পদ্মা সেতুতে গতি, বরিশালের লঞ্চযাত্রায় ভাটা


২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪০

মো. নাজমুল হুদা, বরিশাল : পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। সড়কপথে যাতায়াতের সময় কমে যাওয়ায় ঢাকা-বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নৌপথে স্বাভাবিক সময়ে যাত্রী চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। একসময় রাজধানীমুখী মানুষের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিল লঞ্চ; বর্তমানে দ্রুত ও সময়সাশ্রয়ী হওয়ায় বাস ও ব্যক্তিগত পরিবহনের দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই।
২০২২ সালের ২৬ জুন যান চলাচলের জন্য পদ্মা সেতু উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই এ পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে থাকে। বিশেষ করে কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় যাতায়াতকারীদের একটি বড় অংশ এখন সড়কপথকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে একসময় যাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকা বরিশাল নদীবন্দর ও লঞ্চ টার্মিনালে স্বাভাবিক সময়ে আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে যাত্রীসমাগম।
সম্প্রতি বরিশাল লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, ঢাকাগামী যাত্রীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। পন্টুনে অন্যান্য সময়ের মতো নেই তেমন ভিড়। লঞ্চে ওঠার জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীর সংখ্যাও ছিল কম। ফলে পুরো টার্মিনালজুড়েই অনেকটা ফাঁকা ও নীরব পরিবেশ বিরাজ করতে দেখা যায়।
সুন্দরবন-১৬ লঞ্চের কর্মী মো. সোহাগ বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে লঞ্চে যাত্রী কমতে থাকে। বিশেষ করে কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও জরুরি কাজে ঢাকায় যাতায়াতকারীদের একটি বড় অংশ এখন সড়কপথ ব্যবহার করছেন। আগে নৌপথে ঢাকা যেতে দীর্ঘসময় লাগত। পদ্মা সেতুর কারণে সড়কপথে সময় অনেক কমে আসায় যাত্রীরা দ্রুতগামী সড়ক যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।’
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৮টি লঞ্চ চলাচল করলেও বর্তমানে এ সংখ্যা কমে ১ থেকে ৩টিতে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে লঞ্চের ডেকের ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা। সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা।
তবে স্বাভাবিক সময়ে যাত্রী কমলেও ঈদ ও বিভিন্ন ছুটির মৌসুমে নৌপথের চিত্র অনেকটাই বদলে যায়। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে-পরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাড়ি ফেরা এবং কর্মস্থলে ফেরার সময় লঞ্চগুলোয় দেখা যায় উপচেপড়া ভিড়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে বাড়ি ফেরার ক্ষেত্রে অনেকেই লঞ্চকে স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আরামদায়ক মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বন্দর নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, স্বাভাবিক সময়ে যাত্রী কমলেও বিশেষ দিবস, ঈদ ও ছুটির মৌসুমে নৌপথে যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। পদ্মা সেতুর কারণে নৌপথে যাত্রী কমেছে, তবে লঞ্চ যোগাযোগের গুরুত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। যাত্রীদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেবার মান উন্নত করা গেলে নৌপথে যাত্রী ধরে রাখা সম্ভব।
ঢাকাগামী যাত্রী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এখন আর তেমন একটা লঞ্চে যাতায়াত করা হয় না। তবে মাঝে মধ্যে হাতে সময় থাকলে লঞ্চে যাতায়াত করি। সড়কপথে সময় কম লাগে, কিন্তু লঞ্চে ভ্রমণের আলাদা স্বাচ্ছন্দ্য রয়েছে। বিশেষ করে রাতে যাত্রার ক্ষেত্রে লঞ্চে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকায় অনেকে এখনো নৌপথকে পছন্দ করেন।’
তিনি আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে যাত্রীদের চাহিদা ও যাতায়াতের ধরন বদলে গেছে। তাই নৌপরিবহন খাতকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিক, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। দ্রুত ও সময়সাশ্রয়ী হওয়ায় সড়কপথে যাত্রীদের আগ্রহ বাড়লেও নৌপথের গুরুত্ব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। স্বাচ্ছন্দ্য, রাতের ভ্রমণ ও ঈদকেন্দ্রিক বাড়ি ফেরার ক্ষেত্রে লঞ্চ এখনো অনেকের পছন্দের বাহন। ফলে সড়ক ও নৌ— দুই পথের নিজস্ব সুবিধা বিবেচনা করেই যাত্রীরা তাদের পছন্দের যোগাযোগমাধ্যম বেছে নিচ্ছেন। বরিশাল লঞ্চ টার্মিনালের স্বাভাবিক সময়ের ফাঁকা চিত্র সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।