লংমার্চ : রাজপথ বনাম সংসদীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণ
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৫৫
॥ ফারাহ মাসুম ॥
চলমান লংমার্চ কর্মসূচি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ পাল্টে দিতে পারে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার কত লাখ মানুষ রাজপথে নামল— তা কর্মসূচির তাৎক্ষণিক শক্তি প্রকাশ করবে ঠিকই, কিন্তু এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে পরবর্তী রাজনীতির গতিপথের ওপর।
এই লংমার্চ কি ৭ দফাকে একটি কার্যকর নীতিগত আলোচনার টেবিলে নিতে পারবে, নাকি সংসদ ও রাজপথকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সংঘাত আরও বাড়াবে— আগামী ২০ সেপ্টেম্বর রোববার থেকেই মূলত দেশের রাজনীতির সেই নতুন সমীকরণ লেখা শুরু হবে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে ‘লংমার্চ’ কর্মসূচির তাৎক্ষণিক লক্ষ্য ৭ দফা দাবি নিয়ে সরকারকে রাজনৈতিক চাপে রাখা। কিন্তু রাজপথের এই দীর্ঘ যাত্রার তাৎপর্য কেবল এক দিনের শক্তি প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ নয়। গত ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর এটি তাদের দ্বিতীয় বড় আঞ্চলিক কর্মসূচি। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে শুরু হয়ে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধা হয়ে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাবেশের মধ্য দিয়ে যা শেষ হওয়ার কথা এ লংমার্চ।
বাহ্যিকভাবে এটি দাবিনামাকেন্দ্রিক কর্মসূচি হলেও এর নেপথ্যে নতুন বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে কয়েকটি মৌলিক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হচ্ছে— রাজপথ বনাম সংসদ, নির্বাচনী ম্যান্ডেট বনাম গণভোটের ম্যান্ডেট, প্রশাসনিক সংস্কার বনাম রাজনৈতিক সমঝোতা এবং জাতীয় পলিসি বনাম আঞ্চলিক বৈষম্য।
জোটে ঘোষিত মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে ‘সংস্কার পরিষদ’ কার্যকর করা, জুলাই গণহত্যার দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি-সারের সংকট সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চরম দলীয়করণ বন্ধ এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমন।
দাবিগুলোর রাজনীতি ও আইনি বাস্তবতা
সাত দফার অভ্যন্তরীণ প্রকৃতি এক নয়। প্রথম ভাগে রয়েছে সাংবিধানিক সংস্কার (গণভোট ও সংস্কার পরিষদ); দ্বিতীয় ভাগে বিচার ও রাষ্ট্র পরিচালনা (গণহত্যা বিচার ও দলীয়করণ বন্ধ); আর তৃতীয় ভাগে সরাসরি জনজীবন ও অর্থনীতি (জ্বালানি, সার ও নিত্যপণ্য)।
এখানেই তৈরি হচ্ছে আসল জটিলতা। সভা-সমাবেশ থেকে দ্রব্যমূল্য কমানোর দাবি তোলা সহজ, কিন্তু গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মতো সাংবিধানিক ইস্যু টেনে আনা জটিল। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া মানে জনগণের সম্মতি থাকা। কিন্তু সেই রাজনৈতিক সম্মতিকে সংবিধানের আনুষ্ঠানিক ধারায় রূপান্তর করতে হলে সংসদীয় প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সম্ভাব্য আইনি পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। গণভোটের রাজনৈতিক চাপ সংসদ ও আদালতের এখতিয়ারের সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ালে তা দীর্ঘস্থায়ী সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে পারে।
রাজপথ কি সংসদকে অতিক্রম করছে?
সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারায় প্রধান বিরোধীদলের মূল হাতিয়ার হওয়ার কথা ‘সংসদ’। কিন্তু বিরোধী জোট যদি সংসদের বাইরে ধারাবাহিকভাবে বৃহৎ রাজপথের কর্মসূচিতে মনোযোগ দেয়, তবে সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে আন্দোলনমুখী কৌশলের মিশ্রণ ঘটে।
এর দুটি ফলাফল হতে পারে— প্রথমত, সরকারের ওপর কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহির তীব্র চাপ তৈরি হওয়া। দ্বিতীয়ত, যেসব নীতিগত সিদ্ধান্ত সংসদ ভবনে আলোচনা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে হওয়ার কথা, সেগুলো নিয়মিত রাজপথের শক্তিতে মীমাংসার চেষ্টা করলে সংসদীয় কাঠামোর গুরুত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রশ্ন উঠছে— রাজপথ কি সংসদীয় প্রক্রিয়ার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, নাকি তাকে প্রতিস্থাপন করতে চাইছে বিরোধী জোট?
উত্তরবঙ্গ ও ‘তিস্তা’ রাজনীতি
ঢাকা-রংপুর রুট বাছাই কেবল কৌশলগত নয়, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে কৃষি বঞ্চনা, নদী সমস্যা ও শিল্পায়নে পিছিয়ে থাকার অভিজ্ঞতায় ক্ষুব্ধ। স্থানীয় পর্যায়ে জোট নেতারা তিস্তা মহাপরিকল্পনার দাবিকেও সামনে আনছেন।
তিস্তা অববাহিকার নদীভাঙন, বর্ষায় বন্যা ও শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট উত্তরের কৃষি ও অর্থনীতিকে অচল করে রাখছে। ফলে এই লংমার্চের ভাষা যদি স্রেফ দলীয় রাজনীতি না হয়ে আঞ্চলিক বঞ্চনা ও ‘তিস্তা ইস্যু’র সাথে সঠিকভাবে মিলে যায়, তবে উত্তরবঙ্গের কৃষিজীবী মানুষের সাথে কর্মসূচির এক গভীর রাজনৈতিক সংযোগ তৈরি হবে।
অর্থনীতির জটিল সমীকরণ ও দ্রুত ক্ষোভের রসদ
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার সংকটের সমাধান রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় দাবি হলেও এর অর্থনীতি বেশ জটিল। এলএনজি আমদানি, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, কৃষি ভর্তুকি, ডলারের বিনিময় হার এবং সরবরাহ শৃঙ্খল— প্রতিটির সাথে বহুমাত্রিক আর্থিক হিসাব যুক্ত।
একই কথা প্রযোজ্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও। শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত বা বাজার অভিযান চালিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। লংমার্চের চাপে সরকার হয়তো সাময়িক তদারকি বাড়াবে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে এটি দ্রুতই পরবর্তী আন্দোলনের প্রধান জ্বালানিতে পরিণত হবে।
একইসাথে শেষ মুহূর্তে যুক্ত হওয়া ‘দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি’র দাবি সরাসরি স্থানীয় ক্ষমতার অপব্যবহারকে নিশানা করে। এটি যদি নির্দলীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের (যেমন দুদক বা স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা) দাবি হয় তবে দীর্ঘমেয়াদি সুফল আসবে; অন্যথায় তা স্রেফ রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়িতে সীমিত হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
বিচারের বিশ্বাসযোগ্যতা বনাম দ্রুততার চাপ
জুলাইয়ের গণহত্যার বিচার দ্রুত ও দৃশ্যমান করার দাবি লংমার্চের অন্যতম কেন্দ্রীয় সুর। আবেগ ও ন্যায়বিচারের জায়গায় এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তবে রাজপথের চাপে বিচার ত্বরান্বিত করতে গিয়ে যদি তদন্ত ও প্রমাণের প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন হয়, তবে ভবিষ্যতে সেই বিচারের আইনি গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সরকারকে একদিকে যেমন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক মানের আইনি কাঠামোর বজায় রাখাও জরুরি।
এরই মধ্যে শেখ হাসিনার একটি মামলার পর ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া দ্বিতীয় আরেকটা রায় এসেছে ট্রাইবুনাল থেকে।
সম্ভাব্য চার দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত
আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের এই কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত চার ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে—
১. দ্বৈত রাজনৈতিক মেরুকরণ : দেশে বিরোধী রাজনীতির একটি নতুন ছাঁচ তৈরি হতে পারে, যেখানে সংসদীয় পথ ও রাজপথের চাপ একই সমান্তরালে চলবে।
২. উত্তরাঞ্চলের রাজনৈতিক দরকষাকষি : তিস্তা, কৃষি ও আঞ্চলিক উন্নয়ন মূলধারার রাজনীতিতে অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
৩. রাষ্ট্রীয় সংস্কারের গণঅঙ্গন : সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কার আর আইনজ্ঞ বা সংসদ সদস্যদের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজপথের জনদাবিতে রূপ নেবে।
৪. ইনস্টিটিউশনাল দুর্বলতার ঝুঁকি : রাজপথের শক্তিতে নিয়মিত সরকারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে স্থায়ী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
উত্তাপ কমাতে সরকারের করণীয়
পরিস্থিতি সংঘাতময় না করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকারের সামনে কয়েকটি বিকল্প খোলা রয়েছে :
১. সাত দফার প্রতিটি বিষয়ের ওপর সময়সীমা নির্ধারণ করে লিখিত প্রশাসনিক বক্তব্য বা ‘রোডম্যাপ’ প্রকাশ।
২. সংস্কার পরিষদ ও গণভোটের আইনি ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে সংসদে রাজনৈতিক সংলাপের উদ্যোগ।
৩. অর্থনীতিবিদ ও বিরোধীদের সাথে নিয়ে জ্বালানি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় পরামর্শক কমিটি গঠন।
৪. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে চাঁদাবাজি ও দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া।
এভাবে চাইলে সরকার রাজপথে তৈরি হতে যাওয়া আন্দোলনকে সংসদীয় ও নিয়মতান্ত্রিক অবয়বে রাখতে পারে। তা না করে প্রশাসনের শক্তি দিয়ে আন্দোলন দমন এবং সংস্কার নিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকলে একসময় পরিস্থিতির ওপর সরকার নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে।