ধরপাকড় ও সংঘাতে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ
১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৫৭
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশটির জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন, বিরোধীদলগুলোর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি এবং তরুণদের নেতৃত্বে রাজপথের আন্দোলন— সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।
আন্দোলন দমনে রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন, হাজার হাজার মানুষকে আটক, মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং জনসমাবেশের স্থান পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। গত ১২ অক্টোবর মঙ্গলবার বিরোধীদলগুলোর নেতারা সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে মিছিল করেছেন।
গত ১৩ অক্টোবরের মঙ্গলবারও আন্দোলনকারীদের আটক করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষা করতে চাইলে নরেন্দ্র মোদি নিজের গদি হারাতে হতে পারে। তারা অবিলম্বে দাবি মেনে নিতে সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ভোটার তালিকা থেকে কোটি কোটি নাম বাদ, বিতর্কের সূত্রপাত
আন্দোলনের শুরুটা কেমন ছিল? এর কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রমের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ায় বিতর্ক শুরু হয়। বিরোধীদলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নামও বাদ পড়েছে এবং এর ফলে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনী সুবিধা পাওয়ার জন্যই নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করেছে। রয়টার্সের ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশোধন কার্যক্রমে ১৩ কোটির বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তি, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ভোটার এবং ৩ কোটি এমন ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধীদের আশঙ্কা, বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে মুসলিমসহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য, তালিকা থেকে ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটাররা পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন। কমিশনের দাবি, মৃত, স্থানান্তরিত ও একাধিকবার নিবন্ধিত ভোটারের তথ্য যাচাই করে তালিকা হালনাগাদ করাই এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য।
নির্বাচন কমিশনের ভেতরের মতবিরোধ ঘিরে নতুন প্রশ্ন
বিতর্ক আরও তীব্র হয় নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের খবর প্রকাশের পর। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনার এসএস সন্ধু ও বিবেক যোশি বিভিন্ন সময়ে আপত্তি ও ভিন্নমত জানিয়েছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ১৪ বার তাদের লিখিত ভিন্নমত বা আপত্তির বিষয়টি উঠে এসেছে। কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এ ধরনের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। তাদের মতে, কমিশনের ভেতরেই যদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিরোধ থাকে, তাহলে ভোটার তালিকা সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে আলোচনার সময় ভিন্নমত থাকা অস্বাভাবিক নয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোও নির্ধারিত তথ্যনিরাপত্তা নীতির অধীনে পরিচালিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে বিরোধীরা শুধু ভোটার তালিকা সংশোধন স্থগিতের দাবি তুলছে না; প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা চান তারা।
কংগ্রেস থেকে বামপন্থী দল, এককাতারে বিরোধীরা
আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিসরও বিস্তৃত হয়েছে। কংগ্রেসের নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি (আপ), বামপন্থী দল এবং ইন্ডিয়া জোটের অন্য নেতারাও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। গত ৭ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করেন রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী সংসদ সদস্যরা। পুলিশ তাদের আটকে দেয় এবং কয়েকজনকে আটক করে। এরপরও বিরোধীরা একাধিক দিন প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যায়। গত ১০ অক্টোবর দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করা হয় বলে ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে। তাদের দলের অন্য নেতারাও পুলিশের হাতে আটক হন। একই সময় বামপন্থী রাজনীতিক ও সংসদ সদস্যদেরও বিক্ষোভের ঘটনায় আটক করা হয়। বিরোধীদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার তাদের রয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিবাদ কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করে সরকার ও প্রশাসন রাজনৈতিক বিরোধিতার জায়গা সংকুচিত করছে। অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, নির্বাচনে পরাজয়ের দায় নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে বিরোধীরা। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও সমালোচনা করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের সিইসির পদত্যাগ দাবিতে শুরু হওয়া কর্মসূচি বিরোধীদলগুলোর বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য প্রদর্শনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
তরুণদের নেতৃত্বে ‘ককরোচ’ আন্দোলন, রাজপথে নতুন শক্তি
আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে তরুণদের একটি অংশ আগে থেকেই শিক্ষা, চাকরি ও সরকারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি পালন করে আসছে। সিজেপির সমর্থকরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে চলতি মাসে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ করেছেন। তাদের সঙ্গে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ), বামপন্থী ছাত্রসংগঠন এবং নাগরিক অধিকারকর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন। রয়টার্সের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লি পুলিশ আগের দিন জনসমাবেশের নির্ধারিত স্থান হিসেবে যন্তরমন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সিজেপির নেতাকর্মীরা ব্যারিকেড অতিক্রম করে সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় সংগঠনটির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও অজিঙ্কা শিন্দেসহ প্রায় ২০ জন স্বেচ্ছাসেবককে আটক করা হয় বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করে প্রতিবাদের সুযোগ সংকুচিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে পুলিশ নতুন তিনটি স্থানে বিক্ষোভ আয়োজনের কথা জানিয়েছে। তরুণদের এই অংশগ্রহণ আন্দোলনকে শুধু প্রচলিত রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তবে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারী কিংবা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সংখ্যা থেকে পুরো ভারতের জনমত সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
১০ ও ১১ অক্টোবর ব্যাপক ধরপাকড়, বন্ধ ছিল মেট্রো স্টেশন
আন্দোলন ঘিরে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয় ১০ ও ১১ অক্টোবর। বিক্ষোভকারীদের জমায়েত ঠেকাতে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। রয়টার্সের ১০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই দিন দিল্লিতে দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের জমায়েত ঠেকাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। কেন্দ্রীয় দিল্লির কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ করা হয়। পরদিনও পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। হিন্দুস্তান টাইমসের ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, দিল্লিতে প্রায় ৭০০ জনকে আটক করা হয়েছিল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রায় ৪০ হাজার সদস্য মোতায়েন ছিলেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, আটক ব্যক্তিদের রাত ১০টার আগেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এদিকে বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আটক করার অভিযোগও উঠেছে। আল-জাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের একটি অংশ পুলিশের হাতে আটক হয়। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সও এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ধরপাকড় ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপ করে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
১২ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে বিরোধীদের মিছিল
রাজপথের আন্দোলন ১২ অক্টোবর নতুন মাত্রা পায়। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধীদলগুলোর সংসদ সদস্য ও সমর্থকরা নয়াদিল্লিতে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে মিছিল করেন। তাদের দাবি ছিল, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অভিযোগের বিচারিক পর্যালোচনা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিরোধী নেতারা ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে বিচারাধীন বিষয়ে আলোচনা করা বিচারিক নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় জানিয়ে প্রধান বিচারপতি তাদের আবেদন বা অভিযোগ যথাযথভাবে আদালতে দাখিলের পরামর্শ দেন। এরপর বিরোধীদলগুলোর পক্ষ থেকে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যৌথ আবেদন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মুম্বাই থেকে কলকাতা, দিল্লির বাইরেও ছড়িয়েছে প্রতিবাদ
এই আন্দোলন শুধু নয়াদিল্লিতে সীমাবদ্ধ নেই। মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যেও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ ও ভোটার তালিকা সংশোধন বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি হয়েছে। গত ৪ অক্টোবর মুম্বাইয়ে শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) ও মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা যৌথভাবে ‘বিরাট গর্জনা মোর্চা’ নামে প্রতিবাদ মিছিল করে। এতে উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরে অংশ নেন। মিছিলটির অন্যতম দাবি ছিল জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং মহারাষ্ট্রে এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল করা। রাজ ঠাকরে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের পরিবর্তে ব্যালট পেপার ব্যবহারের দাবিও তুলেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গেও কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আনন্দবাজার পত্রিকার ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কলকাতায় কংগ্রেসের অবস্থান কর্মসূচি চলছিল। তৃণমূল কংগ্রেসও রাজাবাজার থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত মিছিলের ডাক দেয়। রাজ্যভিত্তিক এসব কর্মসূচির রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক দলকে একই দাবিতে একত্র করেছে।
মোদি সরকারের অবস্থান : নির্বাচন কমিশনের পক্ষে, বিরোধীদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ
আন্দোলন তীব্র হলেও কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি বিরোধীদের অভিযোগ মেনে নেয়নি। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তুলে বিরোধীরা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে। রয়টার্সের ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে ভারতের কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বিশৃঙ্খলা তৈরির মাধ্যমে ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করছে কংগ্রেস। বিজেপির বক্তব্য, নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের দায় কমিশনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিরোধীদের রাজনৈতিক কৌশল। নির্বাচন কমিশনও ভোটার তালিকা সংশোধনে কোনো দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য, তালিকা থেকে ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে এবং সংশোধনের উদ্দেশ্য ভোটার তালিকাকে নির্ভুল করা।
অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নির্বাচন কমিশনের উচিত অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া এবং সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। রাহুল গান্ধী আন্দোলনকে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই বিরোধ এখন শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের পদে থাকা বা না-থাকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন পরিচালনার বিশ্বাসযোগ্যতা, ভোটারদের অধিকার, বিরোধী রাজনীতির পরিসর এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিরোধীদলগুলোর সম্পর্ক।
সরকার পতনের আন্দোলন, নাকি নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত?
ভারতের চলমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধীদের বক্তব্য ও কর্মসূচিতে নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। রাহুল গান্ধীও বলেছেন, নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে চলমান প্রতিবাদগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিরোধের সম্পর্ক রয়েছে। তবে আন্দোলনের প্রধান ঘোষিত দাবিগুলো হলো— জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি এবং ভোটাধিকার সুরক্ষা। আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব মোদি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও, সরকার পতনের জন্য সর্বসম্মত বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ১৩ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান আন্দোলনে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক সাধারণ ভোটারের আস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধীদল একই ইস্যুতে একত্র হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তরুণদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে বিস্তৃত করছে এবং পুলিশি ধরপাকড় ও সমাবেশের বিধিনিষেধ নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
সামনে কী হতে পারে
গত ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিশ্লেষকরা তিনটি বিষয় সামনে এনেছেন। প্রথমত, সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। যন্তরমন্তরে প্রবেশের চেষ্টা এবং নেতাদের আটকের ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, আন্দোলন ও প্রশাসনের মধ্যে সংঘাত এখনেই থামছে না। দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টে বিরোধীদের আবেদনের পরবর্তী অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অভিযোগের বিচারিক পর্যালোচনার পথ আরও স্পষ্ট হতে পারে। তবে আদালত কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা আগে থেকে অনুমান করা যায় না। তৃতীয়ত, আন্দোলনে বিরোধীদল, ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ কতটা স্থায়ী হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন রাজ্যে কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে বিরোধীদের রাজনৈতিক পরিসর আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত বৃদ্ধি পেলে জনজীবন ও রাজনৈতিক পরিবেশে চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।
ভারতের এই আন্দোলনের মূল ইস্যু নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া প্রতিবাদ এখন বিরোধী ঐক্য, তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নাগরিক অধিকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে এনেছে। ১৩ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, মোদি সরকার রাজনৈতিক চাপে রয়েছে। (তথ্যসূত্র : রয়টার্স, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস, আল-জাজিরা, প্রথম আলো ও আনন্দবাজার পত্রিকা)।