টানা ছুটিতে ফাঁকা ঢাকা, আয় কমে কষ্টে দিনমজুররা


২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:৪৪

স্টাফ রিপোর্টার : হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে অনেকটাই বদলে গেছে রাজধানী ঢাকার চেনা কর্মব্যস্ততা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছুটি, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে গ্রামে ফিরেছে লাখ লাখ মানুষ। রাজধানী জনশূন্য। তবে এই ছুটি সবার জন্য স্বস্তি নিয়ে আসেনি। প্রতিদিনের কাজের ওপর নির্ভর করে যাদের সংসার চলে, সেই দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, গৃহকর্মী ও ক্ষুদ্র পেশাজীবীদের অনেকের জন্যই এ ছুটিতে আয় কমেছে, কারো কারো আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মানে কাজ কমে গেলে তাদের আয়ও কমে যায়। অথচ চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ কিংবা বাড়িভাড়া পরিশোধের দায় কিন্তু কমেনি। ফলে টানা এই ছুটি রাষ্ট্রের স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য কষ্ট বেড়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, দুর্গাপূজার নির্ধারিত ছুটির বাইরে অতিরিক্ত ছুটি জীবনযাপনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
রাজধানীর কর্মচাঞ্চল্য কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব শ্রমজীবী মানুষের জীবিকায়ও তৈরি হয় চাপ। যেসব এলাকায় প্রতিদিন অফিসগামী মানুষের ভিড়, নির্মাণকাজ, পণ্য পরিবহন ও ছোট-খাটো ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কাজের সুযোগ তৈরি হয়, সেখানে ছুটির প্রভাব পড়েছে। অফিসপাড়া ও ব্যবসাকেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় চা-দোকানি, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা, রিকশাচালক ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক পেশার মানুষের আয়ও কমে যায়।
পাঁচ দিনের ছুটি যেভাবে
২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এবার সরকারি ছুটি বাড়িয়ে টানা পাঁচ দিন করা হয়েছে। গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার থেকে ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিন দিন দুর্গাপূজার ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। এর মধ্যে ২০ অক্টোবর নির্বাহী আদেশে ছুটি, ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী উপলক্ষে সাধারণ ছুটি এবং ২২ অক্টোবরও নির্বাহী আদেশে ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের শুক্র ও শনিবারের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হয়েছে। আগের ছুটির সূচিতে গত ২২ অক্টোবর কর্মদিবস ছিল। পরে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে দিনটিতেও ছুটি ঘোষণা করা হয়। ছুটির সময়সূচি সমন্বয়ের অংশ হিসেবে গত ১৭ অক্টোবর শনিবার সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে অফিস খোলা রাখা হয়েছিল। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পেয়েছেন। দুর্গাপূজায় ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত ছুটির ফলে কর্মজীবী মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো এবং যারা উৎসব করবে তারাও উদযাপনের বেশি সময় পেয়েছেন।
ছুটির আনন্দের বাইরে দিনমজুরদের বাস্তবতা
একজন বেতনভুক্ত চাকরিজীবী ছুটির দিনেও নির্ধারিত বেতন পেতে পারেন। কিন্তু দিনমজুর বা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের ক্ষেত্রে হিসাবটি ভিন্ন। কাজ করলে আয়, কাজ না থাকলে আয়ও নেই। ফলে দীর্ঘ ছুটিতে কাজের সুযোগ কমে গেলে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব পড়ে। রাজধানীতে নির্মাণশ্রমিকদের একটি বড় অংশ দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন। ভবন নির্মাণ, মেরামত, মালামাল ওঠানো-নামানো কিংবা বাসাবাড়ি স্থানান্তরের মতো কাজের ওপর নির্ভর করে তাদের আয়। ছুটির সময় এসব কাজ বন্ধ বা সীমিত থাকলে শ্রমিকদের হাতে কাজ কমে যায়। একইভাবে গৃহকর্মী, দোকান ও বাজারকেন্দ্রিক শ্রমিক এবং অস্থায়ী কর্মীদেরও ছুটির সময়ে কাজ থাকে না। এমন টানা ছুটিতে রিকশাচালক ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের আয়ের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ে। অফিসগামী যাত্রী, শিক্ষার্থী ও নিয়মিত ক্রেতার সংখ্যা কমে গেলে তাদের আয়ও কমে যায়। দিনমজুরদের সংকটের বড় দিক হলো, তাদের অনেকেরই নিয়মিত সঞ্চয় বা বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নেই। এক দিন কাজ না পেলে পরের দিনের আয়ের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। কয়েকদিন কাজ বন্ধ থাকলে খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা চিকিৎসার খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিতে প্রভাব
দীর্ঘ ছুটির নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় লেনদেন ও প্রশাসনিক কাজের গতিও কমে। ছুটির মধ্যে উৎপাদন ও সেবামূলক কার্যক্রমের একটি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে যায়। বিশেষ করে দৈনিক মজুরির শ্রমিকদের কাজ বন্ধ থাকলে তাদের আয় ও ভোগব্যয় কমে যায়। এতে স্থানীয় বাজারে চাহিদাও কমে।
শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষায় কী করা প্রয়োজন
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে স্বস্তিতে ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারেন, সেজন্য পর্যাপ্ত ছুটি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে ছুটির প্রভাবে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী মানুষের জীবিকায় যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাজের সুযোগ, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক সুরক্ষা জরুরি।