ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্দেশেই লোমহর্ষক ২৮ অক্টোবর
২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:১২
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরাসরি নির্দেশে তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে দিয়ে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর দিনে-দুপুরে রাজধানীর পল্টনে লগি-বৈঠা দিয়ে আঘাত করে ৭ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে মেরে লাশের ওপর নাচানাচি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে, যা ইতিহাসের নির্মমতম ঘটনা আইয়্যামে জাহেলিয়াতকে হার মানিয়েছিল।
ঐদিন জোট সরকারের দুটি সমাবেশ ছিল। বিএনপির নয়াপল্টন আর জামায়াতের বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে। সভা চলছিল। এমন সময় আওয়ামী লীগের গুণ্ডা বাহিনী ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরাসরি নির্দেশে লগি-বৈঠা দিয়ে জামায়াতের সভায় হামলা করার জন্য বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে এগোতে থাকে। পল্টন মোড়েই তারা জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হয়। লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মেরেই ফেলে। শুধু তাই নয়, তারা মৃত ব্যক্তিদের মৃত্যু নিশ্চিত করতে লাশের ওপর নাচানাচি করেছে। ংএ সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। জামায়াতের আমীরসহ সব নেতা বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে স্টেজে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরের লোকদের জানালেও কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি।
পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ জড়িতদের নামে হত্যা মামলা হয়। কিন্তু নির্বাচনে জিতে ঐ মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়, যা আইনের শাসনের বরখেলাপ। আমরা ঐ মামলা এখন পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি মনে করি। ৩৬ জুলাই ফ্যাসিস্ট হাসিনার অপতৎপরতা এবং তার মন্ত্রী-এমপিসহ শহর-বন্দরের দায়িত্বে থাকা সবাই হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে থাকায় তাদের সব জায়গায় হামলা করেছে, খুন করেছে, আহত করেছে, গুম করেছে, আয়নাঘরে পাঠিয়েছে। সবই এখন বিচারাধীন।
২৮ অক্টোবরের ঘটনা যেহেতু মানবতাবিরোধীর মধ্যেই পড়ে এবং হত্যা মামলা রুজু আছে, তাই হাসিনাসহ সবার বিরুদ্ধে মামলা পুনরায় চালু করতে হবে।
বিরোধীদল হিসেবে তখন হাসিনা যা করেছিল, তার উদাহরণ শুধু আইয়্যামে জাহেলিয়াতের সাথেই তুলনা করা যায়। একজন নেত্রী হয়ে কীভাবে সরাসরি লগি-বৈঠা দিয়ে প্রকাশ্যে মানুষ মারার নির্দেশ দেয়, তার কোনো তুলনা নেই। অন্যদিকে তখনকার সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাও ছিল প্রশ্নবোধক? তাদের জানানোর পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ভূমিকা রাখেনি। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। শুরু হয়ে গেল জোট সরকারের শরীকদের মধ্যে সন্দেহ ও অনাস্থা। ফলে আওয়ামী গোষ্ঠীর প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতায় ক্ষমতায় আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেই বিগত চারদলীয় জোট সরকারের শরীক দলে নেতা-কর্মীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করে ব্যাপক অত্যাচার চালায়। ক্ষমতার সবটুকু ব্যবহার করে, যা দেশের অধিকাংশ লোকদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে চাকরি কোথাও জোটপন্থীরা কাজ করতে পারেনি। দেখে দেখে ছোট-বড় নেতাদের বিভিন্ন অন্যায় অভিযোগে গ্রেফতার করে জেলে ভরে রেখেছিল। শুধু তাই নয়, জোট সরকারের দ্জুন মন্ত্রী জামায়াতের তৎকালীন আমীর শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৩টি মন্ত্রণালয় ৫ বছর দুর্নীতিমুক্ত অবস্থায় চালালেও তাদের ফাঁসি দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ফাঁসি দেয়া হয়েছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ মীর কাসেম আলী, শহীদ কামারুজ্জামান, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লাসহ বিএনপির সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে; যা দেশের সর্বোচ্চ আদালতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অন্যায় ও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে এটিএম আজহারুল ইসলামকে ফাঁসির রায় থেকে বেকসুর খালাস দেয়ার মাধ্যমে। হাসিনা সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের দাপট বাংলাদেশকে একদিকে যেমন অর্থনীতির ধ্বংস করেছে, ব্যাংকগুলো খালি করে বিদেশে টাকা পাঠানোর সুযোগ করে দিয়েছে আওয়ামী দোসরদের। অন্যদিকে আমলা, বিচারপতি, ব্যবসায়ী সবাইকে দলীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিরোধীদলকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। ফলে ছাত্র-জনতার মাঝে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সঞ্চার হতে থাকে। ৩৬ জুলাই চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে। হাসিনাকে পালাতে হয় তার দাদা মোদির দেশে, যা খুবই লজ্জাজনক ও কলঙ্কজনক। ফলে ভারতের ছাত্র-জনতাও বসে নেই। মোদির বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং, বিক্ষোভ করে বিচারপতির পদত্যাগ থেকে এখন মোদির পদত্যাগ নিয়ে ব্যস্ত সে দেশের ছাত্র-জনতা। একেই বলে যেমন কুকুর তেমন মুগুর।
আমরা বিশ্বের সব দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক চাই, কিন্তু কারো অধীন হতে চাই না। ৩৬ জুলাই হাসিনার পাপের বিচার শুরু হয়েছে। অতিসত্বর সঠিক বিচার করে হাসিনা ও তার দোসরদের বিচারের আওতায় এনে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে।
বর্তমানে দেশের অবস্থা ভালো যাচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে ওপরের সরকারি দলের নেতাদের কাজই হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের কার্যকর বিরোধীদলের বিরোধিতা করা। হাসিনা সরকারের জঙ্গি ট্যাগ আর বর্তমান সরকারি দলের গুপ্তসুপ্ত ও আওয়ামী দলের সাথে যোগসাজশ করার অভিযোগ।
সরকারি দলের মনে রাখা দরকার আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা যেমন ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যা করেছে, তেমনি জামায়াতের শীর্ষনেতাদের বিনা দোষে ফাঁসি দিয়েছে। হত্যা, গুম আর আয়নাঘরের মধ্যে বছরের পর বছর নির্যাতন করেছে আর নাকি আওয়ামীদের সাথে জামায়াতের ঐক্য হবে। মোটেই না! দেশের ভালো মানুষের সাথে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জামায়াতের লোকদের ভালো সম্পর্ক আছে জন্মলগ্ন থেকেই। তাইতো এবারের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্য প্রায় ৩৯% ভোট পেয়ে বিরোধীদল হয়েছে। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, কিন্তু সরকারি দল নির্বাচনের আগে ও পরে যৌথভাবে দেশ চালানোর কথা বলেও এখন শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। মোটেই ভালো হবে না। যে পথে স্বৈরাচার হাসিনা গেছে, সে পথেই বর্তমান সরকার দেশের সর্বক্ষেত্রে অযোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছে। ফলে জনগণ মোটেই ভালো চোখে দেখছে না।
আমরা সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া আশা করি, দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য। আমরা চাই সবাই মিলে এ সরকার ও বিরোধীদল মিলেমিশে ৫ বছর ভালোভাবে ক্ষমতায় থাকুক জনগণের স্বার্থে। এ দেশের মানুষ অনেক সচেতন। দল-মত সবাইকে যাচাই-বাছাই করতে সক্ষম।
প্রতিবেশী মোদি সরকার তার রাষ্ট্রদূত দিয়ে যতই সরকারের মন্ত্রীদের সাথে যোগাযোগ করুক না কেন, দেশবিরোধী ভূমিকা পালন করতে পারবে না। ইতোমধ্যেই কয়েকজন মন্ত্রী-এমপিকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। পত্রপত্রিকা সূত্র বলছে, অনেকে তালিকায় আছে। আমরা সবার ভালো চাই, জনগণের স্বার্থে।
আওয়ামী লীগের হত্যার রাজনীতি শুরু হয় ৭০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র শহীদ আবদুল মালেককে দিয়ে। সেদিন তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র দল সেমিনারে যুক্তিতে না পেরে রাস্তায় তাকে হত্যা করে। তখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এরপর রাজশাহীতে ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিকবার ছাত্রশিবিরের ওপর হামলা করা হয়, আহত করা হয় অনেককে। তার মধ্যে আমাদের কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।
২৮ অক্টোবর পল্টন মোড়ের লগি-বৈঠা দিয়ে হত্যার নির্দেশ তো ফ্যাসিস্ট হাসিনা পূর্বেই দিয়ে রেখেছিল। এই নির্মম ঘটনা মানুষ নামে পশুরা করতে পারে জনগণ বিশ্বাসই করতে পারেনি। মানুষ মেরে লাশের ওপর নাচানাচি করে মৃত্যু নিশ্চিত করতে পারে। হ্যাঁ তারাই পারে, যারা মনুষ্যত্ব হারিয়ে দলবাজিতে মত্ত হয়।
২৮ অক্টোবরের রেশ ধরেই এসেছে ৩৬ জুলাই। কীভাবে হাসিনা তার অনুগত প্রশাসনের লোকদের কাজে লাগিয়ে খুন-গুম আর আয়নাঘরের মতো নিকৃষ্ট নির্যাতনের ফাঁদ তৈরি করে। হেলিকপ্টার থেকে বারান্দায় থাকা শিশুকেও তারা গুলি করে হত্যা করেছে। মায়ের কোলের শিশুকেও জুলাইয়ে হত্যা করে আল্লাহর আরশ কাঁপিয়ে তুলেছিল বলেই মহান আল্লাহ হাসিনার ক্ষমতার দাপট আর সহ্য করতে না পেরে দল-বল, বিচারপতি, ইমামসহ সবাইকে নিয়ে পালাতে বাধ্য করেছিলেন।
আজকেও সরকারি দল ভুলে গেছে বিভিন্ন সময়ের রক্তে রঞ্জিত আন্দোলনের ফসল হিসেবেই আমরা আজ নতুন স্বদেশ পেয়েছি। নির্বাচন পেয়ে সরকার গঠন করেই আবার নির্বাচনের পূর্বের ওয়াদা ভঙ্গ করতে শুরু করেছে। জুলাই সনদ, গণভোট বা তাদেরই দাবির প্রেক্ষিতে দুই ভোট একই দিনে করতে হয়েছিল। কিন্তু তারা জাতীয় নির্বাচন মানে, কিন্তু গণভোট মানে না। এটা জনগণের কাছে ডাহা প্রতারণা। জনগণ মোটেই বাহানা মেনে নেবে না। তাই তো বিভিন্ন জায়গায় লংমার্চে জনতার ঢল নেমেছে জামায়াতের ঐক্যের ডাকে, তাই জনগণের সাড়া আছে। ৩৬ জুলাই, জুলাই সনদে প্রকাশ্যে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সব দলের স্বাক্ষর হয়েছিল। আর ৭০% ভোটে যে গণভোট হয়েছে, তা মানতে দেশের সবাই বাধ্য। কোনো কমিটি দিয়ে গণভোটের বাস্তবায়ন করা যাবে না।
দৈনিক সংগ্রাম ২৮ অক্টোবর সংকলন সংখ্যা বের করেছে অনেকগুলো লেখকের লেখা নিয়ে। ২৮ অক্টোবরে আমাদের যে সমস্ত প্রাণ অকালে গেছে। তাদের মাগফিরাত কামনা করছি। তাদের পরিবারের প্রতি রইল দোয়া ও ভালোবাসা। যেহেতু ২৮ অক্টোবর থেকে ৫ আগস্ট আমাদের সংগ্রামের দীর্ঘতা। তাই সকল প্রকার নির্যাতন আর বৈষমের খাতা লিপিবদ্ধ করে রাখতে হবে— যাতে ভবিষ্যতের বংশধররা জানতে পারে। দেশের শত্রু কারা, আর বন্ধু কারা?
৫৫ বছরের সব অবৈধ কাজ ও ঘটনার নিন্দা করি আমরা। ভালো কাজের প্রশংসা করি— আর আগামীতে সকল ফ্যাসিবাদকে আমরা মুর্দাবাদ বলেই সামনে এগিয়ে যেতে চাই। তাই তো জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রধান বলেছেন, আমরা ১৮ কোটি মানুষের জন্য কাজ করব আর বরকত চাইব মহান আল্লাহর কাছে। আমরাও চাই দেশের মানুষের ভালোবাসা এবং উত্তরোত্তর উন্নতি আর স্বাধীনতার গ্যারান্টি। কাউকে ভয় নয়, মাথা উঁচু করেই আমরা বাঁচতে চাই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com