কারিকুলামে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার বাস্তবভিত্তিক সংযোজন জরুরি
২৫ আগস্ট ২০২৬ ২২:০৯
স্টাফ রিপোর্টার : শিক্ষাঙ্গন থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেয়ার পরও কর্মজীবনে একজন লোক দুর্নীতিবাজ হন। শিক্ষাঙ্গনে এক সহপাঠী অন্য সহপাঠীকে তুচ্ছ ঘটনায় খুন পর্যন্ত করেন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকার পরও বাবা-মায়ের খোঁজ না নেওয়ার ঘটনা অহরহ। এসব কেন হচ্ছে? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের বিরাট একটি অংশ শ্রেণিকক্ষে নৈতিক শিক্ষা পাচ্ছে না। পরিবারেও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা আগের মতো নেই। একযুগ আগেও গ্রামের মসজিদে অথবা বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ধর্ম ও নৈতিকতা শেখানোর উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা মক্তবগুলো চালু ছিল। কিন্তু এখন আর সেই ব্যবস্থা নেই। শহরের শিক্ষার্থীরা একমুখী। যারা ধর্মীয় শিক্ষা নিচ্ছে, তারা ছাড়া বাকিদের আলাদাভাবে ধর্মীয় ও নৈতিকতা শেখার খুব বেশি সুযোগ নেই। বাসায় ধর্মীয় শিক্ষক রেখে শিশুদের ধর্ম ও নৈতিকতা শেখার পরিমাণ পরিসংখ্যানে উল্লেখ করার মতো নয়। ফলে শিশুরা বড় হচ্ছে, শিক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত আদর্শ নাগরিক হচ্ছে না। যারা ভালো হচ্ছেন, তাদের সংখ্যা খুবই কম।
দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন ও পরিমার্জনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাবে, তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। আনন্দময় শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার পাশাপাশি ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার পরিধি বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের সঙ্গে দায়িত্ববোধ, সততা, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও মানবিক গুণাবলি বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু দক্ষ নয়, আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কারিকুলামে নৈতিক শিক্ষার কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক সংযোজন জরুরি।
সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা, তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কথা জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। একইসঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমেও নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগের কথা জানা গেছে। ২০২৭ ও ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ‘খেলাধুলা’, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’-এর মতো বিষয় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশে শেখানো এবং শারীরিক-মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করাই এসব উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
শিক্ষাবিদদের মতে, খেলাধুলা ও আনন্দমুখর শিক্ষা শিশুদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে একজন শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ মানুষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এর সঙ্গে নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় প্রয়োজন। কারণ শুধু পাঠ্যজ্ঞান কিংবা দক্ষতা অর্জন করলেই একজন মানুষ সমাজের জন্য আদর্শ নাগরিক হয়ে ওঠেন না। তার মধ্যে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা, অন্যের অধিকার ও মতের প্রতি সম্মান, সত্য বলার মানসিকতা এবং দায়িত্ব পালনের চর্চাও থাকতে হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার শিক্ষার্থীদের সামনে যেমন জ্ঞান ও তথ্যের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নানা ধরনের ঝুঁকি। গুজব ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইনে অন্যকে হেয় করা, অশালীন ভাষার ব্যবহার, সহিংসতার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া কিংবা ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতার মতো আচরণ কম বয়সীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে নৈতিক শিক্ষা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিকতা, পরোপকার, সংযম, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও অন্যের প্রতি সম্মানবোধ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। তবে এই শিক্ষা যেন কেবল পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার একটি বিষয় হয়ে না থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। বাস্তব জীবনের উদাহরণ, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
কারিকুলাম পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক কীভাবে শ্রেণিকক্ষে নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা করাবেন, শিক্ষার্থীদের মতপার্থক্যকে কীভাবে ইতিবাচকভাবে মোকাবিলা করতে শেখাবেন এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরিতে কীভাবে ভূমিকা রাখবেন- এসব বিষয় শিক্ষক প্রশিক্ষণের অংশ হওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশেও শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবারকেও এ প্রক্রিয়ার অংশ হতে হবে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যা শেখে, তার বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয় পরিবার ও সমাজে। তাই সন্তানকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল ও ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শেখানোর পাশাপাশি সত্যবাদিতা, দায়িত্বশীলতা, বড়দের সম্মান, ছোটদের প্রতি স্নেহ, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিতে হবে।
আগামী দিনের শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের সময় জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের শুধু ‘কী শিখবে’ তা নয়, ‘কীভাবে ভালো মানুষ হয়ে উঠবে’Ñ এই প্রশ্নের উত্তরও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই খুঁজে দিতে হবে। আদর্শ নাগরিক গড়ার লক্ষ্য অর্জনে এ সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।