শরতের সাজ


৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৩৭

॥ আনোয়ারুল ইসলাম ॥

শরতের সকাল। আকাশটা যেন নীল রঙের বিশাল এক চাদর মেলে দিয়েছে। সাদা সাদা মেঘগুলো সেই চাদরের ওপর তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। গ্রামের পাশের নদীর ধারে কাশফুলের ঝোপগুলো বাতাসে দুলছে। ফুলগুলো দেখে মনে হয়, নদীর পাড়ে কেউ যেন সাদা পালকের ঝাড়ু রেখে গেছে।
সেদিন সকালেই মিঠু ঘুম থেকে উঠে জানালার বাইরে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, ‘মা! মা! শরৎ এসে গেছে!’
মা রান্নাঘর থেকে বললেন, ‘তা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু শরৎ এসেছে বলে এত চেঁচামেচি কেন?’
মিঠু গম্ভীর মুখে বলল, ‘শরৎ এসেছে অথচ শরতের সাজ নেই! এটা কি হয়?’
মা হেসে বললেন, ‘তাহলে সাজিয়ে দাও।’
ব্যস! মিঠুর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি ঢুকে গেল।
সে দৌড়ে তার বন্ধু পটল, ঝুমা আর বাবুর কাছে গিয়ে বলল, ‘শোনো! আজ আমরা পুরো গ্রামকে শরতের সাজে সাজাব!’
পটল চোখ বড় বড় করে জানতে চাইল, ‘কী দিয়ে?’
মিঠু বলল, ‘কাশফুল দিয়ে!’
বাবু বলল, ‘কাশফুল দিয়ে আবার গ্রাম সাজানো যায় নাকি?’
ঝুমা বলল, ‘যায়! তবে আগে কাশফুল আনতে হবে।’
চারজন মিলে নদীর পাড়ে গেল। কিন্তু কাশফুল তুলতে গিয়ে বিপদ।
পটল একটা বড় কাশফুলের ঝোপের মধ্যে ঢুকতেই— ‘হাঁচ্ছো.. ও.. ও!’
তারপর আবার— ‘হাঁচ্ছো.. ও..ও!’
মিঠু বলল, ‘কী হলো?’
পটল নাক চেপে ধরে বলল, ‘কাশফুল আমাকে পছন্দ করেনি!’
ঝুমা হেসে গড়িয়ে পড়ল।
বাবু বলল, ‘কাশফুল নয়, তোর নাকটাই তোকে পছন্দ করছে না!’
সবাই মিলে অনেক কাশফুল সংগ্রহ করল। তারপর তারা গ্রামে ফিরে এলো।
তারা সবাই সুন্দরগঞ্জের তারাপুর ইউনিয়নের ঘগোয়া দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ে। এ বিদ্যালয়ের পরিচিত সারাদেশে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল ও খেলাধুলায় প্রতি বছর দেশ সেরা হয়। প্রথমে তারা স্কুলের সামনে কাশফুল দিয়ে একটা বিশাল ফটক বানাল।
ফটকের ওপরে মিঠু লিখল— ‘শরতের রাজ্যে স্বাগতম!’
কিন্তু লেখাটা একটু বাঁকা হয়ে গেল।
পটল বলল, ‘এটা ‘শরতের রাজ্য’ না ‘শরতের রাস্তায়’ বোঝা যাচ্ছে না!’
মিঠু বলল, ‘চুপ! শিল্পীর কাজ নিয়ে প্রশ্ন করতে নেই।’
তারপর তারা স্কুলের বারান্দায় সাদা কাশফুলের মালা ঝুলিয়ে দিল। ঝুমা নীল কাগজ দিয়ে মেঘ বানাল। বাবু কাগজের পাখি বানিয়ে গাছে ঝুলিয়ে দিল।
এদিকে পটল একটা পুরোনো ছাতা নিয়ে এসে বলল, ‘আমি একটা বিশেষ শরতের মেঘ বানিয়েছি।’
মিঠু ছাতার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটা মেঘ?’
পটল গর্ব করে বলল, ‘হ্যাঁ। বৃষ্টি হলে মেঘের কাজ করবে, আর রোদ হলে ছাতার কাজ করবে!’
সবাই হেসে উঠল।
হঠাৎ স্কুলের সহকারী শিক্ষক মানিক, মোকলেসুর রহমান, বিনয় চন্দ্র, আ. রশিদ স্যার সেখানে এসে হাজির।
তারা চারদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাহ! তোমরা তো স্কুলটাকে একেবারে শরতের রাজপ্রাসাদ বানিয়ে ফেলেছ!’
মিঠু বলল, ‘স্যার, শুধু স্কুল নয়। আমরা আজ পুরো গ্রাম সাজাব।’
স্যাররা বললেন, ‘তাহলে একটা কাজ করো। গ্রামের বয়স্ক মানুষকেও অনুষ্ঠানে ডাকো।’
চার বন্ধু ছুটে গেল সবাইকে ডাকতে।
দুপুরের মধ্যে গ্রামের সবাই খবর পেয়ে গেল— আজ বিকেলে হবে ‘শরতের সাজ উৎসব।’
বিকেলে মাঠে শুরু হলো উৎসব।
কেউ কাশফুল দিয়ে মাথার মুকুট বানিয়েছে। কেউ নীল-সাদা পোশাক পরেছে। কেউ কাগজের মেঘ হাতে নিয়েছে এসেছে।
মিঠুর দাদি এসে বললেন, ‘আমার ছোটবেলায় শরৎ এলে আমরা নদীর ধারে গিয়ে কাশফুল দেখতাম। তখন তো এত আয়োজন ছিল না!’
মিঠু বলল, ‘দাদি, আজ আপনিও সাজবেন।’
‘আমি?’ বিস্ময়ে বললেন মিঠুর দাদি।
‘হ্যাঁ!’ বলল মিঠু।
সবাই মিঠুর দাদির মাথায় কাশফুলের মুকুট পরিয়ে দিল।
দাদি আয়নায় নিজের মুখ দেখে বললেন, ‘আহা! আমাকে তো রাজরাণি লাগছে!’
পটল সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘দাদি, রাজরাণি না। আপনি কাশফুলের রাণি!’
দাদি পটলের কান ধরে বললেন, ‘তাহলে তুই কী?’
পটল বলল, ‘আমি রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী!’
দাদি বললেন, ‘তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে একটু পায়েস খাওয়াতে হবে।’
পটলের মুখ চকচক করে উঠল। বলল, ‘আমি রাজি!’
এরপর শুরু হলো খেলাধুলা।
প্রথম খেলা— কাশফুল দৌড়।
প্রত্যেকের হাতে একটা করে কাশফুল। দৌড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে আবার ফিরে আসতে হবে।
পটল দৌড় শুরু করতেই তার পায়ের জুতার ফিতা খুলে গেল।
সে থামল না। এক পায়ে জুতা, অন্য পায়ে মোজা নিয়ে দৌড়াতে লাগল।
ঝুমা চিৎকার করে বলল, ‘পটল! তোর জুতা!’
পটল বলল, ‘ওটা পরে আনব!’
সবাই হেসে উঠল।
শেষ পর্যন্ত পটল দ্বিতীয় হলো।
সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘আমি জুতাসহ দৌড়ালে প্রথম হতাম।’
বাবু বলল, ‘তাহলে জুতাকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়াতে হতো!’
এরপর হলো মেঘ ধরার খেলা।
মাঠের এক পাশে কাগজের মেঘ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চোখ বেঁধে সেই মেঘ ধরতে হবে।
মিঠুর পালা এলো।
চোখ বাঁধা অবস্থায় সে এগোতে এগোতে হঠাৎ গিয়ে ধাক্কা খেল একটা কলাগাছের সঙ্গে।
‘ধপাস!’ করে পড়ে গেল।
মিঠু মাটিতে বসে বলল, ‘আমি মেঘ ধরতে গিয়ে কলাগাছ ধরেছি!’
সবাই এত হাসল যে স্যারও হাসতে লাগলেন।
শেষে হলো সবচেয়ে মজার প্রতিযোগিতা— শরতের সাজে কে সবচেয়ে সুন্দর?
কেউ কাশফুলের মুকুট পরল। কেউ সাদা জামা, নীল ফিতা পরল। কেউ কাগজের মেঘ হাতে নিল।
কিন্তু বিচারকরা অবাক হলেন, যখন দেখলেন, পটল মাথায় কাশফুলের মুকুট, গলায় পুরোনো গামছা, হাতে একটা ছাতা এবং কোমরে কলার খোসা বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘পটল, তোমার এই সাজের নাম কী?’
পটল গম্ভীর হয়ে বলল, ‘শরতের রাজা, বৃষ্টির পাহারাদার এবং কলার নিরাপত্তামন্ত্রী।’
মাঠে হাসির রোল পড়ে গেল।
শেষে বিচারকরা সিদ্ধান্ত নিলেন— সবচেয়ে সুন্দর সাজের পুরস্কার একজনকে নয়, সব শিশুদেরই দেওয়া হবে।
কারণ তারা শুধু নিজেই সাজেনি, পুরো গ্রামটাকেও আনন্দে সাজিয়ে তুলেছে।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। আকাশে কমলা আর গোলাপি রঙের মেলা বসেছে। কাশফুলগুলো বাতাসে দুলছে।
মিঠু চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঝুমা জানো, শরৎ আসলে শুধু আকাশ আর কাশফুলের নাম নয়।’
ঝুমা বলল, ‘তাহলে কী?’
মিঠু হেসে বলল, ‘শরৎ মানে সবাই মিলে আনন্দ করা।’
পটল সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আর শরৎ মানে পায়েস খাওয়া!’
বাবু বলল, ‘তোর কাছে সবকিছুর মানে খাবার!’
পটল বুক ফুলিয়ে বলল, ‘খাবার ছাড়া আনন্দ কি সম্পূর্ণ হয়?’
দূরে দাদির হাসির শব্দ শোনা গেল।
নদীর জলে সূর্যের আলো ঝিকমিক করছে।
সাদা কাশফুল দুলতে দুলতে যেন বলল— ‘শরৎ এসেছে, হাসি নিয়ে এসেছে।’
সেদিন থেকে গ্রামের সবাই প্রতি বছর শরতের শুরুতে ‘শরতের সাজ উৎসব’ করতে লাগল।
আর পটল?
সে প্রতি বছর একই কথা বলত— এবার আমাকে ‘খাবারমন্ত্রী’ বানাতেই হবে!’
লেখক : সহকারী শিক্ষক, দূড়াগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পীরগাছা, রংপুর।