গণপ্রত্যাশা পূরণে অনীহা সরকারের
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:০৩
দূরত্ব বাড়ছে বিরোধীদলের সাথে
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
‘আমি বাঁশের ক্ষুদ্র লগি বলে/আমাকে ফেলিয়া গেলে/আমারে করিলে হেলা/বেলাশেষে ডুবিয়ে তোমার ভেলা।’— ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদ্যসমাপ্ত তৃতীয় অধিবেশনের পর এ প্রতিবেদকের মনে এ স্বগোক্তি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। কারণ অধিবেশনের কার্যক্রম গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দ্বিমত প্রকাশ করার সুযোগ নেই— ‘একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপির সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছে।’ বিরোধীদলের ন্যায়সঙ্গত দাবি এবং নির্বাচনের আগে জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন তো করছেই না; বরং তারা নিজেরাই স্বীকার করছে, জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করার কথা তারা অন্তর থেকে নয়, দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে যেনতেনভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য রাজনীতির চাতুরী হিসেবে বলেছিলেন।
বিরোধীদল ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা বিএনপি নেতাদের এমন স্বীকারোক্তির পর সুস্পষ্টভাবে কঠিন মন্তব্য করছেন। তারা বলেন, নির্বাচনের আগে এবং পরে গণভোট নিয়ে বিএনপির অবস্থান জনগণের সাথে সুস্পষ্ট প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়। সরকার প্রতিটি পদক্ষেপেই বিরোধীদলের মতামত ও জনআকাঙ্ক্ষা পদদলিত করছে। তারা মনে করেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে এর জন্য বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না, বিরোধীদলের সাথে দূরত্ব বাড়ার অর্থ জনগণের সাথে দূরত্ব বাড়া। এমন অবস্থায় রাজনীতি সংসদ থেকে রাজপথে উত্তাপ ছড়াবে— এটাই স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য সংসদের সাথে সাথে মাঠের রাজনীতিতেও সরব হয়ে উঠেছে। কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদ্যসমাপ্ত তৃতীয় অধিবেশনসহ প্রতিটি অধিবেশনেই জনগণের প্রত্যাশিত গণভোট উপেক্ষিত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধীদলের পরামর্শ এবং প্রস্তাবেও সরকার সাড়া দিচ্ছে না। উল্টো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের দেয়া প্রতিশ্রুতি, ‘নির্বাচিত হলে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী আইন পাস করবে না।’— এ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।
জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, বিরোধীদল, রাজনীতি বিশ্লেষক, জনগণের মতামত বিশ্লেষণ করে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক টানাপড়েনের বিষয়টি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে আরও স্পষ্ট হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সংসদের অন্যতম কাজ হবে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়নের ভিত্তি তথা আইন তৈরি করা— এমনটাই ছিল প্রত্যাশিত।’
বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন জনগণ দ্রুত আশা করেছিল। কিন্তু তৃতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার পরও এর কোনো লক্ষণ নেই। যদিও বিরোধীদলীয় নেতার ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান জাতীয় সংসদে বিষয়টি বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু সরকারি দল বিএনপি তা আমলে নেয়নি। বরং তারা আরো একটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, তা হলো কুরআন্ন-সুন্নাহবিরোধী সম্পত্তি হস্তান্তর বিল পাস করেছে এবং তা দ্রুত আইনে পরিণত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। কী সেই বিল? কেন বিএনপি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আদর্শ ইসলামের বিরুদ্ধে যায়— এমন গণতান্ত্রিক ও মৌলিক মানবাধিকারের চেতনাবিরোধী আইন পাস করতে এত তাড়াহুড়ো করেছে। এ কথা কারো অজানা নয়, ধর্মীয় বিধান পালনের দেশের সংবিধান এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদ স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। এ অধিকার হরণকারীরা চরম স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট।
কেন এত তাড়াহুড়ো : ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬ পাসের আগে শরীয়াহ বিশেষজ্ঞ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও আলেমদের মতামত নেয়ার দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। সরকারি দল তা গ্রহণ না করায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধীদলের সদস্যরা গত ৬ সেপ্টেম্বর রোববার সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।
তাদের প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট উপেক্ষা করে দাতার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগস্বত্ব সংরক্ষণ করে সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ রেখে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বিধান মুসলিম উত্তরাধিকার ও হেবা ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক মর্মে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধীদলের সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। গত ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সংখ্যায় সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়ার আমীনুত তালীম মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেকসহ একাধিক আলেম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীরসহ নেতৃবৃন্দের বক্তব্যসহ একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। শীর্ষ আলেমরা সবাই একমত যে, “ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে কার কতটুকু সম্পত্তি প্রাপ্য, তা কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত। সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক প্রয়োজন বা অন্য কোনো যুক্তির দোহাই দিয়ে আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত মিরাসের বিধানে পরিবর্তন বা সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। ইসলামী উত্তরাধিকারের নির্ধারিত অংশ পাশ কাটানো কিংবা মৃত্যুর পর সম্পত্তির বণ্টন নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এ প্রসঙ্গে জামে তিরমিযীর (২১১৭ নম্বর) হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছেন। অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই।’ তবে দাতার মৃত্যুর পর সব প্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ যদি স্বেচ্ছায় ও সম্মতির ভিত্তিতে কোনো বিষয়ে রাজি হন, তবে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কারণ তখন তা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তনের বিষয় থাকে না, বরং ওয়ারিশদের নিজস্ব সম্মতির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কন্যাসন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শরীয়তসম্মত ও বৈধপথ খোলা রয়েছে। একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি থেকে কন্যাকে হেবা বা দান করতে পারেন। তবে তা অবশ্যই শর্তহীন হতে হবে এবং হেবা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির মালিকানা ও প্রকৃত দখল গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। হেবা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার আগেই যদি দাতা মারা যান, তবে ওই হেবা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এবং সম্পত্তিটি দাতার সাধারণ উত্তরাধিকার সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ জীবদ্দশায় পূর্ণ মালিকানা হস্তান্তর করে সম্পত্তি দেওয়া বৈধ হলেও, মৃত্যুর পরের উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে হেবাকে মাধ্যম বানানো শরীয়তসম্মত নয়। পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যাসন্তান ও স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং দূরবর্তী আত্মীয়দের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে সমাজে নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে এসব সামাজিক বাস্তবতা বা মানুষের পছন্দ-অপছন্দ ইসলামী উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জীবদ্দশায় শর্তহীন ও শরীয়তসম্মত পন্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর এবং অন্যান্য অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই কেবল উদ্ভূত সমস্যার সমাধান খোঁজা সম্ভব।”
কিন্তু সেই সম্ভবকে অসম্ভব করে তুলেছে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংসদীয় স্বৈরাচারী শাসন। এমন তাড়াহুড়োর নেপথ্যে অতিসূক্ষ্মভাবে যে অপশক্তি কলকাঠি নাড়ছে তাদের টার্গেট তিনটি বলে এ প্রতিবেদনের অনুসন্ধানে জানা গেছে।
এক ঢিলে তিন পাখি মারার ষড়যন্ত্র : অপশক্তি এক ঢিলে তিন পাখি মারার ষড়যন্ত্র করেছে। সেই তিনটি টার্গেট হলো— ১. বিএনপিকে ইসলামবিরোধী প্রমাণ করা। এর মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক ইসলামবিরোধী শক্তির কাছাকাছি থাকার দুঃস্বপ্ন দেখছে। কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ঈমান নিয়ে খেলছে। যে সাহস সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা দেখায়নি। ২. কুরআন-সুন্নাহবিরোধী আইনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধীদল তীব্র আন্দোলন শুরু করলে, দেশে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটছে— এ বার্তা সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তিকে দেওয়া। ৩. হাসিনার কায়দায় মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ দমনের নামে ইসলামী চেতনা লালনকারী জনগণ ও প্রধান বিরোধীদলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার করে ফ্যাসিবাদ কায়েমের দুঃস্বপ্ন। এ দুঃস্বপ্ন বাস্তবায়নে ইসলামবিরোধী অপশক্তির সমর্থন। ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিশ্চিত করার ভয়ংকর খেলার মাধ্যমে সদ্য পতিত আ’লীগের মতো চিরবিদায় আমন্ত্রণ জানানো। পর্যবেক্ষকদের এমন পূর্বাভাসের কারণ রাষ্ট্রদর্শন ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
জনগণ ও তাদের প্রতিনিধি বিরোধীদলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কেউ টিকতে পারে না। তাই আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যা দিয়ে বিরোধীদলকে বিবেচনা করা হয় না। তাদের সমালোচনার যৌক্তিকতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুধু ক্ষুদ্রমনের মানুষরাই বিরোধীদলকে ক্ষুদ্র গণ্য করে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) এ আত্মঘাতী সংসদীয় স্বৈরাচারদের সতর্ক করে বলেছেন, A state which dwarfed its men, in order that they may be more docile instruments in its hands… will find that with small men no great thing can really be accomplished. (ভাবার্থ : যে রাষ্ট্র বিরোধীমত চূর্ণ করে জনগণকে নিছক অনুগত বানাতে চায়, শেষ পর্যন্ত তারা বোঝে তাদের মতে ক্ষুদ্রমনের মানুষকে নিয়ে কখনো মহান কোনো রাষ্ট্র গঠন করা বা সাফল্য অর্জন করা যায় না। তাদের এ ভুলের মাশুল রাষ্ট্রকেই দিতে হয়)। এখন প্রশ্ন হলো— সরকারের এমন স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে বিরোধীদলের বিরোধিতার সীমানা কতটুকু।
বিরোধীদলের বিরোধিতার সীমানা : জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য বর্তমানে প্রধান বিরোধীদল হিসেবে সংসদ ও রাজপথে সক্রিয় রয়েছে। অথচ সমালোচকদের একটি অংশ বলছেন, ‘বিরোধীদলের দুর্বলতার কারণে সরকার স্বৈরাচার হচ্ছে।’ আরেক দল বলছে, ‘৬ মাসেই বিরোধীদল অস্থির।’
এখন প্রশ্ন হলো— বিরোধীদল সংসদে ওয়াকআউট করছে, সভা-সেমিনার, লিখিত প্রস্তাব, স্মারকলিপি দিচ্ছে এবং রাজপথে মিছিল, মিটিং, লংমার্চ করছে। আর কী করার আছে? সংসদীয় গণতন্ত্র সরকার পতনের মতো তীব্র আন্দোলন কখন সমর্থনযোগ্য। এ প্রসঙ্গে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো কোনো অব্যর্থ সূত্র নাই। তবে পর্যক্ষেকদের অভিমত হলো, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রায়ে নির্বাচিত সরকার দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, মৌলিক অধিকার হরণ এবং ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে গণতন্ত্র হত্যা করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার ষড়যন্ত্র করলেই শুধু পতন বা মধ্যবর্তী নির্বাচন দাবি করা যায়। এছাড়া কোনো মতপার্থক্যের কারণে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা এবং বিরোধীদলের দৃষ্টিতে সরকারের জনস্বার্থবিরোধী কাজগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরে তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা-সমালোচনা, ওয়াকআউট, সভা-সেমিনার, বক্তৃতা-বিবৃতি, মিছিল-মিটিংয়ের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ করা ছাড়া করার কিছু নেই।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাস্কি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘বিরোধিতার মূল সীমা হলো সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আনুগত্য। সংসদীয় প্রক্রিয়ায় ওয়াকআউট বা বয়কট একটি স্বীকৃত সংসদীয় অধিকার। এ অধিকার বিরোধীদল তখনই প্রয়োগ করবে, যখন সরকারের একপেশে আচরণ তাদের সংসদীয় বক্তব্য প্রদানের সুযোগকে রুদ্ধ করে দেয়।’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন লক-এর Resistance to Tyrann (স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ) তত্ত্বানুযায়ী, ‘শাসক যখন নাগরিক অধিকার হরণ করে স্বৈরাচারী রূপ নেয়, তখন তার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা জনগণের মৌলিক অধিকার।’
এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং দেশের আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির প্রতিবাদ ও অর্থনৈতিক সংকট রুখতে রাজপথের আন্দোলনই এখন বিরোধীদলের সামনে সর্বশেষ প্রতিবাদের ভাষা।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ যখন তার কার্যকারিতা হারায় বা সরকার বড় ধরনের জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়, তখন রাজপথে সভা-সমাবেশ ও হরতালের মতো কর্মসূচি আসে। জনআকাঙ্ক্ষার ব্যাপক প্রতিফলন ঘটাতে কিংবা সরকার বৈধতা হারালে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি যৌক্তিক রূপ নেয়। তা ৬ মাস; এমনকি ৪ বছর পরও হতে পারে। আন্দোলনের সময় নির্ভর করে সরকারের আচরণের ওপর। এখনই যদি সরকার দাবি মেনে নেয়, বিরোধীদলও প্রতিবাদের ভাষা বদলাবে।
এ প্রসঙ্গে ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শীর্ষনেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার সুস্পষ্ট ভাষায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘তারা সরকার পতনের আন্দোলন নয়, জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করছেন। সরকার যেন স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট হয়ে না উঠতে পারে, জনগণের পক্ষ থেকে সেই ভ্যানগার্ড (Vanguard) হিসেবে দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে রাজপথে কঠোর কর্মসূচি মধ্যে আছে ১১ দলীয় ঐক্য।
১১ দলীয় ঐক্য ও বিএনপির বক্তব্য : ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘বিরোধিতার প্রাথমিক সীমানা ছিল সংসদে বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া। তেল, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তারা ১০টি প্রস্তাব দিলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। সংসদে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় আমরা রাজপথে লংমার্চের মতো কর্মসূচি দিচ্ছি। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য সরাসরি সরকার ফেলে দেওয়া নয়, বরং সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা। দাবি আদায় না হলে এই আন্দোলন ক্রমান্বয়ে কঠোর রূপ নেবে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বিরোধীদলের আন্দোলনের সীমানা প্রসঙ্গে বলেন, ‘লংমার্চ বা আন্দোলন করা বিরোধীদলের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে আন্দোলনের নামে যদি দেশে পরিকল্পিতভাবে অচলাবস্থা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয় এবং প্রতিবাদের গ্রহণযোগ্য সীমানা অতিক্রম করলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।’
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংসদে সরকারি দল বিরোধীদলের প্রতিবাদের ভাষা পড়তে ব্যর্থ হয়েছে। তাই রাজপথের উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে।
একনজরে তৃতীয় অধিবেশন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ২৭ আগস্ট শুরু হয়। শেষ হয় ১০ সেপ্টেম্বর। এই অধিবেশনে মোট ছয়টি বিল পাস হয়েছে। বিভিন্ন বিধিতে সংসদ সদস্যরা ১৫০টির বেশি নোটিশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য দেওয়া ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্নের মধ্যে উত্তর দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৬৭৮টির। এছাড়া ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ৩৫টি গঠিত হয়েছে এই অধিবেশনে। বাকিগুলো আগে গঠিত হয়েছিল। এই অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে মূল টানাপড়েন দেখা গেছে জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন এবং সংস্কার-সংশ্লিষ্ট তিনটি বিল পাসের প্রশ্নে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবের পাশাপাশি বেশকিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে কিছু আইনি সংস্কার আনা হয়েছিল। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আনা হয়নি। ফলে এগুলো কার্যকারিতা হারায়। আর সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়। এই অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে ছিল— সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ। প্রথম অধিবেশন শেষে সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, বাদ পড়া বিষয়গুলো নিয়ে আরও শক্তিশালী বিল পরবর্তী সময়ে আনা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধে নতুন দুটি বিল পাস করা হয়। তবে বিরোধীদলের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ সংক্রান্ত যে অধ্যাদেশ করা হয়েছিল, এর চেয়ে দুর্বল করে বিল দুটি আনা হয়েছে। এ দুটি বিল পাসের কোনো পর্যায়েই তারা অংশ নেয়নি। বিল দুটি উত্থাপনের প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউটও করেছিল বিরোধী দল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল কমিশনকে। নতুন আইনে বলা হয়েছে, কমিশন এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে। নতুন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে এই তদন্ত করবে শৃঙ্খলা বাহিনী। অবশ্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। অন্যদিকে মানবাধিকার কমিশন আইনে কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এবং শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল কমিশনকে। নতুন আইনে বলা হয়েছে, কমিশন এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। এর বাইরে র্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনের বিল নিয়েও একই ধরনের বিতর্ক হয়েছে। বিরোধীদলের অভিযোগ, নাম পরিবর্তন হলেও র্যাবের জনবল, সম্পদ, ক্ষমতা ও কাঠামো নতুন বাহিনীতে চলে যাচ্ছে। এটি কেবল ‘সাইনবোর্ড’ বদল।
জুলাই সনদ অনুসারে পদ বণ্টন হয়নি : তৃতীয় অধিবেশনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিরোধ ছিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি বিরোধীদল থেকে করার কথা। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধীদলের মধ্য থেকে নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। বিএনপি এই প্রস্তাবে একমত ছিল। সংসদে বিরোধীদলের আসন প্রায় ২৬ শতাংশ। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির মধ্যে ১০টিসহ মোট ১৪টি সভাপতি পদ পাওয়ার কথা বিরোধীদলের। কিন্তু পেয়েছে একটি। এই পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। সরকারি দল বলেছে, বিরোধীদল সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দিলে তাদের জুলাই সনদ অনুযায়ী সভাপতি পদ দিতে আপত্তি নেই। অন্যথায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হওয়ার পর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে বিরোধীদল এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কারের পক্ষে।
তৃতীয় অধিবেশনকে শুধু রাজনৈতিক সংঘাতের অধিবেশন বললে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং সার সংকটের মতো জনস্বার্থের বিষয়েও নোটিশ দিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। জ্বালানি সংকটের জন্য সরকার অতীতের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে সমাধানের পরিকল্পনা সংসদে তুলে ধরেছে। সার সংকট নিয়ে সরকার পর্যাপ্ত মজুদের কথা বলেছে। অপরদিকে বিরোধীদল বলেছে, কৃষকের কাছে সার না পৌঁছানোর মাধ্যমে সরকারের বিতরণব্যবস্থার ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে।