ইউরোপে মুসলিম শাসন বয়ে এনেছিল অনাবিল শান্তি
২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:৫৪
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
ভৌগোলিক দিক থেকে ইউরোপ পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত। মূলত বিশাল ইউরেশিয়া ভূখণ্ডের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত একটি সুবিশাল উপদ্বীপ হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে প্রায় ৫০টি রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত এই মহাদেশের মোট জনসংখ্যা ৭৪.৫ কোটিরও অধিক। মহাদেশটিতে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক মুসলিম ভূখণ্ড। মানবসভ্যতার অন্যতম উজ্জ্বল ইউরোপে মুসলিম শাসন অবসানের পর ভূখণ্ডগুলো কোনোভাবে টিকে আছে।
ইউরোপে মুসলিম শাসন : মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ ও মুসা নুসাইরের আইবেরিয়া দ্বীপ হিস্পানিয়া (স্পেন ও পর্তুগাল) বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলমানদের আগমনের দ্বার উন্মুক্ত হয়। পরে মুসলিমরা এই অঞ্চলের নাম দেয় আন্দালুস। ইউরোপে যে রেনেসাঁ হয় তার ভিত্তিও মুসলমানদের কৃতিত্ব। হারিয়ে যাওয়া মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে আজকের স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস, সাইপ্রাস, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া ইত্যাদি।
স্পেন : আফ্রিকার মুসলিম সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদ প্রায় সাত হাজার সেনা নিয়ে ৪টি যুদ্ধজাহাজে জিব্রাল্টার প্রণালি অতিক্রম করেন। পরে যুদ্ধজাহাজগুলো পুড়িয়ে দেন তিনি। সৈন্যরা হতভম্ব! তারিক সামনে এসে দৃঢ় কন্ঠে বক্তৃতা রাখলেন। ‘বন্ধুগণ! আমাদের পশ্চাতে বিশাল জলরাশি। সামনে শত্রুদের অভয়ারণ্য। শত্রুদের হটিয়ে বিজয় অর্জন ছাড়া গত্যন্তর নাই। সবাই প্রস্তুত হও এবং এগিয়ে চলো’। এভাবে তারিক বিন জিয়াদ ৭১১ খ্রিস্টাব্দে স্পেন জয় করেন। পরবর্তী সময়ে এই প্রণালিটি তার নামানুসারে জাবালুত-তারিক (Gibraltar Straight) নামে পরিচিত হয়।
পর্তুগাল : পর্তুগালেও স্পেনের সমসাময়িককালে মুসলিম শাসন শুরু হয়। পর্তুগালে প্রায় ৫০০ বছর পর মুসলিম শাসনের যবনিকা হলেও দেশটির মুসলিম শাসকগণ ১১৩৯ সালে যে সীমান্ত স্থাপন করেছিলেন তারপর মূল ভূখণ্ডের সীমানায় তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি আজও। এছাড়া পর্তুগালের ১৭টি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থলের অধিকাংশ মুসলিম শাসনামলে আবিষ্কৃত বা নির্মিত। পর্তুগালে গর্বের সাথে বিশ্বব্যাপী প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি, কোইম্ব্রা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। মুসলিম শাসনামলে ১২৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত, এই মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্বের সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আদালবার্তো আলভেজ গত ৪৫ বছর ধরে পর্তুগালে মুসলিম শাসনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি আন্দালুসীয় যুগের আরবি কবিতা পর্তুগিজ ভাষায় অনুবাদ করেছেন। যার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে ইউনেস্কো তাকে শারজাহ পুরস্কারে ভূষিত করে। আলভেজ প্রায় ১০ বছর ধরে পর্তুগিজ ভাষায় ব্যবহৃত আরবি শব্দের একটি অভিধান তৈরিতে কাজ করেছেন। তিনি জানান, পর্তুগিজ ভাষায় প্রায় ১৯ হাজার শব্দ রয়েছে যা সরাসরি আরবি থেকে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ পর্তুগিজরা কোনো কিছুর আশা প্রকাশ করতে সাধারণত ওশলা শব্দটি ব্যবহার করে, যা মূলত আরবি ইনশাআল্লাহ শব্দের সরাসরি রূপান্তর।
গ্রিস : ১৪৫৮ থেকে ১৪৬০ সালের মধ্যে গ্রিসের বড় অংশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ১৮ শতকে গ্রিসের অধিকাংশ অঞ্চল মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। ১৯৩০ সালে মুসলিম শাসনের সমাপ্তি হয়।
সাইপ্রাস : সাইপ্রাসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর খালা (উম্মে হারাম বিনতে মিলহান) সমাহিত আছেন। এটি প্রমাণ করে, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই এই ভূখণ্ড মুসলিমদের ছিল একসময়।
হাঙ্গেরি : ১৫৪১ সালে হাঙ্গেরির বড় অংশে অটোমান শাসন চালু হয়। মুসলমানরা এখানে ১৫৮ বছর শাসন ধরে রাখে। অতঃপর ১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দে কার্লোভিটস চুক্তির (Treaty of Karlowitz) মাধ্যমে হ্যাবসবার্গ বা Habsburg এর নিকট মুসলিমরা হাঙ্গেরিকে ছেড়ে দেয় এবং হাঙ্গেরি মুসলিমদের হাতছাড়া হয়।
সার্বিয়া : ১৪৫৯ সালে মুসলিম অটোমানরা সার্বিয়া জয় করে। অতঃপর প্রায় ৩৫০ বছর সার্বিয়া মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮০৪ সালে প্রথম এখানে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং ১৮১৫ সালে দ্বিতীয় বিদ্রোহের পর স্বায়ত্তশাসিত হয় সার্বিয়া।
বসনিয়া : ১৪৬৩ সালে অটোমান সাম্রাজ্য বসনিয়া জয়ের মাধ্যমে এখানে মুসলিম শাসন শুরু হয়। এ সময় স্থানীয়রা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে চলে আসে। অটোমানদের ৪০০ বছরের শাসনে বসনিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
কসোভো : ১৪৫৫ সালে কসোভো অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ৪০০ বছরের মুসলিম শাসনে মানুষ ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। কসোভার জনগণ এখনো সকল মানুষের বাসভূমি হিসেবে বাস করছে।
দক্ষিণ ইতালি ও সিসিলি : ৮৩১ সালে মুসলিমরা সিসিলি জয় করে। আস্তে আস্তে নতুন নতুন এলাকায় মুসলমানদের শাসন স্থায়ী হয়। প্রায় ২৬০ বছর মুসলমানরা সিসিলিতে শাসন বজায় রাখে। নরম্যানরা এখন মুসলমানদের পাশাপাশি বাস করছে।
রাশিয়া : মহানবী সা.-এর ইন্তেকালের অল্প কিছুদিন পর রাশিয়ার মাটিতে ইসলামের আলো পৌঁছে যায়। ২০ হিজরিতে ওমর (রা.)-এর শাসনামলে সাসানিদের পরাজিত করে দাগিস্তানের ‘বাবুল আবওয়াব’ শহর জয় করেন সাহাবী সুরাকা ইবনে আমর (রা.)। এরপর থেকে দাগিস্তান ওই অঞ্চলে ইসলামের দুর্গ হিসেবেই ভূমিকা পালন করে আসছে। ‘দাগিস্তান প্রজাতন্ত্রে’ জন্মগ্রহণ করেন কিংবদন্তি স্বাধীনতা সংগ্রামী ইমাম শামিল। রাশিয়ার এই ভূখণ্ড সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পৃথক হয়ে যাবার পরও মুসলমানদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষও বসবাস করছে।
ফ্র্যাক্সিনেটে আমিরাত : ৯ম শতাব্দী থেকে মুসলিমরা দক্ষিণ ফ্রান্সের বেশ কয়েকটি অঞ্চল জয়ের পর ৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ফ্র্যাক্সিনেটে আমিরাত প্রতিষ্ঠা করে। এরপর কিছু মুসলিম ছাড়া ৯৭৫ সালে তারা আবার মুসলিম অঞ্চলে চলে যায়। তবে ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি ইসরাইল ন্যাশনাল নিউজে ‘Catholic France, Adieu; Welcome, Islam’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। যার সরল অনুবাদ, ‘ক্যাথলিক ফ্রান্স বিদায়, স্বাগতম ইসলাম। নিবন্ধটির সাবহেডিং ছিলো, ‘Minarets instead of church towers, muezzins instead of church bells.’ (চার্চ টাওয়ারের বদলে মসজিদের মিনার এবং চার্চ ঘণ্টার বদলে মুয়াজ্জিনের আজান।)
তুরস্কের অভ্যুদয় : অন্যদিকে ১৯০৮ সাল থেকে তুরস্কে তরুণদের বিপ্লবের ফলে দ্বিতীয় সাংবিধানিক যুগ শুরু হয়। বিপ্লবের ফলে ১৮৭৬ সালে তৈরি সংবিধান ও উসমানীয় সংসদ পুনরায় চালু করা হয়। ১৯১৪ সালের মধ্যে উসমানীয় সাম্রাজ্য ইউরোপের ও উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চল হারিয়ে যায়। এর মধ্যে অটোম্যান সাম্রাজ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পক্ষ অবলম্বন করে। যুদ্ধে জার্মানি ও অটোমানদের পরাজয় ঘটার পর ১৯১৮ সাল থেকে কামাল আতার্তুকের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর অটোমান সালতানাতের বিলুপ্তি ঘটিয়ে তুরস্কের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ খিলাফত বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়।
মুসলিম গৌরবের পুনরুদ্ধার : রাজনৈতিকভাবে মুসলিম শাসনের অবসান হলেও মুসলিমদের সংরক্ষিত দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, সংস্কৃতি ইত্যাদি আজও অম্লান। যার উত্তরাধিকারী আজকের মুসলিমরা। আন্দালুসের ইতিহাস আমাদের জন্য কেবল অতীত স্মৃতি নয়। ভবিষ্যতে হারানো ইসলামী গৌরব পুনরুদ্ধারের এক তাড়না। আমেরিকান গবেষক ও ইতিহাসবিদ ফিরাস আলখাতিবের হার্স্ট অ্যান্ড কোম্পানি, লন্ডন প্রকাশিত বই ‘লস্ট ইসলামিক হিস্টোরি : রিক্লেইমিং মুসলিম সিভিলাইজেশন ফ্রম দ্য পাস্ট’ (ইসলামের হারানো ইতিহাস : অতীত থেকে মুসলিম সভ্যতার পুনরুদ্ধার) সেই মুছে যাওয়া অবদানের কিছু নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। HHR Prince Charles ১৯৯৩ সালের ২৭ অক্টোবর Oxford এর Scheldonian Theatre-এ অনুষ্ঠিত Islam and the West শীর্ষক সেমিনারে বলেন, ‘সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিনির্মাণে ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে আমরা বেখবর। আর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক হুসাইন ওবামাও ২০০৯ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া বক্তব্যে মুসলিম সভ্যতার অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ইউরোপ-আমেরিকায় স্পেন অথবা মিশরের কর্ডোভা বা আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সমৃদ্ধ কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। ইউরোপের পুনর্জাগরণে এবং আলোকিত হবার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে এই ইসলামী সভ্যতা।’ অন্যদিকে তৎকালীন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেন, ‘ট্রাফালগার শব্দটি আরবি। পশ্চিম স্পেনের তারাফ আল-ঘার বন্দরে নেলসন ১৮০৫ সালে ফরাসি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। লন্ডনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্কয়ারের নাম আরবি। সেটি প্রমাণ করে, আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ইসলামের কাছে ঋণী।’ তিনি আরো বলেন, আমার পরদাদা ১৯০৮ সালে দক্ষিণ লন্ডনে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন মুসলিম এবং কুরআনের হাফিজ।’
ইউরোপে মুসলিম শাসনের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক উত্থান-পতনের নয়, বরং তা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। ইউরোপের স্পেনে চরম দমন-পীড়নের পরও আলহামরা বা কর্ডোভার স্থাপত্যের মতো সাংস্কৃতিক চিহ্ন আজও অম্লান। ইউরোপে মুসলিম শাসনামলের যে সভ্যতা শুধু ইউরোপ নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য বয়ে এনেছিল অনাবিল শান্তি। আজ ইউরোপে যে হানাহানি বিরাজমান তা থেকে রেহাই পেতে ইউরোপবাসী যুগে যুগে হারানো সেই সভ্যতার অনুসন্ধান করছে। শুধু সভ্যতা পুনরুদ্ধারের নেতৃত্ব দিতে হবে আজকের মুসলিমদের।
তথ্যসূত্র: আল-কুরআন, আল-জাজিরা, সাউদি গেজেট, হিস্ট্রি অব দ্য আরাবস: ফিলিপ কে হিট্টি, আল-বাওয়াবা।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com