২৮ অক্টোবর

‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালাকে বাদ’


২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:২৪

স্টাফ রিপোর্টার : ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুসলিম নেতা, সাংবাদিক ও কবি মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহরের বিখ্যাত উক্তি— ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালাকে বাদ’-এর প্রেরণায় বারবার মুসলমানরা ঘুরে দাঁড়ায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের রহমতে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর শহীদী রক্তের বিনিময়ে বিজয়ও হাতের পদ চুম্বন করে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন ট্র্যাজেডির দিনটি থেকে নিয়ে ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই বিপ্লবের ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে এ সত্য বুঝতে কোনো গবেষণার প্রয়োজন হয় না। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু গাদ্দারের কারণে বারবার বিপ্লবের সুফল হারিয়ে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই বিপ্লবও ছিনতাই হওয়ার পথে। জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে চলছে ষড়যন্ত্র। তাই এবারের ২৮ অক্টোবর অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে বিশেষ তাৎপর্যময়। শহীদের ঋণ পরিশোধের বদলে যারা ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে গাদ্দারি করছে, তাদের নীলনকশা ছিন্ন করে নবোদ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শপথের দিন।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক একটি দিন। এ কলঙ্ক দূর করতে হত্যায় মামলা বিচারের বিকল্প নেই বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মীরা। ২০০৬ সালের এই দিনে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমাবেশে হামলা চালিয়ে পিটিয়ে ৭ জনকে হত্যা করা হয়, আর আহত করা হয় অসংখ্য মানুষ। শুধু হত্যাই নয়, মৃত লাশের ওপর নৃত্য করার দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করে বিশ্ববাসী। এ ঘটনার পর নিন্দা ও ধিক্কারের ঝড় উঠেছিল বিশ্বজুড়ে। এটা শুধুমাত্র নৃশংস হত্যাকাণ্ডই নয়, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পথচলা ব্যাহত হয়, ঘটে ব্যত্যয়। সর্বত্র বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার স্লোগান দেখা গেলেও এই নির্মম ঘটনার বিচার হতে দেখেনি দেশবাসী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে গেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপট তৈরির এবং তার ক্ষমতা দখলের পর যারা খুন হয়েছেন, তাদের স্বজনদের মনে আবার বিচার পাওয়ার আশা জেগেছে। বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল শেষে এখন দেশ পরিচালনা করছে তারেক রহমানের বিএনপি সরকার। এখন থেকে ২০ বছর আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের সন্ধিক্ষণে ঘটে ২৮ অক্টোবর ট্র্যাডেজি।
২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের অংশ হিসেবে রেডিও-টিভিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। কিন্তু তৎকালীন বিরোধীদল ১৪ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরকে বাধাগ্রস্ত করতে এ ভাষণ শেষ হওয়ার পরপরই দেশব্যাপী শুরু করে তাণ্ডব। বিভিন্ন স্থানে বিএনপি-জামায়াতের অফিসসহ নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি যেমন চালানো হয় পৈশাচিক হামলা, তেমনি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয় অনেক অফিস, বাড়িঘর, পুরো দেশব্যাপী চলে তাণ্ডবতা।
পরদিন চারদলীয় জোট সরকারের ৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ ছিল বিকাল ৩টায়। সকাল থেকেই সভার মঞ্চ তৈরির কাজ চলছিল। হঠাৎ করেই বেলা ১১টার দিকে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠা ও অস্ত্রধারীরা জামায়াতের সমাবেশস্থলে হামলা চালায়। তাদের পৈশাচিক হামলায় মারাত্মক আহত হন জামায়াত ও শিবিরের অসংখ্য নেতাকর্মী। তাদের এই আক্রমণ ছিল সুপরিকল্পিত ও ভয়াবহ। একপর্যায়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পল্টনের বিভিন্ন গলিতে ঢুকে পড়ে এবং নিরীহ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের বেধড়ক পেটাতে থাকে।
সেদিন পল্টনজুড়ে ছিল তাণ্ডব। লগি-বৈঠা আর অস্ত্রধারীদের হাতে একের পর এক আহত হতে থাকেন নিরস্ত্র জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা। তারা শিবির নেতা মুজাহিদুল ইসলামকে পিটিয়ে হত্যা করে। একের পর এক আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জামায়াতকর্মী জসিম উদ্দিনকে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা তার লাশের ওপর উঠে নৃত্য-উল্লাস করতে থাকে।
অস্ত্রধারীদের ছোড়া গুলি মাথায় বিদ্ধ হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়েন জামায়াতকর্মী হাবিবুর রহমান ও জুরাইনের জামায়াতকর্মী জসিম উদ্দিন। আরো প্রাণ হারিয়েছেন শিবির নেতা গোলাম কিবরিয়া শিপন ও সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম। এ ঘটনায় রাজধানীতে জামায়াত ও শিবিরের সহস্রাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
সেদিন জামায়াতকর্মী হাবিবুর রহমানকে হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, লাশটি টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল গুম করার জন্য। কিন্তু পুলিশের সহায়তায় যখন লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলো, সেখানেও চলতে থাকে লাশ দখলের খেলা। তারা নকল বাবা-মা সাজিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল লাশটি। পরবর্তীতে এ কারসাজি ধরা পড়ায় নকল বাবা-মা সটকে পড়ে।
সেদিন শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাই নয়, জরুরি প্রয়োজনে রাস্তায় বের হওয়া নারী, শিশু ও খেটেখাওয়া মানুষও রেহাই পায়নি। একান্ত নিরীহ অসহায় হতভাগ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ছোট-খাটো দোকানদার এবং ফুটপাতের হকারদেরও চরম ক্ষতির শিকার হতে হয়। এমনি এক হকার কাসেম মিয়া পল্টন এলাকায় বুক চাপড়াতে চাপড়াতে আর্তনাদ করে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছিল আর বলছিল, ‘আমি পথের ফকির অইয়া গেলাম। আমি অহন আত্মহত্যা করুম।’
সে সময় সারা দেশে হত্যা ও নৈরাজ্য চলে। ২৭ অক্টোবর গাজীপুরে হামলা চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জামায়াতে ইসলামী গাজীপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুহাম্মদ রুহুল আমীনকে। ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর ঢাকাসহ সারা দেশে জামায়াত-শিবিরসহ চারদলীয় জোটের ৫৪ নেতাকর্মী শাহাদাতবরণ করেন। আহত হয়েছেন ৫ সহস্রাধিক জামায়াত, শিবির, বিএনপি নেতাকর্মী, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ। এ পৈশাচিকতা ও বর্বরতার হাত থেকে রেহাই পায়নি মায়ের কোলের শিশু, নারী, বৃদ্ধ এবং নিরীহ জনগণও। তাদের তিন দিনের ধ্বংসলীলায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, ২৮ অক্টোবরের পথ ধরেই ওয়ান-ইলেভেনের অবতারণা হয়। আর তারই ধারাবাহিকতায় নীলনকশার নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করে। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের জনগণ হারিয়েছেন তাদের ভোটাধিকার। শুরু হয়েছে গণতন্ত্রহীনতার অবিরাম যাত্রা। ক্ষমতালিপ্সা কত জঘন্য, নৃশংস হতে পারে, রক্তাক্ত সেই আটাশ তার দৃষ্টান্ত হতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক সরকার তার মেয়াদ শেষে যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করছিল, যখন প্রশাসনও একটা অন্তর্বর্তী অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল, সেই সময়ের সুযোগ নিয়ে সেদিন যে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, তা মানুষের স্মৃতিকে বহুকাল পীড়িত করবে। ২৮ অক্টোবর বারবার আমাদের মাঝে ফিরে আসে। আর স্মরণ করিয়ে দেয় লগি-বৈঠার সেই তাণ্ডব। লগি-বৈঠার পৈশাচিক নৃত্যের কথা স্মরণ হলে শিউরে ওঠে মানুষ। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনার পরদিন জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে পল্টন থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নং-৬১(২৯/১০/০৬)। ধারা- ১৪৩/৩২৩/৩২৫/ ৩২৬/৩০২/৩০৭/১০৯/১১৪ দণ্ডবিধি। মামলায় আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের ৪০ নেতার নামসহ অজ্ঞাত সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়। এখন সময় এসেছে বিচারের। কারণ ফৌজদারি মামলা কখনো তামাদি হয় না। সরকারের দায়িত্ব খুনি সন্ত্রাসীদের বিচারের মুখামুখি করা। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। তবেই বন্ধ হবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না করে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং সমৃদ্ধ দেশ করা সম্ভব নয়। ফ্যাসিবাদ বারবার ফিরে আসার দরজা জানালা বন্ধ করতেও দরকার। ২০০৬ থেকে নিয়ে জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত যত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেই প্রতিটি খুনের বিচার নিশ্চিত করা। তবেই দেশের রাজনীতি কিছুটা হলেও হবে কলঙ্কমুক্ত।