ওদের ধরতে না পারলে সরকার ক্ষমতায় আছে কেন?
২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:২৭
॥ জামশেদ মেহদী ॥
অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশসমূহে রাজনীতি নিয়ে বিরোধীদলসমূহ অনেক গরম গরম কথা বলে থাকে। এসব গরম কথার মধ্যে থাকে অনেক মিথ্যা কথা। এসব মিথ্যাচার করে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া হয়। এই উসকানির পেছনে চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থাকে প্রচণ্ড গণঅসন্তোষ, দুর্বার গণআন্দোলন এবং সরকার পতন। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন না হলেও সেই আন্দোলনের প্রভাবে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে সরকারি দলের পরাজয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, ঐ বিরোধীদল আন্দোলনের মাধ্যমে হোক অথবা নির্বাচনের মাধ্যমেই হোক, ক্ষমতায় গেলে আর ঐসব গরম গরম কথা বলে না। যেসব গরম গরম অভিযোগ বিরোধীদলে থাকতে করেছিল, ক্ষমতায় গিয়ে সেগুলোর তদন্তেরও কোনো উদ্যোগ নেয় না।
পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশের অর্ধশতাব্দীতে এই ধরনের গরম অভিযোগ অনেক শোনা গেছে। এসব অভিযোগ রাজধানী ঢাকা থেকে ছড়াতে ছড়াতে যখন মফস্বলে যায়, তখন নানা ডালপালা বিস্তার করে। অমুক দল আমেরিকার কাছ থেকে অনেক টাকা পায়। অমুক দল ইন্ডিয়ার নিকট থেকে বস্তা বস্তা রুপি পায়। অমুক দল পাকিস্তান থেকে বিস্তর রুপিয়া পায়। অমুক দল চীন থেকে অনেক টাকা পায়। সব শেষে এসেছে মধ্যপ্রাচ্য। সৌদি আরব, ইরাক বা কাতার থেকে পেট্রো ডলার আসে। আপনি ঢাকার কেন্দ্রস্থল বাদ দিয়ে উপকণ্ঠে গেলেও এরকম বস্তা বস্তা টাকার গন্ধ পাবেন।
অতীতে বিরোধীদলে থাকতে অনেক দায়িত্বশীল নেতাকে এ ধরনের দায়িত্বহীন কথাবার্তা বলতে বহুবার শোনা গেছে। কিন্তু পাকিস্তানের ২৪ বছর এবং বাংলাদেশের ৫৫ বছর মোট ৭৯ বছরে একটি অভিযোগেরও তদন্ত হয়নি। আর তদন্তই যেখানে হয়নি সেখানে বিচারের প্রশ্নই ওঠে না। যারা এই ধরনের অভিযোগ হাটে-মাঠে-ঘাটে গলা ফাটিয়ে বলে বেড়ান, তাদের বলা হয় ডেমাগগ (Demagouge) বা মেঠো বক্তা। মওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানে বলেছেন, অমুক নেতার রান টেনে ছিঁড়ে ফেলবো। হামিদুল হক চৌধুরীকে ইত্তেফাকের মানিক মিয়া বলতেন হরিবল হক চৌধুরী। মুসলিম লীগের কাইয়ূম খানের এক রাজনৈতিক হুমকির জবাবে শেখ মুজিব বলেছিলেন, কাইয়ূম খান, ঢাকা আসুন। আপনার হুমকির জবাবে বাংলায় রক্তের হোলি খেলা হবে।
কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর এই ধরনের দায়িত্বহীন এবং বল্গাহীন উক্তি কোনো রাষ্ট্র নায়ককে করতে দেখা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, সেদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই ধরনের একটি অভিযোগ হাজার হাজার মানুষের জনসভায় করতে দেখা গেলো।
গত ২০ অক্টোবর রাজশাহীতে আখ চাষিদের সরকারি প্রণোদনা বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দাদের তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে।’
তিনি আরও বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে এক পক্ষ অর্থ দিচ্ছে, আর দেশের ভেতরে আরেকটি পক্ষ অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। বিভিন্ন কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দেওয়ার প্রসঙ্গও তিনি তোলেন। সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনেও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে, পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধীদলের একটি অংশ একত্র হয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে। ‘ডেইলি স্টার’সহ মেইনস্ট্রিম পত্রিকা বলে পরিচিত একাধিক দৈনিকে বিরোধীদলের একটি অংশ না বলে সরাসরি বিরোধীদল বলা হয়। জামায়াতের নাম না বললেও এটি যে জামায়াতে ইসলামী, সেটি বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না। কারণ জাতীয় সংসদে জামায়াতেরই এখন ৭০টিরও বেশি আসন রয়েছে। জামায়াতই একমাত্র রাজনৈতিক দল যার প্রতিটি উপজেলা তো বটেই; এমনকি প্রতিটি ইউনিয়নেও শাখা রয়েছে। সে কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই এটি ধরে নেওয়া যায় যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধীদল বলতে জামায়াতে ইসলামীকেই বুঝিয়েছেন। ফলে জামায়াতও পাল্টা জবাব দিয়েছে।
সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসে— সরকারের এমন অভিযোগের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা নাকি অস্থিরতা সৃষ্টি করছি। সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসে, এই টাকা ঢোকা ঠেকাতে পারেন না কেন? ওপার থেকে অস্ত্র ও মাদক আসে কেন? যে সরকারের অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় ঠেকানোর যোগ্যতা নেই, সেই সরকারের দেশ শাসন করার কোনো অধিকার নেই।’
গত ২৫ অক্টোবর রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই সভার আয়োজন করে জামায়াত।
‘দৈনিক আজকের’ কাগজে প্রকাশিত রিপোর্ট মোতাবেক ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিএনপি নতুন নতুন বয়ান তৈরি করছে। আমরা নাকি পরিত্যক্ত ফ্যাসিস্টের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছি! একজনের গায়ে কোনো কাপড়ই নেই, আরেকজনের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় আছে। তো যার গায়ে কাপড় নেই, সে বলছে, ওই দেখো, ওর গায়ে কোনো জামা নেই।’
বিএনপি নির্বাচনের সময় নানা কথা বলে আওয়ামী লীগের কাছে ‘ভোট ভিক্ষা’ চেয়েছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াত আমীর। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা বলেছেন, হাতে-পায়ে ধরে ভোট নিলো, এখন বেঈমানি করে কেন? তার (শেখ হাসিনার) দলের আরেকজন গডফাদার বলেছেন, কমপক্ষে ৯৫টি আসনে হেরে যাওয়া বিএনপিকে আমরাই ভোট দিয়ে জিতিয়েছি।’ আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) যুবলীগ, ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ) বিভিন্ন নেতাকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামী দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে কিনা সে ব্যাপারটিকে আমরা সেকেন্ডারি ইম্পর্টেন্স দিতে চাই। কারণ জামায়াত তো অতীতেও কোনোদিন বিদেশে পালায়নি, ভবিষ্যতেও পালাবে না। তাদের প্রতিটি কর্মীর ঠাঁই-ঠিকানা এই বাংলাদেশেই। সরকার তদন্ত করে দেখুক, জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে একেবারে তৃনমূলের কোনো কর্মীও যদি অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে যথাযোগ্য আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তাই বলে আইনি ব্যবস্থার নামে কর্তাভজা (সরকারকে সন্তুষ্ট করা) নীতি গ্রহণ করলে সেটি কেউ মানবে না।
প্রধানমন্ত্রী তো বলেই খালাস। গত ২০ অক্টোবর তিনি রাজশাহীতে এই অভিযোগ করেছেন আর গত ২৫ অক্টোবর দিবাগত রাতে তিনি জাপান গেছেন। তাদের অন্যান্য নেতার এ ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। আর থাকবেই বা কোত্থেকে? অস্থিরতা বলতে যা বোঝায়, সেটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। সেটি হলো ধ্বংসাত্মক তৎপরতা। জামায়াত যেটি করছে, সেটি হলো গণরায় অর্থাৎ গণভোটের রায় কার্যকর করার আন্দোলন। জামায়াত জনগণের দল। জনগণের কথা জামায়াত বলতেই থাকবে। আর সেটিকে যদি বলা হয় অস্থিরতা সৃষ্টি, তাহলে জামায়াত বা তার সমর্থকরা নাচার।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— বিদেশ থেকে টাকা আসার বিষয়টি। বিদেশ থেকে টাকা আসার অভিযোগটি তিনি করেছেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ তার সাড়ে ১৫ বছরের রাজত্বে হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ কোটি টাকা লুটপাট ও বিদেশে পাচার করেছে। এটা আমাদের কথা নয়। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ড. ইউনূস সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছিলেন। টাস্কফোর্সটি ৩৮৭ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট পেশ করেছে। আসলে রিপোর্টটি ৩৮৭ পৃষ্ঠার চেয়েও বড়। কারণ পুরো রিপোর্টটিই A4 সাইজের চেয়েও বড় কাগজে মুদ্রিত। অর্থ লুটপাট এবং বিদেশে পাচার করার কত রকম গলি ঘুপচি আছে, তার সবকিছু পাওয়া যায় টাস্কফোর্সের ঐ রিপোর্টে। অর্থনীতির এমন কোনো সেক্টর বা সাব-সেক্টর নেই, যেখানে লুণ্ঠন এবং দুর্বৃত্তায়ন হয়নি। শুধু পাচারই হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় ২৮ লাখ কোটি টাকারও বেশি।
তাদের পক্ষে দু-চার কোটি টাকা নয়, দু-চারশত কোটি টাকা বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়া ডাল-ভাত। বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, ২৮ লাখ কোটি টাকা অনেকে বাপের জন্মেও শোনেনি। সেই টাকার এক ভগ্নাংশ ছিটিয়ে তারা গণেশ উল্টাতে চায়। এই যে এর মধ্যেই এখানে-ওখানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল হচ্ছে, ককটেল ফাটানো হচ্ছে, একের পর এক ইউটিউব চ্যানেল খুলে বাংলাদেশবিরোধী এবং ভারতপন্থী অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, সেগুলোর টাকা কে জোগাচ্ছে? কথায় বলে, লাগে টাকা, দেবে গৌরী সেন।
ভারত এবং আওয়ামী লীগের যৌথ অপতৎপরতা হয় সরকারের ঠেকানোর মুরোদ নাই, না হয় তারা আওয়ামী লীগ এবং তাদের মুরুব্বি ভারতের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহী নয়।
অপ্রয়োজনে তারা অকথা-কুকথা বলেন। আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেছেন যে, সরকারের অনুমোদন পেলে নাকি পুলিশ আবার ক্রসফায়ার শুরু করতেও দ্বিধা করবে না। কাদের ক্রসফায়ার করবে? আয়নাঘরের রেশ এখনো মুছে যায়নি। সেই রেশ মুছে যেতে না যেতেই আবার ক্রসফায়ারের আওয়াজ?
জনগণের কথা খুব পরিষ্কার। হিন্দু পুরাণ ও মহাকাব্যে লঙ্কার রাক্ষসরাজ রাবণকে নাকি বলা হতো দশানন। অর্থাৎ তার ছিলো ১০টি মাথা। আর হিন্দুদের দেবীদুর্গাকে বলা হয় দশভূজা। অর্থাৎ দেবী দুর্গার রয়েছে ১০টি হাত। তেমনি একটি দেশের সরকারেরও ১০টি হাত বা মাথা থাকে (রূপক অর্থে)। অর্থাৎ খবর সংগ্রহের অসংখ্য সোর্স। এ কেমন সরকার যে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দেশের মধ্যে ঢুকছে, আর সরকার প্রধান সেটি বলেই খালাস। যদি তারা সেই সব গৌরী সেনকে ধরতে না পারেন তাহলে জনগণ বলবে, তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নাই। ২৮ লাখ কোটি টাকার কয় পয়সা তারেক সরকার বিদেশ থেকে ফেরত আনতে পেরেছে? ফেরত আনতে না পারলেও সেগুলো ফেরত আনার কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো জনগণকে না হলেও নিদেন পক্ষে পার্লামেন্টে প্রকাশ করা হোক।
সেগুলো না করে শুধু জামায়াত অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, সেই কথা বলা হবে নেহাত স্ট্যান্টবাজি এবং রাজনৈতিক হারিকিরি।
E-mail : jamshedmehdi15@gmail.com