার ক্যাপ্টেন (অব.) এ শওকত আলী ২০১১ সালে একটি বই লিখে বলেছেন যে, আগরতলা মামলাটি ছিল সত্য মামলা। মামলাটির প্রকৃত ইতিহাস হচ্ছে ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে মামলাটি করে। অভিযোগ ছিল, ভারত সরকারের সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র। শওকত আলী ২০১১ সালে তার লিখিত বই ‘সত্য মামলা আগরতলা’ প্রকাশ করেন। তিনি তার বইয়ে লিখেছেন যে, আসামিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার পরিকল্পনা করেছিলেন। পাকিস্তান সরকার তথা পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সরকার এটিকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দমন করতে চেয়েছিল। কিন্তু তীব্র গণআন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে পাকিস্তান সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মামলাটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়।
তৎকালের প্রত্যক্ষদর্শী রাজনীতিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা বলেছেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মিছিল-মিটিং অনেক অচেনা যুবককে দেখা যেত। পরবর্তীতে জানা গেছে, এরা ছিল প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে পাঠানো হাজার হাজার যুবক। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ঐ নির্বাচনটিও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ আসনেই আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামীর প্রার্থীর এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে বসতে দেয়নি। তৎকালে ছাত্রলীগ কর্মী এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে জানা যায়, ভোট শুরুর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মুসলিম লীগসহ অন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটকেন্দ্রে স্থাপিত নির্বাচনী ক্যাম্পগুলো ভাঙচুর করে টেবিল চেয়ার পুকুরে ফেলে দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের কর্মীরা অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মেরেছে। এভাবেই পুরো বাংলায় তারা ভোটকেন্দ্র জবরদখল করেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে (পাকিস্তানের পার্লামেন্ট) কথিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দখল করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট হলে ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।
শেখ মুজিবের ভারত কানেকশন ও ষড়যন্ত্র মামলার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন দাবি ও সত্যতা আবারো প্রমাণ হলো ভারতীয় এক ইতিহাসবিদের জবানে। ভারতীয় ইতিহাসবিদ ও গবেষক ইকবাল চান্দ মালহোত্রা সংবাদমাধ্যমে অতি সম্প্রতি দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবুর রহমানের ভারত কানেকশন নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন।
সম্প্রতি Vaad (সংবাদ # ২৯১) এবং The Awaara Musaafir Show (TAMS 304) পডকাস্টে ইকবাল চান্দ মালহোত্রা ও তার সহ-লেখক সুব্রত চট্টোপাধ্যায়ের সাথে একসাথে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে তাদের লেখা বই ‘Bangladesh: Humiliation, Carnage, Liberation, Chaos’ এর আলোকে বেশ কিছু দাবি করেন।
পডকাস্টে মালহোত্রা দাবি করেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন ১৯৭১ সালে হঠাৎ করে শুরু হয়নি, এটি মূলত ১৯৬১ সাল থেকেই ভারতের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় গড়ে উঠছিল। তিনি দাবি করেন, ১৯৬১ সালে ভারতের তৎকালীন ‘ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো’ (IB) শেখ মুজিবুর রহমানকে যুক্ত করে।
এই দাবির সাথে আইবি কর্মকর্তা ফণীন্দ্র নাথ ব্যানার্জির (যিনি ছদ্মনাম পি. এন. ওঝা ব্যবহার করতেন) ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবেই শেখ মুজিব নির্বাচনী রাজনীতিতে ভারতীয় সহযোগিতা গ্রহণ করেছিলেন। দাবি করা হয়েছে যে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বিজয়ের পেছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা ছিল।
তিনি যা বলেছেন, তার রেফারেন্স দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের কয়েকটি মিডিয়া রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। তবে মি. মালহোত্রার দাবি নিয়ে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ও টিভিগুলো কোনো রিপোট প্রকাশ না করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
তার দাবির রেফারেন্সে কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস নামের একটি সংবাদমাধ্যম ‘Indian historian claims Sheikh Mujibur Rahman was recruited by IB in 1961’, অর্থাৎ ভারতীয় ইতিহাসবিদের দাবি ১৯৬১ সালেই শেখ মুজিবুর রহমান ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো কর্তৃক রিক্রুট হয়েছিলেন’ এ শিরোনামে ইংরেজি ভাষায় একটি খবর প্রকাশ করে। নয়াদিল্লি থেকে ১ নভেম্বর প্রকাশিত এ রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, “ভারতীয় লেখক ও ইতিহাস গবেষক ইকবাল চান্দ মালহোত্রা দাবি করেছেন যে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬১ সালেই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) কর্তৃক রিক্রুট হয়েছিল এবং তিনি দেশটি তথা ভারতের একটি ‘অ্যাসেট’ বা চর হিসেবে কাজ করেছেন।”
এদিকে ‘সেন্ট্রিস্ট ন্যাশন টিভি’ তার এক্স একাউন্টে প্রকাশিত এ বিষয়ের পোস্টে বলেছেন, মালহোত্রা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ভারতীয় গোয়েন্দাদের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের অভিযোগ উল্লেখ করেছেন। ঐ মামলায় শেখ মুজিব ও আরো অনেককেই পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান পৃথক করার ভারতের সাথে যড়যন্ত্র করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এ দাবি যদি প্রমাণ হয়, তাহলে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভারতে গোপন হস্তক্ষেপের অভিযোগ একটি মারাত্মক প্রশ্ন হিসেবে উত্থাপিত হবে এবং ভারতের এ ধরনের ভূমিকার কারণেই ১৯৭১ সালে দেশটি (পাকিস্তান) ভেঙে যায়।”
পাকিস্তানকে দুই ভাগে বিভক্ত করার প্রসঙ্গে মালহোত্রা আরও বলেন, ভারতই পাকিস্তানকেই দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়। তার দাবি, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল প্রায় এক দশকের সূক্ষ্ম পরিকল্পনার ফল, যার বাস্তবায়ন ঘটে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে। আর সেই পরিকল্পনায় শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তিনি বলেছেন, মুজিবের সাথে ভারতের ইন্টেলিজেন্সের সম্পর্ক বিষয়ে পাকিস্তান নাকি জানতেন। এমনকি আগরতলায় ভারতীয় গোয়েন্দাদের সঙ্গে বৈঠক করে মুজিব বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির জন্য সহায়তাও চেয়েছিলেন। পডকাস্টের উপস্থাপক শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেন, Greatest spy of all time!
গত জুলাইয়ে ইন্দিরা গান্ধীর নাতনি প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভারতীয় পার্লামেন্ট লোকসভায় বলেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধী সফল কূটনীতি ও যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানকে বিভক্ত করে বাংলাদেশের জন্মে ভূমিকা রেখেছিলেন, কিন্তু কখনো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব দাবি করেননি। ঢাকা থেকে সম্প্রচারিত ‘সেন্ট্রিস্ট ন্যাশন টিভি (ইউটিভি চ্যানেল) এ সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচারও করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্য হচ্ছে, গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে মি. মালহোত্রার এ ধরনের অভিযোগ পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের গোপন তৎপরতাকে কেন্দ্র করে ভারত পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক বিতর্কের নয়া মাত্রা যোগ করছে।
শুধু মালহোত্রার বক্তব্যও নয়, ইতোপূর্বে ঢাকার পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও বিভিন্ন বইয়ে ভারতের সাথে শেখ মুজিবের গোপন কানেকশন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক মহিউদ্দিন আহমদও লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায়ও ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভারতের সহযোগিতা কামনা করেছেন। শেখ মুজিব যে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ করতে ভারত সরকার ও তার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে সার্বিক সহযোগিতা কামনা করে চিঠি দিয়েছিলেন, তার একটি বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোর ২০১৯ সালে ঈদ ম্যাগাজিনে। লেখক ও কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ ‘সিরাজুল আলম খান এবং স্বাধীনতার নিউক্লিয়াস’ নামক নিবন্ধের চতুর্থ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “শাহ মোয়াজ্জেমের কথায় বোঝা যায়, পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা নিয়ে শেখ মুজিবের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা ছিল। এজন্য তিনি ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালান। এর একটি বিস্ময়কর বিবরণ পাওয়া যায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের তৎকালীন উপহাইকমিশনের পলিটিক্যাল অফিসার শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জির কাছ থেকে। ব্যানার্জি পুরান ঢাকায় চক্রবর্তী ভিলায় থাকতেন। পাশের বাড়িতেই ছিল ইত্তেফাক অফিস। ১৯৬২ সালের ২৪ মার্চ মাঝরাতে ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া একটি ছেলেকে পাঠিয়ে ব্যানার্জিকে ইত্তেফাক অফিসে ডেকে আনেন। মানিক মিয়ার সঙ্গে ছিলেন শেখ মুজিব। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তারা কথা বলেন। ব্যানার্জি দেখলেন, একপর্যায়ে শেখ মুজিব ও মানিক মিয়ার কথাবার্তার ধরন বদলে গেল। তারা কিছু একটা বলতে বা দেখাতে চাইছেন। ব্যানার্জি জানতে চান তারা উঁচুপর্যায়ের কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো বার্তা পৌঁছাতে চাচ্ছেন কিনা। মুজিব মুখ খুললেন। বললেন, এই বৈঠক ডাকার উদ্দেশ্য হলো, তারা ব্যানার্জির মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা গোপনীয় চিঠি পাঠাতে চান। মুজিব চিঠিটা ব্যানার্জির হাতে দিলেন। তার মধ্যে তাড়াহুড়ো ছিল। চিঠিটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে ব্যক্তিগতভাবে সম্বোধন করে লেখা। ভূমিকার পর সরাসরি একটা কর্মপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। মুজিব বললেন, তিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করবেন। মানিক মিয়া ইত্তেফাক-এ লেখনীর মাধ্যমে প্রচারকাজ চালাবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯৬৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চের মধ্যে মুজিব লন্ডনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে প্রবাসী সরকার গঠন করবেন। চিঠির শেষ প্যারাগ্রাফে নৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন ও সাজ-সরঞ্জাম চেয়ে নেহরুকে অনুরোধ জানানো হয় এবং এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মুজিব গোপনে নেহরুর সঙ্গে দেখা করতে চান।
চিঠি পাঠানো হলো। ভারত তখন চীনের সঙ্গে যুদ্ধে বিপর্যস্ত। দিল্লি থেকে খবর এলো, মুজিবকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। মুজিব ভাবলেন, ঢাকায় ভারতীয় উপহাইকমিশনের আমলাদের কারণেই দেরি হচ্ছে। ধৈর্য হারিয়ে তিনি কৌশল পাল্টালেন। গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলায় গেলেন। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। আগরতলায় মুজিবকে রেখে শচীন সিং দিল্লি যান এবং নেহরুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন। চীনের সঙ্গে যুদ্ধের পর নেহরু আরেকটি ফ্রন্ট খুলতে চাননি। শচীন সিং আগরতলা ফিরে এসে মুজিবকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাকে সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং তা ভারতের ঢাকা উপহাইকমিশনকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। নেহরুর পরামর্শ ছিল, এরপর থেকে মুজিব যেন ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমেই যোগাযোগ করেন, আগরতলার মাধ্যমে নয়।
শচীন সিংয়ের ভাষ্যে এবং অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, শেখ মুজিব আগরতলা গিয়েছিলেন ১৯৬৩ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে। তিনি সেখানে ছিলেন ১৫ দিন। তার আগরতলা মিশন সম্বন্ধে দলের সহকর্মীরা এবং সরকারের গোয়েন্দারা ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
১৯৯১ সালে মফিদুল হক দিল্লিতে শচীন সিংয়ের সঙ্গে দেখা করলে তিনি ঘটনাটি নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন। সেই ভাষ্য ফয়েজ আহমদ উল্লেখ করেছেন তার আগরতলা মামলা, শেখ মুজিব ও বাংলার বিদ্রোহ বইয়ে।”
এ আগরতলায় যাওয়া নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগেই পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবসহ বেশ কয়েকজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা করে, যেটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামেই অধিক পরিচিত।
ভারতীয় ইতিহাসবিদ ইকবাল চান্দ মালহোত্রা, আওয়ামী লীগ নেতা ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কলামিষ্ট মহিউদ্দিন আহমদ ও লেখক মফিদুল হকসহ অনেক লেখকের মাধ্যমে এটা প্রমাণ হয়েছে যে, শেখ মুজিব ভারতীয় কূটনীতিক, গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও আগরতলায় গিয়ে ভারতীয় রাজনীতিকদের সাথে যোগাযোগ করে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভারতের সহযোগিতা কামনা করেছেন। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ যে, ভারতের সহযোগিতায় রাজনীতি করে তার অনেক প্রমাণ রয়েছে ১৯৭১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। তার সর্বশেষ প্রমাণ হচ্ছে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ভারতের দিল্লিতে আশ্রয় প্রদান।
এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, ১৯৪৭ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পুনরায় বিশ্লেষণ জরুরি। ভারতীয় বয়ানের ওপর বাংলাদেশের ইতিহাস গড়ে উঠতে পারে না। ভারতীয় বয়ানে যেভাবে শেখ মুজিবকে মহানায়ক ও আওয়ামী লীগকে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে বাস্তবে তার বিপরিত। শেখ মুজিব ১৯৬০-এর দশকে গলা ফাটাইয়া বলতো বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য, ভোটের অধিকারের জন্যই রাজনীতি করি, সেই মুজিবই ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করে সাধারণ জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। শেখ মুজিব ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বলেছিল, আওয়ামী লীগ পাস করলে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করা হবে না। অথচ শেখ মুজিব ১৯৭২ সালে দেশে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামসহ সব ইসলামী দল নিষিদ্ধ করে দেয়। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে প্রধান মূলনীতি হিসেবে বাংলাদেশের সংযোজন করে। এককথায় দেশে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করে ইসলামী আদর্শের প্রচার ও বিকাশধার বন্ধ করে দেয়। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ এসবই করেছে ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। সর্বোপরি হিন্দুত্ববাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা দুধ কলা দিয়ে পুষে গড়ে তুলে। বাংলার মুসলিমরা আস্তে আস্তে যেমন তা বুঝতে পারছে, তেমনিভাবে তা বিভিন্ন গবেষণা ও সমীক্ষার মাধ্যমে তা প্রতিনিয়ত প্রমাণ হচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণ ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার ও গোষ্ঠীর প্রকৃত রূপ বুঝতে পারছে। অতএব, বাংলাদেশে ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের আধিপত্যবাদ চলতে পারে না এবং চলবে না।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com