জিন্নাহ, বাংলা ভাষা ও উর্দু


১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:৪৪

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ— শুধু একটি নাম নয়, এটি একটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। বিংশ শতাব্দীর যে কয়জন মনীষী মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তার জন্ম পাকিস্তানের করাচির এক ব্যবসায়ী পরিবারে। জিন্নাহর পিতা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তাই তিনি চাইছিলেন, ছেলে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্যবসায়ী হোক। তাই ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর তাকে প্রথমে ব্যবসা বিষয়ক লেখাপড়া করতে উদ্ধুদ্ধ করেন। কিন্তু জিন্নাহ ব্যবসা সংক্রান্ত লেখাপড়া করতে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি পড়লেন আইন, হলেন বিশ্বসেরা ব্যারিস্টার। আর সেই ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রতিষ্ঠা করেন মুসলিমদের জন্য একটি নিরাপদ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র পাকিস্তান। ১৯২০-এর দশকে যখন পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে মুসলিমদের একমাত্র পরাশক্তি উসমানিয়া খেলাফত ভেঙে খান খান হয়ে যায়, তার আড়াই দশক পর জিন্নাহ দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিমদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসভূমি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্যারিস্টার থেকে কায়েদে আজম
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর লেখাপড়ার হাতেখড়ি মাদরাসায়। তারপর মিশনারি স্কুল, সর্বশেষ ব্রিটেনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে আইনজীবী হন। তিনি প্রথমে করাচির সিন্ধ মাদরাসাতুল ইসলাম এবং ক্রিশ্চিয়ান মিশনারি সোসাইটি হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। এছাড়া কিছুদিন বোম্বাইয়ের স্কুলেও তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন।
১৬ বছর বয়সে তিনি তার বাবার ব্যবসায়ি বন্ধুর প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার জন্য লন্ডন যান। সেটি ছিল ব্যবসা সংক্রান্ত লেখা পড়া, কিন্তু তিনি ব্যবসা সংক্রান্ত শিক্ষানবিশির কাজ ছেড়ে দিয়ে আইন বিষয়ে পড়ার জন্য মনোনিবেশ করেন। তাই তিনি লন্ডনের বিখ্যাত আইন শিক্ষালয় লিংকনস ইন-এ আইন বিষয়ে ভর্তি হন।
মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি লিংকনস ইন থেকে সর্বকনিস্ট ভারতীয় হিসেবে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি লাভ করেন, যা সে সময় কোনো ভারতীয়র জন্য অত্যন্ত কম বয়সে অর্জিত এক বড় সাফল্য ছিল। এরপর তিনি ভারতে ফিরে এসে বোম্বাই হাইকোর্টে আইন পেশা প্রাকটিস শুরু করেন।
জিন্নাহর রাজনীতির শুরু কংগ্রেসে যোগদানের মাধ্যমে। জিন্নাহ ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা। কংগ্রেস নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলে জিন্নাহর ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাব দেখে তাকে ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সেরা দূত’ আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯২০-এর দশকে করমচাঁদ গান্ধীর উত্থান এবং পরবর্তীতে কংগ্রেস রাজনীতির হিন্দু মেরুকরণের ফলে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং মুসলিম লীগের নেতৃত্বে আসেন। বিশেষ করে মুসলিম লীগ নেতাদের পুনঃপুন অনুরোধের প্রেক্ষিতে তিনি মুসলিম লীগে যোগদান করেন। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই জিন্নাহ মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে থাকেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবের মানুষ হয়েও তিনি ভারতীয় মুসলমানদের দুর্দশা অনুভব করে একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের একচ্ছত্র দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই সময়েই উপমহাদেশের মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে তিনি হয়ে উঠলেন আস্থার প্রতিক ‘কায়েদে আজম’।
প্রফেসর আসাদুল্লাহ আল গালিব (হাফি.) বলেছেন, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে মুছে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়। অথচ ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানকে দিতে হবে। না হলে এই ভূখণ্ডের মানুষ না খেয়ে মরবে। কেননা চট্টগ্রাম হলো বাণিজ্যিক বন্দর এবং পাহাড়গুলির নিচে রয়েছে বিভিন্ন খনিজসম্পদের অমূল্য ভাণ্ডার। অবশেষে নেহরুকে পূর্ব পাঞ্জাব দিয়ে দেয়ার বিনিময়ে তিনি সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করেন। জিন্নাহর সেই আত্মত্যাগ ও দূরদর্শিতার কারণেই আজ আমরা স্বাধীনভাবে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যবহার করতে পারছি।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক মহিউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ১৯৪০-এর দশকে ভারতীয় মুসলমানদের প্রধান নেতা ছিলেন জিন্নাহ। মুজিবের নেতা ছিলেন সোহরাওয়ার্দী আর সোহরাওয়ার্দীর নেতা ছিলেন জিন্নাহ। সোহরাওয়ার্দীর কর্মী শেখ মুজিব, সবুর খান, শাহ আজিজ, ফজলুল কাদের চৌধুরী, তাজউদ্দীন, মসিউর রহমান— এদের কাজ ছিল বাংলার ঘরে ঘরে জিন্নাহ যে মহান নেতা আর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছাড়া যে বাঙালি মুসলমানের মুক্তি নেই— এটা প্রচার করা।’
জিন্নাহ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ একটি ফেডারেল টাইপের স্বাধীন ভারত চেয়েছিলেন। তিনি ভারতকে পাঁচটি বৃহৎ প্রদেশ করে ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। প্রতিটি প্রদেশকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ তিনটি প্রদেশে হিন্দুদের জন্য আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি প্রদেশ মুসলিমদের জন্য নির্দিষ্ট করতে চেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে জিন্নাহ এই শর্তে অখণ্ড ভারতের অধীনে থাকতে রাজি হয়েছিলেন যে, প্রদেশ এবং গ্রুপগুলোর হাতে প্রায় সব ক্ষমতা থাকবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু কংগ্রেস নেতাদের আপত্তি ও বিরোধিতার কারণে তিনি অখণ্ড ভারত চিন্তা ত্যাগ করেন। কংগ্রেস নেতাদের হিন্দুত্ববাদী ভূমিকা ও মুসলিমদের অধিকারকে অস্বীকৃতির কারণে জিন্নাহ মুসলিমদের নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি মুসলিম লীগের মধ্যমনি হয়ে ওঠেন। তার নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালে মুসলিমদের নিরাপদ রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পাকিস্তান তাকে জাতির পিতা হিসেবে ঘোষণা করে।
ঢাবিতে জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর
ডাকসুর সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর করা হয়েছে। ঢাবির এক আদুভাই ছাত্র, নাম তার আবু তৈয়ব হাবিলদার এ অপকর্মটি করেছেন। তাও আবার উর্দু বিভাগে অধ্যয়নকারী এ ছাত্র জিন্নাহর ছবি দেয়াল থেকে খুলে ভেঙেছেন। আদু ভাই ছাত্র, যিনি ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র।
অতি সম্প্রতি ডাকসুর সংগ্রহশালায় নতুন করে যুক্ত করা হয় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি। এর মধ্যে একটি ছবি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক অনুষ্ঠানের, যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। অপর দুটি হচ্ছে ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলগত ছবি, যেখানে জিন্নাহ রয়েছেন। অপর ছবিটি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি-সংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার প্রতিবেদনের পেপার কাটিং।
আবু তৈয়ব বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহসহ বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে শিবির। তিনি আরও বলেন, ‘এই ডাকসুতে, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এই বাংলাদেশে জিন্নাহর মতো কোনো ভিলেন, গোলাম আযম-নিজামীর মতো কোনো ভিলেন আমাদের নায়ক হতে পারে না, নায়ক হতে দেব না।’
রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা নয়, হিন্দির পক্ষে
বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন না। ১৯১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি গান্ধীর হিন্দি ভাষার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে প্রশ্নের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, Hindi is the only possible national language for inter-provincial intercourse in India. অর্থাৎ ভারতের আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা হিসেবে হিন্দিই একমাত্র সম্ভাব্য ভাষা।
শান্তিনিকেতনে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য তিনি আন্দোলন করেন। তার এই আন্দোলনে তাকে সাহায্য করেন ভাষা বিজ্ঞানী সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ও ক্ষিতিমোহন সেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে হিন্দি জানতেন না, কিন্তু হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন। এমনকি শান্তি নিকেতনে হিন্দি ভাষার চর্চার জন্য রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দি ভবন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
শুধু কি রবীন্দ্রনাথ? বাংলা সাহিত্যের হিন্দি সকল সাহিত্যিক ছিলেন হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে। রমেশচন্দ্র মজুমদার, যদুনাথ সরকার, মেঘনাদ সাহা, সুকুমার সেন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বালাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল) কেউই ভারতের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে হিন্দির বাইরে বাংলাকে নিয়ে ভাবেননি। এমনকি ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ এর কবি জীবনানন্দ দাসও চেয়েছিলেন হিন্দিই হোক ভারতের রাষ্ট্রভাষা।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে-বিপক্ষে অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভূমিকা দ্বিচারী। ভারতের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন হিন্দির পক্ষে আর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন বাংলার পক্ষে। এমনকি তার লেখনীর মাধ্যমে তিনি ভাষা আন্দোলনকে প্রমোট করেছেন। ভাষা আন্দোলনের মৃতদের উদ্দেশ্যে তিনি লেখেন, “প্রাণ দিল যারা ভাষার জন্যে কি হবে না তাদের? জয় তো তাদের হয়েই রয়েছে জনতা পক্ষে যাদের।” বাংলা ভাষার জন্য তার দরদ ছিলো মাসির মতো!
মি. গান্ধীর মাতৃভাষা ছিলো গুজরাটি। কিন্তু তিনি তার প্রথম ও প্রধান বই ‘হিন্দ স্বরাজ’ লেখেন হিন্দি ভাষায়। মাতৃভাষার জন্য তার দরদ থাকলেও ভারতের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তিনিও ছিলেন হিন্দির পক্ষে। হিন্দ স্বরাজে তিনি লেখেন, A universal language for India should be Hindi.
গান্ধীর মতো কংগ্রেসের বড় বড় নেতা যেমন- বালগঙ্গাধর তিলক, জওহরলাল নেহরু, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল প্রমুখ সবাই ছিলেন হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে। এমনকি বাঙালি নেতা সুভাষ চন্দ্র বসুও ছিলেন হিন্দির পক্ষে।
সব হিন্দু বড় সাহিত্যিক, হিন্দু রাজনীতিবিদ সবাই ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে হিন্দির পক্ষে। এটা দেখে কেউ মনে করতে পারেন যে, তখন মনে হয় হিন্দি ভাষা ছিলো ভারতের বেশিরভাগ মানুষের মুখের ভাষা। আদতে হিন্দি ছিলো ভারতের সংখ্যালঘু মানুষের মুখের ভাষা।
উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা
পাকিস্তান গঠিত হয় ১৯৪৭ সালে পাঁচটি প্রদেশ মিলে। পূর্ব বাংলা, সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ বর্তমান নাম খাইবার-পাখতানখোয়া নিয়ে। এ পাঁচ প্রদেশের প্রত্যেকেরই পৃথক পৃথক মাতৃভাষা ছিল। বাংলার ছিল বাংলা ভাষা, সিন্ধু প্রদেশের সিন্ধি ভাষা, পাঞ্জাবের পাঞ্জাবী ভাষা, বেলুচিস্তানের বেলুচ ভাষা, খাইবার পাখতানখোয়ার ভাষা ছিল পশতু। তাই পাঁচ প্রদেশের জনগণের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ ও রাষ্ট্রের যোগাযোগের জন্য একটি কমন ভাষা দরকার ছিল। এখানে যদি পাঞ্জাবের পাঞ্জাবী বা সিন্ধের সিন্ধি ভাষাকে রাষ্ট্রের কমন ভাষা করা হতো তা যেমন অন্য প্রদেশের জনগণ বুঝতে পারতো না, তেমনিভাবে বাংলা ভাষাকে যদি একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হতো, তাহলেও অন্য প্রদেশের লোকজন বুঝতে পারতো না। তাই রাষ্ট্রে বৃহত্তর স্বার্থে একটি রাষ্ট্রভাষা দরকার ছিল। তাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা চিন্তাভাবনা ও আলোচনা-পযালোচনা করেই একটি রাষ্ট্রীয় ভাষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আর সেটি ছিল উর্দু ভাষা। উল্লেখ্য, উর্দু কিন্তু পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেরই ভাষা ছিল না। এমনকি জিন্নাহর মাতৃভাষাও উর্দু ছিল না। জিন্নাহ শুধু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তটি ঢাকায় ঘোষণা করেছিলেন মাত্র।
জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমি পরিষ্কার ভাষায় আপনাদের জানিয়ে দিতে চাই যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অন্য কোনো ভাষা নয়। যারা আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, তারা মূলত পাকিস্তানের শত্রু।’
জিন্নাহ বলেছিলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। যদিও খুব কমসংখ্যক পাকিস্তানির মাতৃভাষা ছিলো উর্দু। এতে পাঞ্জাবীদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়নি। সিন্ধিদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়নি। বেলুচদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়নি। পশতুনদের মুখের ভাষাও কেড়ে নেওয়া হয়নি। মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়েছে শুধু বাঙালিদের। আর এ নিয়ে আবেগময় কবিতা ও গান লিখা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের পর কিছু ন্যারেটিভ তৈরি হয়। যার বেশিরভাগই ছিলো অতিরঞ্জিত ন্যারেটিভ। তার মধ্যে একটি হলো ‘মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া’। শিল্পী আবদুল লতিফের গানের মধ্যে এরকম লাইন খুঁজে পাই ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়, ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে পায়।’ অন্য ভাষা রাষ্ট্রভাষা হবার দরুন কখনো তো বাংলা ভাষা হারিয়ে যায়নি। উর্দু ভাষা রাষ্ট্রভাষা হবার দরুন মুখের ভাষা কেড়ে নেবার কথা যারা বলেন, সেটা একটা অতিরঞ্জিত আবেগ ছাড়া আর কিছু না।
আবহমানকাল থেকে এদেশের রাষ্ট্রভাষা ছিলো পালি, সংস্কৃত, ফারসি, ইংরেজি। বৌদ্ধ আমলে পালি, হিন্দু সেন আমলে সংস্কৃত, মুসলমান আমলে ফারসি এবং ইংরেজ আমলে ইংরেজি ছিলো রাষ্ট্রভাষা। প্রায় ৭০০ বছর ফারসি ছিলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা।কিন্তু এই দীর্ঘসময়ে বাংলাদেশের মানুষের মাতৃভাষা কেউ কেড়ে নেয়নি এবং সেটা সম্ভবও ছিলো না। এতো দীর্ঘসময় অন্য ভাষা রাষ্ট্রভাষা থাকার পরও কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ বাংলা ভাষা ভুলে যায়নি।
জিন্নাহ ও লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা উর্দু
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে ১৯ মার্চ ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলায় আসেন ১০ দিনের সফরে। রেসকোর্স ময়দান এই অঞ্চলের জাতীয় ভাষার/প্রাদেশিক ভাষার প্রশ্নে তিনি বলেন, Whether Bengali shall be the official language of this province is a matter for the elected representatives of the people of this province to decide. I have no doubt that this question shall be decided solely in accordance with the wishes of the inhabitants of this province at the appropriate time.
… People of this province to decide what shall be the language of your province.
অর্থাৎ এই অঞ্চলের আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা কী হবে, তা এই অঞ্চলের জনগণ ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে। একই কথা তিনি বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও।
এরই প্রেক্ষাপটে খাজা নাজিমউদ্দীন পরিষদে বাংলাকে পূর্ব বাংলার সরকারি ভাষা হিসেবে পাস করিয়ে আইনগত ভিত্তি দেন ৬ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে। এই আইন যখন পাস হয় তখনো পশ্চিম বাংলায় বাংলা সরকারি ভাষা হিসেবে মর্যাদা পায়নি। অর্থাৎ বাংলা ভাষা প্রথমবারের মতো এই অঞ্চলের জাতীয় ভাষা তথা প্রাদেশিক ভাষার মর্যাদা পায় পাকিস্তান আমলে।
কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর মত ছিলো উর্দুর পক্ষে। অনেকেই মনে করেন, জিন্নাহর মাতৃভাষা বুঝি উর্দু ছিলো। কিন্তু জিন্নাহর মাতৃভাষা ছিলো মহাত্মা গান্ধীর মতো গুজরাটি। এমনকি তিনি উর্দু ভাষা জানতেনও না। তার কাজকর্মের ভাষা ছিলো ইংরেজি।
Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan বলে তিনি যেই বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেটি পর্যন্ত ইংরেজিতে দিয়েছিলেন, উর্দুতে নয়। জাতীয় স্বার্থে গুজরাটিভাষী হয়েও গান্ধী যেমন চেয়েছিলেন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হিন্দিকে, তেমনি জিন্নাহও চেয়েছিলেন উর্দুকে। অবিভক্ত ভারতের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বিতর্ক ছিলো- উর্দু নাকি হিন্দি, কোনটি হবে ভারতের রাষ্ট্রভাষা? শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক মনে করতেন, উর্দু হচ্ছে ভারতীয় মুসলমানদের স্বভাবজাত ভাষা। ১৯৩৮ সালের ১ অক্টোবর কলকাতায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সভাপতির ভাষণে তিনি হিন্দির পরিবর্তে উর্দুকে ভারতের সাধারণ ভাষা (লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা) রূপে গ্রহণের প্রস্তাব করেন ।
বাংলাদেশের খাঁটি বাঙালি হয়েও ফজলুল হক বিয়ে করেছিলেন অভিজাত উর্দু পরিবারে, সেই হিসেবে তার ঘরের ভাষা ছিলো উর্দু। তিনি নিজেও স্বাচ্ছন্দ্যে উর্দু বলতে পারতেন। মওলানা ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বেশ ভালো উর্দু বলতে পারতেন।
Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan এই কথাটির জন্য বাংলাভাষীদের একটি অংশ জিন্নাহর কঠোর সমালোচনা করেন। অথচ রবীন্দ্রনাথেরা প্রায় একই কথা Hindi is the only possible national language for inter-provincial intercourse in India বলা সত্ত্বেও তারা বেখসুর খালাস পেয়ে যান; এমনকি তারা আবির্ভূত হন বাংলা ভাষার গুরু হিসেবে। জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে উর্দুকে ঘোষণা করেছিলেন লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে। লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা (Lingua Franca) হলো এমন একটি সাধারণ বা সংযোগকারী ভাষা, যা ভিন্ন ভিন্ন মাতৃভাষার মানুষ একে অপরের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। আর উর্দু হতে পারতো পাকিস্তানের একমাত্র ও যথাযথ লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা।
বাংলাদেশের একশ্রেণির জনগণের কাছে এইসব স্লোগানের মধ্যে মিথ্যা আবেগ থাকলেও সত্যের ছিটেফোঁটা নেই। ভারতে হিন্দি ভাষা অফিসিয়াল ভাষা হবার ফলে কি আসামসহ ভারতের বাংলাভাষীদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়েছে? কিংবা তামিল, তেলেগু এসব ভাষা কি হারিয়ে গেছে? আবার এই অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবার ফলে কি এই অঞ্চলের আদিবাসীদের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়েছে? এসব রাজনৈতিক ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, উর্দু ছিল দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের ভাষা। আর উর্দু ভাষাতেই কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণসহ অসংখ্য ইসলামী সাহিত্য রচিত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর মুজাদ্দেদ মাওলানা মওদূদীসহ ভারতের অধিকাংশ আলেমই উর্দু ভাষায় শত শত ইসলামী সাহিত্য রচনা করেছেন। উর্দু ভাষা ভারত পাকিস্তানের মুসলিমরা শিখলে যদি উর্দু ইসলামী সাহিত্য পড়ে ইসলাম আদর্শ বুঝা যায়, তাহলে তো হিন্দুত্ববাদী ও নাস্তিক কমিউনিস্টদের ইউটোপিয়ান মতবাদ তো জনগণ গ্রহণ করবে না। তাই ভারতের হিন্দুত্ববাদী ও নাস্তিক কমিউনিস্ট গোষ্ঠী উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে বাংলাভাষী মুসলিমদের বিভ্রান্ত করে। মুসলিম রাজনীতিক ও কর্মীদের একটি অংশ বিভ্রান্তও হয়, যার পরিণতিতে বাংলার মুসলিমরা উর্দু ভাষায় রচিত ইসলামী সাহিত্যের একটি বড় ভাণ্ডার থেকে বঞ্চিত হয়।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com