ভারতে মুসলিমদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন
২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:০৬
বিদেশি অপবাদে উচ্ছেদ বাঙালি মুসলিম
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
প্রায় হাজার বছরের মুসলিম শাসনামলে ভারত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ ছিল। ভারতের ইতিহাস, স্থাপত্য এবং আধুনিক বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য। তাজমহল, লালকেল্লা ও কুতুব মিনারের মতো কালজয়ী স্থাপত্য থেকে শুরু করে ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তির ভিত গড়েছেন মুসলিমরাই। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আজ সেই অবদানকে অস্বীকার করে রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায় মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন চলমান রয়েছে। ১৯৮৪ সালের শিখ বিদ্রোহ, ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা এবং পরবর্তীতে মুজাফফরনগর, পাটনা ও দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় লক্ষাধিক সংখ্যালঘুকে হত্যা ও উচ্ছেদ করা হয়েছে। এছাড়া নাগরিকত্ব আইন (CAA), এনআরসি এবং বিতর্কিত ওয়াকফ সংশোধন বিলের মাধ্যমে মুসলমানদের স্থাপনা, সম্পত্তির অধিকার হরণের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। বর্তমানে বিজেপি সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে এসব পদ্ধতিগত নিপীড়ন চলছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজেপি-শাসিত রাজ্যসহ ভারতজুড়ে মুসলিমদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। খোদ রাজধানী দিল্লিতে ৭০০ মুসলিম পরিবার এবং ঐতিহাসিক রেসকোর্স মসজিদ উচ্ছেদের ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।
দিল্লির ৭০০ মুসলিম পরিবার ও ঐতিহাসিক রেসকোর্স মসজিদ উচ্ছেদ : ভারতের নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক রেস কোর্স মসজিদের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে প্রায় ৭০০টি মুসলিম পরিবার জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন দিল্লির ‘ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস’ (এলঅ্যান্ডডিও) প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসস্থানের কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক রেসকোর্স মসজিদের জমিকে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেছে। ঐ মসজিদটি উচ্ছেদের একটি নোটিশ দিয়েছে সরকার। গত ৭ অক্টোবর থেকে মসজিদসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার জরুরি পরিষেবা সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল (এনডিএমসি)-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ মেনেই ওই এলাকায় উচ্ছেদ ও পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করার কাজ চলছে। কেন্দ্রীয় গণপূর্ত বিভাগ বা সিপিডব্লিউডি-কে ঐ নির্দেশ কার্যকরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সংবাদ সংস্থা ‘সিয়াসত ডটকমের’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লির তুঘলক রোড থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ নয়। বরং ১৫-১৬ কিলোমিটার দূরে মুন্ডকা এলাকায় তাদের জন্য বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে নিবন্ধিত এবং গ্রেড-২ ঐতিহ্যবাহী স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে তালিকাভুক্ত রেস কোর্স মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় ৮০০ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। এদিকে মসজিদের ইমাম মুহাম্মদ হারুন বলেছেন, তাদের মাত্র ছয় দিনের মধ্যে জায়গা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনি পদক্ষেপ নিতে তিনি দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের কাছে অনুরোধ করলেও কোনো সাড়া পাননি। অন্যদিকে আসামের মুসলিম পরিবার উচ্ছেদের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে বিজেপি সরকার।
আসামে ৩,৪০০ মুসলিম পরিবার উচ্ছেদ : আদানি কর্পোরেট স্বর্গরাজ্য : আসাম রাজ্য প্রশাসনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক সপ্তাহের মধ্যে ৬৩৮ হেক্টরের বেশি জায়গা মুক্ত করা হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানে বাড়িঘর হারানো লুটুমারির ৪৪ বছর বয়সী আবদুল নূরকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ‘১৯৭৪ সালে সরকার আমাদের এখানে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করেছিল। আমরা মূলত কাছের জুরিয়া শহরের বাসিন্দা। সব মিলিয়ে আমাদের ৩০০টি ভূমিহীন পরিবারকে চার বিঘা করে জমি দেওয়া হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আমরা হাইকোর্টে আবেদন করেছিলাম, কিন্তু আদালত আমাদের কোনো প্রতিকার দেননি।’ উচ্ছেদ করে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অল আসাম মাইনরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এএএমএসইউ) সভাপতি ইমতিয়াজ হুসেইন। স্ক্রলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বনাঞ্চলের বাসিন্দাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ‘অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপলস’ জুন মাসে আসাম সরকারকে পরিকল্পিত উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছিল। সংগঠনটির দাবি, ঐ এলাকার চারটি গ্রামের বাসিন্দারা ঔপনিবেশিক আমলে চালু হওয়া ‘টাউংয়া’ পদ্ধতির অধীনে সেখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ঐতিহাসিক এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না নিয়ে তাদের দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। প্রসঙ্গত, আসামে এ ধরনের উচ্ছেদ অভিযান নতুন নয়। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বাধীন বিজেপি ক্ষমতায় থাকার গত এক দশকে সরকারি জমি থেকে প্রায় ১৯ হাজার পরিবারকে দখলের অভিযোগে উচ্ছেদ করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম স্ক্রলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দারা ঐ দখলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল জানিয়েছে, ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ২০২৬ দুই দিনে পাঁচটি অভিযানে ‘বিদেশি’ অপবাদে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের সংখ্যা তিন হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে।
নিজভূমে পরবাসী : ‘বিদেশি’ অপবাদে উচ্ছেদ বাঙালি মুসলিমদের : কাশ্মীরে হামলার ঘটনায় পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারত। যদিও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করে। এরপর বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলো নিরাপত্তার অজুহাতে হাজার হাজার বাঙালি মুসলিমকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে আটক করতে শুরু করে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া পরিচালক ইলায়ন পিয়ারসন বলেন, ‘অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত করার নামে ভারত সরকার হাজার হাজার নিরীহ মানুষের জীবন হুমকির মুখে ফেলছে। বাস্তবে এটি মুসলিমবিরোধী বৈষম্যমূলক নীতিরই বহিঃপ্রকাশ।’ আর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রভীন দোন্থি বলেন, ‘আইনগতভাবে বৈধ হলেও বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমরা এখন ভারতের ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর জন্য সহজ টার্গেট হয়ে উঠেছে।’ অন্যদিকে দেশটিতে ভয়াবহ মুসলিম নির্যাতনের ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ শুরু হয়েছে।
‘অপারেশন ল্যাংড়া’ : ভারতে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামে পুলিশ কর্তৃক শত শত মুসলিমকে গুলি করে পঙ্গু করার ঘটনা ঘটেছে। এতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। ২৫ অক্টোবর ২০২৬ গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ভারতে জিরো টলারেন্স নীতির আওতায় পুলিশকে অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ ক্ষমতা প্রদান করে মুসলিম নিধন ও নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’-এর তথ্যে জানা যায়, প্রায় ৬৫০টি ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গেছে আহতদের প্রায় ৯৩ শতাংশই মুসলিম, যা এপির স্বাধীন অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ’ এসব এনকাউন্টারের স্বাধীন তদন্ত দাবি করলেও সেই মামলা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এ অবস্থায় অবিলম্বে ভারতকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার জন্য জাতিসংঘসহ বিশ্বনেতৃত্বের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়। ভারতে সংখ্যালঘু; বিশেষ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নিপীড়নের ঘটনা চলতি বছরে আরও বেড়েছে বলে দাবি করেছে দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন সাউথ এশিয়ান জাস্টিস ক্যাম্পেইন। সংগঠনটির সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া টর্চার ট্র্যাকার’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া মুসলিমদের বিখ্যাত ‘ভোজশালা’ও দখল করেছে দেশটি।
‘ভোজশালা’কে মসজিদ নয়, মন্দির হিসেবেই মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ফয়সালা : ভারতের ধার জেলায় ‘ভোজশালা’ নামক একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা, যেটিকে হিন্দুরা দেবী সরস্বতী মন্দির; অন্যদিকে মুসলিমরা কামাল মওলা মসজিদ বলে। ২০০৩ সাল থেকে হিন্দু সম্প্রদায়কে মঙ্গলবার ও বসন্ত পঞ্চমীতে পূজা করার এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে শুক্রবার নামাজ আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়। ২০০৩, ২০১৩ এবং ২০১৬ সালে, যখন বসন্ত পঞ্চমী এবং শুক্রবার একই দিনে পড়েছিল তখন দুই পক্ষের মধ্যে সহিংসতা হয়। ২০২২ সালে হিন্দু ফ্রন্ট ফর জাস্টিস হিন্দু সম্প্রদায়কে নিয়মিত পূজা করার অধিকার প্রদান এবং চত্বরটিতে নামাজ নিষিদ্ধ করার জন্য হাইকোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করেন। সম্প্রতি আদালত পিটিশনমতেই রায় দেয় এবং বলে ‘লন্ডন মিউজিয়াম থেকে দেবী সরস্বতীর মূর্তি ফিরিয়ে আনা এবং এই চত্বরে তা পুনঃস্থাপনের বিষয়ে ভারত সরকার বিবেচনা করতে পারে।’ মুসলিম পক্ষের আইনজীবী আশহার ওয়ারসি বলেন, ‘আদালত পূর্বে মসজিদ হিসেবে বিবেচিত স্থানটিকে মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে যদিও সম্পত্তিটি প্রায় ৭০০ বছর ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন। আমাদের বলা হয়েছে যে অন্যত্র জমি দেওয়া হবে। আমরা সিদ্ধান্তটি খতিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে যাব।’ অন্যদিকে মুসলিমবিহীন ভারত করতে দেশটিতে ভোটার তালিকা থেকে মুসলিমদের বাদ দেওয়ার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে।
এক বছরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ প্রায় ৬ কোটি নাম : দেশজুড়ে ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision ev SIR) কর্মসূচি শুরু হওয়ার সম্প্রতি এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলে মিলিয়ে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৫.৮ কোটি নাম বাদ পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরে ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলে এই বিশেষ সংশোধন কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলে এখনো প্রক্রিয়া চলছে। তবে পরিকল্পিতভাবে প্রক্রিয়ায় মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন করার উদ্বেগজনক খবর পাওয়া গেছে। প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কলকাতার মুসলিম কলোনিতে পানিও বন্ধ করেছে বিজেপি সরকার।
মুসলিম কলোনির পানি বন্ধ করলো বিজেপি : ভারতের কলকাতার জ্যোতি নগর মুসলিম কলোনির পানির লাইন কয়েক মাস ধরে বন্ধ করে রেখেছে বিজেপি সরকার। এ বিষয়ে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সমীরুল ইসলাম। এ ঘটনা কারবালার করুন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সমীরুল ইসলাম দাবি করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এসেই জ্যোতি নগর কলোনির পানির লাইন কেটে দিয়েছে। কলোনির বাসিন্দারা পানির অভাবে হাহাকার করছেন। শুধু বেঁচে থাকার জন্য তারা অপরিহার্য পানির হাহাকার করছেন। চিঠিতে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে জ্যোতি নগর কলোনিতে নিয়মিত পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার অনুরোধ করেছেন। বাসিন্দারা বলছেন, স্থানীয় বিজেপি এমএলএ রীতেশ তিওয়ারির নির্দেশেই পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে বাসিন্দারা কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন। তবে প্রতিকার পাননি। সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদক জানান। মাত্র ৫০০ মিটার দূরের হিন্দু বস্তির মানুষেরা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য এক-আধ বালতি পানি দিয়ে যথাসম্ভব সাহায্য করেছেন। কয়েকজন হিন্দু বাসিন্দা জানান, মুসলমান প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়ালে যদি তাদের পানি সরবরাহও একইভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই আতঙ্কে ভুগছেন তারাও। নির্বাচিত হয়েই এমএলএ রীতেশ তিওয়ারি তার নির্বাচনি এলাকার মুসলিমদের জন্য কোনো কাজ না করার শপথ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ বাবা ভোলেনাথের সামনে শপথ করছি, আগামী পাঁচ বছর আমি মুসলিমদের জন্য কোনো কাজ করব না। তাদের জন্য কোনো সনদও ইস্যু করব না। আমি এটি সরাসরি বলছি। অন্য কেউ কী বলল বা ভাবল, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।’ অথচ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, পানি হলো মৌলিক অধিকার। কোনো শর্তেই তা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের প্রায় ৯৫ শতাংশই মুসলিম। বাসিন্দাদের অভিযোগ, জরুরি সেবা বন্ধ করে দেওয়া মূলত মুসলিম বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করার অপচেষ্টা। জ্যোতিনগর কলোনির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর বিশ্বাস বলেন, ‘পরিকল্পনাই ছিল পানি ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো বন্ধ করে দেওয়া, যাতে আমরা এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হই।’
মুসলিমদের আগুনে পোড়ানো ও মস্তকবিহীন দেহ নিয়ে উল্লাস : একের পর এক মুসলিমদের ওপর হামলা, খুন ও অপরাধের যেন স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠছে ভারত। এবার ঝাড়খণ্ডে এক মুসলিম কিশোরীকে গাছে ঝুলিয়ে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তারপর তার দেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে ঝাড়খণ্ডের দুমকায়। অন্যদিকে মুসলিম যুবকদের দেহ থেকে মাথা আলদা করে বিছিন্ন দেহ নিয়ে উল্লাস করার মতো বিভৎস ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া প্রকাশ্যে রাস্তায় নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন, বৃদ্ধ মুসলিমদের দাঁড়ি টেনে ছিঁড়ে ফেলে নির্যাতনসহ নানা ধরণের নির্যাতন চলছে।
সরকারি তথ্য ও ‘ইকোনমিক সার্ভে অব আসাম’ অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর থেকে এ পর্যন্ত রাজ্যের মোট আয়তনের প্রায় ৭.৫ শতাংশ স্থায়ীভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে আসাম তথা ভারত সরকারের প্রশাসনিক পদক্ষেপ। সম্প্রতি আসামের ধুবড়ি জেলায় উচ্ছেদ করা জমিতে ৩,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের আদানি পাওয়ার লিমিটেডের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। ভারতীয় গণমাধ্যম ‘স্ক্রল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রায় ১,৪০০টি বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া জমিতেই এই প্রকল্পের সূচনা করা হয়। এর ফলে প্রায় ১০,০০০ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। জমিটি প্রথমে রাজ্য পরিচালিত ‘আসাম পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড’-কে বরাদ্দ করা হয়, যা পরবর্তীতে প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য আদানি পাওয়ারকে হস্তান্তর করা হয়। যদিও ‘দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ’-এর ২০২৬ সালের মার্চের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি নথি বিশ্লেষণের তথ্যানুযায়ী, হিমন্ত শর্মার এসব অবৈধ পদক্ষেপ। এর ফলে আগামী পাঁচ বছরে রাজ্যের ১২,৫০০ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। এদিকে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ জেলা প্রশাসন গবাদি পশুর চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত সরকারি ‘ভিলেজ গ্রেজিং ল্যান্ড’ বা গ্রামের চারণভূমিকেও এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য রূপান্তর করার প্রস্তাব দেয়। অন্যদিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যে, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি এক কোণে নীল ত্রিপলের নিচে উচ্ছেদকৃত শত শত মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশু গাদাগাদি করে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ২০২১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে হিমন্ত শর্মার নেতৃত্বে সরকার অন্তত ৫০,০০০ মানুষকে উচ্ছেদ করেছে, যাদের বেশিরভাগই বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম। মুসলিমরা আজ ভারত সরকারের এধরণের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি চায়।
তথ্যসূত্র : মাকতুব মিডিয়া, স্ক্রলডটইন, সিয়াসাত ডটকম, দ্য টেলিগ্রাফ, আল-জাজিরা, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com