মৃত্যু, সাকারাতুল মাউত এবং মুমিনের প্রস্তুতি


৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৬:০৩

॥ ডা. মুহাম্মদ তফাজ্জল হোসেন ॥
মৃত্যু মানুষের জীবনের এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। দুনিয়ার জীবনে মানুষ ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, শাসক-শাসিত, শিক্ষিত-অশিক্ষিত যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, প্রত্যেক মানুষকে একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তি এবং আখিরাতের জীবনের দিকে যাত্রা শুরুর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।
১. মৃত্যু কী?
ইসলামি দৃষ্টিতে মৃত্যু হলো আল্লাহর নির্ধারিত সময়ে জীবিত মানুষের পার্থিব জীবনের অবসান এবং দেহ থেকে রূহের বিচ্ছিন্নতা। মৃত্যুর প্রকৃত স্বরূপ ও রূহের পূর্ণ রহস্য আল্লাহই ভালো জানেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ প্রাণসমূহকে তাদের মৃত্যুর সময় কবজ করেন।’ — সূরা আয-যুমার : ৪২-এর অংশ।
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, জীবন ও মৃত্যুর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে। মানুষের চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জীবন রক্ষার চেষ্টা করতে পারে; কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত মৃত্যুর মুহূর্তকে কেউ চিরতরে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না।
২. সকল মানুষকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে
আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ — সূরা আলে ইমরান : ১৮৫।
* এখানে ‘প্রত্যেক প্রাণ’ বোঝাতে ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
* কোনো মানুষ তার সম্পদ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা বা জ্ঞানের কারণে মৃত্যুর বাইরে থাকতে পারবে না।
* নবী-রাসূল, রাজা-বাদশাহ, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, ধনী ও দরিদ্র সবাইকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে।
এ আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ জানিয়েছেন, কিয়ামতের দিনই মানুষের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করি এবং তোমরা আমার কাছেই প্রত্যাবর্তিত হবে।’ — সূরা আল-আম্বিয়া : ৩৫।
এ আয়াতে মৃত্যুর অনিবার্যতার পাশাপাশি জীবনের উদ্দেশ্যও তুলে ধরা হয়েছে। সুখ-দুঃখ, সুস্থতা-অসুস্থতা, ধন-সম্পদ ও অভাব সবই মানুষের জন্য পরীক্ষার উপকরণ হতে পারে। মৃত্যুর পর সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।
‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; তারপর তোমরা আমার কাছেই প্রত্যাবর্তিত হবে।’ —সূরা আল-আনকাবুত : ৫৭।
এখানে মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনের কথা সরাসরি বলা হয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যু সবকিছুর চূড়ান্ত অবসান নয়; ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এর পরে পুনরুত্থান ও বিচার রয়েছে।
৩. রাসূলুল্লাহ সা. কি মৃত্যুবরণ করেছেন?
হ্যাঁ, আল্লাহর সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সা. দুনিয়ার জীবন শেষ করে মৃত্যুবরণ করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মৃত্যুবরণ করবেন এবং তারাও মৃত্যুবরণ করবে।’
—সূরা আয-যুমার : ৩০।
এ আয়াত রাসূলুল্লাহ সা. এবং তাঁর সমসাময়িক মানুষের মৃত্যুর অনিবার্যতা স্পষ্ট করেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত, ‘মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র; তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল গত হয়েছেন। সুতরাং তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে?’ —সূরা আলে ইমরান : ১৪৪-এর অংশ।
এ আয়াত ওহুদের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মুসলিমদের শিক্ষা দিয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ সা.-এর মৃত্যুও আল্লাহর নির্ধারিত মানবিক বাস্তবতার বাইরে নয়। ইসলামের সত্য তাঁর দুনিয়ার জীবনের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না।
৪. হাদিসে মৃত্যুর অনিবার্যতার শিক্ষা
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমরা অধিক পরিমাণে স্মরণ করো স্বাদ-আনন্দ বিনষ্টকারীকে’—অর্থাৎ মৃত্যুকে। জামে আত-তিরমিজি।
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে সতর্ক করে এবং নিজের কাজকর্ম পর্যালোচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
৫. মৃত্যু কি শুধু বৃদ্ধ বয়সে আসে?
মৃত্যু শুধু বৃদ্ধ বয়সের জন্য নির্ধারিত নয়। কেউ শৈশবে, কেউ যৌবনে, কেউ মধ্যবয়সে, কেউ বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মানুষের আয়ু কতদিন হবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন কোনো প্রাণের নির্ধারিত সময় এসে যায়, তখন আল্লাহ তাকে কখনো অবকাশ দেন না।’ সূরা আল-মুনাফিকুন : ১১-এর অংশ।
অতএব “বৃদ্ধ হলে তওবা করব”, “অবসর জীবনে ইবাদত শুরু করব” কিংবা “আরও অনেক সময় আছে”— এ ধরনের ধারণার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। মানুষকে জীবিত অবস্থাতেই নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
৬. মৃত্যুর পর কি সব শেষ হয়ে যায়?
ইসলামী আকিদা অনুসারে, মৃত্যু দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তি হলেও মানুষের অস্তিত্বের চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়। মৃত্যুর পরে বারযাখের জীবন, কিয়ামতে পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ এবং জান্নাত বা জাহান্নামের পরিণতি রয়েছে।
আল্লাহ বলেন, “এরপর নিশ্চয়ই তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। তারপর কিয়ামতের দিন তোমাদের পুনরুত্থিত করা হবে।” —সূরা আল-মুমিনুন : ১৫-১৬।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে মৃত্যুর সময়ের কষ্ট, সাকারাতুল মাউত ও মুমিনের প্রস্তুতি
মৃত্যু প্রত্যেক মানুষের জীবনের অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, সুস্থ-অসুস্থ— কেউ মৃত্যুকে এড়াতে পারে না। পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাদিসে মৃত্যুর সময়ের যন্ত্রণা, রূহ কবজের অবস্থা, পাপাচারী ও অবিশ্বাসীদের ভয়াবহ পরিণতি এবং মুমিনের জন্য সুসংবাদের কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
ইসলামে মৃত্যুকষ্টের আলোচনা শুধু ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, তওবা, নেক আমল, মানুষের হক আদায় এবং আখিরাতের প্রস্তুতি সৃষ্টি করার জন্য।
১. মৃত্যুর যন্ত্রণার নাম সাকারাতুল মাউত
আরবি শব্দ সাকারাতুল মাউত বলতে মৃত্যুর সময়ের তীব্র যন্ত্রণা, আচ্ছন্নতা, সংকট ও কষ্টের অবস্থাকে বোঝায়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যসহ উপস্থিত হবে। এটাই তো তা, যা থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াতে।’ সূরা কাফ : ১৯।
এই আয়াত থেকে শিক্ষা
মৃত্যুর মুহূর্ত একসময় প্রত্যেক মানুষের সামনে উপস্থিত হবে। মানুষ দুনিয়ার নানা বিপদ থেকে পালাতে পারে, কিন্তু মৃত্যু থেকে পালাতে পারে না। মৃত্যুর সময় দুনিয়ার ক্ষমতা, সম্পদ, পদমর্যাদা ও সামাজিক পরিচয় মানুষকে মৃত্যুর অনিবার্যতা থেকে রক্ষা করতে পারে না। তাই মৃত্যুর কথা স্মরণ করে জীবদ্দশায় আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং সৎকর্মে আত্মনিয়োগ করা প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য।
২. রাসূলুল্লাহ সা. নিজেও মৃত্যুর যন্ত্রণা অনুভব করেছেন
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা.-এর মৃত্যুর সময় তাঁর কাছে পানির একটি পাত্র ছিল। তিনি পানিতে হাত ডুবিয়ে মুখমণ্ডল মুছতেন এবং বলতেন, “আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। নিশ্চয়ই মৃত্যুর যন্ত্রণা রয়েছে।” — সহিহ বুখারি।
এই হাদিস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ। রাসূলুল্লাহ সা. আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় বান্দা ও রাসূল হওয়া সত্ত্বেও সামান্য হলেও মৃত্যুর কষ্ট অনুভব করেছেন।
মূল শিক্ষা : মৃত্যুর কষ্ট অনুভব করলেই কোনো ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়— এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। নবী-রাসূলগণও মৃত্যুর কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন। মৃত্যুর কষ্ট এবং আখিরাতে মানুষের চূড়ান্ত মর্যাদা এক বিষয় নয়।
৩. মৃত্যুর সময় মানুষের সামনে যে ভয়াবহ দৃশ্য ও সংকট উপস্থিত হতে পারে
কুরআনে মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের আগমন, রূহ কবজ এবং পাপাচারীদের প্রতি কঠোর আচরণের কথা বর্ণিত হয়েছে।
ক. জালিমদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের কঠোর আচরণ
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর যদি তুমি দেখতে, যখন জালিমরা মৃত্যুযন্ত্রণায় নিমজ্জিত থাকে এবং ফেরেশতারা তাদের হাত প্রসারিত করে বলে, ‘তোমরা নিজেদের প্রাণ বের করো।’” —সূরা আল-আনআম : ৯৩।
এই আয়াতে জালিমদের মৃত্যুকালীন ভয়াবহ অবস্থার কথা বলা হয়েছে। আয়াতের পরবর্তী অংশে তাদের ওপর অপমানজনক শাস্তির কথাও রয়েছে।
আসল কথা হলো : অন্যায়, জুলুম, মানুষের অধিকার হরণ এবং আল্লাহর অবাধ্যতাকে তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট মৃত ব্যক্তিকে তার বাহ্যিক মৃত্যুযন্ত্রণা দেখে জালিম বা আল্লাহর শাস্তিপ্রাপ্ত বলে ঘোষণা করা যাবে না।
খ. রূহ কবজের সময় কঠোরতার বর্ণনা
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘শপথ তাদের, যারা কঠোরভাবে টেনে বের করে; আর তাদের, যারা কোমলভাবে খুলে নিয়ে যায়।’ —সূরা আন-নাযিয়াত, : ১-২।
তাফসিরকারদের একটি প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা হলো, প্রথম আয়াতে কঠোরভাবে রূহ কবজকারী ফেরেশতা এবং দ্বিতীয় আয়াতে কোমলভাবে রূহ গ্রহণকারী ফেরেশতাদের বোঝানো হয়েছে। তবে আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় তাফসিরে অন্যান্য মতও রয়েছে।
৪. মৃত্যুর সময় মুমিন ও অবাধ্য মানুষের রূহ কবজের পার্থক্য
বারা ইবনু আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. মুমিন ও পাপাচারী ব্যক্তির মৃত্যুর সময় রূহ কবজের বিভিন্ন অবস্থা বর্ণনা করেছেন।
এই হাদিসে ফেরেশতাদের আগমন, রূহের বেরিয়ে আসা, আসমানের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তী অবস্থার কথা রয়েছে।
‘যখন মুমিন বান্দা দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার এবং আখিরাতের দিকে অগ্রসর হওয়ার অবস্থায় থাকে।’ মুসনাদ আহমাদ; সুনানে আবু দাউদ। হাদিসটির দীর্ঘ বর্ণনা বারযাখ ও রূহ কবজের আলোচনা হিসেবে পরিচিত।
ক. নেক্কার মুমিনের মৃত্যুর সময়
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মুমিনের কাছে উজ্জ্বল চেহারার ফেরেশতারা আসেন। তাঁরা জান্নাতের কাফন ও সুগন্ধি নিয়ে আসেন। এরপর মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে পবিত্র রূহ বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বর্ণনায় মুমিনের রূহকে সহজে বেরিয়ে আসা পানির ফোঁটার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এরপর রূহকে সম্মানসহ ঊর্ধ্বজগতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর অনুগত বান্দার জন্য মৃত্যুর সময় রহমত ও সুসংবাদের ব্যবস্থা থাকতে পারে।
খ. পাপাচারী ও অবিশ্বাসীর মৃত্যুর সময়
একই হাদিসে পাপাচারী বা কাফির ব্যক্তির জন্য কঠোর অবস্থার বর্ণনা রয়েছে। ফেরেশতাদের কঠোর আগমন, রূহ বের করার নির্দেশ এবং রূহের কষ্টকরভাবে বের হওয়ার উপমা দেওয়া হয়েছে।
হাদিসে এ অবস্থাকে ভেজা পশমের ভেতর থেকে কাঁটাযুক্ত লোহার শলাকা টেনে বের করার মতো কষ্টকর বলে তুলনা করা হয়েছে।
৫. মৃত্যুর সময় যখন রূহ কণ্ঠনালিতে পৌঁছে যায়
আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুর শেষ মুহূর্তের একটি গভীর দৃশ্য তুলে ধরেছেন, “অতঃপর যখন প্রাণ কণ্ঠনালিতে পৌঁছে যায়, আর তোমরা তখন তাকিয়ে থাকো; আর আমরা তার নিকটবর্তী থাকি, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” —সূরা আল ওয়াকিয়া : ৮৫।
পরবর্তী আয়াতগুলোয় আল্লাহ চ্যালেঞ্জ করেছেন, যদি মানুষ সত্যিই নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে, তাহলে মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির রূহ ফিরিয়ে আনতে পারে না কেন?
এই আয়াতগুলোর শিক্ষা
মৃত্যুর মুহূর্তে পরিবারের সদস্যরা পাশে থাকলেও রূহ ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা তাদের নেই।
চিকিৎসাবিজ্ঞান রোগীর জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু মৃত্যুর অনিবার্য মুহূর্তকে কেউ নিজের ইচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মানুষের প্রকৃত অসহায়ত্ব ও আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতা মৃত্যুর মুহূর্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৬. মৃত্যুর সময় মুমিনের জন্য ফেরেশতাদের সুসংবাদ
মৃত্যুর সময়ের বর্ণনা শুধু ভয়াবহতা ও শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহর প্রতি ঈমানদার ও সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য শান্তি ও সুসংবাদের কথাও কুরআনে রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যাদের পবিত্র অবস্থায় ফেরেশতারা প্রাণ হরণ করেন, তাদের বলেন, ‘তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। তোমরা যে আমল করতে, তার প্রতিদানে জান্নাতে প্রবেশ করো।’” সূরা আল নাহল : ৩২।
এ আয়াতে আল্লাহর অনুগত বান্দাদের জন্য মৃত্যুকালীন সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে।
এখানে মনে রাখতে হবে, মুমিনের মৃত্যুর সময় শারীরিক কষ্ট হওয়া আর ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে শান্তি ও সুসংবাদ পাওয়া পরস্পরবিরোধী নয়। কোনো মুমিন শারীরিকভাবে কষ্ট পেতে পারেন, তবুও তাঁর পরিণতি আল্লাহর রহমতে উত্তম হতে পারে।
৭. মৃত্যুর যন্ত্রণা কি গুনাহ মাফের কারণ হতে পারে?
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির যে ক্লান্তি, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা বেদনা হয়; এমনকি একটি কাঁটা বিদ্ধ হওয়াও— এর মাধ্যমে আল্লাহ তার কিছু গুনাহ মোচন করেন।’ — সহিহ বুখারি।
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মুমিনের দুনিয়ার কষ্ট আল্লাহর কাছে গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে। মৃত্যুকালীন কষ্টের ক্ষেত্রেও আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কী প্রতিদান দেবেন, তা তাঁর জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও রহমতের ওপর নির্ভরশীল।
তবে শুধু মৃত্যুযন্ত্রণা হলেই সব গুনাহ মাফ হয়ে গেছে— এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। বিশেষত মানুষের অধিকার, ঋণ, জুলুম এবং অন্যের সম্পদ আত্মসাতের মতো বিষয়ের জন্য যথাযথ প্রতিকার ও তওবা জরুরি।
৮. মৃত্যুকষ্ট থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে প্রস্তুতি নেব?
ক. আন্তরিক তওবা করা ও সার্বক্ষণিক মৃত্যুর চিন্তা করা : আল্লাহর কাছে নিজের পাপ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া, পাপ পরিত্যাগ করা এবং পুনরায় পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প করা। মানুষের হক নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাযথভাবে মীমাংসা করা।
খ. নিয়মিত সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত কুরআন বোঝা ও কুরআন প্রতিষ্ঠার কাজে শামিল থাকা : নামাজ প্রতিষ্ঠা, কুরআন সুন্নাহর বিধান যথাযথভাবে মেনে চলা, দীন কায়েমের আন্দোলনে সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকা, আল্লাহর জিকির এবং নেক আমলের মাধ্যমে আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া।
গ. মানুষের অধিকার আদায় : ঋণ পরিশোধ, আমানত ফেরত, অন্যায়ভাবে নেওয়া সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং কারো প্রতি জুলুম করে থাকলে বা মনোমালিন্য থাকলে তা সংশোধন করে মীমাংসার চেষ্টা করা।
ঘ. মৃত্যুপথযাত্রীকে কালিমা স্মরণ করানো : রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “তোমরা তোমাদের মৃত্যুপথযাত্রীদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ স্মরণ করিয়ে দাও।” — সহিহ মুসলিম। অর্থাৎ কোমলভাবে কালিমা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে; রোগীকে চাপ দেওয়া বা বিরক্ত করা উচিত নয়।
৯. মৃত্যুকষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া
রাসূলুল্লাহ সা. নামাজে মৃত্যুর শাস্তিসহ বিভিন্ন বিষয় থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন।
দোয়া— ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জাহান্নামের শাস্তি, কবরের শাস্তি, জীবন ও মৃত্যুর পরীক্ষা এবং মসীহ দাজ্জালের পরীক্ষার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।’ -সহিহ মুসলিম ।
এ দোয়াটি নামাজের শেষ বৈঠকে সালাম ফেরানোর আগে পড়া যায়।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ঈমানের সঙ্গে জীবনযাপন, আন্তরিক তওবা, সুন্দর আমল, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দীন কায়েমের আন্দোলনে সক্রিয় থেকে এবং ঈমানের সঙ্গে অটল- অবিচল থাকা অবস্থায়, নিস্পাপ মাসুম অবস্থায়, দুনিয়ায়র জীবনের সকল প্রকার জঞ্জাল ঝামেলা মীমাংসা করে, মানুষের সকল প্রকার হক আদায় করে ঋণমুক্ত অবস্থায় শহিদী মৃত্যু বরণ করার তাওফিক দান করুন। মৃত্যুর সময় আমাদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, কবরের আজাব থেকে রক্ষা করুন এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।
লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ।