সার ডিলার নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্যে নাকাল ভুক্তভোগীরা


২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:০৮

স্টাফ রিপোর্টার : কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির চালিকাশক্তি কৃষকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হন। সরলতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির টাউট তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, বঞ্চিত হয় গোটা দেশ। সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি প্রথমে নজরে আনেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। এ বছরের এপ্রিল মাসে তিনি জাতীয় সংসদের অধিবেশেনে বিষয়টি কৃষিমন্ত্রী প্রশ্নোত্তর পর্বে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কৃষকদের কাছে সঠিক সময়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে সার পৌঁছে দিতে দেশে মোট ১১ হাজার ৫ জন সার ডিলার নিয়োজিত আছেন। ‘অনিয়ম ও নীতিমালা লঙ্ঘনের’ অভিযোগে ২ হাজার ৩১১ জন ডিলারের তালিকা করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি দলের এমপি জিলানীর প্রশ্নে কৃষিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান ডিলারদের মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের নিয়োগ পাওয়া ৫ হাজার ৬৬৯ জন এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের নিয়োগ পাওয়া ৫ হাজার ৩৩৬ জন রয়েছেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নতুন তালিকা প্রকাশের পর বিতর্ক আরো বেড়েছে। সারা দেশে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তালিকা প্রণয়নে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতদের সুপারিশ উপেক্ষা এবং সরকারের দলের একটি বিশেষ গ্রুপের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে দেখে দেখে বিরোধীদল বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির কর্মী ও সমর্থকদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনপ্রতিনিধিদের একাংশ। তারা ডিলার নিয়োগে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। ৯ অক্টোবর নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, সারের লাইসেন্স দেওয়ার নামে অনৈতিক লেনদেনের চেষ্টা চলছে। ঈশ্বরগঞ্জের সরিষা ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি লেখেন, ‘কে কোথা থেকে কত পার্সেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি।’ তিনি এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দাবি করেন।
সরিষা ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া জিয়া এন্টারপ্রাইজের নাম উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল বলে দাবি করেছেন সংসদ সদস্য। তবে জেলা প্রশাসনের বক্তব্য, নিয়োগে নীতিমালার বাইরে কিছু করা হয়নি। নিয়োগ পাওয়া জিয়াউর রহমান ভূঁইয়াও ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সুত্রে প্রকাশ, এই টাকা কালেকশন করেছেন সচিবালয়ের শীর্ষ তিন দালাল, শামীম ওরফে মাইনুল শামীম, সবুজ এবং রিপনের মাধ্যমে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত ৯ অক্টোবর বিভিন্ন জেলার ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় সার ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত একাধিক প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়া, কুমিল্লা, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলার তালিকা রয়েছে।
গাইবান্ধায় অভিযোগ : গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সদস্য এবং যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সম্পাদক সাইদুর রহমান রয়েলের অভিযোগ সাঘাটা থানার প্রকাশিত তালিকায় ১নং পদুমশহর ইউনিয়নে যে নাম প্রকাশিত হয়েছে তার জন্য সচিব সেলিম খানের লোক দালাল শামীম ২৫ লাখ টাকা নিয়েছে। উপজেলা এবং জেলা থেকে প্রেরিত তালিকায় তার ভাই নাম ১ নং ক্রমিকে ছিলো, কিন্তু ফলাফল প্রকাশের সময় যে নাম প্রকাশ করা হয়েছে তার নামের মন্তব্যের ঘরে লেখা আছে জেলা প্রশাসন থেকে প্রেরিত সিরিয়াল নম্বর ১ যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
সচিব সেলিম খান সারা দেশ থেকে টাকা তোলার জন্য জেলা প্রশাসক থেকে সিলগালা করে প্রেরিত লিস্ট যাচাই-বাছাই করতে ২৪ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ কমিটি করলেও পরে ১ অক্টোবর জেলা প্রশাসক কতৃক প্রেরিত তালিকা প্রকাশ হওয়ার ভয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ করতে না দিয়ে তাদের হাত থেকে সেই কাগজ ফেরত নেন ফেনীর কৃষিকার্ড প্রোগ্রামের আগে। এর মাঝে যাদের লিস্ট সংগ্রহ করা দরকার সবাই করে ফেলেছে। আমরা সবাই তার বিচার চেয়ে হাইকোর্টে যাব।
গাইবান্ধারই আরেকটি উপজেলা, ফুলছড়ি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সালাম সরকার বলেন, আমার থানার এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নে যার ব্যবসা তো দূরের কথা, বাড়িঘরই নাই, যার নাম উপজেলা থেকে বাদ দিয়ে জেলায় পাঠানো হয়েছে, তার নামে নাকি সারের ডিলার হচ্ছে এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নে। যদি তাই হয় তবে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলনে নামবো আমরা।
নয়ন মণ্ডল যে গোডাউনের ঠিকানা ব্যবহার করেছে, সেটা বাস্তবে কোনো গোডাউন নয় অন্য একজনের পানের দোকান। সুতরাং তারে যদি কোনো অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ডিলার দেওয়া হয় আমরা তা মানবো না।
সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান জুয়েল এবং সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার যুগ্ম সচিব কামরুল হাসানের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক সুপারিশ উপেক্ষা করে একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং ডিলারপ্রতি তাদের নিয়োগকৃত দালালরা ২০-২৫ লাখ টাকা করে কালেকশন করে নিয়েছেন এবং তাদের দুজনের হাতে পৌঁছেছে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা। সেলিম খান যত টাকা ঘুষ দিয়ে সচিব হয়েছেন তার চেয়ে বেশি টাকা সে এক মাসেই তুলে ফেললেন। সচিব সেলিম খান আগস্টে রাজশাহীতে এক সভায় সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তালিকা প্রণয়নে দুর্নীতির অভিযোগ তার বিরুদ্ধেই বেশি।
সাবেক ফ্যাসিস্টদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে
আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাভোগী সেলিম খান গত ৫ আগস্টের পর বিএনপির সমর্থক বনে যান। স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মীর সরাফত আলী সপুর খালাতো ভাই পরিচয় দিলেও তা সত্য নয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেলিম খানের সঙ্গে দূরতম আত্মীয়তার সম্পর্কও নেই সপুর। দল ক্ষমতায় আসার পর কোনো সুবিধা না পাওয়া সপুকে কীভাবে ম্যানেজ করেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সারজিস আলমের অভিযোগ
ইউনিয়ন পর্যায়ে সার ডিলার নিয়োগে বিএনপির নেতাকর্মীরা হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য শুরু করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে এই অভিযোগ করেন তিনি। সারজিস লিখেছেন, প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন করে এক বা একাধিক সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইউএনও অফিসের মাধ্যমে সেই তালিকা ডিসি অফিসে পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, উপজেলা ইউএনও অফিস থেকে যে তালিকা পাঠানো হচ্ছে সেই তালিকা করছেন উপজেলা বিএনপির নেতারা। বিএনপি দল না করলে অন্য কোনো যোগ্য, নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ব্যক্তির নাম সেই তালিকায় আসার কোনো সুযোগ নেই। অথচ স্থানীয় বিএনপি নেতারা তাদের নিজেদের নামে, স্ত্রী, ভাই-বোন, বাবা-মায়ের নামে-বেনামে সেই ডিলারশিপ পাওয়ার সব অপচেষ্টা করছেন। সুযোগ থাকলে অনাগত সন্তানের নামেও লাইসেন্স করার চেষ্টা করতেন। তিনি লেখেন, যোগ্য হলে করতেই পারেন সেটা নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা তখনই যখন বিএনপির পরিচয় কিংবা লবিং ছাড়া নির্দলীয় কোনো ব্যক্তি সেই প্রাথমিক তালিকায় থাকার সুযোগটা পর্যন্ত পান না। বিরোধীদলের সমর্থনকারী হলে যত যোগ্যই হোক, কোনো সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত একটা ডিলারশিপের লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার দর স্থানীয়ভাবে উঠেছে ৩০-৩৫ লাখ টাকা! তিনি আরও লেখেন, যখন কোনো ব্যক্তি ডিলারশিপ পাওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করেন, তখন সেই অর্থ উঠিয়ে নিতে পরবর্তীতে যা করা দরকার, তিনি তাই করেন। এতে কৃষক বাঁচলো নাকি মরলো তা নিয়ে তাদের কিছু যায় আসে না। এভাবে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে বিএনপি তাদের নেতাকর্মীদের হাতে কিংবা তাদের ছত্রছায়ায় যারা আছে তাদের হাতে লাইসেন্স তুলে দিচ্ছে। এই লাইসেন্সধারীরা পরে অবৈধভাবে মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সরকার নির্লজ্জভাবে সেই সিন্ডিকেটের কাছে মাথানত করছে এবং মূল্যবৃদ্ধি করছে।
অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ‘ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের’ অভিযোগ উঠেছে। প্রকাশিত বিতর্কিত তালিকা বাতিল করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মাঝে ডিলারশিপ প্রদানের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন এবং কৃষিমন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর সোমবার দুপুরে গৌরীপুর প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন মেসার্স মুন্সী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও গৌরীপুর পৌর কৃষক দলের সভাপতি মো. গোলাম কাজীয়েল হাজাত মুন্সী (শাহী মুন্সী)। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শাহী মুন্সী বলেন, উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় অত্যন্ত গোপন প্রক্রিয়ায় সার ডিলার নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি নিজে ডৌহাখলা ইউনিয়নের ডিলারশিপের জন্য নিয়ম অনুযায়ী জামানত ও প্রয়োজনীয় সরকারি খরচ দিয়ে আবেদন করেছিলেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত লটারিতে তার আবেদনটি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হয় এবং লটারির ভিডিও অনুযায়ী তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে দাপ্তরিকভাবে তাকে কিছু না জানিয়ে চূড়ান্ত প্রকাশিত তালিকা থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করা হলেও উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন বা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে আবেদনকারীদের চূড়ান্ত তালিকা বা যাচাই-বাছাইয়ের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, একটি প্রভাবশালী চক্র প্রতিটি ডিলারশিপের বিনিময়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে এই তালিকা চূড়ান্ত করেছে। এ অনৈতিক লেনদেনের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন জেল-জুলুম সহ্য করা ত্যাগী নেতাকর্মী ও প্রকৃত ব্যবসায়ীরা অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এছাড়া সদ্য প্রকাশিত তালিকার অনেকেই বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত পরিবারের সদস্য বলে তিনি দাবি করেন।