ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্কের পর্যালোচনা

শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যায্য হিস্যা পায় না বাংলাদেশ


২৫ আগস্ট ২০২৬ ২২:১০

সোনার বাংলা ডেস্ক : ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে বেশিরভাগ সময়ে পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি বলে নয়াদিল্লিভিত্তিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএমপিআরআই) সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। থিঙ্কট্যাঙ্কের পর্যালোচনায় বলা হয়, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির অধীনে শুষ্ক মৌসুমের সংকটপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশে পানির প্রয়োজন যখন সবচেয়ে বেশি, তখনই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ধারিত ন্যূনতম পানি পাওয়া যায়নি।
পর্যালোচনায় উঠে আসে যে, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এমন কম প্রবাহের ২৭টি ঘটনার মধ্যে ১৫টিতেই বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম পানি ছাড়েনি ভারত। অর্থাৎ জরুরি প্রয়োজনের সময় ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই চুক্তি অনুযায়ী পানির হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ। চুক্তিটির ৩০ বছরের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে শুধু ফারাক্কা থেকে ছাড়া পানির হিসাব নয়, বাংলাদেশে বাস্তবে কত পানি পৌঁছেছে, সেটিও বিবেচনায় নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
আইএমপিআরআই’র ‘রিভিজিটিং ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ গঙ্গা ওয়াটার ট্রিটি (১৯৯৬)’ শিরোনামের পর্যালোচনাটি তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে। এতে ২০০৮-১৬ সময়ে ফারাক্কা থেকে বাংলাদেশকে দেয়া পানির পরিমাণ নিয়ে গবেষণাগুলোর ফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
কিম্বারলি এ থমাসের গবেষণা উদ্ধৃত করে আইএমপিআরআইয়ের পর্যালোচনায় বলা হয়, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহ কমে গিয়ে বাংলাদেশে পানির প্রয়োজন যখন সবচেয়ে বেশি ছিল, তখনই অধিকাংশ ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী ন্যূনতম পানি ছাড়েনি ভারত। ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এমন কম প্রবাহের ঘটনা ঘটেছে ২৭ বার। এর মধ্যে ১৫ বারই নির্ধারিত ন্যূনতম পানি পায়নি বাংলাদেশ। অথচ নদীতে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক থাকা এবং বাংলাদেশের জরুরি প্রয়োজন না থাকার সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চুক্তির পানিবণ্টন সূচি অনুসরণ করেছে ভারত। কোনো কোনো সময় নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশিও পানি ছাড়া হয়েছে। ফলে পর্যালোচনাটির মূল্যায়ন, চুক্তির মূল দুর্বলতা সামগ্রিক পানিবণ্টনে নয়; বরং বাংলাদেশের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি থাকার সময় ন্যূনতম পানি নিশ্চিত করতে না পারায়।
বাংলাদেশ ও ভারত ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সই করে। এতে প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টের পানি দুই দেশের মধ্যে ভাগ করার নিয়ম রয়েছে। প্রতি ১০ দিনের প্রবাহ হিসাব করে পানির ভাগ নির্ধারণ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ফারাক্কায় পানির প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে বাংলাদেশ ও ভারত সমান ভাগ পাবে। প্রবাহ ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক, অবশিষ্ট পানি পাবে ভারত। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং বাকি পানি পাবে বাংলাদেশ। ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময়কে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ বা খরার সময় হিসেবে ধরা হয়েছে। এ সময়ে পর্যায়ক্রমে উভয় দেশের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেক পানি নিশ্চিত রাখার কথা বলা হয়েছে। কোনো ১০ দিনে ফারাক্কায় প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে গেলে দুই দেশকে জরুরি আলোচনায় বসার বিধানও রয়েছে।
ফারাক্কা থেকে কত পানি ছাড়া হয়েছে, শুধু সেই হিসাবের ভিত্তিতে চুক্তি বাস্তবায়ন মূল্যায়ন না করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমপিআরআই। দুই দেশের যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি রিয়েল টাইম ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরির সুপারিশও করা হয়েছে।
গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে এমন বড় বাঁধ, অবকাঠামো বা পানি প্রত্যাহার প্রকল্প গ্রহণের আগে অন্য দেশকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রাখার কথা বলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
চুক্তি নবায়নে শুধু পানি ভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার পরামর্শও দিয়েছে আইএমপিআরআই। এতে লবণাক্ততা, মৎস্যসম্পদ, পলি পরিবহন, পানির মান ও নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম প্রবাহের সূচক যুক্ত করতে হবে। এসব সূচক দুই দেশকে যৌথভাবে পর্যবেক্ষণ ও নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যালোচনা করতে হবে।
এছাড়া গঙ্গা-পদ্মা নদী ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে নতুন চুক্তির আওতায় আনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পানিবণ্টনের পাশাপাশি বন্যার পূর্বাভাস, নৌ-চলাচল, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নদী পুনরুদ্ধারে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়াতে হবে।