ঝুলে গেল তিস্তা মহাপরিকল্পনা
২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:১৭
॥ জামশেদ মেহদী ॥
তিস্তা মহাপরিকল্পনার ভবিষ্যৎ আবার অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ‘সোনার বাংলার’ এই প্রতিনিধি অত্যন্ত উচ্চপর্যায় থেকে জানতে পেরেছেন যে, খুব সহসা চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে নামবে, সেই সম্ভাবনা আপাতত ঝুলে গেছে। এর সহজ-সরল কারণ হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা ৩টি বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক খেলার জালে আটকে পড়েছে। এই ৩টি দেশ হলো— ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীন নিয়ে খেলায় প্রথমে অংশীদার ছিলো না। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা জড়িত হয়ে পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রিসটেনসেন পিটার হাসের স্থলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। গত ১৫ জানুয়ারি সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র প্রদানের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির সাথে গত ৩ জুন ব্রেন্ট ক্রিসটেনসেন দেখা করেন। এই বৈঠকের পর থেকেই তিস্তা নিয়ে খেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জড়িত হয়ে পড়ে। ইতোপূর্বে এই খেলায় জড়িত ছিলো প্রধানত ভারত ও চীন।
তিস্তা নদীর পানিবণ্টন সমস্যা বহু পুরাতন। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই গঙ্গা তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশের সমস্যা ছিলো। তবে বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর শেখ মুজিবের আমলে ফারাক্কা বাঁধ চালু করার অনুমতিদানের মাধ্যমে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সমস্যা সৃষ্টি হয়। তিস্তা নিয়ে সমস্যা থাকলেও সেটিকে ততখানি হাইলাইট করা হয়নি। ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ড. মনমোহন সিং ঢাকায় আসেন। তার হাতে ছিলো তিস্তা চুক্তির খসড়া। ঢাকায় তার ঐ সফরকালেই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিলো। তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা চুক্তিটি স্বাক্ষরের জন্য এক পায়ে খাড়া ছিলেন। ঐ চুক্তিতে ছিলো— শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির ৪২.৫ শতাংশ পাবে ভারত এবং বাংলাদেশ পাবে ৩৭.৫ শতাংশ।
কথা ছিলো, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও আসবেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মমতা ব্যানার্জী বেঁকে বসেন। তিনি আর ঢাকায় আসেননি। বলেন, ঐ চুক্তিতে তিনি শামিল হবেন না। কারণ চুক্তিতে ভারত যে পানি পাবে, সেই পানি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের চাহিদা মিটবে না। পশ্চিমবঙ্গের আরো পানি চাই। ভারতের সংবিধানে আছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে যদি কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করে, সেই চুক্তিতে ভারতের যে অঙ্গরাজ্য জড়িত, সেই অঙ্গরাজ্যের সরকারের সম্মতি থাকতে হবে। তিস্তা নদীতে ভারতের ২টি রাজ্য জড়িত। একটি হলো সিকিম। অপরটি হলো পশ্চিমবঙ্গ। যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ বেঁকে বসে, তাই সেই যাত্রায় অর্থাৎ ২০১১ সালে আর তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।
আজ ২০২৬ সাল। মাঝখানে ১৫ বছর পার হয়ে গেছে। তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরে এক ইঞ্চিও অগ্রগতি হয়নি। আর এর মধ্যে অর্থাৎ এই ১৫ বছরে সিকিমে এবং পশ্চিমবঙ্গে অর্থাৎ তিস্তার উজানে ভারত আরো নতুন করে বাঁধ নির্মাণ করেছে। সুতরাং পানিপ্রবাহের জন্য যে পয়েন্টটিকে নির্ধারণ করা হয়েছিলো সেই গজলডোবায় পানির পরিমাণ গত ১৫ বছরে আরো অনেক কমে গেছে। এখন যদি ভারত কোনো পানি দিতে রাজিও হয়, তাহলে সেটি হবে, ‘ভিক্ষার চাল কাঁড়া আর আকাঁড়া’।
এদিকে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে দিনের পর দিন পানি কমে যাচ্ছে। তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল উত্তরবঙ্গের ৫টি জেলার অর্থাৎ রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, লালমনিরহাটের ২ কোটি মানুষের জীবনযাপন জড়িত। তারা দিনের পর দিন তিস্তার নায্য পানির দাবিতে সোচ্চার হচ্ছেন।
এই পটভূমিতে এগিয়ে আসে চীন। ততদিনে বাংলাদেশ বুঝে গেছে যে, তিস্তার ন্যায্য পানি পাওয়া যাবে না। সুতরাং বাংলাদেশের চাহিদা মেটানোর জন্য বাংলাদেশের অনুরোধে চীন একটি মহাপরিকল্পনা রচনা করে। এই মহাপরিকল্পনার সংক্ষিপ্ত সার হলো, চীনের প্রস্তাবিত তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (Teesta River Comprehensive Management and Restoration Project—TRCMRP)-এর মূল উদ্দেশ্য হলো তিস্তার ভাঙন নিয়ন্ত্রণ, নদী খনন, বন্যা মোকাবিলা, শুষ্ক মৌসুমের জন্য পানি সংরক্ষণ এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। এই মহাপরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য দিক হলো নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, ভূমি পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ঐ মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বাঁধ নির্মাণ এবং তীর রক্ষা ও সংশ্লিষ্ট বিশাল অবকাঠানো নির্মাণ করা।
চীন এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম পর্যায়ে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করে। উল্লেখ্য, পরিকল্পনার কাজ শুরুর আগে একটি নয়, দুটি জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই রিপোর্ট (Feasibility Study) প্রণয়ন করা হয়। এর পর দেশবাসী যখন আশা করছিলেন যে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে চীন সহসা নেমে পড়বে, তখন বাগড়া দেয় ভারত। ভারত চাচ্ছিলো নিজেরাই তিস্তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।
এ ব্যাপারে ভারতের ত্রিবিধ স্বার্থ ছিলো। প্রথম স্বার্থ হলো যেহেতু তিস্তা সিকিম থেকে শুরু হয়ে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তাই ভারতের উজানের বাঁধ, পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প ও সেচব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের ভাটির পানির চাহিদা একই নদীকে কেন্দ্র করে পরস্পর সম্পর্কিত।
ভারতের দ্বিতীয় স্বার্থ হলো শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা। ভারত আশঙ্কা করে যে, চীনা অর্থায়নে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বড় অবকাঠামো গড়ে উঠলে চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উপস্থিতি ভারতের সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চলের কাছে বাড়তে পারে। ভারত আরো আশঙ্কা করে যে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও প্রভাবের ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। ভারতীয় আশঙ্কাকে আমলে নেন ভারতের তাঁবেদার হাসিনা সরকার। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, চীনের পরিবর্তে ভারত তিস্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করুক, সেটি বাংলাদেশ পছন্দ করে।
ভারত তিস্তা নিয়ে বাগড়া দিলে কী হবে, এই ধরনের বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের কারিগরি যোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যে এস্টিমেট দিয়েছে, সেই এস্টিমেট মোতাবেক এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে খরচ হবে ১২ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা। তবে এর মধ্যে প্রায় ২ বছর পার হয়ে গেছে। এই ২ বছরে খরচ বেড়ে গেলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই।
ভারতের বাগড়া দেওয়ার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কেউ খুলে বলেন না। তার আসল ভয় হলো শিলিগুড়ি করিডোর। তিস্তা নদী বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাছে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। এই মিলনস্থল থেকে শিলিগুড়ি করিডোরের নিকটতম অংশের সরলরেখার দূরত্ব ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। এই নৈকট্যের কারনেই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে চীনের বড় অবকাঠামোগত উপস্থিতিকে ভারত কৌশলগত দৃষ্টিতে বিবেচনা করে।
২০২৪ সালের ৮ জুলাই শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চীন সফরে গমন করেন। তিনি চীনের কাছে অর্থনৈতিক সাহায্যের একটি ফর্দ দেন। ঐ ফর্দ মোতাবেক তিনি চান প্রাথমিকভাবে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৭০০ কোটি ডলার) ও পরবর্তীতে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০০০ কোটি ডলার), মোট ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (মোট ২৭০০ কোটি ডলার)। কিন্তু তার এই দাবি বা চাহিদার বিপরীতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে দিতে চান মাত্র ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার। কোথায় চাহিদা ২৭০০ কোটি আর কোথায় সেখানে প্রতিশ্রুতি মাত্র ১৪০ কোটি, অর্থাৎ ২ হাজার ৫৬০ কোটি ডলার কম।
ঐ সময়ের অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৮ জুন থেকে ১২-১৩ জুনের পত্রপত্রিকা যদি খুলে দেখেন, তাহলে দেখতে পাবেন, শেখ হাসিনা চীনের আচরণে ক্ষুব্ধ এবং অপমানিত হয়ে তার সফর ২৪ ঘণ্টা সংক্ষিপ্ত করে নির্ধারিত তারিখের ২৪ ঘণ্টা আগেই ঢাকা ফিরে আসেন। গত ১৭ অক্টোবর একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে, চীন থেকে খালি হাতে ফেরায় সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে এই ধারণার সৃষ্টি হয় যে অত্যধিক ভারতনির্ভরতার কারণে চীনের কাছে হাসিনার আর এক পয়সাও মূল্য নেই। হাসিনা ফেরার কয়েকদিন পরেই শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলন শুরু হয়, যেটি শেষ হয় ৫ আগস্ট।
এরপর আসে জুলাই বিপ্লোবত্তর অন্তর্বর্তী সরকার। এই সময় অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি (হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ) খলিলুর রহমান জানান, ড. ইউনূস চীনের কাছে আগামী ৫০ বছরের পানি ব্যবস্থাপনার মহাপরিকল্পনায় সহায়তা চেয়েছেন। চীন পানি সংরক্ষণ, বন্যার পূর্বাভাস, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ব্যবস্থাপনায় সহায়তার ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছে। তখন কথা হয়েছিলো যে, পাওয়ার চায়না নামক চীনা প্রতিষ্ঠান এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। অর্থনৈতিক ও কারিগরি দিকও তারাই সামলাবে।
২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি ব্রেন্ট ক্রিসটেনসেন বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির সাথে গত ৩ জুন বৈঠক করেন। তার পর থেকেই পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। আমেরিকা ঢুকে পড়ে তিস্তা সমস্যায়। ব্রেন্ট ক্রিসটেনসেন গত সেপ্টেম্বরে তিস্তা অঞ্চলে গিয়ে পানি ব্যবস্থাপনা, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। এ সম্পর্কে দেশি ও বিদেশি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট মোতাবেক মার্কিন পক্ষ থেকে কারিগরি সহায়তার আশ্বাসও দেওয়া হয়। দেশি ও বিদেশি পত্রপত্রিকায় বলা হয় যে, মার্কিন ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশকে জড়ানোর জন্য আমেরিকা এতদিন পর তিস্তা পরিকল্পনায় ইন্টারেস্ট নিচ্ছে।
এখনকার অবস্থা হলো, তিস্তা নিয়ে আমেরিকা এবং চীনের মধ্যে টাগ অব ওয়ার, অর্থাৎ দড়ি টানাটানির খেলা শুরু হয়েছে। এই খেলার বাইরে থাকার জন্য এখন বিএনপি সরকার বলছে যে, এই সরকার নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা কি বাংলাদেশের আছে? প্রশ্ন করেন কয়েকজন নদী ও পানি বিশেষজ্ঞ।
আগামী কয়েক মাসে এই দড়ি টানাটানির খেলার ফলাফল জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Email : jamshedmehdi15@gmail.com