সম্পাদকীয়

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ সময়ের দাবি


২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:১১

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি— এ পার্বত্য জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সম্পদ, সৌন্দর্যময় এবং ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুপূর্ণ অঞ্চল। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ অঞ্চল নিয়ে ষড়যন্ত্র নতুন নয়। এর শিকড় বিস্তৃত রয়েছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাসের গভীরে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তির প্রাক্কালেও তৎকালীন এই অঞ্চলে বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল ও প্রতিবেশী ভারতের পক্ষ থেকে কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বৃহত্তর সিলেটসহ চট্টগ্রামের ভূখণ্ডকে বিচ্ছিন্ন করে নবগঠিত পাকিস্তানকে একটি প্রতিকূল বা ল্যান্ডলকড রাষ্ট্রে পরিণত করার দুরভিসন্ধি ওই সময়ও সক্রিয় ছিল। যদিও তৎকালীন রাজনৈতিক নেতাদের দৃঢ়তায় সেই চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে গেছে। কিন্তু দেশ বিভাগের সেই ঐতিহাসিক দিন থেকে শুরু করে আজ অব্দি এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে অস্থিতিশীল করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকেনি। পাহাড়ে শান্তি বিঘ্নিত করতে এবং দেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ও তৎপরতাও নতুন নয়। শান্তি বাহিনীসহ এ অঞ্চলে গড়ে ওঠা নানা সশস্ত্র সংগঠনের নেপথ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারতের মদদ এবং সহযোগিতা ওপেন সিক্রেট। বাংলাদেশের এ ভূখণ্ডে হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি করে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো ভারতে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে। আবার সুযোগ বুঝে এসে অরাজকতা তৈরি করে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীর দিকে অস্ত্র তাক করতে তাদের হাত কাঁপে না। কারণ তারা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না। তারা মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী। যাদের মদদদাতারা দেশকে অশান্ত করে ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। একটি মহল এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির কথা বলেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনের শর্ত বাস্তবায়নের জন্য পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়িরা নিজেদের ‘আদিবাসী’ বলে দাবি করে বিতর্ক শুরু করেছে। এ প্রক্রিয়ায় শ্রম আইন সংশোধনের নেপথ্যে আছে বাংলাদেশ ঘিরে ষড়যন্ত্র। আমরা মনে করি, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার বা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে আদিবাসী স্বীকৃতি দেওয়া বাংলাদেশ থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের প্রথম ধাপ হতে পারে।’ কারণ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৬৯-এর ঝবষভ-উবঃবৎসরহধঃরড়হ-এর পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। আদিবাসীরা এ কনভেনশন অনুযায়ী, তারা তাদের জন্য পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র দাবি করতে পারবে। আইএলও কনভেনশন-১৬৯ অনুযায়ী, শ্রম আইন সংশোধন করলে বাংলাদেশ সরকার বাধ্য হবে তাদের দাবি মানতে। এমন হাজার হাজার ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে।
আমরা মনে করি, বর্তমানে এই ষড়যন্ত্রের নতুন ফ্রন্ট হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে দেশের অন্যতম নান্দনিক পর্যটন কেন্দ্র ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি সাজেক ভ্যালিকে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সীমান্তঘেঁষা এই সম্ভাবনাময় জনপদ আজ সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর কারণে চরমভাবে অশান্ত। পাহাড়ের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে এই গোষ্ঠীগুলো গভীর এক খেলায় লিপ্ত হয়েছে। তাদের প্রধান কৌশল হলো পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মেলবন্ধনে ফাটল ধরানো। উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে কৃত্রিম দূরত্ব ও বিভাজন সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি জিইয়ে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য যাতে এই স্পর্শকাতর সীমান্ত অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি অরাজকতা বজায় থাকে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো তাদের অপতৎপরতা নির্বিঘ্ন করতে অত্যন্ত সুকৌশলে এ অঞ্চল থেকে দায়িত্বশীল সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি তুলে আসছে। অথচ পাহাড়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পাহাড়ি-বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি অপরিহার্য। রাষ্ট্রবিরোধী এই চক্রটি কেবল ক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং সম্প্রতি দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় নিয়োজিত বীর সেনাবাহিনীর ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণের মতো চরম দুঃসাহসও দেখিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এমন সশস্ত্র আক্রমণ কেবল কোনো সাধারণ সন্ত্রাসী বা জঙ্গিবাদী অপরাধ নয়, এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর এক প্রকাশ্য আঘাত।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় সময়ক্ষেপণের কোনো অবকাশ নেই। দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা এবং ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বর্তমান সরকারকে আরও অনেক বেশি কঠোর, দূরদর্শী এবং নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে পাহাড়ে সক্রিয় সকল অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালিদের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার সেতু সুদৃঢ় করতে সামাজিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে এবং যেকোনো ধরনের উসকানি কঠোরভাবে দমন করতে হবে। দেশের নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষায় সরকারের এই আপসহীন ও দৃঢ় অবস্থানই পারে পার্বত্য অঞ্চলের রক্তক্ষয় ও ষড়যন্ত্রের চির অবসান ঘটাতে। আমরা মনে করি, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সরকার বিরোধীদলকে সাথে নিয়ে দেশের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।