বিনিয়োগখরার চক্রজালে পুঁজিবাজার
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৫৩
॥ উসমান ফারুক ॥
দেশের পুঁজিবাজারে ধস ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগখরার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়ে প্রতিনিয়ত বাজার ছাড়ছেন। সরকারের সংস্কার কমিশন ও বিভিন্ন নীতিমালার ঘোষণা কেবল খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ থাকায় তারল্য সংকট ও আস্থার অভাব কাটছে না। এতে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্রান্তিকাল ও দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকটে ভুগছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। গত দেড় দশকজুড়ে দেশের পুঁজিবাজার যে টানা পতন, অনিয়ম ও কাঠামোগত অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বর্তমান অর্থমন্ত্রী বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগের কথার যে ফুলঝুরি উড়িয়েছিলেন, তা এখন কল্পকাহিনীতে পরিণত হয়েছে। নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আসার বদলে পুরোনো বিনিয়োগ চলে যাচ্ছে। পুঁজিবাজার যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।
এর জন্য নীতিনির্ধারকদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা, সুশাসনের অভাব, শেয়ার কারসাজির দৌরাত্ম্য, কারসাজি চক্রের বিচার না করা, সংস্কারের ধারা অব্যাহত না রাখা ও নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়াকে দায়ি করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, গত নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করার পর এখন পর্যন্ত শুধু পছন্দের ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেয়া ছাড়া আর কিছুই করেনি। দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি— যাতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা ভাজন হবেন। নতুন কোনো কোম্পানি এখনো বাজারে আসার সম্ভাবনা দেখায়নি। এভাবে শুধু কাগজে-কলমেই পরিকল্পনা সীমিত রেখেছে সরকার। এর ফলে প্রতিনিয়ত পুঁজি হারিয়ে চলছেন বিনিয়োগকারীরা।
যেমন ছিল আওয়ামী আমল
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরিচালনগত কাঠামো উন্নয়নের বদলে শুধু কল্পনানির্ভর কথাই ছড়ায় বাজারে। উল্টো একশ্রেণিকে সুবিধা দিতে একাধিকবার ফ্লোর প্রাইস ও কৃত্রিম কারসাজির দুয়ার খুলে দেয়া হয়। বিগত ১৫ বছর ধরে দেশের পুঁজিবাজারে যে উন্নয়নের গল্প শোনানো হয়েছিল, তার বড় একটি অংশই ছিল কৃত্রিম ও নীতিগত জটিলতায় ভরা। বাজারে দীর্ঘমেয়াদি গভীরতা বাড়ানোর চেষ্টা না করে কৃত্রিম উপায়ে সূচক ধরে রাখার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় শেয়ার দরপতন ঠেকাতে বিএসইসি প্রথম ফ্লোর প্রাইস প্রবর্তন করে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে তা তুলে নেওয়ার কথা বলা হলেও ২০২২ সালে পুনরায় তা চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফ্লোর প্রাইসের কারণে বাজারে স্বাভাবিক শেয়ার কেনাবেচা ও মূল্যায়নের পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফ্লোর প্রাইসের এই কৃত্রিম ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক সূচক প্রদানকারী সংস্থা ‘এমএসসিআই’ বাংলাদেশের নিয়মিত সূচক পর্যালোচনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছিল।
কৃত্রিমভাবে দর ধরে রাখার এই নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। তাতেই অচল হয়ে পড়েছিল পুরো বাজার। পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর পুঁজিবাজারে লেনদেন ও সূচকে সাময়িক উত্তাপ দেখা গেলেও সেই গতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
কয়েক মাসের ব্যবধানে গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির সরকার গঠন এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন করে সাজালেও বাজারের পুঞ্জীভূত সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। বারবার একই আইনি পরিবর্তন, কমিশন পুনর্গঠন এবং খাতা-কলমে নীতিগত আলোচনার কথা বলা হলেও বাজারে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। ২০২৪ সালের মার্চের পর থেকে অর্থাৎ আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও অনুমোদিত হয়নি।
ভালো কোম্পানির অভাবে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। আর বাজারে থাকা গুটিকয়েক ভালো শেয়ারের দরও ঊর্ধ্বমুখী। এখানে বিনিয়োগের বিপরীতে কোনো লাভ নেই। উচ্চ দরের এসব শেয়ার কেনার ক্রেতাও কমে গেছে। এভাবে সার্বিক তারল্য সংকটে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এই বিনিয়োগ খরার মধ্যে গত কয়েক মাসে পুঁজিবাজারে একের পর এক দরপতন ঘটেছে, আর উধাও হয়ে গেছে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজার মূলধন।
পরিকল্পনাগুলো কেবল সরকারি খাতা-কলমে বন্দি
সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাসের কথা বলা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের কোনো কার্যকর গতিশীল উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। বিগত সময়ের আইপিও স্থবিরতা, অর্থমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের চিত্র, বিদেশি মূলধন প্রত্যাহার, বিএসইসি ও ডিএসইর মধ্যকার টানাপড়েনে বাজার ও বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে বিদেশি তহবিলের প্রতিশ্রুতি দিলেও ৬ মাসে বিনিয়োগ আনতে পারেনি অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থমন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বৈচিত্র্যময় তহবিল ও নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা হবে। তবে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পেরিয়ে গেলেও বিদেশি তহবিল আনার সেই আশার বাণী বাস্তবে রূপ নেয়নি। উল্টো বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে অব্যাহতভাবে তাদের পুঁজি গুটিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পুঁজিবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিট ২২ কোটি ৩০ লাখ ডলার (যা দেশীয় মুদ্রায় দুই হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা) বের করে নিয়ে গেছেন। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও নিট ১ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের প্রত্যাহার করে নেয়। মূলত ২০২০-২১ অর্থবছর থেকেই নিট বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে, যার অর্থ কেনার চেয়ে বিক্রির পরিমাণ অনেক বেশি। গত জুলাই মাসেও বিদেশিরা বিনিয়োগ তুলে নিয়েছে বেশি। এর মানে হচ্ছে বিনিয়োগ করার বদলে আরো আস্থা হারিয়ে আগের বিনিয়োগ তুলে নিতে শুরু করেছেন বিদেশিরা।
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, সার্বিকভাবে বিনিয়োগকারিদের কেউ আস্থা দিতে পারছে না বাজারের প্রতি। এখন বাজারের অর্ধেক শেয়ারই জেড শ্রেণিতে রয়েছে। এমন বাজারে শেয়ারে বিনিয়োগ করার সুযোগ কম। আগে তো শেয়ার থাকা লাগবে। এজন্য বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন।
তিনি বলেন, আইপিও আনা লাগবে যেভাবে হোক। নতুন কোম্পানি না এলে তো নতুন বিনিয়োগ আসবে না। পুরোনো শেয়ারে তো সুযোগ কম। অন্যদিকে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সরকার তো চেষ্টা করছে নতুন কোম্পানি আনার। সবসময় শুধু বললেই হবে না, কিছু কোম্পানিকে বাধ্য করতে হবে বাজারে আসতে। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তো বাজারে আনা যায়। সেগুলো আসতে আমলাদের একটি অংশ বাধা দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আনতে হবে আগে। এজন্য নীতিগত অনিশ্চয়তাও দূর করতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগকারীদের অনেকেরই ফ্লোর প্রাইসের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের জন্যও একটু প্রণোদনা দরকার। বৈশ্বিক কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেভাবে কমে গিয়েছিল, তার বিপরীতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নেওয়ায় টাকার মান ক্রমাগত কমে গেছে— এটিও একটি কারণ নতুন বিনিয়োগ না আসার। এছাড়া ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা ও অর্থ পাচার দায়ী।
আওয়ামী লীগ সরকারের মতো ফাঁকা বুলিতে চলছে সরকার
ক্ষমতার রদবদল হলেও পুঁজিবাজার পরিচালনায় নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতিতে কার্যকর কোনো পরিবর্তন আসেনি। অতীত সরকারের আমলের মতোই বর্তমান নীতিনির্ধারকরাও নিয়মিত বাজারের আস্থা ফেরানো হবে, বহুজাতিক ও ভালো সরকারি কোম্পানি আনা হবে, নতুন আইন সহজ করা হচ্ছে— এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু মাঠে তার প্রয়োগ নেই।
খাতা-কলমে বাজারের জন্য ১৭ দফার নীতিগত সংস্কার এজেন্ডা, টাস্কফোর্স গঠন এবং গ্রিন চ্যানেল তৈরির ঘোষণা দেওয়া হলেও তার একটিরও বাস্তব বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও লাভজনক বহুজাতিক কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা উদ্যোগ দৃশ্যমান নেই এখনো। নীতিনির্ধারকদের ধারাবাহিক এই আশ্বাসের বাণী এবং বাস্তব কাজের মধ্যে যে বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে, তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর চরম হতাশাই সৃষ্টি করেছে।
আড়াই বছর ধরে নতুন প্রতিষ্ঠান আসেনি পুঁজিবাজারে
একটি গতিশীল পুঁজিবাজারের প্রাণসঞ্চার ঘটে নতুন ও ভালো মানের কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে। কিন্তু দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে তার ইতিহাসের দীর্ঘতম আইপিও খরার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ‘টেকনো ড্রাগস’ নামক একটি কোম্পানিকে আইপিও অনুমোদন দিয়েছিল বিএসইসি। এরপর থেকে দীর্ঘ আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি নতুন কোম্পানিকেও পুঁজিবাজারে আসার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বর্তমানে কোনো অপেক্ষমাণ তালিকাও নেই। আইন সংশোধনের নামে এই সময়টি পার করা হয়। আবার নতুন করে আইনি সংস্কার শুরু করেছে বর্তমান কমিশন। এতে আরো সময় লাগবে। সেই আইন হলে যদি নতুন কোম্পানি বাজারে আসে।
কমছে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ার
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বর্তমানে প্রায় ৩৯৫টি কোম্পানি ও ফান্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে, যার মধ্যে ১৯৫টি এ ক্যাটাগরি, ৭৪টি বি ক্যাটাগরি এবং ১২৬টি জেড বা দুর্বল ক্যাটাগরির। এর অর্থ হলো তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই দুর্বল বা জাঙ্ক শেয়ার। মৌলিক ভিত্তিসম্পন্ন ও ভালো লভ্যাংশ প্রদানকারী প্রকৃত বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা বাজারের মোট কোম্পানির তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। বাজারে নতুন ভালো শেয়ার সরবরাহ না থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তহবিল ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির ওপর নির্ভর করছে। এদের মধ্যেই কেনাবেচা চলছে। কিন্তু এসব ব্লু-চিপ বা মৌলিক ভিত্তিসম্পন্ন ভালো কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ইতোমধ্যেই অনেক উঁচুতে লেনদেন হওয়ায় এবং বাজারে নতুন জোগান না থাকায় বড় বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগ আনছেন না। এর ফলে বাজারে তরল মূলধনের স্বাভাবিক আবর্তন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও ডিএসইর মধ্যে দায় চাপাচাপি
পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক ধারাবাহিক পতনের জেরে বাজার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও টানাপড়েন প্রকাশ্যে এসেছে গত কয়েক মাসে। প্রকাশ্যে সভায় কমিশন চেয়ারম্যান মাসুদ খান পর্যন্ত সমালোচনা করেছেন ডিএসইর। গত এক মাসের ব্যবধানে সূচক শত শত পয়েন্ট হারিয়েছে এবং কেবল একটি একক ট্রেডিং সেশনে ডিএসইর সূচক ডিএসইএক্স ১০৩ পয়েন্টের বেশি পড়ে যায়, যা একদিনেই হাজার হাজার কোটি টাকার মূলধন ধসিয়ে দেয়। এর পেছনে স্টক ব্রোকার ও ডিএসইর অংশীজনরা অভিযোগ তুলেছেন যে, শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে এবং বড় অর্ডারে স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অযাচিত কড়াকড়ি ও হস্তক্ষেপের কারণে বড় বিনিয়োগকারীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। অন্যদিকে বিএসইসির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, কমিশন বাজারে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না এবং লেনদেনে অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়েনি। দরপতন চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক ফল।
কমিশন বদলালে সবাই নিয়ম বদলে হাত দেয়
এই দায় চাপাচাপি ও মার্জিন নিয়মের বারবার রদবদলের কারণে প্যানিক সেল বা আতঙ্কের বিক্রি তীব্র হয়ে বাজারে ধস নামিয়েছে। ব্যক্তি বিনিয়োগকারী আনিসুজ্জামান বলেন, কমিশন আসলেই শুধু নিয়মকানুনে রদবদল হয়। একই নিয়ম বারবার বদল হয়। শুধু মার্জিন ঋণ রুল ও আইপিও রুল গত এক বছরে দুইবার বদল হচ্ছে। বাজার উন্নয়নে তাদের নজর নেই। নতুন বিএসইসি কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করার পরও একই কাজ করছে। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন এবং বর্তমান নীতিনির্ধারকরা কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়। তারাও ছয়টির মত আইন বদল করে। প্রবিধি তৈরি ও সংস্কার করে। এবারের নতুন কমিশনেরও মূল মনোযোগ আটকে রয়েছে প্রবিধান সংশোধন ও আইনি সার্কুলার রদবদলে।
এ কারণে বর্তমানে দেশে ৬৬টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মার্চেন্ট ব্যাংক থাকা সত্ত্বেও জটিল নিয়মকানুন ও মূল্যায়নের অনিশ্চয়তার ভয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন আইপিও আবেদন জমা দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। মৌলিক ও অর্থনৈতিক সংকট সমাধান করে বাজারে তারল্য বাড়ানো বা উন্নয়নমূলক কাজ করার চেয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেবল আইনি চিঠি চালাচালি ও তদারকিতেই ব্যস্ত রয়েছে, যা মূল পুঁজিবাজার উন্নয়নকে পুরোপুরি আড়ালে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ যে গভীর আস্থা সংকটের মুখে পড়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কেবল খাতা-কলমে বা সভা-সেমিনারে ১৭ দফার পরিকল্পনা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। বিগত সময়ের ভুল নীতি, আইপিও স্থবিরতা এবং নীতিগত অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে অবিলম্বে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। একইসাথে বিএসইসি ও ডিএসইর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা দরকার। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা দেওয়া না গেলে, এই বিনিয়োগ খরার চক্রজাল দেশের সামগ্রিক মূলধনী অর্থনীতিকে আরও গভীর ঝুঁকিতে ফেলবে।