সৌদি-হুতি সংঘাতের বিস্তার

রিয়াদ থেকে তায়েজ- পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে যুদ্ধের ঝুঁকি


২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:২৭

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতি আন্দোলন এবং সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে তীব্র হওয়া সংঘাত এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা। বিপরীতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বিমান হামলা চালিয়েছে। তাছাড়া ইয়েমেনের বিভিন্ন রণাঙ্গনে স্থলযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে রিয়াদসহ সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আক্রান্ত, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর ওপর প্রাণঘাতী হামলা এবং তায়েজে বেসামরিক লোক হতাহতের ঘটনা সংঘাতের ভয়াবহতা বাড়িয়েছে। যুক্তরাজ্য ও মিশর সৌদি আরবকে সহায়তার উদ্যোগও এই লড়াইয়ের আঞ্চলিক মাত্রা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সৌদি স্থাপনায় হুতিদের হামলা, সৌদি জোটের পাল্টা বিমান অভিযান এবং ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের স্থলযুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, বিমান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং তায়েজসহ বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক মানুষের ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে। উভয়পক্ষের সামরিক পদক্ষেপ আরও বিস্তৃত হলে লোহিত সাগরের নৌবাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নতুন করে চাপে পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বেসামরিক সুরক্ষা, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বে রাজনৈতিক আলোচনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কেন সংঘাত
ইয়েমেনে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ২০২৬ সালে ভেঙে পড়ার পর সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। জুলাইয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলায় সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আক্রান্ত হওয়ার পর উত্তেজনা বাড়ে। সেপ্টেম্বরে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে হুতিদের অগ্রযাত্রা ও সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযান পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতমুখী করে। এই প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ। গত ১০ থেকে ১২ অক্টোবর সময়ের মধ্যে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সৌদি স্থাপনায় দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর আসে। রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয় এবং বিভিন্ন এয়ারলাইন ফ্লাইট বাতিল করে। গত ১১ অক্টোবরের হামলার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকি দেয়।
গত ১৩ থেকে ১৫ অক্টোবর হুতিরা ধাহরানে সৌদি আরামকোর স্থাপনা, রিয়াদের বিমানবন্দর ও একটি তেল শোধনাগারে হামলার দাবি করে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ধাহরানে আরামকোর একটি ভবনে আঘাত ও সীমিত অগ্নিকাণ্ডের কথা নিশ্চিত করেন; সেখানে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সানায় হুতিদের অবস্থান লক্ষ করে বিমান হামলা চালায়। একই সময়ে ইয়েমেনের এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্সে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় পাঁচজন নিহত এবং ১৬ জন আহত হন বলে ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়। হুতিদের দাবি, স্থাপনাটি সৌদি সামরিক কার্যক্রমের কেন্দ্র ছিল।
গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্রের দাবি, অক্টোবরের প্রথম ভাগে রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে ২০টি হামলার চেষ্টা হয়েছে; এতে ১৭ জন নিহত ও ৩৩৩ জন আহত হয়েছেন। আবহা বিমানবন্দরে হামলায় তিনজন নিহত ও ২৮ জন আহত হওয়ার কথাও জোট জানায়। অন্যদিকে হুতিরা সৌদি হামলার জবাব দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
প্রাণহানি ও মানবিক সংকট
গত ১৯ অক্টোবর শনিবার শাবওয়া প্রদেশের আল-আলাম সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরে তিনটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ইয়েমেনের প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের হিসাবে গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩ হয়, নিখোঁজ ছিলেন ১৪ জন এবং আহত হন ২০০ জনের বেশি। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র দাবি করেন, শিবিরটি সৌদি বাহিনী পরিচালনা করত; সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি। গত ২০ অক্টোবর তায়েজের একটি আবাসিক এলাকায় হুতিদের হামলায় দুই কিশোরী নিহত ও ছয়জন আহত হন বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক তায়েজ অবরোধে বেসামরিক মানুষের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানান।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বাংলাদেশের প্রভাব
যুক্তরাজ্য সৌদি আরবের আকাশসীমায় প্রতিরক্ষামূলক টহলে টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, লক্ষ্য হবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা, হুতিদের স্থলঘাঁটিতে হামলা নয়। মিশরও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিমান দিয়ে সহায়তার পরিকল্পনা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সৌদিকে রসদগত সহায়তার কথা বললেও সরাসরি স্থলযুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখায়নি।
বাংলাদেশেও এ যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ একটি অনলাইন গণমাধ্যম গত ১৭ অক্টোবর শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলার কারণে ঢাকা থেকে ১১৪টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়; আটকা পড়েন ১৭ হাজার ৭০১ যাত্রী। প্রতিবেদনে নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি এবং আহতদের মধ্যে ২৭ বাংলাদেশির কথা বলা হয়েছে। তথ্যসূত্র : রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আল-জাজিরা এবং বিডিনিউজ।