রাজনীতি, আদর্শ ও শূন্য আদর্শ


২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:২৪

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
রাষ্ট্র, রাজনীতি, রাজনীতিক, রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক তৎপরতা আধুনিক বিশ্বে শুধু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই নয় অপরিহার্য বটে। রাজনীতি ও রাজনীতিক ছাড়া এখন রাষ্ট্র ও সরকার চলতেই পারে না এবং রাজনীতিকরা চলতে দিচ্ছেনও না। রাষ্ট্র ও সরকারে রাজনীতিক ও রাজনীতিই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ চালক ও উপাদান। কারণ রাজনীতি হলো কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে মানুষের ক্ষমতার সম্পর্ক নির্ধারণ, নীতি প্রণয়ন এবং সম্পদের সুষম বণ্টন বা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সামাজিক ও প্রশাসনিক কার্যকলাপ। সহজ কথায়, সমাজকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে এবং মানুষের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে যে নিয়ম-নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া চালানো হয়, তাকেই রাজনীতি বলে। আর এ রাজনীতিকে মূলত পরিচালনা করে থাকে রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলগুলোই।
রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি বা রাজগতি বা রাজবুদ্ধি হলো দলীয় বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে রাষ্ট্র ও সরকারের ক্ষমতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ক কর্মকাণ্ডের সমষ্টি। রাজনীতি একাডেমিক অধ্যয়নকে বলে রাজনীতিবিজ্ঞান বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাজ হলো রাষ্ট্র, রাজনীতি, রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দল ও সরকার নিয়ে গবেষণা করা।
রাজনীতির মূল বিষয়সমূহ হচ্ছে ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আইন ও শাসনব্যবস্থা, সম্পদের বণ্টন, জনকল্যাণ ও অধিকারসহ রাষ্ট্র, সরকার, অর্থনীতি, সামরিক নীতি ও সমাজ। সমাজের বিভিন্ন দল বা ব্যক্তির মধ্যে ক্ষমতা প্রয়োগ এবং কে কখন কীভাবে ক্ষমতা পাবে বা সিদ্ধান্ত নেবে তা নির্ধারণ করা। রাষ্ট্রের সম্পদ, সুযোগ-সুবিধা ও বাজেট জনগণের মধ্যে কীভাবে ভাগ করা হবে তার রূপরেখা তৈরি করা। ন্যায়নীতি ও আদর্শ বজায় রেখে সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জীবনমান উন্নয়ন করা। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধান, আইন প্রণয়ন এবং সরকার গঠন করা।
রাজনীতি শব্দটা এসেছে ইংরেজি পলিটিক্স, শব্দটি এসেছে এরিস্টটল-এর ধ্রুপদী রচনা, পলিটিকা থেকে, যা Politiká. নামক গ্রিক পরিভাষাটিকে ইংরেজিতে প্রবর্তন করে। ১৫ শতকের মাঝামাঝি, অ্যারিস্টটলের রচনাটি প্রাথমিক আধুনিক ইংরেজি ভাষায় পোলেটিকস (Polettiques) হিসেবে ডাকা হতো, যা আধুনিক ইংরেজি এ পলিটিক্স-এ পরিণত হয়।
একবচনে পলিটিক্স শব্দটি প্রথম ১৪৩০ সালে ইংরেজিতে প্রযুক্ত হয়, যা মধ্য ফরাসি পলিটিক—এর সমতুল্য যা নেওয়া হয়েছে ল্যাটিন লাতিন: পলিটিকাস থেকে, যা গ্রিক প্রাচীন গ্রিক-এর একটি লাতিনিকৃত রূপ, যা প্রাচীন গ্রিক Polites ও প্রাচীন গ্রিক Polis থেকে এসেছে।
আরবি ভাষায় নীতি ও রাজনীতি উভয়কে বোঝাতেই সিয়াসাত বা সিয়াসাহ শব্দটি ব্যবহৃত হয়, ব্যকরণবিদদের মতে, এটি আরবি ধাতু সাসা থেকে এসেছে যার অর্থ পরিচালনা করা, ব্যবস্থাপনা করা, শাসন করা। শব্দটির ফিল মুদারী বা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ক্রিয়ারূপ হল ইয়াসুস।
হ্যারোল্ড ল্যাজওয়েলের মতে, রাজনীতি হল ‘যে যা, যখন, যেভাবে পায় সেটাই’। ডেভিড ইস্টনের মতে, ‘এটি হলো কোনো সমাজের জন্য মূল্যবান বিষয়গুলোর কর্তৃত্বপূর্ণ সুষম বণ্টন’। দিমির লেনিনের কাছে, ‘রাজনীতি হলো অর্থনীতির সবচেয়ে ঘনীভূত বহিঃপ্রকাশ’।
বার্নার্ড ক্রিক দাবি করেন যে, ‘রাজনৈতিক হলো নীতিমালার একটি স্বতন্ত্র রূপ, যার দ্বারা মানুষ নিজেদের পার্থক্য মিটিয়ে ফেলার জন্য, বৈচিত্র্যময় আগ্রহ ও মূল্যবোধ উপভোগ করার জন্য এবং সাধারণ প্রয়োজনের বিষয় পরিচালনায় সরকারি নীতি তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিলেমিশে কাজ করে।’
আড্রিয়ান লেফ্টউইচ সংজ্ঞা দেন যে, ‘রাজনীতি সমাজে ও সমাজসমূহের মধ্যে সমবায়, মতবিনিময় ও দ্বন্দ্বের সকল কাজের জন্ম দেয়, যার দ্বারা মানুষ তাদের জৈবিক ও সামাজিক জীবনের উৎপাদন ও প্রজননের নিমিত্তে মানবীয়, প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার, উৎপাদন ও বণ্টনের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে’। ইবনে সিনার মতে, বিষয়াবলির ব্যবস্থাপনা করাই হলো সিয়াসাত বা নীতি বা রাজনীতি।
সাহিব ইবনে আব্বাদও একই মত পোষণ করে বলেন, সিয়াসাত বা রাজনীতি হলো রাজনীতিবিদ বা শাসকের কাজ, প্রশাসক তার প্রজাদের শাসন করে, আর তার নিম্নস্তরের শাসকেরা তাদের নিম্নস্তরের প্রজাদের শাসন করে, আর এটাই তাদের রাজনৈতিক বা শাসনের নীতি।
ফায়রুজ আব্বাদী বলেন, রাজনীতিবিদ বা শাসকরাই রাজনীতি বা শাসনতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করেন, তারাই এটি প্রতিষ্ঠা করেন, আবার তারাই এটি ধ্বংস করেন।
রাজনীতি কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে গঠিত। উইলিয়াম কেরি তার বাংলা অভিধানে রাজনীতি শব্দের অর্থ করেছেন রাজন্য (The king) + নীতি (Justice), অর্থাৎ রাজার ন্যায়বিচার।
রাষ্ট্রক্ষমতা আরোহনের এ রাজনীতিতে যেমন আছে আদর্শ, তেমনিভাবে আদর্শবিহীন তথা শূন্য আদর্শের রাজনীতিও চলছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রে এখন শূন্য আদর্শের রাজনীতিই যেন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের রাজনৈতিক আদর্শ না থাকার কারণেই আজকে বিশ্বে শূন্য আদর্শের রাজনীতির বিকাশ ঘঠছে। রাজনৈতিক ময়দানে সঠিক আদর্শের অনুপস্থিতিই শূন্য আদর্শের রাজনীতি চলছে। শূন্য আদর্শের রাজনীতি দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা যেতে পারে কিন্তু জনগণের কল্যাণ তথা কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। আধুনিক বিশ্বে রাজনৈতিক দলগুলো রাজনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমেই ক্ষমতায় আসে ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, কিন্তু সাধারণ জনগণের প্রকৃত কল্যাণ ও মুক্তি আসছে না।
রাজনীতিতে আদর্শের অভাব বা ‘শূন্য আদর্শ’ (Lack of Ideology in Politics) বর্তমান যুগে একটি বহুল আলোচিত বিষয়। যখন কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা নির্দিষ্ট কোনো মূল্যবোধ, দর্শন বা জনকল্যাণমূলক নীতি বাদ দিয়ে কেবল ক্ষমতা অর্জন, ক্ষমতার টিকিয়ে রাখা এবং ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তখন তাকে আদর্শহীন রাজনীতি বা শূন্য আদর্শের রাজনীতি বলা হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এ আদর্শহীন রাজনীতি ও রাজনীতিকরাই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে আছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শূন্য আদর্শ তথা রাজনীতিতে এই আদর্শিক সংকটের পেছনে বেশকিছু মূল কারণ ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।
আদর্শহীন রাজনীতি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর
আদর্শহীন বা শূন্য আদর্শের রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা নিয়ে বিভিন্ন যুগের প্রখ্যাত মনীষী, দার্শনিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আদর্শহীন রাজনীতি বা শূন্য আদর্শের রাজনীতি নিয়ে বিখ্যাত মনীষীরাও গুরুত্বপূর্ণ অভিমত দিয়েছেন। বিশ্বের কোনো দার্শনিকই আদর্শহীন রাজনীতিকে সমর্থন করেন না।
এরিস্টটল বলেছেন, ‘রাজনীতি যখন তার নৈতিক আদর্শ হারায়, তখন তা কেবল ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটি নোংরা খেলায় পরিণত হয়।’
প্লেটোর মতে, ‘রাজনীতিতে অংশ না নেওয়ার অন্যতম শাস্তি হলো, আপনার চেয়ে নিকৃষ্ট কেউ একজন আপনার ওপর শাসন কায়েম করবে। আর এটি তখনই ঘটে যখন রাজনীতি আদর্শচ্যুত হয়।’
এডমন্ড বার্ক বলেছেন, ‘খারাপ মানুষেরা যখন ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন ভালো মানুষদেরও আদর্শ নিয়ে একজোট হতে হবে; অন্যথায় তারা এক এক করে একটি অর্থহীন ও নীতিহীন ব্যবস্থার শিকার হবে।’
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছেন, ‘আমাদের এমন নেতা প্রয়োজন যিনি ক্ষমতার প্রেমে পড়েননি, বরং ন্যায়বিচারের প্রেমে পড়েছেন। যিনি টাকার প্রেমে পড়েননি, বরং মানবতার প্রেমে পড়েছেন।’
করমচাঁদ গান্ধীর অভিমত হচ্ছে, ‘আদর্শহীন রাজনীতি হলো সামাজিক পাপগুলোর মধ্যে অন্যতম। নীতি ছাড়া রাজনীতি (Politics without principles) মানুষকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।’
রাজনীতিতে আদর্শ শূন্যতার কারণসমূহ
রাজনীতিতে আদর্শহীন রাজনীতির জন্য রাজনীতিকরা যেমন দায়ি তেমনিভাবে সাধারণ জনগণের একটি অংশও তার দায়ভাগ এড়াতে পারে না। আদর্শকে বাদ দিয়ে যারা শুধু ক্ষমতার জন্য পপুলিস্ট রাজনীতি করে জনগণের একটি অংশও আপাত লাভের পিছনে তাদের পিছনে ছুটে। আর তাই আদর্শহীন রাজনীতিকরা এ ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করার সুযোগ পান।
আধুনিক রাজনীতিতে যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে জয়লাভ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করাটাই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি আদর্শের চেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধাবাদ প্রাধান্য পাচ্ছে। রাজনীতিক ও জনগণের মধ্যে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক মানসিকতার কারণেই আদর্শহীন রাজনীতি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার সুযোগ পায়।
রাজনীতি এখন অনেক ক্ষেত্রে জনসেবার চেয়ে একটি লাভজনক পেশা বা ব্যবসায়িক বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। আদর্শহীন রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোয় সক্রিয় রাজনীতিকরা অর্থ ও সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। অর্থ এবং পেশিশক্তির অতিব্যবহার আদর্শিক কর্মীদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। আর এভাবেই শূন্য আদর্শের রাজনীতি আজ বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে।
আদর্শহীন রাজনীতিতে শুধু রাজনৈতিক দলই নয় সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলগুলো এক হয়ে জোট গঠন করছে। এসব দল নিজেদের চিরশত্রু বা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর ভাবাদর্শের দলের সাথেও কেবল ক্ষমতার অংশীদার হতে জোট গঠন করছে, যা সাধারণ ভোটারদের মনে আদর্শের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এসব জোটের লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ নয়, শুধুই ক্ষমতা ও নিজেদের আখের গোছানো। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও এ ধরনের অনেক রাজনৈতিক দল যেমন আছে, তেমনিভাবে তাদের রাজনৈতিক জোটও আছে।
আদর্শহীন রাজনীতি আর একটি ট্রেন্ড হচ্ছে পপুলিজম বা পপুলিস্ট রাজনীতি। কোনো আদর্শ, নীতি বা দর্শনের চেয়ে জনগণকে তাৎক্ষণিকভাবে আবেগ তাড়িত করে এমন সস্তা প্রতিশ্রুতি বা জনপ্রিয় স্লোগান দিয়ে ভোট টানার প্রবণতা বাড়ছে। যেমন উনাদের ভোট দিলে ক্ষমতায় গিয়ে দশ টাকা কেজি করে চাল দেয়া, কয়েক কোটি বেকার যুবকদের চাকরির ব্যবস্থা করা হবে ইত্যাকার জনপ্রিয় ও অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়ে থাকে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর এর প্রভাব
শূন্য আদর্শ তথা আদর্শহীন রাজনীতির কারণে রাষ্ট্র ও সমাজ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনিভাবে ব্যক্তিগতভাবে সাধারণ মানুষও সংকটের মধ্যে পড়ে। তবে সাধারণ মানুষকে এ সংকটটা বুঝতে কিছুটা সময় লাগে। ততক্ষণে অবশ্য সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়।
আদর্শহীন রাজনীতিক ও দলগুলোর প্রতি একসময় জনগণের আস্থা উঠে যায়। সাধারণ মানুষ যখন দেখে নেতারা বারবার দল বা নীতি পরিবর্তন করছেন, তখন পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর থেকেই তাদের আস্থা উঠে যায়। একপর্যায়ে আদর্শহীন রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলগুলো আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। তার জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলের নেতাকর্মীরা।
আদর্শহীন রাজনীতিতে নৈতিক মান নিয়ে যেমন কোনো বিকাশ ঘটে না তেমনিভাবে জবাবদিহি থাকে না। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বৃদ্ধি পায় এবং আইনের শাসন দুর্বল হয়। নীতিভিত্তিক বিতর্ক বা আলোচনার স্থান দখল করে নেয় পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি, প্রতিশোধপরায়ণতা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা। বাংলাদেশের আদর্শহীন রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন স্তরে তার প্রতিফলন দেখা যায়।
কল্যাণরাষ্ট্র গঠনে আদর্শিক রাজনীতি অপরিহার্য
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ ও দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য রাজনীতিতে সুস্থ ধারা, নৈতিকতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার মতো মৌলিক আদর্শগুলো ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। রাজনীতিকদের একটি অংশ অবশ্য আদর্শিক রাজনীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
আদর্শিক রাজনীতি হলো এমন একটি রাজনৈতিক ধারা যা ক্ষমতা দখল বা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির চেয়ে নির্দিষ্ট নীতি, মূল্যবোধ, দর্শন ও জনকল্যাণমূলক মতাদর্শকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। পশ্চিমা বিশ্বে উদারতাবাদ, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র ইত্যাদি বস্তুবাদি দর্শনের রাজনীতি আর মুসলিমবিশ্বে ইসলামী আদর্শ। আদর্শিক রাজনীতি নিছক ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং একটি সুসংহত বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি যার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তৈরি করা হয়। বিশেষ করে ইসলামী আদর্শের রাজনীতিই সমাজ, সরকার ও রাষ্ট্রে একটি কল্যানমুখী নীতি ও কর্মসূচির মাধ্যমে কল্যাণমুখি দেশ গঠন করতে পারে।
আদর্শিক রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
আদর্শিক রাজনীতিই রাজনীতিতে নীতি ও মূল্যবোধভিত্তিক চিন্তা-চেতনা বিশ্বাস লালন করে। তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা সুবিধাভোগী রাজনীতির বদলে এটি সততা, ন্যায়বিচার এবং সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সমাজ কীভাবে চলবে, রাষ্ট্রের সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হবে এবং নাগরিকদের অধিকার কেমন হবে— তার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকে। আদর্শিক রাজনীতিতে রাজনীতি কোনো পেশা বা ব্যবসার মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের অধিকার ও ভাগ্যোন্নয়নের একটি নৈতিক দায়িত্ব বা ব্রত হিসেবে বিবেচিত হয়। ক্ষমতাকে লক্ষ্য না ভেবে সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক পরিবর্তন সাধনের পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
আদর্শিক রাজনীতির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসলামী আদর্শকে ধারণ করে রাজনীতি এবং রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন করা। হযরত মুহাম্মদ সা. চৌদ্দশত বছর আগে আরবে ইসলামী আদর্শের ওপর ভিত্তি করে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেটি ছিল বিশ্বের মধ্যে সেরা কল্যাণরাষ্ট্র। হযরত মুহাম্মদ সা. এ অনুসারী মুসলমানরা পরবর্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামী আদর্শকে ধারণ করে যুগে যুগে অনেক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেগুলো ছিল অন্যতম কল্যাণরাষ্ট্র। বর্তমান যুগেও মুসলমানরা ইসলামী আদর্শকে ধারণ করেই রাজনীতি করছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করে যাচ্ছে।
ইসলামী আদর্শিক রাজনীতি হলো— এমন একটি রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মপদ্ধতি, যা কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী শরিয়াহর আলোকে আইন ও জীবনবিধানকে ভিত্তি করে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা করতে চায়।
ইসলামী রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য
ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হচ্ছে আল্লাহর ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা মানুষের নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর। মানুষ এ দুুনিয়ায় আল্লাহর প্রতিনিধি মাত্র। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় শাসন, বিচার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ইসলামী নিয়ম ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। সমাজে সাম্য, শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। ইসলামী রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলে শূরা বা পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবতার সার্বিক মুক্তিলাভ।
ইসলামী আদর্শের রাজনীতি ও মাওলানা মওদূদী রহ.
বিংশ শতাব্দীতে বেশ কয়েকজন ইসলামী চিন্তাবিদ মুসলিম বিশ্বে ইসলামী রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ইসলামী রাজনৈতিক দল গঠনের অগ্রনী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন হলেন ভারতে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ. ইরানে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি রহ. ও মিশরে হাসানুল বান্না প্রমুখ।
মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে বর্তমান বিশ্বের সামনে নতুন করে তুলে ধরেছেন। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তার আদর্শিক রাজনীতির দর্শন হচ্ছে, তিনি বলেছেন, ইসলামী আদর্শ ও রাজনীতি আলাদা বিষয় নয়, এ দুটি হচ্ছে অবিচ্ছেদ্য। তিনি বলেছেন, ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র ও সরকার গঠন করে কল্যাণমুখী সমাজ গঠন করতে হবে। মাওলানা মওদূদী বিশ্বাস করতেন যে ইসলাম ও রাজনীতি আলাদা কোনো বিষয় নয়; বরং ইসলামকে বাস্তবায়ন করতে হলে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। তার রাজনৈতিক দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘ইকামতে দীন’ বা পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর দীনকে সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ইসলামী দর্শনের আলোকে ইসলামী সাহিত্য রচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রে একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাওলানা মওদূদীর রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম ভিত্তি হলো ‘হাকিমিয়াত’। তিনি মনে করতেন আইন প্রণয়ন ও ক্ষমতার সর্বময় মালিকানা কেবল আল্লাহর, মানুষের নয়।
তিনি এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা দেন যেখানে সাধারণ মানুষ ইসলামী শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে খেলাফত বা প্রতিনিধিত্ব পরিচালনা করবে। যেটাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ‘থিওডমেক্রেসি’ (Theodemocracy) বা শরিয়াহভিত্তিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
মাওলানা মওদূদী রহ. দর্শন হচ্ছে ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতেই রাজনীতি চলবে এবং রাষ্ট্র ও সরকার গঠিত হবে। সেই রাজনীতিই হবে আদর্শিক এবং তার মাধ্যমে বিশ্বে কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবতার প্রকৃত মুক্তি আসবে। মাওলানা মওদূদী রহ.-এর চিন্তাধারার আলোকে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তেই এখন মুসলমানরা ইসলামী আদর্শের আলোকে রাজনৈতিক দল গঠন ও রাজনীতি করে ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে যাচ্ছে। মজলুম জনগণের একটাই প্রত্যাশা আগামী দিনে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বে আবারো কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে এবং মানবতার প্রকৃত মুক্তি আসবে।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com