শকুনি মামার থাবায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস
২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:৪৬
॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির তিতুমীর কলেজের বাংলা প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী সুমি। ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়ে উন্নত ক্যারিয়ার গঠনের স্বপ্ন চোখে-মুখে তার। এমন স্বপ্ন নিয়ে ক্যাম্পাসের বর্ণিল প্রথম আয়োজন নবীনবরণে যোগ দিতে আসেন। যেটির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। তবে ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠানে আসা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে মনে। কারণ কলেজ অধ্যক্ষ ইতোমধ্যে অনুষ্ঠানকে বন্ধ করতে ছাত্রশিবিরকে নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার প্রয়াস অনলাইনে নজরে পড়েছে তার। এমন শঙ্কার মধ্যেও কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। আয়োজনে সন্তুষ্টি প্রকাশসহ ক্যারিয়ার গাইডলাইনের সেরা মোটিভেশনাল বক্তব্য তাকে আলোড়িত করে। নিজের এমন অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি।
গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সরকারি তিতুমীর কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের নবীন বরণ অনুষ্ঠান বন্ধ করতে কয়েকজন শিক্ষককে সাথে নিয়ে ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দকে নির্দেশ দিচ্ছেন অধ্যক্ষ ছদরুদ্দীন আহমেদ। সঙ্গে রয়েছেন কয়েকজন শিক্ষকও। এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকসহ গণমাধ্যমে ভাসতে দেখা যায়। ছাত্রশিবিরের দাবি তারা কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতিসাপেক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। তখন কোনো শর্ত দেয়া হয়নি, হঠাৎ অনুষ্ঠানের আগের দিন তা বন্ধ করতে নোটিশ টানানো হয়, যা পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। গত ১৪ অক্টোবর বুধবার রাতে তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ ছদরুদ্দীন আহমেদের সই করা হাতে লেখা একটি নোটিশে ১৫ অক্টোবর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাত্রীপূজার বিষয় উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তিতুমীর কলেজ শাখার নেতাকর্মীরা ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে একই সময়ে কলেজ শাখা ছাত্রদল থেকে নবীনবরণ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন।
পরে গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় তিতুমীর কলেজ মাঠে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ২০২৫-২৬ সেশনের প্রায় আড়াই হাজার নবীন শিক্ষার্থীকে নিয়ে নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রাম করেছে তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রশিবির।
ছাত্রশিবিরের এ অনুষ্ঠানকে বানচাল করার যে প্রচেষ্টা, তাকে ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখছে ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দ। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয় নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টির যে পাঁয়তারা তারই অংশ এটি, যার অনেকাংশই পরিকল্পিত ও দুরভিসন্ধিমূলক।
একইভাবে গত ১৭ অক্টোবর শনিবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিকল্পিতভাবে গরুর গোশত রান্না করা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে আড়ালে থেকে একটি পক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এতে কাণ্ডজ্ঞানহীন ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত দিয়ে পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে। ক্যাম্পাসে গরু জবাই নিষিদ্ধ করে নোটিশ জারি করে। পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করে ‘গরুভোজ কর্মসূচি’ পালন করে। ৯২ ভাগ মুসলিমের এ রাষ্ট্রে ও ক্যাম্পাসে মুসলিমরা গরু জবাই করে গোশত খাবে কি না, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিদ্ধান্ত দেয়া কতটা বুদ্ধিসম্মত— সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একইসঙ্গে ধর্মীয় ইস্যুকে পুঁজি করে ফায়দা হাসিলের যে একশ্রেণির সংস্কৃতি রয়েছে- সেটিকে ক্যাম্পাসের মতো জায়গায় স্পেস দেয়া স্বাভাবিক নয়। শৃঙ্খলা কিংবা পরিস্থিতি শান্ত করার নামে নোটিশ জারি করা, পাল্টা শুকর জবাই করার ঘোষণা— এগুলোকে স্বাভাবিক না ভেবে ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার জন্য শকুনি মামার থাবা বলতে দ্বিধার সুযোগ নেই।
জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মুস্তাফিজ রহমান বলেন, ‘৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি গরু জবাই নিষিদ্ধ করেছেন। আমরা মনে করি, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুভূতি ও অধিকারকে উপেক্ষা করার শামিল। এর প্রতিবাদ জানাতেই আজকের এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।’
অন্যদিকে জবি ক্যাম্পাসে গরু জবাইকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের এক নেতার ফেসবুক স্ট্যাটাস আরও ভয়ংকর বার্তা দেয়। ছাত্ররা কেন গরু জবাই করে খেলো, এর প্রতিবাদে গত ১৭ অক্টোবর শূকর জবাই করার ঘোষণা দেয় জবি ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিব সরকার। তার এ ঘোষণায় সামাজিকমাধ্যম আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে পরিবেশকে আরও জটিল করার চেষ্টা করে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর ক্যাম্পাসে মোড়লিপনা করার চেষ্টা জবি ছাত্রদলের পুরোনো। এর আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি রিয়াজুল ইসলামকে মেরে রক্তাক্ত করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়েছিল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এজিএসসহ আরও বেশ কয়েকজনকে বেদম মারধর করেছিল তারা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এসব ঘটনাকে ভালোভাবে নেয়নি।
ওই হামলার পেছনে জবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্নীতি ও ছাত্রদলের ক্যাডারদের টেন্ডার পাইয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছিল। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরসহ জকসু ছাত্র সংসদের নেতাদের দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের যে বরাদ্দ সরকার থেকে এসেছে তা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা হোক।
সম্প্রতি সেই বিষয়টি আবারো আলোচনায় এনেছেন জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ। গত ১৫ অক্টোবর তিনি নিজের ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘আজকে ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু ৭ একরে আবাসন নির্মাণের বিষয়ে আমরা এখনো কোনো আপডেট পাইনি। ২০ কোটি টাকা ব্যাংকে পড়ে আছে। ২০ কোটি টাকা কতদিন ব্যাংকে থাকলে কত টাকা ইন্টারেস্ট আসে এবং ব্যাংক থেকে কী কী উপঢৌকন পাওয়া যায়— এগুলো ১৭ হাজার শিক্ষার্থীর কাছে ক্লিয়ার করতে হবে। এই টাকা ব্যাংকে রেখে দেওয়ার জন্য যমুনার সামনে আমাদের ভাই-বোনেরা রক্ত দেয়নি। টাকা এসেছে আবাসন নির্মাণের জন্য; সেই টাকা দিয়ে আবাসন নির্মাণ করতে হবে এবং ১,৬০০ শিক্ষার্থীর জন্যই করতে হবে।’
সম্প্রতি জবিতে নেতাকর্মীদের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়কসহ ৮ নেতাকর্মী বহিষ্কার, একজনকে শোকজ করে কেন্দ্রীয় সংসদ।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর ক্যাম্পাসগুলোয় দীর্ঘসময় পর ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়। ছাত্রশিবির সমর্থিত ও নির্বাচিত ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধিরা ক্যাম্পাসে ব্যাপক পরিসরে শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও অন্যান্য বাম ও ডান ছাত্র সংগঠনগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সহাবস্থানে থেকে। যদিও ক্যাম্পাসগুলোর কোথাও কোথাও গণ্ডগোল বাঁধাচ্ছে ছাত্রদল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) উদ্যোগে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা সংস্কৃতির বিকাশ, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তার প্রসার এবং গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ‘প্রথম জাতীয় গবেষণা উৎসব ২০২৬’ আয়োজন করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গত ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার ও বুদ্ধিজীবী চত্বর প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবে অংশ নেয় দেশের ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সৃজনশীলতা ও উচ্চতর গবেষণার ক্ষেত্র করে দেয়। যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনকে বিকশিত করার সুযোগ পায়, এটি প্রত্যাশিত। ২০২৫ সালে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পর এর দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকা অনেক ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়। যার সুবিধাভোগী হতে শুরু করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কিন্তু অতীত রাজনৈতিক সংস্কৃতি এটিকে আবারো পেছনে টেনে নেয়ার চেষ্টা করছে। ক্যাম্পাসগুলোয় সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল শিক্ষার্থীবান্ধব তেমন কর্মসূচি দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে টানতে পারছে না। ফলে বেছে নিয়েছে পেশিশক্তির পথ। নিজের মোড়লিপনা করতে গিয়ে জড়াচ্ছে সংঘর্ষে, অস্থিতিশীল করছে ক্যাম্পাসের শিক্ষার ও গবেষণার পরিবেশ। তাদের আচরণ এমন— ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’। যার ফলে তিতুমীর কলেজে ছাত্রশিবিরের নবীনবরণ বানচালে নিজেদের নবীনবরণ অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা ও কলেজ প্রশাসনকে দিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধের হীন প্রচেষ্টা তারা করেছে। হিন্দুদের দুর্গাপূজার ঠিক আগে ধর্মীয় ইস্যুকে পুঁজি করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ফ্যাসিবাদী কৌশল নিয়েছে সংগঠনটি। অন্যদিকে জবিসহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে ছাত্রদল। জকসু নেতাদের ওপর হামলা এবং নিজেদের মধ্যেও মারামারি করছেন তারা।
ক্যাম্পাসগুলোয় শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লেজুড়বৃত্তিক ভূমিকা পরিহার করতে হবে নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে। যেকোনো ব্যক্তি, শিক্ষক বা দায়িত্বশীল ও কর্তাব্যক্তির রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা দোষের না, তবে তার প্রয়োগ যেন শিক্ষার্থীদের বা অন্য কারো অধিকার হরণ কিংবা ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল না করে সেটি নিশ্চিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উচ্চতর গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করতে এবং বহুমুখী ক্ষেত্র উন্মুক্তের প্রকল্প হাতে নেয়া সময়ের দাবি। কারণ শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ সম্পদ ও প্রতিভা। তাদের বিকশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশ।