ব্রিকস দিল্লি ঘোষণা : কী পেল বিশ্ব
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৪৮
কূটনৈতিক প্রতিবেদক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থাৎ আমেরিকার একক প্রভাবমুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে গঠিত ব্রিকস (BRICS)-এর ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শেষে দিল্লি থেকে নেতারা চলে গেছেন যার যার দেশে। এখন প্রশ্ন একটাই— লক্ষ্য অর্জনে কতটা সফল ব্রিকস? প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়ে তাদের অর্জন কী?
নয়াদিল্লির প্রগতি ময়দান কমপ্লেক্সের ভারত-মণ্ডপমে ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন ১২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে শেষ হয়েছে। ব্রিকসের বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ সদস্য ১০টি দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও নতুন যুক্ত হওয়া ইন্দোনেশিয়া এবং এছাড়া সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো ‘পার্টনার কান্ট্রি’ এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন সংস্থার প্রধানসহ প্রায় ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি এবং জাতিসংঘের মহাসচিব অংশগ্রহণ করেন। সদস্য দেশগুলোর সর্বসম্মত সম্মতিতে ৪৫ পৃষ্ঠার ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬’ আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছে।
নয়াদিল্লি ঘোষণার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো—
১. স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারের তাগিদ : কোনো যৌথ একক ব্রিকস মুদ্রা চালু না করলেও, আন্তঃরাষ্ট্রীয় লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সহজীকরণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
২. একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের বিরোধিতা : বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নীতি লঙ্ঘনকারী একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য বাধা (যেমন কার্বন বর্ডার ট্যাক্স)-এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রকাশ করা হয়।
৩. বহুপাক্ষিক বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার : নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB)-এর কার্যক্রম আরও জোরদার করা এবং বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) সংস্কারে গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়।
৪. মহাকাশ ও কারিগরি ক্ষেত্রে সহযোগিতা : ব্রিকস মহাকাশ কাউন্সিল (BRICS Space Council) গঠন এবং টিভিইটি (TVET) কো-অপারেশন অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষায় যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৫. সন্ত্রাসবাদ দমন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা : আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের নিন্দা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমানো ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানানো হয়।
১৮তম ব্রিকস (BRICS)-এ শীর্ষ সম্মেলনকে গৃহীত দিল্লি ঘোষণাকে কীভাবে দেখছে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রশ্নের উত্তরে আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জের মাত্রা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলেছেন, সম্মেলনে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিয়ে একতরফা শুল্কারোপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়ম লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। এছাড়া ডলারের বিকল্প হিসেবে সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারের বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে ভারতের সভাপতিত্বে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় এতে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী চরম অবস্থান বা সাধারণ মুদ্রার (Common Currency) ঘোষণা আসেনি। ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক রক্ষা করে চলায় এটি আমেরিকার জন্য সরাসরি কোনো অর্থনৈতিক হুমকি তৈরি করেনি, বরং একটি বহু-মেরু (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে। বাংলাদেশের এ সম্মেলনে প্রতিনিধি না পাঠানোর কারণ হিসেবে হাসিনা ইস্যু সামনে আসলেও এর নেপথ্যে অন্য কারণও আছে বলে মনে করে বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের না যাওয়ার কারণ
কূটনৈতিক ভারসাম্য ও পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক : নতুন রাজনৈতিক পটভূমির পর বাংলাদেশ বিশ্বরাজনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে ঝুঁকতে চায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিশাল পোশাক ও রপ্তানি বাজার অক্ষুণ্ন রাখা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে শীর্ষনেতৃত্বের এই সফর এড়িয়ে যাওয়াকে একটি কারণ হিসেবে দেখা হয়।
দ্বিপাক্ষিক পরিস্থিতি : আয়োজক দেশ ভারতের সাথে বিদ্যমান কিছু দ্বিপাক্ষিক ইস্যু ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে এই মুহূর্তে উচ্চপর্যায়ের সফর আয়োজনের পরিবেশ পুরোপুরি অনুকূলে ছিল না বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদল হলে বাংলদেশের অবস্থানও বদলাতে পারে। কারণ ব্রিকস সৃষ্টির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শুরু হয়নি, এর মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানো।
পিছন ফিরে দেখা
এই জোটটির সৃষ্টি এবং নামকরণের ইতিহাস অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ব্রিক (BRIC) নামের প্রবক্তা জিম ও’নিল (Jim O’Neill)। ২০০১ সালে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর শীর্ষ অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল প্রথম ‘BRIC’ (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন) শব্দটি তৈরি করেন। জিম ও’নিলের মতে, এটি মূলত কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শুরু হয়নি, বরং উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর শক্তি প্রদর্শনের একটি ধারণা ছিল। পরবর্তীতে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হয়ে ‘BRICS’ নাম ধারণ করে। বর্তমানে ব্রিকসের ১১ সদস্যের সদস্যভিত্তিক সম্প্রসারণ নিয়ে তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সদস্য বৃদ্ধি করার চেয়ে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং নিজস্ব মূল লক্ষ্য অর্জন করা এই জোটের জন্য বেশি জরুরি।
ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সংসদ সদস্য শশী থারুর নয়াদিল্লি শীর্ষ সম্মেলনকে ভারতের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন। থারুর বলেছেন যে, ‘১১টি বড় অর্থনীতির দেশকে এক ছাতার নিচে এনে নয়াদিল্লিতে সম্মেলন আয়োজন করা ভারতের ‘কূটনৈতিক ক্ষমতা’ (Diplomatic Convening Power) এবং গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্বে দেশটির দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরে। তার মতে, ব্রিকস বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৪৯.৫% জনসংখ্যা এবং ৪১% জিডিপির প্রতিনিধিত্ব করে, যা বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যে পশ্চিমাদের আর উপেক্ষা করার সুযোগ দেয় না।’
অবশ্য শশী থারুর রাজনৈতিক দল নিখিল ভারত কংগ্রেস ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজের নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস এ সম্মেলনের অতিথির ওপর চাপানোরে সমালোচনা করেছে। রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন যে, ‘ভারতের প্রায় ৮০% মানুষ আমিষভোজী এবং ভারতের আমিষ পদ অত্যন্ত সুস্বাদু ও বৈচিত্র্যময়।’ কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করার নামে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র তার খাদ্যাভ্যাস চাপিয়ে দিয়েছেন বলে তিনি মনে করেন।
কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা অভিযোগ তোলেন, বিজেপি সরকার দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ ভারতীয়দের ওপর নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং এখন তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও বিশ্বনেতাদের ওপরও চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।