সরকার জুলাইকে ধারণ না করায় গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না -মিয়া গোলাম পরওয়ার
২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:৫৫
স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে সরকার যথাযথ সম্মানজনকভাবে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়নি। তাকে সংবিধান প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। তাই তিনি দেশের জনগণ ও সংবিধান প্রদত্ত তাকে দেওয়া সম্মান, মর্যাদা রক্ষা এবং সাংবিধানিক পদের গুরুত্ব অটুট রাখতে ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা থেকে বিরত ছিলেন। অথচ তার বিরুদ্ধে অসত্য বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তিনি নাকি জুলাইকে ধারণ করেন না। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। সাথে সাথে তাদের উদ্দেশে আমাদের পরিষ্কার বক্তব্য, এরপর এমন আচরণের জবাব শুধু সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমেই দেওয়া হবে না।
গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংম্মেলনে এ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি ৭টি পয়েন্ট উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প উপদেষ্টা এডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও সরকারদলীয় চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনির বক্তব্যের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান। বক্তব্য শেষে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এতে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিরোধীদলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য আব্দুর রব, মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ সেক্রেটারি ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান; মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকারসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরী নেতৃবৃন্দ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের সাত মাসে সমন্বয়হীনতা, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর যে চেষ্টা করছে, তা হাস্যকর। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জুলাইকে ধারণ করে না— বিএনপির এমন অভিযোগ হাস্যকর। জামায়াতে ইসলামীই জুলাইকে ধারণ করে। সরকার জুলাইকে ধারণ না করায় তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না। তারা সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসাচ্ছে। তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সাংবিধানিক পদ, সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও যুবদলের লোকদের বসাচ্ছে। জামায়াতসহ ১১ দল জুলাইকে ধারণ করে বলে জনগণের দাবি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করছি। বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে না বলে গণভোটকে অস্বীকার করছে। গণভোটকে বাতিল করেছে। তা বাস্তবায়নে টালবাহানা করছে।
তিনি বলেন, জুলাই চেতনার বাইরে তারা পদক্ষেপ নিচ্ছে। সম্প্রতি সরকারি কর্মকমিশনে তারা হাত দিয়েছে। সেখানে তারা চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে পিএসসির চেয়ারম্যানসহ অন্য সদস্যদের পদত্যাগের কথা বলেছেন। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা এই দলীয়করণের বিরুদ্ধে চব্বিশের আন্দোলনে নেমেছিল।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমি চ্যালেঞ্জ করছি— যারা বলছেন, আমরা জুলাই চেতনা ধারণ করি না, তারা কতজন শহীদ ও আহত জুলাইযোদ্ধার বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দলীয় তহবিল থেকে কত টাকা খরচ করেছেন। এখন সরকারে আছেন, অভিযোগ আছে সরকারি তহবিল থেকেও ঠিকমতো টাকা এ খাতে খরচ করছেন না। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন ও জাদুঘরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না। অথচ জুলাই আহতদের চিকিৎসার জন্য আমীরে জামায়াত সবসময় পাশে ছিলেন। সারা বিশ্বে জামায়াতে ইসলামী নিজস্ব চেষ্টায় জুলাই শহীদদের স্মৃতি তুলে ধরতে এবং সংরক্ষণের জন্য তিনটি ভাষায় (বাংলা, ইংরেজি ও আরবি) বই প্রকাশ করেছে। সরকারের কোটি কোটি টাকার তহবিল থাকার পরও কোনো উদ্যোগ নেই।
তিনি আরো বলেন, বিএনপি তাদের নোট অব ডিসেন্টের ওপর অনড় থাকতে গিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, যা ফ্যাসিবাদী আচরণ। তারা নিজেদের মতো বিশেষ কমিটি করে সংবিধান সংস্কার না করে সংশোধনের পথে যাচ্ছে। তারা ভিন্নমত গ্রহণ করতে পারেনি, স্যাক্রিফাইস করেনি। জামায়াতের পাঁচটি নোট অব ডিসেন্টের ওপর তারা শক্ত থাকেনি। সংবিধান সংস্কার কমিটির মত মেনে নিয়েছে। বিএনপি ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্রকাঠামোকে রাখতে তাদের নোট অব ডিসেন্টের ওপর অটল আছে। সংবিধান সংস্কার না করে যেভাবে রাখা হচ্ছে, তাতে যিনি প্রধানমন্ত্রীই আসবেন, তিনিই ফ্যাসিবাদী হবেন।
ওসমানী উদ্যানে অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার যোগদানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, ওই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে নাম উল্লেখ না করা অসম্মানজনক। অথচ প্রতিমন্ত্রীদের নাম কার্ডে উল্লেখ করা হয়েছে। রুলস অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী, তিনি একজন পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদার অধিকারী। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রে যথাযথ সম্মান না দেওয়ার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে যাননি। ফলে আমরা এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি। প্রধানমন্ত্রী যে অসত্য ও হাস্যকর তথ্য তুলে ধরেছেন, আমরা তার নিন্দা জানাই।
তিনি বলেন, আমরা যদি সরকারের দুর্নীতি ও দলীয়করণ নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা নাকি রাষ্ট্রের বিরোধিতা করি। তারা এসব বলে একদলীয় কর্তৃত্ব কায়েম করার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদকে ও আওয়ামী লীগকে ফেরার পথ করে দিচ্ছে। বিরোধীদল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে সেটিকে জুলাইবিরোধী আখ্যা দিয়ে নিজেদের দলীয়করণ ও ব্যর্থতা আড়াল করার জন্য জুজুর ভয় দেখিয়ে সব দায় বিরোধীদলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা ফ্যাসিস্টদের কখনো আসার সুযোগ করে দিচ্ছি না। বরং সরকার বিরোধীদলের সমস্ত আন্দোলন উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে যে অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে, এ পথ দিয়ে সরকার ইচ্ছা করে আওয়ামী লীগকে ঢোকার পথ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার।
সংবিধান সংশোধনে বিরোধীদলের সহযোগিতা লাগবে কেন— এমন প্রশ্ন তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণ গণভোটে প্রায় ৭০ ভাগ ভোট দিয়ে সংবিধান সংস্কারের রায় দিয়েছে। তারা সংস্কার না করে জনগণকে বাইপাস করে সংবিধান সংশোধন করতে চায়। একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সরকার অসত্য তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার তীব্র নিন্দা জানান তিনি।
সরকার ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ফ্যাসিজম শিখেছে আওয়ামী লীগকে দেখে। কিন্তু রিজভী সাহেব সাত মাসেই তা ভুলে গেছেন। ফ্যাসিস্ট চিনতে হলে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে। চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, সরকারি পদে দলীয় লোক বসানোই ফ্যাসিবাদের পথ। জনগণের রায় উপেক্ষা করা ফ্যাসিবাদের পথ। গণভোটের রায় না মানা ফ্যাসিবাদের পথ। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গণরায় উপেক্ষা করা ফ্যাসিবাদের পথ। নিজের দলের জুলাই আহতদের জিজ্ঞেস করলেই ফ্যাসিবাদের পথ চিনতে পারবে বিএনপি। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে সেটিকে ফ্যাসিবাদের পথ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো জোট করিনি। যেমন চারদলীয় ও ২০ দলীয় জোট করা হয়েছে বিএনপির সঙ্গে। আমরা জামায়াতের প্রস্তুত করা কেয়ারটেকার সরকারের ফর্মুলা বাস্তবায়নের দাবিতে জাতীয় পার্টি, বাম দলসহ অনেক দলের সঙ্গে আন্দোলন করেছি। বিএনপি গণবিরোধী অবস্থানের কারণে ৯৬ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বিএনপির কারণেই আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেছিল। সে সময় স্বচ্ছ নির্বাচনের দাবিতে জনগণ আন্দোলন করেছিল। মাগুরা মার্কা নির্বাচন করেছে বিএনপি। ক্ষমতায় গিয়ে ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্রশিবিরকে উৎখাত করেছে। আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাঁটিনি। জনগণের দাবি আদায় করতে আমরা একত্রে আন্দোলন করেছি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগ যা করত, তা এখন করছে বিএনপি। সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না, ওয়াজ-মাহফিল করতে দেওয়া হচ্ছে না আমির হামজা এমপিকে। লাখো ভোটে নির্বাচিত এমপিকে ঠেকাতে না পেরে ওয়াজ-মাহফিলের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। বিএনপির মুফতিদের তাফসির মাহফিল করার আহ্বান জানান তিনি। আওয়ামী লীগ এ ধরনের কাজ করেছে বলেও সতর্ক করেন তিনি। রাজশাহীর সম্মেলন বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদের পথ থেকে ফিরে আসুন।
তিনি বলেন, মাদরাসাগুলোর ম্যানেজিং কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে। সরকার ফ্যাসিবাদী চিন্তায় দলীয় লোকদের বসাতে কমিটি ভেঙে দিয়েছে। গত ১৭ বছর শেখ হাসিনা এ পথেই হেঁটেছেন, পরে দিল্লি চলে গেছেন বলেও রিজভীকে স্মরণ করিয়ে দেন গোলাম পরওয়ার।
মিয়া গোলাম পরওয়ার ফ্যাসিবাদ কেমন এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রচলিত কথা আছে, ‘আদব শিখেছি কার কাছে? আদব শিখেছি বেয়াদবের কাছে’। তেমনি বাংলাদেশের মানুষ ফ্যাসিজমের স্বরূপ চিনেছে আওয়ামী লীগের কাছে। ফ্যাসিবাদ হলো, বিনা অপরাধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাউকে গ্রেফতার করা, যা এখন সরকার করছে।
তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতে ইসলামী জোট করেনি লিঁয়াজো কমিটি কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে ছিলো। এ ব্যবস্থার প্রবর্তক জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম। ডান-বাম সব রাজনৈতিক দল এ ব্যবস্থা বিভিন্ন নামে মেনে নিয়ে আন্দোলন করেছে। আন্দোলনে যাওয়ার আগে অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেব আব্বাস আলী খানকে ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কাছে পাঠিয়েছিলেন এ দাবি মেনে নিতে। তিনি তা মেনে নেননি।
সেক্রেটারি জেনারেল আরো বলেন, সরকারের কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ থেকে বিরোধীদলের এমপিদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। অনির্বাচিত নারী এমপিদের নির্বাচিত এমপিদের ওপর দারোগাগিরি করতে বসানো হয়েছে। এটি ফ্যাসিবাদের পথ। আমরা অসংলগ্ন আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। ভবিষ্যতে বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে আর যেন কোনো অসত্য তথ্য জাতির কাছে তুলে না ধরা হয়, সেই আহ্বান জানাই।