মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি : বাংলাদেশের জন্য অপার সম্ভাবনা
২৫ আগস্ট ২০২৬ ২২:৩৭
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
বিশ্বে প্রায় ৬০টি মুসলিম দেশ রয়েছে। দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের নিজস্ব শক্তিতে সমৃদ্ধ। তবে তারা ঐক্যবদ্ধ নয়। ফলে পশ্চিমাবলয় কর্তৃক নির্যাতিত হচ্ছে কাশ্মীর থেকে ফিলিস্তিনসহ প্রায় সারা মুসলিম জাহান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম বিশ্বের তিন পরাশক্তি ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ সই করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর সামরিক অভিজ্ঞ পাকিস্তান, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি প্রভাবশালী সৌদি আরব এবং সামরিক প্রযুক্তিতে বিশ্বের অন্যতম সেরা শক্তি তুরস্ক। এর আগে অবশ্য পাকিস্তান-সৌদি আরবের মধ্যে ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত হয় ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ ‘এসএমডিএ’। ফলে ২০২৬ সালে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা, যুদ্ধবিমান এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়। অন্যদিকে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ বহু বছর ধরে যৌথ সামরিক কর্মসূচি বাড়িয়ে আসছে। ফলে মনে করা হয় ‘এসএমডিএ’রই সম্প্রসারণ ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’।
মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট : ৭ গত আগস্ট শুক্রবার মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদের পাশে আল-সাফা প্রাসাদে এক বৈঠক হয়। সেখানে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ (MJDA) সই করেন। চুক্তিটির কোনো এক সদস্যের ওপর আক্রমণ সকল সদস্যের ওপরই আক্রমণ বলে গণ্য হবে। অনেকটা ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর আদলে গঠিত। মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের এই ভূমিকা নয়াদিল্লিকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। ইতোমধ্যে ২০২৫ সালে পাকিস্তান অপারেশন বুনিয়ানুম মারসুস (Operation Bunyan-ul-Marsoos) নামে ভারতকে নাস্তানাবুদ করেছে। তবে দোহা থেকে আল-জাজিরার ওসামা বিন জাভাইদ বলেন, এই সমঝোতা মূলত বিশ্বের বৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার তিনটি দেশকে যৌথ শান্তি-নিরাপত্তার এক রূপরেখায় এনেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা চুক্তি শুধু একটা প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়, এটা মধ্যপ্রাচ্যের নতুন শক্তির সমীকরণ। চুক্তিটির ফলে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে তার রাজনৈতিক শক্তির প্রাধান্য পুনরুদ্ধারে সমর্থ হবে।
যদিও মিশরীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কেন আরব বিশ্বের একটি প্রধান সামরিক শক্তি মিশর এই চুক্তির বাইরে। অন্যদিকে দখলদার ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট পূর্বে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও তুরস্ককে ঘিরে এ ধরনের ‘অক্ষ’ গড়ে ওঠার আশঙ্কা করেছিলেন। একটি সৌদি সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে মক্কাকে ‘ঐক্যের শহর’ আখ্যায়িত করা হয়েছে। চুক্তিটিকে দীর্ঘ ঐতিহ্যের নবীজি মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগের ‘হিলফুল ফুজুল’ (ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার) থেকে শুরু করে, ২০০৭ সালের ইসরাইলি দখলদারিত্বর বিরুদ্ধে ফাতাহ-হামাস মক্কা চুক্তি এবং ২০১৯ সালের ‘মক্কা মুকাররমা সনদ’ এর অংশ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জার্মান মার্শাল ফান্ডের সাউথ অ্যান্ড ওয়াইডার ইউরোপ অফিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, পাকিস্তান-সৌদি আরবের ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ও হয়েছিল ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরাইলের হামলার পরপরই। তুরস্কবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক ওজগুর উনলুহিসারচিকলির ন্যায় তুরস্কের গাজিয়ানতেপের হাসান কালিওনচু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুরাত আসলানও আল-জাজিরাকে একই মত দেন। তারা বলেন, এইজোট শুধু অবৈধ ইসরাইলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে নয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাসেরও ইঙ্গিত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস : সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনে মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম প্রধান রূপকার ব্রেট ম্যাকগার্কের মতে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ট্রাম্প প্রশাসন আঞ্চলিক মিত্রদের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও প্রভাব যথেষ্ট বিবেচনায় না নিয়েই মিত্রদের অসন্তোষ করে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালায়। এ সময়ে মিত্র দেশগুলোকে পর্যাপ্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রদানেও ওয়াশিংটন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরান হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। একই সময়ে সৌদি আরবে হুথি হামলা, হরমুজ প্রণালী, বাব আল-মানদেব ও লোহিত সাগর দিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে লাগাতার হুমকি তৈরি হয়। ‘ফলে ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাবে আঞ্চলিক শৃঙ্খলা নতুন রূপ নেয়, মক্কা নিরাপত্তা চুক্তি তার অন্যতম ভূরাজনৈতিক লক্ষণ।’ আরটি আরবি-তে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ মতে, এই চুক্তি ১৯৫৫ সালের বাগদাদ চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ার বাইরে ঘোষিত প্রথম আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোট যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাসের ইঙ্গিত। একই মত আল-জাজিরাকে দেন সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসি। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গালফ ও অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক ইয়াসমিন ফারুক ভিন্ন কথা বলেন। তিনি বলেন, মক্কা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প নয়। বরং এটি ‘ব্যাকআপ প্ল্যান’। কারণ চুক্তিতে থাকা তিন দেশই যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার। ইরানে আগ্রাসনের পর থেকেই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মধ্যস্থতায় কাজ করেছে। অর্থাৎ আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরো বহুমুখী অংশীদারিত্ব ও ‘নর্মাটিভ ডিটারেন্স’ বা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে।
ইসলামিক বা মুসলিম ন্যাটো : ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ ইতোমধ্যেই ‘ইসলামিক বা মুসলিম ন্যাটো’ হিসাবে পরিচিত পেয়েছে। তবে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দিলেও ন্যাটোর মতো পূর্ণ সেনা সমর্থন দেয়নি। আবার ইরানে আগ্রাসনের সময় সৌদি আরবে হামলা হলেও পাকিস্তান এগিয়ে যায়নি। বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার বলছেন, ২০১৬ সালেও ‘ইসলামিক ন্যাটো’ জাতীয় সামরিক জোট গঠনের চেষ্টা হয়েছিল। সে সময় সৌদি উদ্যোগে ৩০টির বেশি মুসলিম দেশ মিলে আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘আইএমসিটিসি’ গঠন করে। তখন পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান রাহিল শরিফকে সৌদি নেতৃত্বাধীন ‘আইএমসিটিসি’ বা ‘ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশন’র প্রথম কমান্ডার করা হয়। দেশগুলো একত্রে সৌদি আরবে জাঁকজমকপূর্ণ ‘নর্থ থান্ডার’ সামরিক মহড়াও করে। সেই ‘ইসলামিক ন্যাটো’ কার্যকর হয়নি। তবে এবারের সামরিক জোট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি তিনটি অর্থনৈতিক, সামরিক ও পারমাণবিক পরাশক্তির সমন্বিত জোট। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার নিশ্চয়ই সময়মতো MJDA কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। তবে জোটটির দিকে সঙ্গত কারণেই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর তীক্ষè দৃষ্টি রয়েছে।
আঞ্চলিক শক্তির দৃষ্টি : বিবিসির ‘গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স করেসপন্ডেন্ট’ আনবারাসান ইথিরাজনের একটি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ‘উইল ইসলামিক ন্যাটো প্রোটেক্ট পাক-সৌদি-টার্কি’ শিরোনামে বিবিসির গ্লোবাল নিউজ পডকাস্ট অনুষ্ঠিত হয় ১১ অগাস্ট। সেখানে উঠে এসেছে ভারত কিছুদিন আগে সংযুক্ত আঞ্চলিক শক্তি আরব আমিরাতের সাথে সামরিক চুক্তির প্রাথমিক রূপরেখায় স্বাক্ষর করেছে। আবার চীনের কাছ থেকে পাকিস্তান সামরিক পর্যায়ের প্রযুক্তিগত সমর্থন পায়। জোটে পাকিস্তানের থাকা যেমন আঞ্চলিক শক্তি ভারতকে চিন্তায় ফেলছে।
কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড ইনক্লুসিভ জোট : ২০২৬ সালে ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইল আগ্রাসনের প্রথম সপ্তাহেই ইরানি পাল্টা আক্রমণে মার্কিন ঘাঁটিগুলো অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্কিন কিছু সেনা ও সরঞ্জাম জর্ডান ও ইসরাইলে সরিয়ে নিতে হয়। এই প্রক্রিয়ার বাইরে মিশর, সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে ‘আর ফোর’ বা ‘রিজিওনাল ফোর’ নামে একটি জোটও গঠন হয়। ইসলামিক বিপ্লবের দুই বছরের মাথায়, ১৯৮১ সালে সৌদি উদ্যোগে উপসাগরের ছয়টি দেশ একজোট হয়ে জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল গঠন করে। এই জোটে উপসাগরের সবাই আছে, নেই কেবল ইরান। এরপর ১৯৯০ সালে আরব দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডের নিরাপত্তায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেয়। কিন্তু নিরাপত্তার বদলে অশান্তি এসেছে অঞ্চলটিতে। ইরান মক্কা চুক্তিরও সদস্য নয়, তাকে যোগ দিতে আমন্ত্রণও জানানো হয়নি। যদিও তুর্কি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই চুক্তি ইসরাইল-ইরান সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে উদ্ভূত। চুক্তিটি ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক’, কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়।
সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক মধ্যপ্রাচ্য : ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না। বরং এমন অর্থনৈতিক সম্পর্ক দরকার, যাতে সংঘাত করলে সবারই বড় ক্ষতি হয়। ২০১৫ সালের একটি প্রবন্ধে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ এবং স্ট্যানফোর্ডের সমাজবিজ্ঞানী গ্যারি কক্স ও ব্যারি ওয়েইনগাস্ট ‘সহিংসতার ফাঁদ’ নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের মতে, যখন বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও উৎপাদন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন সহিংসতার খরচ বেড়ে যায়। ফলে যুদ্ধের বদলে সংযমই যুক্তিসংগত হয়ে ওঠে। কারণ সবাই কিছু না কিছু হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। ইতিহাসে এর উদাহরণ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ অর্থনৈতিক সংহতির মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাটিয়ে উঠেছে। শিল্প ও বাজার একীভূত হওয়ায় যুদ্ধ অযৌক্তিক হয়ে পড়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলেও এমন উদাহরণ আছে। বহুদিন ধরে ইরান ও আরব উপকূলের বন্দরগুলো বাণিজ্য, অভিবাসন ও পারিবারিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। ঐ সম্পর্কেরই ফল দুবাইয়ের উন্নয়ন। বর্তমানের বৈরিতা তুলনামূলক নতুন। এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি বড় প্রশ্নের উত্তর। কেন এত ধনী অঞ্চল হয়েও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান, জ্বালানি সম্পদ ও বাজারের দিক থেকে তারা স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের পরিপূরক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের সহায়ক। (অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক আদিল মালিক ও লেবানিজ আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জামাল ইব্রাহিম হায়দার) তবে শান্তির বার্তা হলো সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তুরস্কের পরিবহন ও অবকাঠামো মন্ত্রী আব্দুলকাদির উরালোগলু জানান, ইতোমধ্যেই তুরস্ক থেকে ইরাক হয়ে সৌদি আরব পর্যন্ত পরীক্ষামূলক হিজাজরেল চলাচল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আবার ওমান-ইরান বাণিজ্য বাড়ানোর মতো নতুন সম্ভাবনাময় কিছু উদ্যোগের কথাও বলছে যেটি দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। অন্যদিকে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম সদস্য বাংলাদেশ। ভূরাজনৈতিক কারণেও জোটটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা : সম্প্রতি লোহিত সাগরে নৌ চলাচল নিরাপত্তার লক্ষ্যে সৌদি উদ্যোগে একটি স্বতন্ত্র ‘মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ গঠিত হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ এই যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থায় যোগ দিয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হুসাইন বলেন, এই অ্যালায়েন্সের সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশ মাল্টিলেটারাল ফ্যাসিলিটিজ পাবে। কারণ বাংলাদেশেরও বিশাল মেরিটাইম এলাকা রয়েছে। সেটিরও নিরাপত্তা জরুরি। তবে ভূরাজনৈতিক কারণে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রবেশে কিছুটা ঝুঁকি দেখেন। আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাশিদুল ইসলাম জোটে প্রবেশে দেশটির নিরাপত্তার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন। তবে তিনি মনে এখনই জোটটিতে যোগদানের উপযুক্ত সময় নয়। তবে ‘মক্কা চুক্তি’-তে বাংলাদেশকে যুক্ত করার যে বিষয় ইসলামাবাদ ও আঙ্কারার গণমাধ্যমে এসেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি উঠে, কৌশলটি ভারতের সামরিক ও কৌশলগত বলয়ের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
যদিও বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম কোনো দেশের উদ্বেগকে পাত্তা দেননি। তিনি ইতিবাচকভাবে বলেন, কোনো মাল্টিলেটারাল জোটে যোগদান করা বা না করা ঢাকার নিজস্ব বিষয়।
এনডিটিভিতে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অদিতি ভাদুড়ির লেখা নিবন্ধে বলা হয়, সম্প্রতি তুরস্কের প্রভাবশালী দৈনিক ‘ইয়েনি শাফাক’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে উঠে আসে সৌদি-পাক-তুর্কি জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ঢাকাকে ‘ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক অসমতা কাটিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির’ দিকে অগ্রসর করবে। ভারতের আরো উদ্বেগের কারণ তুরস্ক ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ আধুনিকায়ন কর্মসূচির আওতায় বায়রাকতার ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নৌ করভেট প্রদানে সম্মতি দিয়েছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা শিল্প প্রযুক্তি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা। দেশটির নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ এবং সম্প্রতি প্রদর্শিত ৬,০০০ কিলোমিটার পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রোটোটাইপ ‘য়িলদিরিমহান’ আন্তর্জাতিক বাজারে ঝড় তুলেছে। নিবন্ধে আরও বলা হয়, সম্প্রতি ইসরাইল কেন্দ্রিক ‘ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর’ (আইএমইসি) থমকে যাওয়ায় তুরস্ক বিকল্প বাণিজ্য রুট হিসেবে নিজ দেশকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা জোটে ঢাকাকে ইসলামী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় স্বাগত জানাবে। যেটি ঢাকার অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষার জন্য নতুন সমীকরণ। অন্যদিকে দিল্লিকে তার পূর্বাঞ্চলীয় ঢাকার প্রতি ঐতিহ্যগত দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করতে হবে যেটি ঢাকার জন্য ইতিবাচক।
বিশেষজ্ঞদের মত ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিক্রিয়া বলছে, মুসলিম বিশ্বের তিন পরাশক্তির জোট মুসলিম উম্মাহ, মুসলিম উম্মাহর সদস্য ও ভূরাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। এ বিষয়ে ইস্তানবুল গেলিশিম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রহমত উল্লাহ সুনির্দিষ্টভাবে বলেন ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্টে’ যুক্ত হলে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ে ভারসাম্য তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে। তিনি আরো বলেন, দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক প্রযুক্তি সংযোজন সুবিধার পাশাপাশি জোটটি হতে পারে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার বিশাল সম্ভাবনাময় তোরণ।
তথ্যসূত্র : ইয়েনি শাফাক, দ্য মিডল ইস্ট আই, CNN, APP, বিবিসি, NDTV, আল-জাজিরা ইত্যাদি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com