৭ দফা দাবিতে ঢাকা-রংপুর লংমার্চ ১৯ সেপ্টেম্বর
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৩৭
স্টাফ রিপোর্টার : ৭ দফা দাবিতে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার ঢাকা-রংপুর লংমার্চ করবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এটি এ কমসূচির দ্বিতীয় পর্ব। গত ৫ সেপ্টেম্বর শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রথম লংমার্চে আশাতীত সাড়া পেয়েছে বলে ১১ দলের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। ১১ দলীয় ঐক্যের ৭ দফা হলো— ১. গণভোটের রায় বাস্তবায়ন : নির্বাচনে সংসদ সংস্কার বা জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে হওয়া গণভোটের গণরায় দ্রুত কার্যকর করা। ২. জুলাই গণহত্যার বিচার: ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যা ও নির্যাতনের দৃশ্যমান ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। ৩. সংকট নিরসন : জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টিকারী বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের সরবরাহ স্বাভাবিক করা। ৪. মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি বন্ধ : নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি এবং সব ধরনের দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করা। ৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি : দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটিয়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ৬. দলীয়করণ বন্ধ : প্রশাসন ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গনে সংকীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণের অবসান ঘটানো। ৭. দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ : দেশজুড়ে চলমান দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও সন্ত্রাস বন্ধ করা (এটি তাদের আগের ৬ দফার সাথে নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে)।
১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষনেতা জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, উল্লেখিত ৭ দফা ১১ দলীয় ঐক্যের দাবি নয়, এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রাণের দাবি।
ঢাকা-রংপুর লংমার্চ বাস্তবায়ন উপলক্ষে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রোববার দুপুরে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবেন ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির এক প্রস্তুতি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি এবং ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে একের পর এক ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কোনো বিষয়ে সংকট সৃষ্টি হলে, সংকট মোকাবিলায় সরকার বার বার যে অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে— তা জাতির কাছে স্পষ্ট। গত ৬ মাসে সংকট নিরসনে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার সিঙ্গেল ট্রাফিকে চলছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।
১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির প্রস্তুতি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী; এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী; বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী; বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার; এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা; বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এসএম ইউসূফ আলী ও মুখপাত্র নাজমুল ইসলাম; জাগপার সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন; বিডিপির জেনারেল সেক্রেটারি নিজামুল হক নাঈম; বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনে মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন।
ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা ও দেশের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ১১ দল ভূমিকা পালন করে আসছে। এ লক্ষ্যে জনগণের দাবি নিয়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রথম লংমার্চে আশাতীত সাড়া পেয়েছে ১১ দল। জনবান্ধব ইস্যু হওয়ার কারণে জনগণ সাড়া দিয়েছে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন; দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি রোধ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে দ্বিতীয় লংমার্চ ঢাকা-রংপুর শুরু হবে। সকাল ৭টায় জমায়েত, ৮টা পর্যন্ত উদ্বোধনী সমাবেশ হবে। পরে লংমার্চ রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করবে। পথে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধায় পাঁচটি পথসভা হবে এবং রংপুর জিলা স্কুল মাঠে গিয়ে সমাপনী সমাবেশ করা হবে।
তিনি বলেন, আমাদের লংমার্চ অব্যাহত থাকবে। আমাদের ৬ দফা দাবি এখন ৭ দফায় রূপান্তরিত হয়েছে। নতুন করে দুর্নীতি, দখলদারি, চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি যুক্ত হয়েছে। কারণ এসব বিগত ফ্যাসিস্ট আমলকে ছাড়িয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ১১ দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শুরু থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সংসদে নোটিশ দিয়ে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের জন্য সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন। কিন্তু সরকার প্রথম দিনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে গণভোটে প্রায় ৭০% মানুষের দেয়া রায়কে উপেক্ষা, প্রত্যাখ্যান করেছে, যা গণতন্ত্রের ওপর চপেটাঘাত এবং গণরায়ের প্রতি অবজ্ঞা।
ড. হামিদুর রহমান বলেন, দেশের তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন করতে পারেনি সরকার। সংকট নিরসনে বিরোধীদলীয় নেতা একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। বরং সংকটের কৃত্রিম অজুহাত দিয়ে তেলের দাম বাড়িয়েছে। তারা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে একের পর এক ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কোনো বিষয়ে সংকট সৃষ্টি হলে সংকট মোকাবিলায় সরকার বার বার যে অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে— তা জাতির কাছে স্পষ্ট। গত ৬ মাসে সংকট নিরসনে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার সিঙ্গেল ট্রাফিকে চলছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।
ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দেশে সার সংকট কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। এর জন্য গোটা জাতি খাদ্য সংকট ও ভোগান্তিতে পড়বে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এ সরকারের আমলে হু-হু করে বেড়েছে। বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। খুন-গুম অব্যাহত রয়েছে। অপহরণের ঘটনা ঘটছে। বিরোধীদলের ওপর হামলা করা হচ্ছে। জামায়াতের ৫ নেতাকর্মীকে খুন করা হয়েছে। এসবের প্রতিবাদে সংসদে আলোচনা ও রাজপথে ভূমিকা রেখে চলছে বিরোধীদল।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি দুর্নীতি দমনের কথা বলেছিল। কিন্তু তারা সরকার গঠনের পর দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্ধ হয়নি। জনজীবন দুর্বিষহ হয়েছে, জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে এবং অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐকমত্য দরকার, সেখানে সরকার বিরোধীদলের কোনো প্রস্তাবই আমলে নিচ্ছে না। সংসদে সংকটের সমাধান না হওয়ায় ১১ দল রাজপথে নেমেছে।
তিনি ১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা-রংপুর লংমার্চ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। সেইসাথে লংমার্চ কর্মসূচি ও সংশ্লিষ্ট পথসভাসমূহ সফল করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।