প্রশাসন দলীয়করণের কবলে


২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:০০

রং পাল্টে ফ্যাসিস্টরাই সুবিধাজনক অবস্থানে

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থায় বিএনপির ব্যাপক দলীয়করণ ও রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিরোধীদল এবং নাগরিক নেতৃবৃন্দে পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠছে— সংস্কারের প্রতিশ্রুতির পরও প্রশাসনে যোগ্যতা ও মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, ফ্যাসিস্ট আমলের একই কালচারে ফিরে যাচ্ছে প্রশাসন। এ সুযোগে প্রশাসনের সুবিধাবাদী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা রং পাল্টে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করছে। দীর্ঘদিন বঞ্চিত ও কোণঠাসাদের মাঝে হতাশা তৈরি হয়েছে। ফলে স্থবির প্রশাসন নিয়ে বিভিন্ন মহলে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের প্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকা অনেক কর্মকর্তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পাচ্ছেন না— এমন অভিযোগ ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে ক্রমেই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারের বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ নিয়ে চলছে নানা প্রশ্ন। তাদের অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের অনেকে এখনো সমান সুযোগ পাচ্ছেন না।
প্রশাসনের প্রায় সর্বস্তরেই ঢিলেঢালা পরিস্থিতি। নিয়ন্ত্রণও দৃশ্যত শিথিল। শীর্ষ আমলাদের মধ্যে দায়সারা ও গা-ছাড়া ভাব। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার আগ্রহ কম। এ নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও অস্বস্তি বিরাজ করছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে পারস্পরিক আস্থাহীনতার ঘটনাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সরকারের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরগুলোয় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, একাধিক ধারায় বিভক্ত প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রুটিন ওয়ার্ক চালিয়ে গেলেও প্রশাসনের মধ্যম ও নিচের দিকে স্থবিরতা বিরাজ করছে। নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েও গতি আনতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার। প্রশাসন নিয়ে অসন্তোষের কথা সরকারের নীতিনির্ধারকদের মুখে মুখে। সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথাও বলছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ।
দলীয়করণে প্রশাসনে গা-ছাড়া ভাব
নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব যেভাবে প্রশাসন সাজানোর দরকার ছিল, এ সরকার তা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। শুরু থেকেই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশাসন সাজাতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে সরকার। তাদের ভাষায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে প্রশাসনের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। কর্মকর্তারা সরকারের নীতিকে তাদের নিজস্ব নীতি হিসেবে বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তা কয়েকটি ধারা থেকে পদায়ন হয়েছেন। ফলে তাদের মধ্যে বিএনপির প্রতি দায়বোধ নেই। শুধু রুটিন ওয়ার্ক করছেন।
অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা সোনার বাংলাকে জানান, মেধাবী ও দক্ষ হওয়ার পরও শুধু জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের নেতাদের তকমা না থাকায় তার পদোন্নতি আটকে আছে। বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তাদের দলীয় ট্যাগ না থাকায় তার পদোন্নতি দেয়নি আওয়ামী লীগ। পূর্বের সময় যারা পদোন্নতি ও পদায়ন বঞ্চিত ছিল, তাদের অনেকে এখনো বঞ্চিত রয়েছেন।
প্রশাসনে এখনো আওয়ামী প্রভাবের কথা উল্লেখ করে এক কর্মকর্তা জানান, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও শেখ হাসিনার জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের হাতে গড়া প্রশাসনের ধারাবাহিকতায় চলছে বর্তমান প্রশাসন। বর্তমান সরকার প্রশাসন সাজানোর ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী খুঁজতে গিয়ে সুবিধাবাদীদের পুনর্বাসন করছে। এ সুযোগে সর্বত্র আওয়ামী লীগের অনুসারী কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় স্থান করে নিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ১১টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে বিএনপিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনে দলীয়করণে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা কমিয়ে দেয়।
এ নিয়োগ পাওয়া ১১ জনই বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি বা সহযোগী সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতা। এর মাঝে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান পদে দলের সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবদুল বারী এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দলের সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম নিয়োগ পেয়েছেন।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জাকির হোসেন এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক করা হয়েছে সালাহউদ্দিন সরকারকে। তিনি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি।
বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মো. কামরুজ্জামান। বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন বেনজীর আহমেদ। তিনি বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে রাজনৈতিক এসব নিয়োগে প্রশাসনে ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি তৈরি হবে যা ভবিষ্যতে এ সরকারের জন্য সুখকর কিছু হবে না।
নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনেও দলীয় নিয়োগ
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ দেয়া হয় বিএনপি-সমর্থিত আমলা মো. সামসুল আলমকে। তার দলীয় কোনো পদ না থাকলেও তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য ছিলেন।
বিভিন্ন সূত্রমতে, বিএনপির বিগত সময়ে তারা নির্বাচন প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে ব্যাপক দলীয় নিয়োগ দেয়, যা এবারের নির্বাচনে সুফল পায়। তারই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনের উচ্চ পদে নিয়োগ দিল, যার সুফল তারা স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনসহ আগামীতে নেবে।
এ নিয়োগগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘একসঙ্গে এতগুলো সরকারি সংস্থার নেতৃত্বস্থানীয় পদে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ উদ্বেগজনক। শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতো নজরদারি সংস্থার শীর্ষ পদ থেকে স্থানীয় সরকারের প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে যত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সব ক্ষেত্রেই দলীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্যের সংস্কৃতি অনুসরণ করা হয়েছে। এসবের মাধ্যমে সরকার পরিষ্কারভাবে যে বার্তা দিচ্ছে, তা হলো এবার আমাদের পালা। এটা যে চূড়ান্ত বিবেচনায় আত্মঘাতী হবে, তারা সেটা উপলব্ধি করছে না।’
নির্বাচন কমিশনে দলীয় নিয়োগ সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব পদটি প্রশাসনিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় এই পদের ভূমিকা অপরিসীম। দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে এমন স্পর্শকাতর পদে বসানো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি করতে বাধ্য। এই সিদ্ধান্ত আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
এই সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য যেমন আত্মঘাতী, তেমনি বাংলাদেশর গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্যও অশনিসংকেত। আমি আশা করব, বিএনপি তাদের ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিসম্মান দেখিয়ে অবিলম্বে এই নিয়োগ বাতিল করবে।
রং পাল্টে ফ্যাসিস্টরাই সুবিধাজনক অবস্থানে
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে বৈষম্য কমবে— এমন প্রত্যাশা ছিল অনেক কর্মকর্তার মধ্যে। তবে এখনো মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগে হতাশা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন তারা। প্রশাসনের ১৫ ও ১৮তম ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তাদের অনেকেই আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে পদোন্নতি থেকে পিছিয়ে পড়েছিলেন।
তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেউ কেউ একাধিক ধাপে পদোন্নতি না পাওয়ায় দীর্ঘদিন একই পদে ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু কর্মকর্তাকে দ্রুত পদোন্নতি দিলেও, বঞ্চিতদের একটি বিরাট অংশ তখনো কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পাননি। বর্তমান সরকারের সময়েও অনেক কর্মকর্তা সংযুক্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে রয়েছেন বা তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিগত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেয়। তবে এই তালিকায় থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তালিকায় এমন কিছু কর্মকর্তার নাম রয়েছে, যাদের অতীত ভূমিকা বা চাকরি-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিতর্ক ছিল। এদের মাঝে অনেকেই বিগত আওয়ামী লীগের সময়ও সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল, এখনো তারা ভালো পদ বাগিয়ে নিচ্ছে। আইন মন্ত্রণালয়ের উপসচিক পদমর্যাদার সাবেক একজন পিএস বর্তমান সরকারের আমলে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন এবং এখনো মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তেই রয়েছে। এ অবস্থা অনেক মন্ত্রণালয়ের।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কিছুটা কমেছে। আগে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় যেসব ফাইল নিষ্পত্তি হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে। এতে সময় বেশি লাগছে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি তৈরি হচ্ছে।
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ গোলাম ফিরোজ আউয়াল বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারকে একাধিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, প্রশাসনিক প্রয়োজন ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি বা পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও পেশাগত দক্ষতাই মূল বিবেচ্য হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান সরকার সব কিছু লেজেগোবরে করে দিচ্ছে।
প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা রয়েছে এমন আলোচনা সচিবালয়ে রয়েছে। তাদের দাবি, এই ধরনের প্রভাবের কারণে অনেক সময় প্রকৃত যোগ্য কর্মকর্তারা পিছিয়ে পড়েন এবং তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। তাদের অভিযোগ, আগের মতোই বিএনপি সরকারে এসব পদ বাগাতে বিভিন্ন তদবির, টাকা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার লেনদেনের কথা শোনা যাচ্ছে।
প্রশাসন-সংশ্লিষ্টদের মতে, পদোন্নতি ও পদায়নে যদি মেধা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থা বাড়বে। একইসঙ্গে সরকারি কার্যক্রমেও গতি ফিরবে। তাদের মতে, অতীতের রাজনৈতিক বিভাজন থেকে বেরিয়ে একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়নে সরকারের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী— এ বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো ঘোষণা আসেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অতি নির্ভরতা
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার তার শোভাকাঙ্ক্ষী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের চিনতে না পেরে বিশ বছর আগে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের দিয়ে মন্ত্রণালয় চালাচ্ছে। ফলে বর্তমান এ আই যুগের জিনিয়াস কর্মকর্তারা বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছে না। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব তাদের অর্ন্তভুক্ত। তিনি বিগত বিএনপি সরকারের সময় এই মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দলের প্রতি আনুগত্যশীল ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়নের সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে পুরো সিভিল সার্ভিসের প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড বা জ্যেষ্ঠতার ধারাবাহিকতা ধ্বংস করছে। প্রশাসনকে গতিশীল করতে দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে কর্মরত দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সঠিক মূল্যায়ন করা জরুরি বলে তারা মনে করছেন। সাবেক আমলাদের ফিরিয়ে আনার কারণে নিয়মিত ও সিনিয়র কর্মকর্তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত বা যোগ্যপদে মূল্যায়ন না পেয়ে মনোবল হারাচ্ছেন যা তাদের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে বলে বলছে সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, সরকার প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায়ভিত্তিক পদোন্নতি এবং পদায়ন নিশ্চিত করতে পারেনি। কারণ আগের আমলের কর্মকর্তারাই পদোন্নতির ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকছে। আর সরকার দক্ষ ও সৎ লোকদের না খুঁজে তাদের আমলের পুরোনো লোকদের ফিরিয়ে আনতে গিয়ে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। এক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে।